‘সম্মানের’ টানাপড়েনে মধ্যবিত্ত নারী

উদিসা ইসলাম
০৮ মার্চ ২০১৭, ১৪:০০আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৭, ১৬:৩০

‘সম্মানের’ টানাপড়েনে মধ্যবিত্ত নারী

রাহেলা একজন পেশাজীবী নারী। তার স্বামীও কাজ করেন। স্বামীর তুলনায় রাহেলার উপার্জন বেশি। নিজস্ব ফ্ল্যাটে থাকেন তারা। প্রায় রাতে রাহেলাদের ফ্ল্যাট থেকে কলহের আওয়াজ পাওয়া যায়। রাতভর দাম্পত্য কলহ শেষে সকালে হাসি মুখেই রাহেলা অফিসে রওনা দেন।অফিস কিংবা অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিবেশী কারো সঙ্গেই সজ্জন রাহেলা সংসারের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে গল্প করেন। কখনও কখনও শরীরে থাকা কালসিটের দাগ নিয়েও। এক রাতে তার স্বামী তাকে বেজায় মারধর করছিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি সেই সাহায্য নিতে রাজি হন না বরং, তার স্বামী খুবই ভালো, কোনও সমস্যা নেই বলে প্রতিবেশীদের বিদায় করেন তিনি। এটা শুধু রাহেলার জীবনে গল্প নয়, বেশিরভাগ নারীরই জীবনের গল্প।

স্বাবলম্বী হওয়ার পরও কেন রাহেলারা মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করেন- এ বিষয়ে  সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই টানাপড়েন কেবল মধ্যবিত্ত নারীরই। মধ্যবিত্ত নারীদের চারপাশ ঘিরে থাকে পারিবারিক সম্মানের এক অদৃশ্য পর্দা রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে টিকিয়ে রাখা সেই পারিবারিক মর্যাদার ভিত্তি। তাই তারা এভাবেই সব সহ্য করে।

‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইম্যান সার্ভে ২০১৫’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনের দ্বারা কোনও না কোনও ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। এ নির্যাতন শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক বা যৌন হতে পারে। শহর এলাকায় এই হার ৫৪.৪ শতাংশ। আর গ্রাম এলাকায় ৭৪.৮ শতাংশ।

গবেষকদের মতে, স্বামীর হাতে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন নারীরা। মানসিক নির্যাতনের শিকার উচ্চবিত্ত নারীলা চিকিৎসার জন্য দ্রুত এলেও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা আসেন দেরিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিম্নবিত্তের নারীকে প্রতিদিনই জীবিকার জন্য ঘরের বাইরে যেতে হয়। সমস্যা মোকাবিলা করেই জীবনের পথ চলতে গিয়ে তারা সরব হয়েছেন। উচ্চবিত্ত নারীরা এই সমস্যা জয় করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। মধ্যবিত্ত নারীদের চারিপাশে পারিবারিক সম্মানের অদৃশ্য পর্দা রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে টিকিয়ে রাখা সেই পারিবারিক মর্যাদার ভিত্তি। তাই কোনও মেয়ে চাকরি করবে কি না সেটি নির্ভর করে স্বামী-শ্বশুরবাড়ির মর্জির ওপর।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিয়ের পরে নির্যাতিত হলে বিচার চাওয়া বা ঘর ছেড়ে আসবে কি না, সেটা নির্ভর করে পারিবারিক মর্যাদার প্রশ্নে নেওয়া বাপের বাড়ির সিদ্ধান্তের ওপর। তাই শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরাও তাদের সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করতে বাধ্য হয়।’

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পারিবারিক জীবনেও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খোলা শুরু হয়েছে। এই মুখ খোলার বিষয়টি যদি উত্তরাধিকার সম্পত্তি, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং বিয়ে বিচ্ছেদের অধিকার জাতীয় আইন সংশোধনের পৃষ্ঠপোষকতা পেতো, তবে সব শ্রেণির নারীর পক্ষেই মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা সহজ হতো। নারী আন্দোলনে এসব দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন মনে করেন, মধ্যবিত্তের সমাজকে নিয়ে ভাবনার জায়গা অনেক বেশি। নিম্নবিত্তের হারানোর কিছু নেই। কিন্তু মধ্যবিত্তের কাছে হারানোর সমাজ আছে, যে সমাজকে সে ভয় পায়। সমাজের কাছে আজীবন ভালো হওয়াই যেন নারীর লক্ষ্য হয়ে যাচ্ছে।

করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মধ্যবিত্তকে তার সমাজ ভয়, ঘরের ভয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

শ্রমিক আন্দোলন নেত্রী জলি তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গামেন্ট শ্রমিকেরা জীবন ধারণ বা বাঁচার প্রয়োজন যে লড়াই সেখানে তথাকতিত আব্রু কিংবা রাখটাক রাখা সম্ভব নয়। তাই সর্বোচ্ছ ডিগ্রিধারী একজন নারীর পক্ষ হয়তো রাত ৩টায় বাসায় ফেরা সম্ভব নয়। কিন্তু গার্মেন্ট শ্রমিকদের রাতে যে কোনও সময় ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরতে হয়। তা না হলে তার চাকুরি থাকে না। বাঁচার তাগিদেই তাকে এই লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের নারী ঘর থেকেও বের হতে চায় প্রয়োজনের তাগিদে। আবার আব্রু চিন্তা, সমাজের তথাকথিত ভালো নারী হয়ে থাকার চিন্তা তাকে স্বাচ্ছন্দ্যে তার কাজটি করতে দিচ্ছে না। ফলে তার টানাপোড়েন অনেক বেশি।

তিনি মনে করেন এই টানাপোড়েন থেকে বের হতে হলে আমাদের শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত নারীদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বিপ্লবী ধারার নারী মুক্তি আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।

/ইউআই/এসটি/

আরও পড়ুন:

জীবনযুদ্ধে হার না মানা ভ্যানচালক জায়দা বেগম

বখাটের বিরুদ্ধে নিজেই মামলা করলেন বিচারক

শাহজাদপুরে প্যানেল মেয়রের ওপর পৌরসভার দায়িত্ব অর্পণ

নারী দিবস উপলক্ষে রাজশাহীতে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন

ডিএসইর প্রধান সূচক ৩৩, সিএসইতে বেড়েছে ৬২ পয়েন্ট

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ

কী আছে ট্রাম্পের নতুন ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞায়’

আবারও আইনি লড়াইয়ের মুখে ট্রাম্পের ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’

ট্রাম্পের নতুন ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’য় সোমালিয়া ও সুদানের নিন্দা

ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ

নারী দিবসে বাংলা ট্রিবিউনের নেতৃত্বে আবারও নারীরা

পলিসি বাস্তবায়ন: নারীর অবস্থান হতাশাজনক

আজ নারী দিবস: নারীর চোখে বিশ্ব ভাবুন

ভালো নেই নারী কাউন্সিলররা

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম