নিজস্ব ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বিশ্বদরবারে অবস্থান তৈরির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৭:৫৮, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৯, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (ফাইল ছবি)নিজস্ব মেধা ও মননের সাহায্যে নিজস্ব ভাষার চলচ্চিত্র তৈরি করে বিশ্বদরবারে অবস্থান তৈরির জন্য নির্মাতা, নাট্যকার, শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে প্রতিভার ঘাটতি নেই উল্লেখ করে তিনি দেশের চলচ্চিত্রের বিকাশে প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। 

২০১৭ ও ২০১৮ সালের ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ প্রদান শেষে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। রবিবার (৮ ডিসেম্বর) বিকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তথ্য মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে আমাদের দেশের মানুষ মেধাবী। আমরা দেখেছি আমাদের শিল্পীরা পাশের দেশে গেলে অনেক ভালো কাজ করেন এবং সেখানে একটা স্থান করে নিতে পারেন। তাহলে আমাদের দেশে কেন পারবো না আরও উন্নতমানের ছবি করে অন্য দেশের মানুষকে আকর্ষণ করতে? অবশ্য অন্য দেশ থেকেও শিল্পীরা আসেন। আমরা তাদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখতে পারবো। তবে আমরা নিজস্ব মেধা ও মনন দিয়ে আমাদের নিজস্ব চলচ্চিত্র তৈরি করে বিশ্বদরবারে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করে নিতে পারবো। সে বিষয়ে আরও দৃষ্টি দেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।

আজকের বাংলাদেশ ডিজিটাল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আমরা উৎক্ষেপণ করেছি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে এখন আর বিদেশি মুদ্রায় স্যাটেলাইটের ভাড়া দিতে হচ্ছে না। ফলে তাদের যে টাকাটা বেচে যাচ্ছে সেটি তারা ব্যবহার করতে পারেন আমাদের শিল্পীদের উন্নয়নে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে কোনও প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না। আমরা সরকারে আসার পরে প্রথম মেয়াদে প্রথম প্রাইভেট সেক্টরকে উন্মুক্ত করে দেই। তাতে অনেকের কর্মসংস্থান যেমন হয়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেকের মেধা বিকাশের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের দেশকে বিশ্বদরবারে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি। এদিকে আরও আমাদের দৃষ্টি দেওয়া দরকার। ইতোমধ্যে ৪৪টি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুমতি দিয়েছি। এরমধ্যে ২৪টা এখন চালু আছে। ১৫টা এখন সম্প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৫টা এফএম ও ১৮টা কমিউনিটি রেডিও দিয়েছি। এভাবে আমরা মিডিয়াকে জনগণের হাতের কাছে, একেবারে দোরগোড়ায় নিয়ে যাচ্ছি। কাজেই ডিজিটাল যুগের মাধ্যমেই আমরা পারি আরও উন্নতমানের কাজ দেখাতে।

তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে আসছে। তাদের যে ভাবনা, চেতনা, মননশীলতা, সেগুলো কাজে লাগানো দরকার। যুগটা আধুনিক যুগ এবং পরিবর্তনশীল যুগ। এই পরিবর্তনশীল যুগের সঙ্গে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সেভাবে আমাদের কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি, যেখানে আমাদের তরুণ নির্মাতারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেদের আরও বিকশিত করতে পারবে। আমাদের যারা অভিজ্ঞ আছে তাদের কাছ থেকেও তারা অনেক কিছু শিখতে পারবে। চলচ্চিত্র ও নাটকের শাখায় আমাদের তরুণ প্রজন্ম যাতে আরও বেশি করে আসে, সংস্কৃতি চর্চার দিকে যাতে আরও বেশি মনোনিবেশ করে, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কলকাতার সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউটের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমরা চাই আমাদের চলচ্চিত্রের এই অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। বিশ্বদরবারে আমরা একটা স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছি। সংস্কৃতি জগতেও ভালো কিছু করে আমাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারি।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে মুজিববর্ষ এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের কথা জানিয়ে বলেন, জাতির পিতার জীবনী নিয়ে ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নিমার্তা শ্যাম বেনেগাল একটি জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র বানাবেন। আরও কিছু নির্মাতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করবেন। যারা এসব ভিডিও নির্মাণ করেছেন তাদের অভিনন্দন জানাই। আজ জাতির পিতার নাম শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বে স্থান পেয়েছে। জাতির পিতার ভাষণ বিশ্বের প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে আর কেউ দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত থাকবে না। বাংলাদেশের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকবে।

এ সময় তিনি পুরস্কারপ্রাপ্ত সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। এখানেই যাতে শেষ না হয়, সবাইকে আরও এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে এই আয়োজনে এত তাড়াহুড়া না করে যাতে আরও গুছিয়ে করা যায় এবং যিনি পুরস্কার পাচ্ছেন তার একটি করে ভিডিও ক্লিপ যাতে পুরস্কার দেওয়ার আগে দেখানো যায় সে বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

দেশের চলচ্চিত্রের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি খুব বেশি সিনেমা ও টিভি দেখার সুযোগ পাই না। ফাইল দেখতে দেখতে আর নথি পড়তে পড়তেই দিন শেষ হয়ে যায়। তবে দেশে সুযোগ না পেলেও আমি বিদেশে যখন যাই বিমানে উঠলেই সিনেমা দেখি। আমাদের বাংলা বইগুলো খুঁজে খুঁজে পড়ি। আমাদের দেশের সিনেমাগুলো এত চমৎকার যে, যখন যেটা দেখি আমার খুব ভালো লাগে। এ সময় আরও জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নির্মাতাদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

বাংলাদেশের টিভি নাটকের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মাঝে মাঝে টিভি নাটক দেখি। অন্য দেশের টিভি অনুষ্ঠানগুলোতে শাড়ি, গয়না, কম্পিটিশন আর খুনসুটিপনা দেখি কিন্তু, আমাদের নাটকে এত বেশি জীবনস্পর্শী বিষয় থাকে, তাতে অনেক কিছু জানা যায়, শেখা যায়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়ন- আমাদের নাটকগুলো সব থেকে শ্রেষ্ঠ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ২০১৭ ও ২০১৮ সালের যথাক্রমে ২৭ এবং ২৮টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ীদের  হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। গত ৭ নভেম্বর এসব বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল।

পুরস্কার প্রাপ্তদের মধ্যে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান এবং অভিনেত্রী সালমা বেগম সুজাতাকে যৌথভাবে চলচ্চিত্র জগতে তাদের অবদানের জন্য ২০১৭ সালের আজীবন কৃতিত্বের পুরস্কার অর্জন করেন। আর অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক এমএ আলমগীর এবং অভিনেতা প্রবীর মিত্র ২০১৮ সালের আজীবন পুরষ্কার অর্জন করেছেন।

২০১৭ সালের সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে ‘ঢাকা অ্যাটাক’ এবং ২০১৮ সালের পুরস্কার জিতেছে ‘পুত্র’।

বদরুল আনাম সৌদকে তার চলচ্চিত্র ‘গহিন বালুচর’ ২০১৭ সালের জন্য সেরা পরিচালক এবং মুস্তাফিজুর রহমান মানিক তার ‘জান্নাত’ চলচ্চিত্রের জন্য ২০১৮ সালের জন্য সেরা পরিচালকের পুরষ্কার পেয়েছেন।

শাকিব খান রানা, যিনি সিনেমায় শাকিব খান নামে সুপরিচিত তিনি এবং মাহবুবুল আরেফিন শুভ যৌথভাবে ২০১৭ সালে ‘সত্তা’ এবং ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন।

ফেরদৌস আহমেদ এবং সাদিক মো. সাইমন (সাইমন সাদিক) ২০১৮ সালের জন্য যথাক্রমে ‘পুত্র’ এবং ‘জান্নাত’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন।

‘হালদা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য নূসরাত ইমরোজ তিশা ২০১৭ সালের সেরা অভিনেত্রীর পুরষ্কার পেয়েছেন এবং ২০১৮ সালের সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার ‘দেবী’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জয়া আহসান।

‘গহিন বালুচর’ এ অভিনয়ের জন্য ২০১৭ সালের সেরা সহ-অভিনেতার পুরষ্কার পেয়েছেন মো. শাহাদাত হোসেন এবং ‘জান্নাত’-এ অভিনয়ের জন্য ২০১৮ সালের সেরা সহ-অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন আলী রাজ।

‘গহিন বালুচর’ ও ‘হালদা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০১৭ সালের সেরা সহ-অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন যৌথভাবে সুবর্ণা মুস্তাফা ও রুনা খান এবং ‘মেঘকন্যা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০১৮ সালের পুরস্কার পেয়েছেন সুচরিতা।

২০১৭ সালের ‘হালদা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা খলনায়কের পুরস্কার পেয়েছেন জাহিদ হাসান এবং ২০১৮ সালের ‘একটি সিনেমার গল্পো’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা খলনায়কের পুরস্কার পেয়েছেন সাদেক বাচ্চু।

‘তুমি রবে নিরবে’ চলচ্চিত্রের জন্য ২০১৭ সালের সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন এম ফরিদ আহমেদ হাজরা এবং ‘জান্নাত’ চলচ্চিত্রের জন্য ২০১৭ সালের সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন ইমন সাহা।

‘সত্তা’ ছবিতে ‘তোর প্রেমেতে অন্ধ’ গানটির জন্য ২০১৭ সালের সেরা পুরুষ সংগীত শিল্পীর পুরষ্কার পেয়েছেন মাহফুজ আনাম জেমস এবং ‘পুত্র’ ছবিতে ‘যদি দুঃখ ছুঁয়ে’ গানটির জন্য ২০১৮ সালের সেরা পুরুষ সংগীত শিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন নাইমুল ইসলাম রাতুল।

‘সত্তা’ ছবিতে ‘না জানি কোন অপরাধে’ গানটির জন্য ২০১৭ সালের সেরা নারী সংগীত শিল্পীর পুরষ্কার পেয়েছেন মমতাজ বেগম এবং ‘পুত্র’ ছবিতে ‘ভুলে মন অভিমান’ গানের জন্য সাবিনা ইয়াসমিন ও ‘একটি সিনেমার গল্প’ ছবিতে ‘গল্প কথার ওই’ গানের জন্য আঁখি আলমগীর যৌথভাবে ২০১৮ সালের সেরা নারী সংগীত শিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন।

সেরা ডকুমেন্টারি বিভাগে ২০১৭ সালের জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশনকে ‘বিশ্ব আঙিনায় অমর একুশে’ সেরা চলচ্চিত্রের জন্য পুরষ্কার প্রদান করা হয়েছে এবং ২০১৮ সালের জন্য ফরিদুর রেজা সাগরকে ‘রাজাধিরাজ রাজ্জাক’ সেরা চলচ্চিত্রের জন্য পুরষ্কার প্রদান করা হয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মুরাদ হাসান এবং তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হাসানুল হক ইনু। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, তথ্য সচিব আবদুল মালেক।

অনুষ্ঠানে জাতীয় চলচ্চিত্র অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের শীর্ষস্থানীয় সব নির্মাতা, কাহিনিকার, শিল্পী, কলাকুশলী, গীতিকার, সুরকারসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ