বেকার ও অসচ্ছলদের টার্গেট করে মানবপাচার, নারীরাই বেশি ভুক্তভোগী

রিয়াদ তালুকদার
০৬ এপ্রিল ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৩, ১০:০০

পাচারের শিকার কোনও ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর পাচারকারীদের পেছনে কারা রয়েছে, ভুক্তভোগীর সঙ্গে কী ঘটেছিল— বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব আর উদঘাটিত হয় না। গ্রেফতার করা হয় চুনোপুঁটিদের, অন্তরালে থেকে যায় রাঘব-বোয়ালরা। বাংলাদেশকে ঘিরে মানবপাচারে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২২– এই ছয় বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) উদ্ধারের তালিকায় পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী। ৬ বছরে ৩৬৬ নারী ও ৩১০ জন পুরুষকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়া এ সময়ে সাতটি শিশুকেও উদ্ধার করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, দেশের যশোর, বেনাপোল, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দর্শনা, দিনাজপুর, লালমনিরহাট সীমান্ত ও স্থলবন্দর সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুপাচার হচ্ছে বেশি। এসব এলাকার অরক্ষিত সীমান্ত পয়েন্টগুলো নারী ও শিশুপাচারে প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া চাকরি দেওয়ার নাম করে বিমানবন্দর দিয়েও নারীপুরুষদের বিদেশে পাচার করা হয়। পরে তাদেরকে বিভিন্ন দেশে জিম্মি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। পাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে অবৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টাকালে সমুদ্রপথে ঘটছে মৃত্যুর ঘটনাও। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ট্রলারে করে সাগর পাড়ি দিয়ে এভাবেই পাচার করা হয়

বেকার কিংবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল নারী-পুরুষকে টার্গেট করে চলছে এই মানবপাচার। চক্রের সদস্যরা দেশব্যাপী এজেন্টের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড। নামে-বেনামে বিভিন্ন ম্যানপাওয়ার এজেন্সি  অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচার চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু পাচারই নয়, চাকরিপ্রার্থীদের বিদেশের মাটিতে জিম্মি করে দেশে থাকা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশ গিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে এক-একটি পরিবার। এতকিছুর পরও প্রতারক চক্রের প্রলোভনে পড়ে ভালোভাবে খোঁজখবর না নিয়ে পরিবারগুলোকে পড়তে হচ্ছে নানা ধরনের ঝক্কি-ঝামেলায়।

র‌্যাবের তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৪১৭টি ঘটনায় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৮৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা দায়ের করা হয় ৪৫১টি। এছাড়া নারী-শিশুসহ ৬৮৩ জনকে উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব বলছে, যত দিন যাচ্ছে, মানবপাচারে অভিযুক্ত অপরাধীদের গ্রেফতারের তালিকাও বাড়ছে। ২০১৭ সালে ৬৮টি অভিযানে ১৬৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা দায়ের হয় ১৪৩টি, উদ্ধার করা হয় ৯৮ জনকে। ২০১৮ সালে ১৭টি অভিযানে ২৫ জন মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা হয় ১৪টি, উদ্ধার করা হয় ২৫ জনকে। ২০১৯ সালের ৪৭টি অভিযানে ৯১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা  হয় ৪৮টি। অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৫৪ জনকে। ২০২০ সালে ৬২টি অভিযানে ১০২ মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। উদ্ধার করা হয় ৭৯ জনকে। মামলা দায়ের করা হয় ৫৭টি। ২০২১ সালে ১১৪টি অভিযানে গ্রেফতার করা হয় ১৯১ জনকে। ১১৬ জনকে উদ্ধার করা হয়, মামলা দায়ের করা হয় ৯৬টি। ২০২২ সালে ১০৯টি অভিযানে ২৬১ মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানে উদ্ধার করা হয় ২৬১ জনকে। মামলা দায়ের করা হয় ৯৩টি।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার চার মানবপাচারকারী তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবপাচার প্রতিরোধের প্রধান কাজ হিসেবে বেকারত্ব হ্রাসের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। উন্নত বিশ্বে কারিগরি ক্ষেত্রে যে পরিমাণ কর্ম খালি আছে, তাতে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ পাঠানোর মাধ্যমে আমাদের বেকারত্ব যথেষ্ট কমিয়ে আনা সম্ভব। যেসব দেশে মানবপাচারের হার বেশি, সেসব দেশের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মানবপাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশে কিংবা বিদেশে কোথাও চাকরির প্রস্তাব পেলে— সেই চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটির নামে পূর্বে কোনও খারাপ রিপোর্ট রয়েছে কিনা, তা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিস লিমিটেডে বিদেশগামী যেকোনও প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া বেকারদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে বিদেশ যাওয়াদের সংখ্যা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আরও  জানান, পাচার রোধে ইমিগ্রেশন পয়েন্ট বা সীমান্তে কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাচারকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ‘মানবপাচার দমন ও প্রতিরোধ আইন-২০১২’ এর সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের জন্য মামলার তদন্ত ও প্রসিকিউশন— উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ কর্মকর্তাদেরকে অপরাধীদের বিচারে নিয়োগ করতে হবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানবপাচারের অভিযোগে দেশীয় বেশ কয়েকটি চক্রের সদস্যদের আমরা গ্রেফতার করেছি। তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের শিকার হয়ে সেখানকার মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে নির্যাতিত বেশ কয়েকজনকে আমরা দেশে ফিরিয়ে এনেছি। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা  অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছি।’

/আরকে/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
লিবিয়া থেকে দেশে ফিরছেন আরও ১৭০ বাংলাদেশি
অন্য দেশ থেকে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশিদের পাচার ও বিক্রি 
লিবিয়ায় জিম্মি করে টাকা আদায়, মানব পাচার চক্রের সদস্য গ্রেফতার
সর্বশেষ খবর
সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সারের বদলে আবর্জনা, তদন্তে কমিটি
সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সারের বদলে আবর্জনা, তদন্তে কমিটি
বাংলাদেশে ওয়াটারএইডের ৪০ বছর, লোগো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে উদযাপন শুরু
বাংলাদেশে ওয়াটারএইডের ৪০ বছর, লোগো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে উদযাপন শুরু
দুটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নেমেছে জার্মানি 
দুটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নেমেছে জার্মানি 
আশুরার প্রথম প্রহরে রাজধানীতে ‘ইয়া হোসাইন’ ধ্বনিতে শোকের মাতম
আশুরার প্রথম প্রহরে রাজধানীতে ‘ইয়া হোসাইন’ ধ্বনিতে শোকের মাতম
সর্বাধিক পঠিত
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার
লক্ষ্মীপুরে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যাবিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার
তীব্র গরমেও ইউরোপে কেন এসি এত বিরল
তীব্র গরমেও ইউরোপে কেন এসি এত বিরল
বিএসএফের ২১ ঘণ্টার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছে বিজিবি 
বিএসএফের ২১ ঘণ্টার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছে বিজিবি 
নতুন নিয়মে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন কীভাবে করবেন
নতুন নিয়মে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন কীভাবে করবেন
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা