১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড় ‘ফণী’

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ১৩:৪৪, মে ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৮, মে ০২, ২০১৯




ঘূর্ণিঝড় ফণী

অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ ঘনীভূত হয়ে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। শুক্রবার (৩ মে) সন্ধ্যা নাগাদ ঝড়টি বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গত ১০ বছরের মধ্যে শক্তিশালী ঝড় হবে এই ফণী। বর্তমানে এর গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ১৮০ কিলোমিটার। তবে ভারতের ওপর দিয়ে আসার কারণে ও নিজেদের প্রস্তুতি থাকায় বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি কম হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবহাওয়া দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত দশ বছরে দেশে মোট পাঁচটি বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ‘মোরা’। ২০১৭ সালের ৩০ মে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাত হেনেছিল। এর গতি ছিল ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার।

এর আগে, ২০১৬ সালের ২১ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ আঘাত হানে। এর গতিবেগ ছিল ১২৮ কিলোমিটার। ২০১৩ সালের ১৬ মে আসে মহাসেন, যার গতি ছিল ১০০ কিলোমিটার।

আর ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই আসে কামেন। এর গতি ছিল ৬৫ কিলোমিটার। আর ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানে আইলা। এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার।

সিনিয়র আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, শুক্রবার (৩ মে) বিকাল নাগাদ ফণী ওড়িষা উপকূলে উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসেবে সন্ধ্যার দিকে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানার কথা।

ঝড়ের শক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, ঝড়ের শক্তি বোঝা যায় বাতাসের গতি দিয়ে। এখন যে গতি অর্থাৎ ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ১৮০ কিলোমিটার, একে বলা হয় অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়। তবে ভারত উপকূল হয়ে এলে ফণীর গতি কিছুটা কমতে পারে। আমাদের প্রেডিকশন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে এটি হয়তো ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিবেগে বয়ে যেতে পারে। একে আমরা ঘূর্ণিঝড় বলি।

সংশ্লিষ্ট অনেকেই ফণীকে আইলার সঙ্গে তুলনা করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের লেকচারার বিএম রাব্বি হোসেইন বলেন, ফণীর গতি আইলার চেয়েও অনেক বেশি। ফণী এখন ওড়িষার দিকে আছে। এটি এখনও বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে। ঝড়টি যদি ভারতে আগে আঘাত হানে, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সেখানে বেশি হবে। পাশাপাশি সেখানেই বাতাসের গতি অনেকখানি কমে যাবে। সেখানে অনেক জায়গায় বাধা পাবে, বৃষ্টি হয়ে পানি যখন ঝরে যাবে তখন এর শক্তিও অনেক কমে যাবে। পরে ভারত হয়ে এটি সাতক্ষীরা-খুলনা অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার কথা। তবে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা কমে যাবে, কারণ সেখানে আমাদের সুন্দরবন আছে। এই বন বড় বাধা হিসেবে কাজ করবে। ফলে ঝড়ের গতি আরও কমে যাবে। বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হতে পারে, কিন্তু গতি ও ক্ষতি কমে যাবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আইলা’র সময় বাংলাদেশের কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। সে সময় ক্ষয়ক্ষতি বেশি ছিল, কারণ আমাদের প্রস্তুতি ছিল না। কিন্তু এখন বাংলাদেশ অনেক আপডেট। ঝড় সৃষ্টির পর প্রায় সাতদিন সময় পাওয়া গেছে। সরকারের প্রস্তুতি ভালো থাকলে ক্ষতির পরিমাণ খুব কম হওয়ার কথা। তবে ফণী যদি ভারতে আঘাত না হেনে সরাসরি বাংলাদেশে আঘাত হানে, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ফণীর বর্তমান ব্যাস প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার। ভারতের উপকূল হয়ে আসলেও এর এক পাশ সাগরেই থাকবে, ফলে সে আবার সাগর থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তাই ভারত হয়ে আসলেও ঝড়ের শক্তি খুব বেশি কমে যাবে বলে মনে করেন না আবহাওয়াবিদরা।

এদিকে দুর্যোগ ত্রাণ ও ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কালাম বলেন, ঝড়ের গতি পরিবর্তন হয়। এটি এখন বাংলাদেশ থেকে ৯১৫ কিলোমিটার দূরে আছে। ঝড়টি যে সময় আসবে, তখন এর গতি হয়তো পরিবর্তন হবে। কিন্তু গতির কারণে এটি এখন অনেক শক্তিশালী। শক্তিশালী মনে করেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, স্কাউট, রেড ক্রিসেন্টসহ আমাদের যারা ভলান্টিয়ার আছে তারা এখন এলাকায় এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাইকে সবাইকে সতর্ক করছে। আমরা ইভ্যাকুয়েশন প্ল্যান তৈরি করেছি এদেরকে শেল্টারে নিয়ে আসার জন্য। সড়ক ও জলপথে তাদের সরিয়ে নিতে যে পরিমাণ যানবাহন লাগবে, যেমন- নৌকা, ট্রাক ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শুকনা খাবার, চিকিৎসা, খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি জানান, ঝড়ের অবস্থা বুঝে লোকজনকে ঘরবাড়ি ছেড়ে আসার নির্দেশনা দেওয়া হবে।

ফণী বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া বিভাগের বিশেষ বুলেটিনে জানানো হয়, ফণী বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১০৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১০২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।

আরও পড়ুন- 

শুক্রবার সন্ধ্যায় আঘাত হানতে পারে ‘ফণী’

‘ফণী’ মোকাবিলায় সরকারের যত প্রস্তুতি

‘ফণী’র সতর্কতায় সারাদেশে নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’: চট্টগ্রাম বন্দরের সব জাহাজ বহির্নোঙরে, তিনটি কন্ট্রোল রুম

বরিশালে ‘ফণী’ মোকাবিলায় প্রস্তুত ২৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও ২৩২টি আশ্রয়কেন্দ্র

ধেয়ে আসছে ‘ফণী’: খুলনায় সব উপজেলায় সতর্কতা, জরুরি কন্ট্রোল রুম

/টিটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ