X
রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪
৯ আষাঢ় ১৪৩১
সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘অস্ত্র’ দুর্নীতি

শেখ শাহরিয়ার জামান
২২ মে ২০২৪, ১৯:৪৬আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ১৯:৫৩

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদকে গত সোমবার (২০ মে) ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস অ্যাক্টের ৭০৩১(সি) ধারার আওতায় ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রকাশ্যে সেটি ঘোষণা করেছে। এই প্রথমবারের মতো কোনও বাংলাদেশিকে প্রকাশ্যে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।

এর আগে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘শাস্তিমূলক’ ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ সংক্রান্ত অস্ত্র (টুল) ব্যবহার করেছে। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে র‌্যাব এবং বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। সেটি দিয়েছিল মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট, অর্থাৎ তাদের অর্থ মন্ত্রণালয়। এবারেই প্রথম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘দুর্নীতি’ অস্ত্রটি ব্যবহার করলো মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুর্নীতি অস্ত্রের ভবিষ্যৎ ব্যবহার কী হবে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নের (অ্যাসেসমেন্ট) ওপর নির্ভর করবে। তবে এটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে প্রভাব রাখতে পারে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিকরা।

এ বিষয়ে সাবেক একজন কূটনীতিক বলেন, ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন অ্যাক্টের অধীনে প্রায় ১৫ বছরে ৬০টি দেশের ৫০০-এর বেশি রাজনীতিবিদ ও আমলা—যারা বিভিন্ন ধরনের সরকারি পদধারী (প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী ও সরকারের বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন বা আছেন), তাদের যুক্তরাষ্ট্র দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে।’

অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন অ্যাক্টের অধীনে যাদের নাম প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়, তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য সাধারণভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হলেও এর একটি ‘রাজনৈতিক বার্তা’ আছে বলে তিনি জানান।

এই সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন অ্যাক্টের অধীনে যাদের চিহ্নিত করা হয়, তাদের নাম যুক্তরাষ্ট্র গোপন রাখতে বা প্রকাশ করতে পারে। যদি গোপন রাখতে চায়, তাহলে শুধু ওই ব্যক্তিকে জানানো হয়। যখন যুক্তরাষ্ট্র কোনও রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায়, সাধারণত তখন তারা এটি প্রকাশ করে থাকে।’

উল্লেখ্য, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর সোমবার এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধানকে ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস অ্যাক্টের ৭০৩১(সি) ধারার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর ফলে আজিজ আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্রের অবনতি’ ও ‘দুর্নীতি’তে জড়িত থাকার কারণ দেখিয়ে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

তিন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি

সাধারণভাবে গুরুত্বের মাত্রা অনুযায়ী একটি দেশে তিন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি থাকে। প্রথমত, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী, দ্বিতীয়ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং তৃতীয়ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। এদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ সংক্রান্ত অভিযোগ করা সহজ।

এ বিষয়ে সাবেক একজন কূটনীতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয় এবং হয়েছে। এমনকি ২০ বছর আগে র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটির বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তারা (যুক্তরাষ্ট্র) করেছিল। শুধু তা-ই না, তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশনা, যেমন- হিউম্যান রাইটস রিপোর্ট বা অন্য রিপোর্টে বা বক্তব্যে তারা এটি উল্লেখ করে আসছে।’

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সবার ক্ষেত্রে আনা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—সাধারণ একজন আমলা বা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা যায় না বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ যে কারও বিরুদ্ধে আনা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র যদি দুর্নীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে কেউ নিরাপদ নয়।’

দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা

দুই দেশের মধ্যে বৈঠকে দুর্নীতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা সাধারণত কম হয়। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশের দুর্নীতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ দেখাচ্ছে।

গত বছরের আগস্ট মাসে স্টেট ডিপার্টমেন্টের গ্লোবাল অ্যান্টি-করাপশন কোঅর্ডিনেটর রিচার্ড নেফিউ ঢাকা সফর করেন এবং পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব মো. মাহবুব হোসেনসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনায় দুই দেশ একসঙ্গে কীভাবে কাজ করতে পারে—বিশেষ করে অর্থপাচারের বিষয়ে, সেটি নিয়ে আলোচনা করেন।

ওই সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘আমার ধারণা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘দুর্নীতি অস্ত্র’ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে তাদের অ্যাসেসমেন্ট আগেই শুরু হয়েছে এবং এর প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে।’

রাজনৈতিক বার্তা

বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার, যেমন- গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সুশীল সমাজের গুরুত্ব, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশ করার স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সরব ছিল। সম্প্রতি ঢাকা সফরের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া-বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু সাংবাদিকদের কাছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দুই দেশের মধ্যে ‘টেনশন’ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে তারা পেছনে তাকাতে চান না। ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি দিতে চান। তবে, একইসঙ্গে দুই দেশের জন্য হার্ড ইস্যু (অস্বস্তিকর)—এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

এ বিষয়ে সাবেক আরেক কূটনীতিক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নাগরিক অধিকার বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি। তাদের মুখের কথা যাই হোক, তাদের যে মূল অবস্থান, সেটি থেকে তারা সরেনি।’

সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দুই দেশের মধ্যে উঁচু পর্যায়ের স্তর থেকে বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ ও আলোচনা আরও বাড়ানো দরকার রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আলোচনার কোনও বিকল্প নেই।’

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশের যেমন উদ্বেগ আছে, তেমনই বাংলাদেশের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে, সেটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেরও উদ্বেগ আছে বলে তিনি জানান।

সাবেক ওই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর এক নম্বর শক্তি। তারা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে তাদের বলয়ে নিতে চায় এবং এটি কোনও গোপন বিষয় নয়। তারা বাংলাদেশে প্রেডিক্টেবল বিহেভিয়ার (অনুমানযোগ্য আচরণ) প্রত্যাশা করে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক কীভাবে বজায় রাখা যায়, সেটি বাংলাদেশকে খুঁজে বের করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে ঢাকার কাছে দিল্লি একটি নির্ভরযোগ্য বন্ধু হতে পারে বলে তিনি জানান।

আরও পড়ুন:

‘ব্যক্তিগত দায়ে’ সাবেক সেনাপ্রধানকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ভিসানীতি নয়, অন্য আইনের প্রয়োগ সাবেক সেনাপ্রধানের ওপর: ওবায়দুল কাদের

জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের বিষয়ে আগেই জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

বাংলা ট্রিবিউনকে সাক্ষাৎকার: নিষেধাজ্ঞায় ‘বিস্মিত’ জেনারেল আজিজ, বললেন ‘এতে লাভ নেই

জেনারেল আজিজ ইস্যুতে মন্তব্য করতে চান না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
মার্কিন প্রশাসনের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিষয়ক কর্মকর্তার পদত্যাগ
যৌথ সামরিক মহড়া: দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছেছে মার্কিন রণতরি
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় নিহত ৩, আহত আরও ১০
সর্বশেষ খবর
ইসরায়েলি বন্দরে চারটি জাহাজে হামলার দাবি হুথিদের
ইসরায়েলি বন্দরে চারটি জাহাজে হামলার দাবি হুথিদের
টানা দুই হ্যাটট্রিকে ইতিহাসের পাতায় কামিন্স
টানা দুই হ্যাটট্রিকে ইতিহাসের পাতায় কামিন্স
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ
তাসকিনকে একাদশে না দেখে বিস্মিত মাশরাফি
তাসকিনকে একাদশে না দেখে বিস্মিত মাশরাফি
সর্বাধিক পঠিত
দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেমিফাইনালে ওঠার সমীকরণ
দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেমিফাইনালে ওঠার সমীকরণ
নায়িকার বিয়ে মাদ্রাসায়, দেনমোহর ৯ টাকা
নায়িকার বিয়ে মাদ্রাসায়, দেনমোহর ৯ টাকা
তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা ভারতের
তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা ভারতের
দীর্ঘায়ু পেতে চাইলে এই ৭ সুপার ফুড রাখুন পাতে
দীর্ঘায়ু পেতে চাইলে এই ৭ সুপার ফুড রাখুন পাতে
ইন্দো-প্যাসিফিক ওশেনস ইনিশিয়েটিভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের
ইন্দো-প্যাসিফিক ওশেনস ইনিশিয়েটিভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের