কাল্পনিক চারটি চরিত্র বানিয়ে বাকিদের দলে ভেড়ায় নাজমুল

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ০১:২৯, জানুয়ারি ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০৬, জানুয়ারি ২৪, ২০২০

গ্রেফতার চার আসামিপুলিশের একজন কর্মকর্তা, একজন বড় সাংবাদিক, ডাক্তার ও বড় উকিল। পৃথক চার পেশার চারজনকে হাতে রাখতে পারলে অপরাধ জগত হাতে রাখা যায়, যেকোনো অপরাধ করা যায়। প্রচুর হিন্দি সিনেমা দেখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলীর পরিবারের ওপর হামলার পরিকল্পনাকারী ও দলনেতা শেখ নাজমুল ইসলামের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়। বাস্তবে এই চার পেশার লোককে নিজের সঙ্গে না পেয়ে কাল্পনিকভাবে চারজনকে তার সাতজনের দলের সামনে উপস্থাপন করে। নাজমুল নিজে ছাড়া বাকি ছয়জনকে তার দলে ভেড়ানোর জন্য কাল্পনিক চার চরিত্রকে হাজির করে। দলের অন্য সদস্যদের নাজমুল বলে, ‘পুলিশ, সাংবাদিক, ডাক্তার ও উকিল মিলে খেলার মাঠ তৈরি করে রেখেছে। এখন আমাদের শুধু মাঠে নেমে খেলতে হবে। বাকি সব তারা সামলাবে।’
সারওয়ার আলীর পরিবারের প্রতি ক্ষোভ জমা ছিল নাজমুলের মনে। এই ক্ষোভ থেকে এই পরিবারকে শায়েস্তার পরিকল্পনা করে সে। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দলের অন্য সদস্যদের সামনে ভিন্ন পরিকল্পনা হাজির করে যা ছিল ডাকাতি। দলের সদস্যরা জানতো, চারজন মাস্টার মাইন্ড (পুলিশ, সাংবাদিক, ডাক্তার ও আইনজীবী) একটি বাসায় ডাকাতির পরিকল্পনা করেছে। খুবই সুক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা করা আছে, এখন শুধু বাস্তবায়ন বাকি। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে শেখ নাজমুলের নেতৃত্বে। চার মাস্টার মাইন্ডের কোনও অস্তিত্ব বাস্তবে না থাকলেও নাজমুল তার দলে অন্যদের ভেড়ানোর জন্য এই কাল্পনিক চরিত্রগুলো উপস্থাপন করে। মাস্টার মাইন্ডদের বিভিন্ন গল্প দলের নতুন সদস্যদের কাছে তুলে ধরে। আর এসব গল্প শুনে ছয়জন শেখ নাজমুলের সঙ্গে ডাকাতি করতে সম্মত হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা হলো, শেখ নাজমুল ইসলাম (৩০), শেখ রনি (২৫), মো. মনির হোসেন (২০), মো. ফয়সাল কবির (২৬) ও মো. ফরহাদ (১৮)। আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে এসব তথ্য জানান পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার।
চেহারা পাল্টাতে দুই মাস ধরে দাড়ি কাটেনি নাজমুলতিনি বলেন, ‘নাজমুলকে গ্রেফতারের আগে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা বলেছে- উকিল, সাংবাদিক ও পুলিশকে জিজ্ঞাসা করেন কেন এ কাজ করা হয়েছে। আমরা জানি না। তাদের এসব কথা শুনে শুরুতে আমরা খুব বিভ্রান্ত ছিলাম। দলের অন্য সদস্যদের নাজমুল বোঝাতো, উল্লেখিত চারজনের কাজ হলো, মাঠ তৈরি করা। আর আমাদের কাজ হলো- মাঠে খেলা।’ চার মাস্টার মাইন্ড ‘মাঠ’ হিসেবে একটি বাসা নির্ধারণ করেছে। আর খেলোয়াড় হিসেবে নাজমুলের নেতৃত্বে সাতজন ‘মাঠে খেলবে’। অর্থাৎ ওই বাসায় ডাকাতি করবে। আর এই কাজে চার কাল্পনিক মাস্টার মাইন্ড পেছনে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে দলের অন্য সদস্যদের জানায় নাজমুল।
গ্রেফতারকৃতদের উদ্ধৃতি দিয়ে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘দলের অন্য সদস্যদের নাজমুল বলেছিল, তাদের কাজে পুলিশ অস্ত্র সরবরাহ করবে। আর ঘটনাস্থলে কেউ চলে এলে পুলিশ তাকে সরিয়ে দেবে। সাংবাদিক অন্য জায়গায় বসে কোথায়, কোন ফ্লোরে যেতে হবে তার নির্দেশনা দেবে। ক্যামেরা থাকবে স্ট্যান্ডবাই। উকিল স্ট্যাম্প দিয়ে দিয়েছে। এগুলোতে সারওয়ার আলীর সাক্ষর নেওয়া হবে। এতে সারোয়ার আলী হয়ে যাবেন আসামি। এছাড়া পরের সমস্যাগুলো সামলাবে। আর ভুলক্রমে কেউ আহত হলে, ডাক্তার তাদের চিকিৎসা দেবে। এছাড়া অগ্রিম কিছু ওষুধও দেবে। এসব কাল্পনিক চরিত্র উপস্থাপন করে নাজমুল অন্যদের দলে ভিড়িয়েছিল।’

কাল্পনিক উকিলের দেওয়া কাগজপত্রকাকে কোথা থেকে দলে এনেছিল নাজমুল
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, নাজমুল তার সাতজনের টিমের টু আই সি (উপ-অধিনায়ক) বানান চাচাতো ভাই শেখ রনিকে। সে উত্তরায় একটি দোকানে চাকরি করতো। এরপর দলে যোগ দেয় নাজমুলের প্রতিবেশী ফয়সল কবির। সে এক সময় ঢাকায় গার্মেন্টেসে চাকরি করতো। দলে দুজন সাহসী লোক জোগাড় করতে নাজমুল যায় আব্দুল্লাহপুর লেবার মার্কেটে। সেখানে গিয়ে নাজমুল সন্ধান করে, সাত তলায় মাচা বানাতে পারে এমন দুজনের। মনির হোসেন ও ফরহাদ নামে দুজনকে নিয়ে আসে। প্রথম দু’দিন বেতন দেওয়ার পর তাদের বোঝানো হয়, মাঠ তৈরি আছে, এখন শুধু খেলায় নামতে হবে। নাজমুলের পরিকল্পনা শুনে এই দুজন রাজি হয়ে যায়। ঘটনা ঘটানোর পর তাদের দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা জানায় নাজমুল।
নাজমুলের ওপর যে কারণে নাখোশ ছিলেন সারওয়ার আলীর স্ত্রী
পলাতক নাজমুল এক বছরের বেশি সময় আগে ডা. সারওয়ার আলীর চালক হিসেবে কাজ করতো। চার মাস কাজ করার পর ডা. সারওয়ার আলীর স্ত্রী ডা. মাখদোম নারগিসের সঙ্গে কথাকাটি হয় তার। সেদিন রাতেই চাকরি ছেড়ে চলে যায় নাজমুল। আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তার ওপর নাখোশ ছিলেন মাখদোম নারগিস। এ বিষয়ে ডা. মাখদোম নারগিস বলেন, ‘নাজমুল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দেখলেই অন্য রকম আচরণ করতো। উত্তরা থেকে মহাখালী বা অন্যান্য জায়গায় আসা-যাওয়ার সময় ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কোনোভাবেই প্রবেশ করতে চাইতো না। বরাবরই নানা অজুহাতে এড়িয়ে যেতো। পুলিশ বা সেনাবাহিনী দেখলে নিজেকে আড়াল করে রাখতো। কোনও চেকপোস্টে গাড়ি থামানো হলে সে নিজে কথা না বলে পেছনের গ্লাস নামিয়ে দিতো। বাধ্য হয়ে আমি কথা বলতাম। সে রহস্যজনকভাবে নিজে কখনও মুখোমুখি হতো না।’
তিনি বলেন, ‘নাজমুলের সন্দেহজন আচরণ ও চলাফেরা আমি টের পেয়ে মেয়ে ও ডা. সারওয়ার আলীকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা পাত্তা দেয়নি। সর্বশেষ যেদিন ও চাকরি ছাড়ে সেদিনও মূল সড়কে জ্যাম থাকায় আমি ক্যান্টনমেন্ট দিয়ে যেতে বলি। সে প্রথমে না করে, পরে আমি জোর গলায় বলায় ভেতরে প্রবেশ করে। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সেদিন কোনও ইভেন্ট ছিল হয়তো। সেজন্য নিরাপত্তা কড়াকড়ি ছিল। ভেতরে ঢোকার পর তার যাওয়ার কথা জাহাঙ্গীর গেটের দিকে। কিন্তু সে মিরপুরের দিকে যাওয়ার জন্য গাড়ি ঘোরায়। আমি কারণ জানতে চাইলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, রাস্তা ভুল হয়েছে। এ নিয়ে আমার বেশ রাগ হয়। এমনিতেই দ্রুত যেতে হতো আমার। এরপর বাসায় এসে অন্যদের ঘটনা জানিয়েছি। সেদিনই সে চাকরি ছেড়ে চলে যায়।’ ‘নাজমুল আচরণ উগ্রপন্থিদের মতো ছিল। যে কারণে আমাদের টার্গেট করে হামলা করে থাকতে পারে।’ বলছিলেন মাখদোম নারগিস।

কাল্পনিক সাংবাদিকের দেওয়া জিনিসপত্রযেভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়
আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, গত ৪ জানুয়ারি সকালে আশকোনা এলাকায় হাজি ক্যাম্পের সামনে একটি হোটেলে নাস্তা ও ডাকাতির বিষয়ে বৈঠক করে পুরো টিম। এ সময় নাজমুল সদস্যদের জানায়, এই কাজটি করার জন্য গত তিন মাস ধরে নিজের দাড়ি গোফ কাটেনি যাতে বাসায় তাকে কেউ চিনতে না পারে। এরপর ৫ জানুয়ারি বিকাল ৫ টার দিকে আশকোনার হোটেল রোজ ভ্যালির ৩০৩ নম্বর কক্ষে বসে সাতজন চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে। এ সময় নাজমুল বাসার পরিবেশ, কক্ষ, পার্কিং প্লেস ইত্যাদি সম্পর্কে সকলকে জানিয়ে দেয় এবং ডাকাতির সময় কার, কী ভূমিকা হবে তা বুঝিয়ে দেয়। নাজমুল অন্য আসামিদের জানায়, ডা. সারোয়ার আলীর বাড়িতে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার রয়েছে কিন্তু সে অন্য আসামিদের ডা. সারোয়ার আলীর পরিবারের প্রতি তার ক্ষোভের বিষয়টি গোপন রাখে। ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭ টার দিকে ওই হোটেল থেকে প্রথমে একা বের হয় নাজমুল। প্রায় আধা ঘণ্টা পর বাকি ৬ জন ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেয়। উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে এসে নাজমুল একটি ব্যাগে করে ৭টি চাপাতি ও ৫ টি সুইচ গিয়ার ছুরি নিয়ে রনির হাতে দেয়। রনি ঘটনাস্থলে থাকা ৫ জনকে ছুরিগুলো বিতরণ করে। নাজমুল রাত ৯ টার দিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে বাসায় ঢুকে দারোয়ান হাসানকে দেয় এবং কৌশলে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়। পরে দারোয়ান হাসান ঘুমিয়ে পড়বে এ অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু রাত ১০ টা পর্যন্ত দারোয়ান না ঘুমালে তাকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রেখে বাইরে থেকে ফয়সালকে ডেকে নিয়ে ২য় তলায় গিয়ে আড়ালে থেকে অপেক্ষা করতে বলে এবং তার সঙ্গে থাকা চাপাতিসহ ব্যাগটি গ্যারেজের পাশে রেখে দেয়। নাজমুল ও ফয়সাল ২য় তলায় তাদের সেন্ডেল খুলে রেখে ৩য় তলায় যায়। তৃতীয় তলায় সারওয়ার আলীর মেয়ের ফ্ল্যাটে বাড়ির সিসিটিভির মনিটর রয়েছে বলে তথ্য ছিল নাজমুলের। বাসায় নক করার পর দারোয়ান হাসানের পরিচয় দিলে সারওয়ার আলীর মেয়ে দরজা খুলে দেন। তখন ধাক্কা দিয়ে নাজমুল ও ফয়সাল বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। ছুরির মুখে ড. সায়মা আলী, তার স্বামী মো. হুমায়ুন কবির ও মেয়ে অহনা কবিরকে জিম্মি করে।
রাত ১০ টা ২৫ মিনিটের দিকে ফয়সালকে ৩য় তলার নিয়ন্ত্রণে রেখে নাজমুল ৪র্থ তলায় ডা. সারওয়ার আলীর ফ্ল্যাটে নক করে। ডা. সারওয়ার আলী দরজা খুলে দিতেই জোরপূর্বক ভেতরে ঢুকে তাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে মেঝেতে ফেলে গলায় ছুরি ধরে এবং এই সময় তার স্ত্রী ডা. মাখদুমা নার্গিস চিৎকার শুরু করলে নাজমুল বাইরে অপেক্ষারত সহযোগীদের ফোনে ভেতরে আসতে বলে। তাদের অনবরত চিৎকার শুনে ২য় তলার ভাড়াটিয়া মেজর (অব.) সাহাবুদ্দিন চাকলাদার ও তার ছেলে মোবাশ্বের চাকলাদার সজিব ৪র্থ তলায় আসেন। দারোয়ান ঘুমিয়ে না পড়ায় নাজমুলের বাইরে অবস্থানরত সহযোগীরা ফোন পেয়েও ভেতরে ঢুকতে না পারায় নাজমুল হতাশ হয় ও ভয় পেয়ে যায়। ওই সময় ডা. সারওয়ার আলীর পরিবারকে রক্ষার জন্য ভাড়াটিয়ার ছেলে টি-টেবিল হাতে নিলে টেবিলের ওপরে থাকা গ্লাসটি ফ্লোরে পড়ে বিকট শব্দ হয়। তখন নাজমুল ভয় পেয়ে দ্রুত বাসার ভেতর থেকে পালিয়ে যায়। ওপরের শব্দ শুনে ৩য় তলায় থাকা আসামি ফয়সালও দ্রুত পালিয়ে যায়। নাজমুল ও ফয়সাল দৌড়ে নিচে চলে গেলে অন্য সকল আসামিরাও দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

ছদ্মবেশে পুলিশের অভিযান পরিচালনাকারী টিম প্রযুক্তির সহায়তা ও ছদ্মবেশে আসামিদের গ্রেফতার
ডা. সারওয়ার আলীর বাসায় হামলার ঘটনা ঘটে গত ৫ জানুয়ারি রাতে। হত্যা চেষ্টা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। পরবর্তীতে তদন্ত ভার পায় পিবিআই। গত ১২ জানুয়ারি আসামি ফরহাদকে গ্রেফতারের পর ঘটনার কিছুটা তথ্য পান তদন্তকারী সদস্যরা। তবে মূল টার্গেট ছিল পরিকল্পনাকারী শেখ নাজমুল ইসলামকে গ্রেফতার করা। মামলার তদারকি কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রেজাউল মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নাজমুল প্রচুর সিনেমা দেখার কারণে পুলিশি তদন্তের কিছু কৌশল সম্পর্কে অবগত ছিল। প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা তার অবস্থান বুঝতে পারলেও বারবার সে জায়গা পরিবর্তন করে। এছাড়া বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরা ছদ্মবেশে অবস্থান নিয়ে নাজমুলকে গ্রেফতার করে।

আরও পড়ুন: সারোয়ারের পরিবারকে শায়েস্তা করতেই বাসায় হামলা



/আরজে/ওআর/

লাইভ

টপ