ওয়াহেদ ম্যানশনের কেমিক্যাল গোডাউনই কী অগ্নিকাণ্ডের কারণ

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ০৬:৫৩, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:১৬, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯




বিস্ফোরণে বডি স্প্রের ক্যান ও প্রসাধন সামগ্রীর  প্লাস্টিক বোতল ছড়িয়ে পড়েরাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত গ্যাস সিলিন্ডার না গোডাউনে থাকা কেমিক্যাল থেকে এ নিয়ে বিতর্ক ছিল শুরু থেকে। তবে এই বিতর্কের মধ্যে দুটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের পর আগুনের সূত্রপাত নিয়ে সন্দেহের তীর যাচ্ছে ওয়াহেদ ম্যানশনে থাকা বডি স্প্রে, পারফিউম ও কেমিক্যাল গোডাউনের দিকেই।

ফুটেজ দুটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই আগুনের পাশাপাশি বডি স্প্রের ক্যান ছড়িয়ে পড়ছে। রাস্তায় থাকা পিকআপ ভ্যানের সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে স্থানীয়রা জানালেও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে উপর থেকে বডি স্প্রের ক্যানসহ জিনিসপত্র নিচের দিকে পড়ছে। সেই সঙ্গে একের পর এক বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬৭ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁচটি ভবন। এই পাঁচটি ভবনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ওয়াহেদ ম্যানশনের। আর এই ওয়াহেদ ম্যানশনের প্রতিটি ফ্লোরে বিস্ফোরণ হওয়ার মতো প্রচুর পরিমাণে কেমিক্যাল মজুদ ছিল বলে জানিয়েছে বাড়িটির বাসিন্দারা। নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউন; দোতলায় পারফিউম-বডি স্প্রের গোডাউন, রিফিল করার কাঁচামাল; তৃতীয় তলায় চার ইউনিটের মধ্যে একটিতে পারফিউম-বডি স্প্রের গোডাউন; চতুর্থ তলায় কসমেটিক ও পারফিউম-বডি স্প্রের গোডাউন ছিল।

রাজমহল হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা একটি ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ১০টা ৩২ মিনিটে প্রথমে একটি ছোট বিস্ফোরণ ও তার এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের ব্যবধানে আরও একটি বড় বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে উপর থেকে জিনিসপত্র ভেঙে নিচে পড়ে যায়। এই নিচে পড়া জিনিসপত্রের মধ্যে বডি স্প্রের ক্যান ও কার্টন নিচে পড়তে দেখা গেছে। একই সঙ্গে ভারি জিনিসপত্রও উপর থেকে নিচে পড়তে দেখা যায়।

ঘটনাস্থলের পাশে থাকা মসজিদ সংলগ্ন একটি ভবনের সিসিটিভিতে ধারণ করা অপর একটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেই ফুটেজেও বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে বডি স্প্রের ক্যান উড়ে এসে মসজিদের গলিতে পড়তে দেখা যায়।

অগ্নিকাণ্ডের পর ওয়াহেদ ম্যানশনের ফ্লোরগুলো ঘুরে দেখা গেছে, পারফিউ ও বডি স্প্রের বিশাল মজুদ ছিল তাতে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা কোনও একটি ক্যানে অতিরিক্ত গ্যাসের প্রেসারের কারণে বিস্ফোরিত হতে পারে পুরো গোডাউন।

ওয়াহেদ ম্যানশনের গোডাউনগুলোতে কেমিক্যালের উপস্থিতি ছিল বলে এরই মধ্যে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তদন্ত কমিটির সদস্য ও ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান।

অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে দেখা মেলে পারফিউম ও প্রসাধন সামগ্রীর প্লাস্টিক বোতলতিনি বলেন, ‘ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এছাড়া আরও অন্যান্য কেমিক্যাল ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে।’

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোথা থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে বা আগুনের সূত্রপাত কীভাবে, তা তদন্ত প্রতিবেদনের আগে বলা যাচ্ছে না। আমরা ভিডিওগুলো পেয়েছি, প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছি। ঘটনাস্থলে কী কী উপাদান পাওয়া গেছে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদনে আশা করছি মূল ঘটনা উঠে আসবে।’

ওয়াহেদ ম্যানশনে থাকা গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে কিনা? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণ হওয়া বা আগুন লাগার মতো অনেক উপাদান এই ভবনে মজুদ ছিল। এখন কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত তা সময় হলে জানা যাবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

গোডাউনে থাকা অসংখ্য বডি স্প্রে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিস্ফোরিত হয়ে অনেক বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বডি স্প্রেতে বিস্ফোরণ হওয়ার মতো অনেক উপাদান থাকে। আর একসঙ্গে অনেকগুলো মজুদ করে রাখলে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা যে কোনোভাবে একটি বিস্ফোরিত হলে বড় আকারের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।’

আরও পড়ুন:
চকবাজার ট্র্যাজেডি: ৪৮ মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর
আগুন দেখে শাটার বন্ধ, ভেতরে দগ্ধ হয়ে বেশিরভাগের মৃত্যু
মুহূর্তেই মৃত্যুপুরী! (ফটোস্টোরি)

/আরজে/টিটি/

লাইভ

টপ