গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র: তিন নীতি অনুসরণের ঘোষণা

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১২:৩২, জানুয়ারি ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩০, জানুয়ারি ২০, ২০২০

দৈনিক বাংলা

 ‘গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতির অর্থনীতির লক্ষ্য অনুসরণ করা হবে’— ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি পূর্ব জার্মান বেতারকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়, আবারও এই নীতি মনে করিয়ে দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। এদিনে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে এক আবেগপ্রবণ বার্তা আসে বঙ্গবন্ধুর কাছে। স্বাধীন বাংলার ওপর দিয়ে বিমানে করে যাওয়ার সময় ইন্দিরা গান্ধী সেই বার্তা পাঠান। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু এদিন দেশি-বিদেশি বেশকিছু সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গুরুত্ব থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অন্ধ জনগোষ্ঠীর সেবা নিশ্চিতের কথা জানান তিনি।

পূর্ব জার্মান বেতারের প্রতিনিধি মি. এ থোলের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতির অর্থনীতি হবে মূল লক্ষ্য।’ পাকিস্তান জেল থেকে তাকে মুক্ত করা ও বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন-সহযোগিতার জন্য তিনি পূর্ব জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধু আরও  বলেন, ‘ভারত আমাদের যে সহযোগিতা করেছে, তার জন্যও আমরা ভারতের নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তার সরকার ও ভারতের জণগণের প্রতি কৃতজ্ঞ।’ এ সময় তিনি আরাও জানান— ভারত থেকে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনকারী শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য বাংলাদেশের পুনর্বাসন দফতর এরইমধ্যে ব্যাপক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সব শরণার্থী দেশে ফিরে আসবে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি

রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বরাত দিয়ে ২০ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত ভূইয়া ইকবালের রিপোর্ট বলছে, তাকে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর মাথায় অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী করার চিন্তা ছিল। কিন্তু আবু সাঈদ চৌধুরী শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন— বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হলেই কেবল তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আহ্বানে সাড়া দেবেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু তাকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আহ্বান জানালে আবু সাঈদ চৌধুরী বিস্মিত হন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘আমি সাধারণ নাগরিক হিসেবে সহযোগিতা করতে পারি।’  বঙ্গবন্ধু বললেন,  ‘এটা কার্যকরীভাবে সম্ভব নয়।’ আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি এই পদের যোগ্য বলে নিজেকে বিবেচিত করি না।’ বঙ্গবন্ধু এসময় বলেন, ‘আপনার যোগ্যতা নিয়ে আপনি সচেতন না হলেও আমরা দেশবাসী আপনাকে জানি।’ আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তখন অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী করার কথা ভাবছেন বলে আমাকে জানান। আমি তাকে বলি, একমাত্র তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেই কেবল আমি রাষ্ট্রপতি হবো।’

বাড়ি গাড়ির ঋণ বন্ধ

বাড়ি ও গাড়ির জন্য ঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি ক্ষেত্রে ঋণের কড়াকড়ি প্রত্যাহার করে। কিন্তু অনুৎপাদক খাতে এবং ডিম্যান্ড লোন, ওভারড্রাফট ও ফার্ম কোম্পানি ক্যাশ ক্রেডিট অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়। এছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, মোটর গাড়ি ক্রয় কিংবা গৃহ নির্মাণের মতো অনুৎপাদক খাতে কোনও ঋণ দেওয়া হবে না।

তফসিল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এক ইশতেহারে এসব কথা জানানো হয়। এছাড়া মুদ্রা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন দিক পরীক্ষার জন্য পর্যালোচনা বিভাগও গঠন করা হয়েছে। তারা একমাসের মধ্যে রিপোর্ট দেবে বলেও জানান গভর্নর।

বিমানবন্দরে স্বাগত জানাবেন ইন্দিরা গান্ধী

৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভারত সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দমদম বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাবেন ইন্দিরা গান্ধী। দুদিনব্যাপী ভারত সফরে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হবে। ৬  ফেব্রুয়ারি  প্যারেড গ্রাউন্ডে সম্মাননা নেওয়ার পরে ৭  ফেব্রুয়ারি  বঙ্গবন্ধু কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করবেন বলে ইউএনআই-এর বরাতে জানানো হয়।

শরণার্থী

আমি সোনার বাংলার ওপর দিয়ে যাচ্ছি: বিমান থেকে ইন্দিরার বার্তা

বঙ্গবন্ধু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিমানযোগে যাওয়ার সময় ইন্দিরা গান্ধী যে বার্তা পাঠান বঙ্গবন্ধুকে তার উত্তরে নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ আপনাকে গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তারা আপনাকে নিজেদের মাঝে পেতে চায়।’ গৌহাটি যাওয়ার পথে বাণী পাঠানোয় ইন্দিরা গান্ধীকে ধন্যবাদ জানান শেখ মুজিব। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিমানে করে বাংলাদেশের আকাশ দিয়ে গৌহাটি যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধুকে একটি বার্তা পাঠান। বার্তাতে তিনি লেখেন, ‘এই প্রথমবারের মতো আমি সোনার বাংলার ওপর দিয়ে যাচ্ছি। আমি ৫ হাজার ফুট ওপরে থাকলেও আমি আপনার মহান জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি ও আমার কৃতজ্ঞতা জানচ্ছি।’

বন্দুকের নলই সব ক্ষমতার উৎস নয়

জনগণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বন্দুকের নলই সব ক্ষমতার উৎস নয়। এটি হচ্ছে জনগণ, যারা যেকোনও স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নতুন মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠান শেষে চা চক্রে এসব কথা বলছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আরেকবার প্রমাণ হলো— স্বাধীনতা সংগ্রামে জনগণই প্রধান রক্ষাকবচ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমার বাড়ির সব বইপত্র লুট করেছে উল্লেখ করে শেখ মুজিব বলেন, ওরা আমাকে গ্রেফতার করেছিল, কিন্তু জনগণের কাছ থেকে আমার হৃদয়কে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।’

 

অন্ধ প্রতিনিধিদের অধিকারের প্রতিশ্রুতি

বাংলাদেশের অন্ধদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর কাছে এইদিনে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। প্রায় আড়াইশ’ অন্ধ ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে সচিবালয়ের সামনে হাজির হলে বঙ্গবন্ধু তাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়— বাংলাদেশে প্রায় সাত লাখেরও বেশি অন্ধ রয়েছে। অন্ধদের যে সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়, তা হলো— অন্ধত্ব নিবারণের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থার অভাব, সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার অভাব এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার দৈন্যদশা। বঙ্গবন্ধু তাদের সমস্যার কথা সহানুভূতির সঙ্গে শোনেন এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অন্ধ সমিতির প্রতিনিধিরা

বঙ্গবন্ধুর যত সাক্ষাৎ

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সমাজকর্মী ও লেখক মৈত্রেয়ী দেবী। সেসময় মৈত্রেয়ী দেবী বঙ্গবন্ধুকে বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি পাণ্ডুলিপি উপহার দেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। তারা কবিগুরুকে নিজেদের কবি মনে করে।’ দুই দেশেরই জাতীয় সংগীতের জনকের কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পাকিস্তান সরকার তাকে যোগ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এবার তাকে সেই মর্যাদা দেওয়া হবে।’

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পশ্চিম বাংলার লেখক মৈত্রেয়ী দেবী

এদিন ফরিদপুর এলাকার কিছু নেতাকর্মী তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা গোপালগঞ্জ বিশেষত কোটালিপাড়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কথা জানাতে গেলে ব্যথায় আচ্ছন্ন হন বঙ্গবন্ধু। বাকরুদ্ধ কণ্ঠ আর অশ্রুসজল চোখে বঙ্গবন্ধু বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছিলেন। জোরে হাত নাড়তে লাগলেন আর বললেন, ‘না না আর শুনতে চাই না।’

পত্রিকা কার্টেসি: ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ