আড়ালেই থেকে যায় কিশোর গ্যাংয়ের ইন্ধনদাতারা

রিয়াদ তালুকদার
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:০০ আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:০৭

রাজধানীসহ সারা দেশেই বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার কথা প্রায়শই সামনে আসে। তবে আড়ালে থেকে তাদের দিয়ে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যারা পরিচালনা করেন বা ইন্ধন দেন; তাদের নাম খুব একটা উঠে আসে না। অনেক সময় আবার গ্রেফতার কিশোর গ্যাং সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে ইন্ধনদাতাদের নাম পাওয়ার কথা জানা গেলেও তা আটকে থাকে ‘নজরদারি’ পর্যন্তই। শেষ পর্যন্ত অন্তরালেই থেকে যায় কমবয়সীদের দিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মূলহোতারা। 

এবার এ বিষয়ে নড়েচড়ে বসেছে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা কামনা করেছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেসব কিশোররা সংঘবদ্ধ হয়ে এলাকায় বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করে, তাদের অনেকের তথ্য পাওয়া গেছে। এরা মূলত কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে এ ধরনের অপরাধগুলো করে থাকে। অনেকেই এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারেও আড়ালে থেকে এসব কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করছে। তাদের অনেকের তথ্য আমাদের কাছে ইতোমধ্যে এসেছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ‘গ্যাং কালচার’ মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি গ্যাং নিজেদের কর্ম তৎপরতা জানান দিতে ব্যবহার করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টিকটক। নিজেদের অস্থিত্বের জানান দিতে এসব মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নিজেরাই তুলে ধরছে তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেক সময় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ধরা পড়লেও থেমে থাকছে না অপরাধ। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটছে, ঘটছে নিহতের ঘটনাও।

সবশেষ শুক্রবার (২২ সেপ্টেম্বর) কিশোর গ্যাংয়ে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ লিমন (১৫) ছুরিকাঘাতে আহত হয়।

গত ২৩ আগস্ট রাজধানীর দক্ষিণ খানের গাওয়াইর এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাং সদস্য তৌফিক এক দোকানিকে ছুরিকাঘাত করে। পরে সেই দোকানি রাফসানকে (১৭) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎস তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৮ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় ‘কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়ায়’ কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হয় মোহাম্মদ লিমন আহমেদ একজন। সে উত্তরার আইইএস উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যে জানা গেছে, রাজধানীতে ৮৫টির মতো কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। যাদের ইন্ধন দিচ্ছে বিভিন্ন সুবিধাভোগীরা। এসব কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক, ছিনতাই, জমি দখল, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে। 

র‌্যাব বলছে, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য অনেকটাই বেশি। এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এসব গ্যাংয়ের হাত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে বিভিন্ন সময়। অপরাধ করে তারা গা ঢাকা দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করে বাঁচার চেষ্টা করে। 

র‌্যাব আরও জানায়, শুধু শেরেবাংলা নগর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও বসিলা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে গত দুই মাসে প্রায় ৯০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে জামিনে বের হয়ে আবার একই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে গ্যাংয়ের সদস্যরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিটি কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে ইন্ধনদাতা হিসেবে প্রতিটি এলাকার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রয়েছেন। বিভিন্ন সময় প্রতিটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য যারা গ্রেফতার হয়, তাদের কাছ থেকেও নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের তথ্যও পাওয়া গেছে। যারা কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করে এলাকায় মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও জমি দখলসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছে। যেকোনও সময় তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধচক্র সব সময় অপরাধ ঘটানোর জন্য কম বয়সী এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের টার্গেট করে। শুরু থেকে মাদক এবং আর্থিক বিষয়ে সহায়তার পাশাপাশি তাদের কাছে টেনে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে নানা ধরনের প্রলোভন দেখানো হয়। যদিও এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতার বিষয় বলা হয়ে থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকদের সচেতনতার বিষয়টি তারা উদাসীন থাকে। যখন কোনও ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সন্তান জড়িয়ে যায়, তখন তাদের আর কিছু করার থাকে না। পরিবারের পাশাপাশি সমাজ এবং স্থানীয় ব্যক্তিদের জনপ্রতিনিধিদের সমাজে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তা না হলে সমাজ প্রতিনিয়ত অস্থিতিশীল হয়ে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এর পেছনে ইন্ধনদাতা হিসেবে কারা জড়িত, তাদের বেশ কয়েকজনের বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে, তথ্য যাচাই-বাছাই করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

তিনি বলেন, রাজধানীর পল্লবীতে শাহিন উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত গ্যাং গ্রুপের মূলহোতা সাবেক এমপি এম এ আওয়ালকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এছাড়া টঙ্গীতেও বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়াও রাজধানীতে গ্যাং কালচারে ইন্ধন দেওয়ার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর নির্ভর করে থাকা সমীচীন নয় উল্লেখ্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে কাদের সঙ্গে চলাফেরা করছে, এসব বিষয়ে পরিবারকে খোঁজ রাখতে হবে। পরিবারের গাফিলতির কারণে সন্তান যেন বিপথে না যায়, সে বিষয়টি অভিভাবকদের নজরে রাখতে হবে। 

এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সচেতন থাকা উচিৎ, তার এলাকায় যেন কোনও গ্যাং কালচার গড়ে উঠতে না পারে বলে উল্লেখ করেন ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, বিনা কারণে এলাকার চায়ের দোকানে কিশোর-তরুণদের আড্ডা দেওয়ার বিষয়গুলো আরও কঠোর নজরদারিতে রাখা দরকার। গ্যাং কালচারের পেছনে যারা ইন্ধনদাতা হিসেবে স্বার্থ হাসিলের কাজে জড়িত থাকে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলেও কিশোর গ্যাং তৈরি কিংবা এর অপতৎপরতা অনেক কমে আসবে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
মিরপুরে মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা হবে জুলাই গ্রাফিতি
আইনশৃঙ্খলার নেতিবাচক চিত্র: কী বলছেন রাজনীতিবিদরা
কিশোর গ্যাং নির্মূলে শর্টকাট সমাধান চাওয়া ভুল হবে: এসআরবি
সর্বশেষ খবর
শেষ মুহূর্তের গোলে বেলজিয়ামকে হারালো ফ্রান্স
শেষ মুহূর্তের গোলে বেলজিয়ামকে হারালো ফ্রান্স
তুরস্ককে উড়িয়ে নেশসনস লিগে ইতালির দাপুটে জয়
তুরস্ককে উড়িয়ে নেশসনস লিগে ইতালির দাপুটে জয়
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি বন্ধের চাপ, ইউপিএলের দুই কর্মীকে আটকের পর মুক্তি
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি বন্ধের চাপ, ইউপিএলের দুই কর্মীকে আটকের পর মুক্তি
মধ্যরাতে বিক্ষোভে উত্তাল চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
মধ্যরাতে বিক্ষোভে উত্তাল চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
সর্বাধিক পঠিত
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
প্রাথমিকে নিয়োগবঞ্চিত ৮১৭ জনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানালেন শিক্ষামন্ত্রী 
প্রাথমিকে নিয়োগবঞ্চিত ৮১৭ জনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানালেন শিক্ষামন্ত্রী 
আকাশসীমার অনুমতি দেয়নি পাকিস্তান, থমকে আছে রূপপুরের ইউরেনিয়াম পরিবহন
আকাশসীমার অনুমতি দেয়নি পাকিস্তান, থমকে আছে রূপপুরের ইউরেনিয়াম পরিবহন
প্রথম হলেন শ্রাবন্তী, বললেন মায়ের জন্যই এতদূর আসতে পেরেছি
প্রথম হলেন শ্রাবন্তী, বললেন মায়ের জন্যই এতদূর আসতে পেরেছি
প্রত্যেক কর্মীর হাতে আইফোন তুলে দিলেন অফিসের বস!
প্রত্যেক কর্মীর হাতে আইফোন তুলে দিলেন অফিসের বস!