ক্যাপিটালিজমের কল্যাণ অনেকে দেখতে পেলেও মানব জীবনে এর উন্নয়নকল্প আমি সবসময় সংশয়ের সাথে দেখি। দৃক গ্যালারিতে 'কোম্পানিদেশ' (২০২৩) নামে একটা প্রামাণ্যচিত্র দেখেছিলাম। প্রামাণ্যচিত্রটা ছিল ৩০০ ফিট থেকে সুদূর পর্যন্ত নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্প এবং তার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের বাস্তুহারা হবার গল্প।
৩০০ ফিটের ঠিক ওপাশেই বলা যায় রূপগঞ্জ। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় প্রত্যেকের দুই-তিন থেকে শুরু করে অনেক বিঘা পর্যন্ত জমি ছিল। কিন্তু উন্নয়নের চাপে আজ তারা বাস্তুহারা। এক বয়স্ক লোক কান্নাচাপা চোখে বললেন, একটা সময় তারা নিজেদের জমিতে ৪০০-৫০০ মণ ধান ফলাতেন। সারা বছর নিজেদের খাবারের জন্য ৫০ মণ রেখে বাকিটা তারা হাটে বিক্রি করে দিতেন। বাড়ির আশেপাশে সবকিছু ফলতো। সাপ্তাহিক হাট থেকে কিনতে হতো শুধু নারিকেল তেল, লবণ আর কেরোসিন।
তারা ছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ। কোনো অতিথি এলে তাদের বসতে বলে জাল নিয়ে যেতেন পাশের নদীতে। কিন্তু এখন বিভিন্ন কোম্পানি সে-নদী প্রায় ভরাট করে ফেলেছে। সেখানে কোনো মাছ নেই; দূষণ আর প্রশস্ততা কমে আসার জন্য কোনো প্রাণী আর সেখানে বাঁচার অধিকার রাখে না। দেশি মাছ বাদে অন্য মাছে তাদের রুচি ছিল না। যে-মাছ ধরে তারা নদীতে ফেলে দিতেন সেটাই এখন তাদের বাজার থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। নিজেদের জমি বসুন্ধরা, আনোয়ার, বেক্সিমকো গ্রুপসহ অনেক বড়ো বড়ো কোম্পানির হাতে চলে যাওয়ার এখন তাদের অন্যের ক্ষেতে কাজ করতে হয়। কিন্তু সেই ‘অন্যের ক্ষেত’ও কয়েক মাস পর ক্ষেত থাকবে কিনা তার নিশ্চয়তা নাই।

অর্থনীতিতে 'কমন প্রপার্টি' বলে একটা টার্ম আছে। নদী, বন, জঙ্গল সাধারণ মানুষের কাজে লাগে, কারণ সেখান থেকে তারা নিজেদের পরিবারের জন্য মাছ, কাঠ ও জ্বালানি সংস্থান করতে পারে। কিন্তু ক্যাপিটালিজমে এর গুরুত্ব খুব কম। জিডিপিতে এসব কমন প্রপার্টি কোনো কিছু যোগ করতে পারে না। সেই নদী, বন দখল করে সেখানে যদি শিল্প-কারখানা দাঁড় করানো যায় তাহলে অর্থনীতির বিশেষ লাভ আছে। উন্নয়নের সাথে এই ক্যাপিটালিজমের কানেকশনও তীব্র। এদেশে উন্নয়ন মানেই শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আর যখন অবকাঠামো তৈরির প্রসঙ্গ আসে তখন বিভিন্ন শিল্পের অবতারণা হয়: ইট তৈরির শিল্প, সিমেন্ট তৈরির শিল্প, রড তৈরির শিল্প। কিন্তু এখানে সাধারণ মানুষের অবস্থানটা কী? তারা কোথায়? তারা শিল্পের মূল কারিগর, কিন্তু সামাজিক অবস্থান আর আয়ের হিসেবে সাধারণ শ্রমিক। আগের স্বনির্ভর অবস্থান পালটে এখন তারা পরনির্ভর।

আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ের বিষয় বলে যেটা মনে হয় সেটা হচ্ছে ক্যাপিটালিজমের সাথে এখন সভ্যতা জুড়ে গেছে। সভ্যতার মানে সে শুধু উন্নয়ন এটা আমি কখনো মানি নাই। সভ্যতা রিগ্রেসিভও হয়। সব সভ্যতা মনে করে তাদের জন্য বর্তমান সময় উৎকর্ষের উচ্চতম পর্যায়ে। কিন্তু যে সভ্যতায় জবাবদিহিতা থেকে না সেটা সামনে যাবার বদলে পেছনের দিকে যায়। পেছনে যাবার পথে যা পায় ধ্বংস করে শুধু। এই ধ্বংসের অন্য নাম জবরদখল। 'কোম্পানিদেশ' প্রামাণ্যচিত্রের চিত্রগ্রহণে ছিলেন সৌম্য সরকার ও ব্রাত্য আমিন। গবেষণা ও পরিচালনায় ছিলেন ব্রাত্য আমিন নিজেই।
এই তথ্যচিত্রে দেখা যায় শহর গ্রামের কাছে চলে আসছে। এটাই ভয়ের। ভালো একটা জিনিসের কাছে মানুষ স্বেচ্ছায় যাবে। কিন্তু যখন সেটা নিজের ইচ্ছার আপনার পাশে এসে দাঁড়ায় তখন ব্যাপারটা হয় উদ্বেগের। ভয়ের।









