শর্তের বেড়াজালে মেয়রদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ: আইন সংস্কারের চিন্তা

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১৭:২৪, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৩, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের সেসব বিষয় সংস্কারের চিন্তা

সিটি করপোরেশনের মেয়াদপূর্তির ১৮০ দিন আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইনগত যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি মেয়রকে পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যে বিধান রয়েছে সেটিও সংস্কার করা হবে। এছাড়া স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের আরও বেশ কিছু ধারা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, সচিব ও মন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা চলছে। তারা মনে করছেন, এই ধারাগুলো নাগরিক সেবার পরিপন্থী। সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯-এর ৯ ধারার ২ উপধারার (ঙ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘কোনও ব্যক্তি মেয়র বা কাউন্সিলর নির্বাচিত হইবার যোগ্য হইবেন না, যদি প্রজাতন্ত্রের বা সিটি করপোরেশনের বা কোনও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা অন্য কোনও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোনও লাভজনক পদে সার্বক্ষণিক অধিষ্ঠিত থাকেন।’

প্রসঙ্গত, মেয়র পদটিকে আদালত লাভজনক পদ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যে কারণে ক্ষমতাসীন মেয়র যদি পরবর্তী সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে চান তাহলে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে বাকি মেয়াদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা মেয়র ছাড়া থাকতে হয়। এতে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নাগরিকরা অনেক সেবা থেকে বঞ্চিত হন। উন্নয়ন কাজেও ব্যাঘাত ঘটে।

এই আইন অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামকে পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নিতে হয়েছে। আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ মাস আগে। পদত্যাগ করায় মেয়রের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (নির্বাচনকালীন) ও প্যানেল মেয়রকে। মেয়রের অবর্তমানে তারা দায়িত্বে থাকলেও নির্বাচিত মেয়রের যে ক্ষমতা রয়েছে সেই ক্ষমতা নেই নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্যানেল মেয়রের।

অপরদিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের উপ-ধারা (১) এর দফা (খ)তে বলা হয়েছে-‘নির্বাচিত মেয়র অথবা কাউন্সিলর করপোরেশনের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যভার গ্রহণ করিতে পারিবেন না।’ আর উপ-ধারা (১) এর দফা (খ) দফায় বলা হয়েছে, ‘করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হইবার ক্ষেত্রে, উক্ত মেয়াদ শেষ হইবার পূর্ববর্তী একশত আশি দিনের (১৮০ দিন) মধ্যে নির্বাচন করিতে হইবে।’

সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদ সম্পর্কে ধারা ৬ এ বলা হয়েছে,‘করপোরেশনের মেয়াদ উহা গঠিত হইবার পর উহার প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হইবার তারিখ থেকে পাঁচ বৎসর হইবে,তবে শর্ত থাকে যে সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও উহা পুনর্গঠিত সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করিয়া যাইবে।’

এই আইন অনুযায়ী এবারের দুই সিটি নির্বাচন সংস্থা দুটির চলমান পরিষদের মেয়দ উত্তীর্ণের প্রায় সাড়ে চারমাস আগেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে কারণে নতুন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এই পুরো সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তাছাড়া পদত্যাগ করে নির্বাচন করার কারণে উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম তার ক্ষমতার প্রায় সাড়ে ৫ মাস দায়িত্বপালন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয়গুলোকে নাগরিক সেবার অন্তরায় হিসেবে বিবেচনায় করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

এই আইনের খুঁটিনাটি বিষয় ও মেয়রের পদত্যাগের পর সৃষ্ট আইনি জটিলতা নিয়ে গত ২৯ জানুয়ারি মেয়রের পদত্যাগের পর আইনের ফাঁদ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউন। এরপরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আইনটি সংস্কারের কথা ভাবছে।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (সিটি করপোরেশন শাখা-১) আ ন ম ফয়জুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনটিতে বেশ কিছু বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। সিটি করপোরেশনের ডেস্ক কর্মকর্তা হিসেবে আমার কাছে যেসব বিষয় সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে আমি সেগুলো সচিবকে জানিয়েছি। তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইনে সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ পূর্তির ১৮০ দিন আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। এটা ৯০ দিন আগে করা যায় কিনা সে বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। তাছাড়া মেয়রকে পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে হলে পদত্যাগ করতে হয়। এটাও আমার কাছে নগর সেবার জন্য অন্তরায় বলে মনে হয়েছে। এ বিষয়গুলো প্রাথমিকভাবে আমি সচিবকে জানিয়েছি। তবে বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এ আইনে বেশ কিছু অস্পষ্টতা আছে। আইনটি স্পষ্ট করা দরকার। এজন্য আইনের সংস্কার প্রয়োজন। নির্বাচনের দিনক্ষণও কমিয়ে আনা দরকার। আর আমাদের নির্বাচন কমিশনকেও এমনভাবে নির্বাচনের আয়োজন করা উচিত যাতে নির্বাচনের পর নবনির্বাচিতদের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বেশিদিন অপেক্ষা না করতে হয়।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনটি যদি চলমান পরিষদের মেয়াদপূর্তির শেষদিকে অনুষ্ঠিত হয় তাহলে তেমন কোনও সমস্যা থাকে না। কিন্তু এক্ষেত্রে ১৮০ দিন তো অনেক বেশি। এতো আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বর্তমান পরিষদ ও নবনির্বাচিত পরিষদের মেয়র ও কাউন্সিলরদের মধ্যে একটা নেতিবাচক মনোভাব দেখা দেয়। পাশাপাশি আগের পরিষদ প্রতিনিধিদের মধ্যে দায়িত্বপালনেও অলসতা দেখা দিতে পারে। এই বিষয়গুলো নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা চলছে।

ওই কর্মকর্তার দাবি, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামও বিষয়টির গুরুত্ব বুঝেছেন। তিনিও মনে করেন, আইনটির সংস্কার প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।  

/এমআর/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ