দেশ গোছাতে বঙ্গবন্ধুর যত নির্দেশনা

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:১২, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৬, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০

১৯৭২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পত্রিকাবেআইনিভাবে ঘরবাড়ি দখল,উচ্ছৃঙ্খলতা প্রদর্শন ও  ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে হুঁশিয়ারি দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একইসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীদের কাজে মনোযোগ দেওয়া ও কৃষকসমাজকে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের প্রধান হিসেবে তিনি একের পর এক বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাজধানীর বাইরে গিয়ে তিনটি এলাকায় তিনি বড় ধরনের জনসভা করেন। সব জায়গাতেই তিনি অস্ত্র জমা দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব, কৃষক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা, পাকিস্তানে আটকে পড়াদের দেশে ফিরিয়ে আনা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন তিনি। তারপরও বাংলাদেশ জন্মের পর ১৯৭২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচারের দাবিতে প্রথম মিছিল ও সভা নিয়ে রাস্তায় নামে জনগণ।

বেআইনি গাড়ি-বাড়ি

বেআইনি সম্পত্তি প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বলেন, ‘যারা বেআইনিভাবে গাড়ি-বাড়ি ও সম্পত্তি দখল করেছে, অথবা যাদের অধিকারে বেআইনি গাড়ি, বাড়ি ও সম্পত্তি আছে, ২৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকারের কাছে অবশ্যই সব জমা দিতে হবে। জমা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলে ঘোষণা করেন তিনি। বেআইনিভাবে সম্পত্তি উদ্ধারের ব্যাপারে সরকারকে সর্বতোভাবে সাহায্য করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বানও জানানো হয়।১৯৭২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পত্রিকা

মুক্তি বাহিনীর প্রতি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি বাহিনীর  সব সদস্যকে ২৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিজ নিজ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘এই তারিখের মধ্যে ক্যাম্প ছেড়ে গিয়ে মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা ইচ্ছা করলে জাতীয় রক্ষীবাহিনী অথবা পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা যদি লেখাপড়া করতে চান, অথবা তারা যদি অন্য কোনও বৃত্তি গ্রহণ করতে চান, তাহলে তারা তা করতে পারেন। সরকার তাদের আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিচার করবেন এবং তাদেরকে  সব রকমের সাহায্য দেওয়া হবে।’

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবে কৃষকরা

কৃষকসমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাদের দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার দায়িত্ব কৃষকদের কাঁধে তুলে নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে আমাদের দেশ খাদ্য-শস্যে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে। দেশের এক ইঞ্চি পরিমাণ জমি যেন পড়ে না থাকে এবং জমির ফলন বাড়ে, তার জন্য দেশের কৃষকসমাজকে সচেষ্ট হতে হবে।’১৯৭২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পত্রিকা

নির্যাতনের শিকার নারীদের বিষয়ে

দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্যাতনের শিকার নারীদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও তাদের যোগ্য মর্যাদা ও সম্মান প্রদানের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। এর আগের দিন (২৬ ফেব্রুয়ারি) শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব নির্যাতনের শিকার নারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের সবধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

বঙ্গবন্ধুর বাণী

বাংলাদেশের জনগণের হৃদয় জয় করেছে রাশিয়া। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সোভিয়েত ইউনিয়ন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। দৈনিক বাংলার খবরে প্রকাশ— সম্প্রতি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ সমিতির অনুষ্ঠানে এক শুভেচ্ছা বাণীতে বঙ্গবন্ধু উপরোক্ত কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তাঁর বাণীটি পাঠ করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ভূমিকা পালন করেছে, বাংলাদেশের জনগণ তা চিরদিন স্মরণ রাখবে।’ সোভিয়েতকে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মহান বন্ধু বলে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, ‘আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্যোগপূর্ণ দিনগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের প্রতি যে নজিরবিহীন সমর্থন দিয়েছে, সে জন্য তারা বাংলাদেশের জনগণের হৃদয় জয় করে নিয়েছে।’

বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার দাবি

বাংলা অ্যাকাডেমির পরিচালক কবির চৌধুরী বলেন,‘বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার জন্য দায়ী প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিচার করা না হলে, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ব্যর্থ হয়ে যাবে।’ বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিচারের দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি একথা বলেছিলেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বিক্ষুব্ধ পরিবারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করার সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। এর আগে বিক্ষুব্ধ পরিবারবর্গের সদস্যরা রাজপথে এক বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। সভাপতির ভাষণে কবির চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতার তিন মাস পরেও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা কেন আজ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের সরকারকে অবশ্যই তার কারণ আবিষ্কার করতে হবে।’ অনুষ্ঠানে দেশের সব সেক্টরের বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে ছাত্রনেতা আসম আবদুর রব বলেন যে, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার চাইতে আজ সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে কেন? বাংলাদেশ সরকার জনগণের সরকার, এটা সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য।’ তিনি বলেন, ‘নিহত বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। তাদের পরিবারের পাশে আমরা রয়েছি।’

আরও পড়ুন- চাকরি হবে যোগ্যতায়, সুপারিশে নয়: বঙ্গবন্ধু

/এপিএইচ/আপ-এফএস/

লাইভ

টপ