কেন হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০৭:৫০, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৫, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯

দেশে প্রথমবারের মতো এতিম-বিপন্ন শিশুদের জীবন বাঁচাতে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করেছে মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। গত ১ ডিসেম্বর থেকে এর কার্যক্রম চলার কথা থাকলেও সামাজিক ও ধর্মীয় বিধি-নিষেধের কারণে এর কার্যক্রম এখনও শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। আর এই ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলেমরা ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। একপক্ষের দাবি, এই ধরনের প্রচেষ্টা ইসলামসম্মত নয়। অন্যপক্ষের মতে, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তারা যুক্তি দিয়ে বলছেন, প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে আলেমদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সমাধান বের করতে হবে। কোনোভাবে এমন একটি মহৎ উদ্যোগের বিরোধিতা করা উচিত হবে না বলেও তারা মনে করেন।

‘মিল্ক ব্যাংক’ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় তাফসির পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম দুধমায়ের সন্তানদের সম্পর্ক হবে ভাই-বোনের সম্পর্ক। ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে বিয়ে হলে সেটি হারাম (নিষিদ্ধ) হবে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের’ সমন্বয়ক ও ইনস্টিটিউটের নবজাতক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক  ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘সম্পূর্ণভাবে ইসলামি বিধিবিধান মেনেই এই ‘মিল্ক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দুধদাতা ও গ্রহীতাদের প্রত্যেককে আলাদা আইডিকার্ড দেওয়া হবে। একজন মেয়ে শিশুর মা একজন মেয়ে শিশুকে এবং একজন ছেলে শিশুর মা ছেলে শিশুকেই দুধ দেবেন। যে কারণে যারা দুধ ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে মনে করে বিরোধিতা করছেন, আশঙ্কা এখানে নেই। যারা বিরোধিতা করছেন, তারা যদি পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে জানেন, তাহলে এখানে বিরোধিতা করার কিছু নেই।’’

বিষয়টি নিয়ে ‘জিদ’ না ধরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন ইসলাহুল মুসলিমিন পরিষদের চেয়ারম্যান ও কিশোরগঞ্জ শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুধ ভাই-বোনের বিয়ের বিষয়টির সমাধান করতে হবে।’  

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের উচিত আলেমদের নিয়ে বসা। পুরো বিষয়টি আলেমদের ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা। আর ভালো কাজে কেউ বাধা দেবে না। এজন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলবো, আলেমদের নিয়ে বসুন। তাদের বুঝিয়ে বলুন।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘মুসলিম দেশ কুয়েত, মালয়েশিয়া, ইরাক, ইরান ও পাকিস্তান যে পদ্ধতি অনুসরণ করে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করেছে, আমাদের দেশেও সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যাবে কেন?’’

এক প্রশ্নের জবাবে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ আরও বলেন, ‘‘শুনেছি মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘মিল্ক ব্যাংকের উদ্যোক্তারা’ যে পদ্ধতিতে দুধদাতা গ্রহণকারীদের প্রত্যেককে যেভাবে আলাদা আইডিকার্ড দেওয়া হবে, তাতে তাদের সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য থাকবে উদ্যোক্তাদের কাছে। একজন মেয়ে শিশুর মা একজন মেয়ে শিশুকে এবং একজন ছেলে শিশুর মা ছেলে শিশুকেই দুধ দেবেন। যদি এমন পদ্ধতিতে মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দুধ ভাই-বোনের বিয়ের ক্ষেত্রে কোনও জটিলতা হবে না। কারণ, বিয়ের আগে  সংশ্লিষ্টরা খোঁজ নেবেন, তারা এতিম ছিলেন কি না, তারা মিল্ক ব্যাংক থেকে দুধ গ্রহণ করেছেন কিনা। তখন তাদের সম্পর্কিত তথ্য যাচাই করলেই বিষয়টি ধরা পড়বে। প্রকৃত তথ্যও জানা যাবে। ফলে যারা দুধ ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হওয়ার আশঙ্কা করছেন, তারা ভুল করছেন।’’  

বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) মাতুয়াইলে অবস্থিত ‘মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা গেছে, ইনস্টিটিউটে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ নামে একটি কর্নার রয়েছে। প্রথম কক্ষেই মায়ের বুকের দুধ সংরক্ষণ করে রাখার আধুনিক যন্ত্রপাতি। পাস্তুরিত মেশিনের ভেতরে পৃথক পৃথক ঘরে রয়েছে একেকটি কৌটা, এসব কৌটায় মায়ের দুধ সংরক্ষণ করা হবে। এরও ভেতরের আরেকটি বড় কক্ষের ভেতরে পার্টিশান দিয়ে দু’টি কক্ষ বানানো হয়েছে। এর সামনে কালো গ্লাস দেওয়া হয়েছে।

কী করে এই ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের’ উদ্যোগ নেওয়া হলো—জানতে চাইলে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের’ সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘দুই বছর আগে দেশের বাইরে নবজাতক বিষয় একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে যাই। সেখানেই একজন চিকিৎসকের প্রেজেন্টেশন ছিল হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক নিয়ে। আর চিকিৎসক হিসেবে জানতাম, একজন নবজাতকের জন্য মায়ের দুধের কোনও বিকল্প নেই। বুকের দুধ খাওয়ানো যায় না বলেই কেবল অনেক শিশু মারা যায়। বেঁচে থাকলেও অনেকে সারাজীবনের জন্য অপুষ্টিতে ভোগে, কেউ কেউ প্রতিবন্ধী হিসেবে বেড়ে ওঠে।’  

ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘এ সময় মাথায় আসে নবজাতকের ইনফেকশনজনিত পেটের ভেতরে ছোট ছোট ক্ষত হওয়ার একটা রোগ আছে। এই রোগের একমাত্র ওষুধ মায়ের বুকের দুধ। মায়ের বুকের দুধ খেতে পারলেই ওই নবজাতক বেঁচে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘মুসলিম দেশ কুয়েত, মালয়েশিয়া, ইরাক, ইরান ও পাকিস্তানে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক রয়েছে। মালয়েশিয়ায় তাদের স্লোগানই হচ্ছে, ‘হিউম্যান মিল্ক ফর হিউম্যান বেবি’। তখন মনে হয়, ইরান, কুয়েত, মালয়েশিয়া যদি করতে পারে, আমরা কেন পারবো না? আর বাইরের কথা যদি বাদও দেই, এই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে যেসব বাচ্চারা থাকে, যেসব বাচ্চার দত্তক নেওয়া হয়, তাদের সাহায্য করার জন্যও ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।’’

‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের’ সমন্বয়ক বলেন, ‘‘ভারতের রাজীব গান্ধী মেডিক্যাল কলেজে পৃথিবীর সবচেয়ে ‘বড় হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ রয়েছে, সেখানেও গিয়েছি পুরো বিষয়টি জানার জন্য। সেখানেই একাধিক মায়ের বুকের দুধ একসঙ্গে রাখা হয়, কিন্তু আমাদের দেশে এটা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে আলাদা করে রাখতে হবে। এ কারণে আমরা ছক করে পাস্তুরিত মেশিন তৈরি করালাম, যেখানে প্রত্যেক মায়ের বুকের দুধ আলাদা কৌটায় রাখা যাবে।’ 

‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের’ এই উদ্যোক্তা আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে আবেদন করেছি। শুরুতে তাদের দ্বিধায় থাকলেও পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলার পর সেই সন্দেহ দূর হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তারা নিজেরা ওয়ার্কশপ করে শিগগিরই আমাদের জানাবে।’

বুকের দুধ দাতা-গ্রহণকারী নাম-পরিচয় সংরক্ষণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যকের জন্য আলাদা ডাটা, আলাদা আইডি কার্ড  রাখা হবে। যিনি দান করবেন এবং যিনি গ্রহণ করবেন, তাদের দুজনের কাছেই পরিচয়পত্র থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে প্রত্যেক মায়ের দুধ আলাদা কৌটায় রাখা হবে, যেসব শিশুকে আরেক মায়ের দুধ খাওয়ানো হবে, তাদের দুই পক্ষকেই আইডি কার্ড দেওয়া হবে। রেফারেন্স নম্বর-রেজিস্ট্রেশন নম্বর, খাতা ও ভলিউম, এন্ট্রি পৃষ্ঠার নম্বর, সবই তাদের দেওয়া হবে।’ একজন মায়ের দুধের সঙ্গে আরেকজন মায়ের দুধ মিশে যাওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই বলেও তিনি জানান।

কবে থেকে এই ‘মিল্ক ব্যাংক’ চালু করা হবে—জানতে চাইলে ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘সব নিয়ম মেনে গত ১ ডিসেম্বর থেকে চালু করার কথা ছিল। কিন্তু কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে আপাতত সময় পিছিয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেবল যেসব শিশুকে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া বাঁচানো যাচ্ছে না, সেসব বাচ্চাকেই এই দুধ খাওয়ানো হবে।’

উদ্বেগজনক হারে রাস্তায় ফেলে যাওয়া এতিম ও অনাথ শিশুর সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখ করে ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘এসব শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যেন শরিয়তের পরিপন্থী কিছু না হয়, সেদিকে আমরা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া একজন চাকরিজীবী মা যদি চান, তার মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়ে তার বুকের দুধ এখানে জমা রাখতে, তাহলে তিনি তা পারবেন। পরে এখান থেকে নিয়ে সন্তানকে খাওয়াতে পারবেন। যে পদ্ধতিতে একজন মায়ের বুকের দুধ প্রিজার্ভ করার পদ্ধতি রয়েছে, তাতে তিন থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ গুণ বজায় থাকবে।’ 

ব্যক্তিগতভাবে অনেক আলেমের সঙ্গে কথা হয়েছে উল্লেখ করে ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রথমে তারা দ্বিধান্বিত হলেও পরে পুরো বিষয়টি জানার পর আর দ্বিমত করেননি। তারা বলেছেন, দুধমায়ের বিষয়টি মাথায় রেখে যদি বিষয়টির ব্যবস্থাপনা করা যায়, তাহলে  কোনও সমস্যা থাকবে না।’  

প্রসঙ্গত, মাতৃদুগ্ধ সংরক্ষণে ‘মিল্ক ব্যাংক’ স্থাপনের বিরুদ্ধে যথাযথ শর্ত আরোপ চেয়ে গত ২৪ ডিসেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইসিএমএইচ), নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র (স্কানো), নবজাতক আইসিইউ (এনআইসিইউ) এবং ঢাকা জেলা প্রশাসসকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান। নোটিশে বলা হয়েছে, ‘মিল্ক ব্যাংক’ ইস্যুতে আইনগত ও ধর্মীয় সমস্যা রয়েছে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, কোনও শিশু কোনও নারীর দুধ পান করলে ওই নারী ওই শিশুর দুধমাতা হয়ে যান। বাংলাদেশে ওই ‘মিল্ক ব্যাংক’ স্থাপনের ফলে একই মায়ের দুধ পানের কারণে যারা দুধ পান করবে, তারা প্রত্যেকে ভাই-বোন হয়ে যাবে। তাই ভবিষ্যতে এসব ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হলে সেটি ইসলাম ধর্মবিরোধী হয়ে যাবে।

এছাড়া ‘মিল্ক ব্যাংক’ ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তাই নোটিশ অনুসারে মিল্ক ব্যাংক স্থাপনে যথাযথ শর্ত আরোপ চাওয়া হয়েছে। না হলে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনি নোটিশের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘নোটিশ এখনও হাতে পাইনি।’ হাতে পাওয়ার  প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ