বাংলা ট্রিবিউনকে ইশরাক হোসেননির্বাচন উৎসব থেকে লড়াই হয়ে গেছে

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১৩:০৩, জানুয়ারি ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪১, জানুয়ারি ১৮, ২০২০

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলছেন ইশরাক হোসেনআগে নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভোটে বিএনপির মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, আমার বাবা সাদেক হোসেন খোকা যখন অবিভক্ত ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন নির্বাচন সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর ছিল। এখন তো নির্বাচনে উৎসব নেই। এখন নির্বাচন লড়াইয়ের অংশ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আজকেও (বুধবার) কিছুক্ষণ আগে আমাদের একজন সিনিয়র নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন আমরা তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছি। তাহলে নির্বাচনে উৎসব কি থাকলো? এখন আমাদের লড়াই করতে হচ্ছে নেতাকর্মীদের ছাড়ানোর জন্য। ঢাকা সিটি নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা, মেয়র নির্বাচিত হলে কাজের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইশরাক হোসেন এসব কথা বলেন। বুধবার (১৫ জানুয়ারি) নেওয়া সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো—

বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচনের এই মুহূর্তে সম্পদ বিবরণী জমা না দেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলা আলোচনায় এসেছে। এর প্রভাব নির্বাচনে পড়বে কিনা?

ইশরাক হোসেন: সরকার সব জায়গায় বিচার বিভাগকে ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রের অন্যান্য যন্ত্রগুলোকে তারা নির্বাচনে ব্যবহার করছে। আমার পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার দেখে এ রকম একটি কাজ করা হচ্ছে। তবে জনগণ বোকা নয়। তারা সহজে বিষয়টি বুঝতে পারে। খুবই মামুলি একটা বিষয়কে তারা যেভাবে মিডিয়াতে হাইলাইট করছে, এখানে ধর্ষণ, হাজার-হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ডাকাতি, অর্থপাচার, শেয়ার বাজার লুট সেগুলো নিয়ে তো আমরা মিডিয়াতে কিছু দেখছি না। আমার সম্পদের তথ্য বিবরণী নোটিশের উত্তর দেইনি সেই মামলা নিয়ে এত কিছু করা হচ্ছে। এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি বলতে চাই, জনগণ এগুলো বোঝে। সরকার এসব যত করবে ততই আমার জনসমর্থন বাড়বে।

বাংলা ট্রিবিউন: রাজনীতিতে আপনি নতুন। নগরবাসীর জন্য আপনি কী করছেন যে জনগণ আপনাকে ভোট দেবে।

ইশরাক হোসেন: এই প্রশ্নের সম্মুখীন বারবার হচ্ছি। যে কথাটি বলতে চাই, আমি ঢাকার সন্তান। এই শহরের আলো-বাতাসে বড় হয়েছি। ঢাকার অলি-গলিতে আমার অবাধ বিচরণ রয়েছে। নগরীর সমস্যাগুলো জানা আছে। এই শহরের সমস্যাগুলোর মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা। এটি একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছি। দ্বিতীয়ত, দেশের ৮০ ভাগ মানুষ এই সরকারের বিপক্ষে চলে গেছে। তারা পরিবর্তন চায় এবং ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে ধানের শীষে ভোট দিয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করবে। আমার বাবা দীর্ঘদিন এই এলাকার সংসদ সদস্য এবং অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন। তিনি অনেক কাজ করেছেন। নগরীর উন্নয়নে তার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। বাবা যখন মেয়র ছিলেন তখন এবং পরবর্তীতে তার কাছে আমি নগরীর সমস্যাগুলো জানতে চাইতাম। তিনি নগরের উন্নয়নে কী-কী বাধার সম্মুখীন হয়েছেন তা জানতে চাইতাম। আমি নিজেও একজন প্রকৌশলী। সিটি ডেভেলপমেন্টের ওপর আমার নিজস্ব রিসার্স রয়েছে। দেশের বাইরে পড়ালেখা করার সময় উন্নত বিশ্বের শহরগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে। তখন দেখেছি উন্নত দেশগুলো কীভাবে তাদের সিটি সমস্যাগুলোর সমাধান এবং ডেভেলপমেন্ট করে। সবকিছু মিলিয়ে মনে করছি, ভোটারা আমাকেই ভোট দেবে। তরুণ ভোটাররা আমার বড় শক্তি বলেও মনে করি।

বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে বারবার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর কারণ কী?

ইশরাক হোসেন: দলীয় সরকারের অধীনে কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ ক্ষমতাসীন দল ইতোমধ্যে সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে দলীয় কর্মকাণ্ডে। সব প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। জনগণ জানে, গত জাতীয় নির্বাচনটা কীভাবে হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর ভোট ২৯ তারিখে হয়ে গেছে। সংবিধানকেও কাটাছেঁড়া করে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। তারা এখনই নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। আমাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, হয়রানি করা হচ্ছে। এভাবে কি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব?

বাংলা ট্রিবিউন: মেয়র নির্বাচিত হলে কোন কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন।  

ইশরাক হোসেন: মেয়র নির্বাচিত হলে আমার প্রথম কাজ হবে মশা নিধন। সামনে ডেঙ্গু ও মশা প্রজননের মৌসুম আসছে। ফলে প্রথম দিন থেকে এটাকে আমি গুরুত্ব দেবো। আমরা চাই না যে, আবার ডেঙ্গুর মহামারি হোক এবং মানুষের প্রাণহানি ঘটুক। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার- যানজট নিরসন। আপনারা জানেন যে, ঢাকার কী ভয়াবহ অবস্থা। যানজটের কারণে প্রতি বছর ৩৬ হাজার কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। নগরের সব অংশীজনকে নিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করবো। এরপর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেবো। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর বর্জ্য পড়ে থাকে। বৃষ্টির সময় সেগুলো ভেসে পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। আরেকটি বিষয়ে জোর দেওয়া হবে, সেটি হচ্ছে বায়ু দূষণ। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা প্রায়ই এক নম্বরে থাকে। এক থেকে সাতের মধ্যে তো সব সময় থাকে। জলাবদ্ধতা নগরীর সমস্যাগুলোর অন্যতম। এটিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। হালকা বৃষ্টিতে শহর ডুবে যায়। বিশেষ করে পুরান ঢাকার অনেক এলাকা রয়েছে যেগুলো ওয়াসার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার বাইরে রয়েছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতে খুব তাড়াতাড়ি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বাংলা ট্রিবিউন: গত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অনেক জায়গায় বিএনপির পোলিং এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ সমস্যার কি সমাধান করতে পারবেন?

ইশরাক হোসেন: বিএনপি পোলিং এজেন্ট নিশ্চিত করতে পারে না, এটা ভুল। বিগত নির্বাচনগুলোতে পুলিশি অত্যাচার চালানো হয়েছে। আমরা কাদের এজেন্ট নিয়োগ দেবো? দলীয় কর্মীদের তো। গত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকায় প্রায় ১০ হাজার নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে মাঠ শূন্য করে ফেলা হয়েছে। এই নির্বাচনে যদি সেই রকম কিছু না হয় তাহলে আমরা পোলিং এজেন্ট দিতে পারবো।

বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিপক্ষে বিএনপি। আবার আপনারা নির্বাচনে অংশও নিচ্ছেন। এটা কেন?

ইশরাক হোসেন: আমরা জানি যে, ইভিএমে বিশেষ উপায়ে ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। ইভিএমকে মেনে নিয়েছি বিষয়টি এমন নয়- তা বাতিলের দাবি আমরা অব্যাহত রাখছি। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেও থাকছি। আন্দোলনের অংশ হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।

ইশরাক হোসেনবাংলা ট্রিবিউন: নগরীতে বিএনপির প্রার্থীদের পোস্টার তেমন একটা চোখে পড়ছে না, এটা কেন?

ইশরাক হোসেন: এর কারণ সবাই জানে। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। যারা পোস্টার লাগাতে যাচ্ছে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তাদের মারধর করা হচ্ছে। পোস্টার লাগানোর সময় ধানমন্ডি থেকে চারজনকে আটক করে নিয়ে গেছে। পরবর্তীতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে। আমরা পোস্টার লাগানোর চেষ্টা করছি। তারা যেহেতু ক্ষমতায়, ফলে শক্তি প্রয়োগ করে তা ছিঁড়ে ফেলছে। আমি মনে করি, এতে জনগণের মত পাল্টাবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: দিন-দিন নারী ও শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে ঢাকা নগরী। এটা নিয়ে আপনার কোনও পরিকল্পনা আছে কিনা? 

ইশরাক হোসেন: নারী ও শিশুদের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ শহরের তালিকায় ঢাকা এক নম্বরে এসেছিল। এ বিষয়ে আমাদের ইশতেহারে কিছু প্রস্তাবনা থাকবে। ইশতেহারে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীকে কীভাবে দেখছেন

ইশরাক হোসেন: আমি আমার প্রতিপক্ষ নিয়ে কিছু বলতে চাই না। সে বিচার-বিবেচনা জনগণ করবে। আমার বিচারও জনগণ করবে। জনগণ সুষ্ঠু ভোট দিতে পারলে তারা তাদের রায় দেবে। আর বিগত এক দশকে নির্বাচনগুলোতে কী হয়েছে সেটা আপনারা জানেন। সেই রকম হলে ভোটের ফলাফল কী হবে সেটাও জনগণ জানে। 

 ছবি- সাজ্জাদ হোসেন

 

 

/ওআর/

লাইভ

টপ