ড্রাইভার মালেকের সহযোগীরা এখনও বহাল তবিয়তে

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১১:০০, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৮, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক আব্দুল মালেক ওরফে মালেক ড্রাইভারআইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষায় চরম দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি হলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের গাড়ি চালক আব্দুল মালেক। নিজের স্বার্থের জন্য তিনি প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন তৈরি করেছেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তুরাগ থানাধীন কামারপাড়ার ৪২ নম্বর বামনেরটেক হাজী কমপ্লেক্সের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২ মামলায় সাতদিন করে মোট ১৪ দিন রিমান্ড নেওয়া হয়েছে তাকে। অথচ যাদের সহযোগিতায়, যাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে, যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মালেক ড্রাইভার ‘মালেক সাহেব’ হয়েছেন তারা এখনও বহাল তবিয়তে স্বাস্থ্য অধিদফতরে কাজ করে যাচ্ছেন।
র‌্যাবের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবির হোসেন চৌধুরী ও মো. শাহজাহান ফকির, প্রধান সহকারী সৈয়দ জালাল এবং অফিস সহকারী জাহাঙ্গীর আলম (পেনশনের কাজ করেন) বিভিন্নভাবে গাড়িচালক মালেককে দুর্নীতিতে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।

হেড ড্রাইভার হিসেবে স্বেচ্ছাচারিতা

অনেক আগে থেকেই একটু একটু করে ড্রাইভার মালেকের খুঁটির জোর শক্ত হয়েছে অধিদফতরের কর্তা ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। তার ভয়ে কোনও গাড়িচালকই মুখ খুলতেই রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, ‘অধিদফতরে বেশিরভাগ সময়ই কর্মকর্তাদের বিকাল পাঁচটার পর পর্যন্তও কাজ করতে হয়। অফিস সময়ের বেশি কাজ করলে গাড়িচালকরা ওভারটাইম পেয়ে থাকেন। কিন্তু ওভারটাইমের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে টাকা দিতে হতো ড্রাইভার মালেককে। আর কেউ সেটা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওভার টাইমের বিলে স্বাক্ষর করতেন না। তাকে নিয়মিতভাবে চাঁদা দিয়ে পরিশ্রমের টাকা নিতে হতো।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরে ড্রাইভার্স অ্যাসোসিয়েশন নামে সংগঠন তৈরি করে তার সভাপতি হন মালেক। আর সে ক্ষমতা দিয়ে ড্রাইভারদের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন তিনি। ড্রাইভারদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করেন।

এক ঘণ্টা বসেও দেখা মেলেনি কবির হোসেন চৌধুরীর

স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন ভবন নামে পরিচিত মহাখালীতে অবস্থিত ভবনের তিন তলায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবির হোসেন চৌধুরীর কক্ষ। দুপুরে তার কক্ষে গিয়ে এক ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করে তাকে পাওয়া যায়নি। তার কক্ষে থাকা একাধিক সহকারী জানান, ‘স্যার ওজু করতে বের হয়েছেন।’ কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও তিনি তার কক্ষে ফেরেনি। অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাড়িচালক আব্দুল মালেকের সঙ্গে যাদের নাম এসেছে তারা সবাই অফিস করছেন, বহাল তবিয়তে রয়েছেন তারা।’

নিয়োগ বাণিজ্য

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মুনীর হোসেনের আমলে (২০০৯ থেকে ২০১০ ) স্বাস্থ্য সহকারী পদে শতাধিক নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন মালেক ড্রাইভার। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেনের গাড়িচালক ছিলেন। মহাপরিচালক তার অন্যতম আশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছে র‌্যাব। বিনিময়ে তিনি মহাপরিচালককে নানা ধরনের অনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয় সেখানে।

এ বিষয়ে বক্তব্য কী জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতরে কোনও নিয়োগ-বদলি বা পদায়নের কোনও বিষয় নেই। তাহলে তাকে কিভাবে আমি আশ্রয় দিলাম। এসব অভিযোগ আমি অস্বীকার করছি।’

মহাপরিচালকের জন্য বরাদ্দ হওয়া গাড়ি তিনি ব্যবহার করতেন কিনা জানতে চাইলে অধ্যাপক এনায়েত হোসেন বলেন, ‘আমার জন্য পাজেরো ছিল অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে যখন ছিলাম, সেই সময়ে।’ ড্রাইভার মালেক অনেক আগে থেকেই আপনার গাড়ি চালাতেন কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমার নয়-অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের গাড়ি চালাতেন তিনি, সে হিসেবে তিনি আমার গাড়িও চালাতেন।’

ক্যান্টিন বন্ধ

গাড়িচালক আব্দুল মালেকের বড় মেয়ের জামাই রতন ক্যান্টিন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) মহাখালীতে অবস্থিত অধিদফতরের পুরাতন ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ক্যান্টিন বন্ধ, বড় করে প্রধান ফটকে তালা মারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদফতরের একাধিক কর্মচারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই তালা কয়েকদিন পরেই খুলে যাবে। মালেক ড্রাইভার খুব শক্তিশালী। আগেও এভাবে কিছু ঘটনার পর ক্যান্টিন বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু পরে তারা এসে ক্যান্টিন খুলেছে।  এর আগেও মালেক ড্রাইভারের কিছুই হয় নাই।’

মহাপরিচালকের জন্য বরাদ্দ হওয়া সাদা পাজেরো জিপটি ব্যবহার করতেন মালেক

গাড়িটি পড়ে আছে

গাড়িচালক আব্দুল মালেক স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. এনায়েত হোসেনের গাড়িচালক ছিলেন। নিজে গাড়িচালক হওয়া সত্ত্বেও তিনি মহাপরিচালকের জন্য বরাদ্দ হওয়া একটি সাদা পাজেরো জিপ গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন। এছাড়াও তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের  আরও দুটি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন, যার মধ্যে একটি পিক-আপ গাড়ি তার খামারের দুধ বিক্রি এবং অধিদফতরের ক্যান্টিনের মালামাল পরিবহন করতো। আরেকটি মাইক্রোবাস অধিদফতরে কাজ করা পরিবারের অন্য সদস্যরা ব্যবহার করে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরে গিয়ে দেখা যায়, আব্দুল মালেক যে গাড়িটি তার খামার এবং ক্যান্টিনের কাজে ব্যবহার করতেন সেটি পড়ে আছে ক্যান্টিনের সামনে, অধিদফতরে ঢোকার প্রধান ফটকের বাম পাশে। গাড়িটি নিয়ে কৌতূহলও রয়েছে কর্মচারীদের মধ্যে।

মালেক ড্রাইভারের ভয়ে তটস্থ অধিদফতরের কর্মচারীরা বলেন,   ‘এই গাড়ির অনেক দাপট দেখেছি আমরা, কিন্তু কিছু বলার সাহস কারও নেই।’

গাড়িচালক আব্দুল মালেকের সঙ্গে যাদের নাম রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকাতে তারা এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। কাজ করছেন নিয়মিত। আব্দুল মালেকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক বড় কর্মকর্তার নাম। বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অ্যাকশন রিজেন্টের সাহেদ, জেকেজির সাবরিনা কিংবা এখন কেবল মালেকেই শেষ হবে। এদের পেছনে যারা রয়েছেন তাদেরই ধরা যায় না, তাহলে মাস্টার মাইন্ডদের কিভাবে ধরবেন।’

ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন,  ‘‘বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন সেগুলো প্রশংসনীয়। কিন্তু এই দুর্নীতিতে যারা সামনে রয়েছে যেমন সাবরিনা, মালেক, সাহেদ-তারা সম্মুখভাগের দুর্নীতিবাজ, কিন্তু এদের পেছনে যারা মাস্টারমাইন্ড, তাদেরকে যদি না ধরা যায় কিংবা তাদেরকে যদি ‘ট্রেস’ না করা হয় তাহলে এই দুর্নীতি নির্মূল হবে না। এই মালেক-সাহেদরাই সবসময় ধরা খাবে, পরে আবার এরকম মালেক-সাহেদ-সাবরিনা তৈরি হবে। কিন্তু এদেরকে যারা তৈরি করে, যারা কাজ করায়, যারা ‘পারপাস সার্ভ’ করায়, তাদের পর্যন্ত যদি না যাওয়া যায় তাহলে আসলে কিছুই হবে না।’’

গাড়িচালক আব্দুল মালেকের সঙ্গে যাদের নাম রয়েছে সহযোগী হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে অধিদফতর এখনও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। আর এর কারণ হিসেবে অধিদফতর বলছে, ‘তাদের হাতে অফিসিয়ালি কোনও ডকুমেন্টস আসেনি এখনও।’

এদের বিরুদ্ধে আলাদা ভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতর তদন্ত করবে কিনা জানতে চাইলে অধিদফতরের মিডিয়া সেলের প্রধান ডা. হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এদের বিরুদ্ধে তদন্ত করবো যখন আমাদের কাছে স্পেসিফিক অভিযোগ আসবে। গাড়িচালক আব্দুল মালেককে আমরা বরখাস্ত করেছি, আমাদের কোনও কর্মকর্তার নামে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসে যে তিনি দুর্নীতিবাজ বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে সেক্ষেত্রে তদন্ত করবো।’

/এমআর/

লাইভ

টপ