জীবনযাত্রা আগের চেহারায় ফিরেছে

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:০০, আগস্ট ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৮, আগস্ট ১৪, ২০২০

রাজধানীসহ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার চেহারা দেখলে বোঝার উপায় নাই যে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনাভাইরাসে আরও ৪২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে কোভিড-১৯ এ নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও দুই হাজার ৯৯৫ জন। একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের হাটবাজার, অফিস আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, দোকান পাট, রাস্তাঘাট, লঞ্চ-স্টিমার, ট্রেনে মানুষের সমাগম ফিরেছে আগের চেহারায়।

বিভিন্ন জনের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, জীবনের প্রয়োজনেই সব কিছু আবার শুরু করেছেন তারা। মনের ভয় কেটে গেছে। করোনা হলেই নিশ্চিত মৃত্যু- এরকম ভয় এখন আর তাদের দুর্বল করে না।

করোনার কারণে রাজধানীতে স্থবির হয়ে যাওয়া জীবনযাত্রা এখন পুরোটাই ফিরেছে আগের জায়গায়। শুরু হয়েছে রাজধানীর ফুটপাথ জুড়ে হকারদের রমরমা ব্যবসা। রাজপথে এখন নিয়মিত যানজট। আগের মতোই সকাল থেকে বাসস্ট্যান্ডে শুরু হয় অফিসগামী মানুষের দীর্ঘ লাইন, ভিড় এবং চিরচেনা গাড়িতে ওঠার ঠেলাঠেলি।

সরকারি অফিস আদালতে রোস্টার প্রথা তুলে দিয়ে অসুস্থ ও সন্তানসম্ভাবা স্টাফদের বাদ দিয়ে শতভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত আগের নিয়মে অফিস করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ১২ আগস্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ভার্চুয়াল কিংবা শারীরিক উপস্থিতিতে মামলার শুনানিতে বিচারপতি এবং আইনজীবীরা বসতে শুরু করেছেন।

বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট হাউসগুলোর অনেকেই এখন চলছে পুরনো নিয়মে। সেখানেও শতভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। শপিংমল, মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে আগের সেই নিয়মে অর্থাৎ আগের মতো রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি মিলেছে। পাড়া-মহল্লায় চায়ের দোকানগুলোয় মধ্যরাত পর্যন্ত চলে আড্ডা। আগের মতোই স্টেশনগুলোর চায়ের দোকান, হোটেল চলে সারা রাত।

বাস, লঞ্চ, স্টিমারসহ গণপরিবহন চালানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব মানার শর্ত থাকলেও এখন তা পুরোটাই ম্লান। ৬০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া আদায় ছাড়া গণপরিবহনে এখন আর সামাজিক দূরত্ব বলে কিছু নেই। বাসে প্রতি দুই সিটে একজন যাত্রী পরিবহনের বিধান করে দেওয়া হলেও এখন প্রতি দুই সিটে দুই জনসহ দাঁড়িয়েও যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যাত্রীরা অসহায়। মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধির কোনও শর্তই। বাসে, লঞ্চে কোনও গণপরিবহনেই রাখা হয় না হ্যান্ড সেনিটাইজার। রেলের অবস্থাও সেইদিকে যাচ্ছে।

গত ২৫ মার্চের পর গত ৩১ মে খুলেছে সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দফতর বাংলাদেশ সচিবালয়। ২৬ মার্চ থেকে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার সারাদেশের সরকারি বেসরকারি সব ধরনের অফিস কার্যক্রম বন্ধ করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল। শুরুতে কয়েক দিনের জন্য হলেও পরবর্তীতে কয়েক দফায় সাধারন ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে তা সর্বশেষ ৩০ মে পর্যন্ত গড়ায়। ৩১ মে রবিবার থেকে সরকারি বেসরকারি অফিস খোলার অনুমতি দেয় সরকার।

নিস্তব্ধতা কেটে সরকারের প্রধান প্রশাসনিক দফতর বাংলাদেশ সচিবালয়ের গেটে এখন দর্শনার্থীদের ভিড় আগের মতো। দর্শনার্থী পাস ইস্যু শুরু না হলেও দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। সচিবালয়ের ভেতরে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা সংকুলান হয় না। আগের মতোই বিভিন্ন তদবির নিয়ে লোকজনের আগমন ঘটছে। পাসের অভাবে ভেতরে যেতে না পারলেও সমস্যা নাই। গেটে ডেকে এনে তদবির চলছে আগের নিয়মেই। অভিযোগ রয়েছে লেনদেনও হচ্ছে পুরনো সিস্টেমে।

মন্ত্রীরাও এখন অফিসিয়াল কাজকর্ম বা মিটিং অনলাইন বা জুম ব্যাবহারের পাশাপাশি সরাসরি নিজ দফতরে করতে শুরু করেছেন।

সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনরত ডিএমপির অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার রাজিব দাস বুধবার (১২ আগস্ট) জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এখনও সচিবালয়ে দর্শনার্থী পাস দেওয়া বন্ধ রয়েছে। পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশনা মেনেই অফিস করছি। যদিও দর্শনার্থী নাই। তাই সব মিলিয়ে এখনও কিছুটা নিস্প্রান মনে হয় মন্ত্রীর দফতর।

করোনাকালে রাজধানীর থানাগুলোয় ভিড় ছিলও না বললেই চলে। পাল্টে গেছে সেখানকার চিত্র। এখন রাত বাড়লে জমে ওঠে থানার কর্মতৎপরতা। নেই কোনও ভয়, নেই শঙ্কা।

করোনা আগমনের পর থেকে স্থবির হতে থাকা জীবনযাত্রা কিছুটা ঘুড়িয়ে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেও এখন সরাসরি ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করছে সবাই। মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে এই করোনা। তাই সামনে এগুতে হবে। পূরণ করতে হবে করোনার কারণে সৃষ্ট ঘাটতি। তাই এই ছুটে চলা।

রাজধানীর মহল্লায় দোকানপাট বা কাঁচাবাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকান পাটগুলো এখন পুরোপুরি খুলেছে। রাত ১০ টার মধ্যে এখন রাজধানীর কোনও মহল্লায়ই এখন আর অন্ধকার নেমে আসে না। জন্মদিন বা বিয়েসাদির আয়োজন এখনও শুরু হয়নি। এখনও পুরোপুর বন্ধ রয়েছে কমিউনিটি সেন্টার ভিত্তিক ব্যবসা। তবে শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।

রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোয় ভিড় বাড়তে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। কাঁচাবাজারের মাছ বা সবজির অনেক দোকান এবং স্টল পুরোটাই পূর্ণ হয়ে গেছে। সারাদেশে লকডাউন চলাকালে যারা ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে গ্রামে চলে গেছেন, তাদের অনেকেই আবার রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছেন। অনেকেই হয়তো ব্যবসা বা পেশা পরিবর্তন করেছেন।

মতিঝিলের একটি ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা আরিফুল হক। তিনি জানিয়েছেন একসময় ২৭ জন স্টাফের সমন্বয়ে এ অফিস চললেও এখন চলছে মাত্র ৯ জন দিয়ে। সবে মাত্র জীবনযাত্রা শুরু করেছেন মানুষজনেরা। তাই কাজ কম।

রাজধানীর কাওরান বাজারের কিচেন মার্কেটের ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম লাল মিয়া। তিনি জানিয়েছেন, জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো মানুষের মনে অজানা ভয় নাই। আগের তুলনায় ভয় অনেকটাই কমেছে। তাই জীবনযাত্রা শুরু হয়েছে আগের নিয়মেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হেসেন জানিয়েছেন, সরকারি অফিস যথারীতি আগের নিয়মে চলা শুরু হয়েছে। অসুস্থ ও সন্তানসম্ভাব কর্মকর্তা কর্মচারি বাদ দিয়ে সবাইকে অফিসে নির্দিষ্ট সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অফিস করা বাধ্যতামূলতক করা হয়েছে। এখন সেভাবেই চলছে।

/এফএস/

লাইভ

টপ