ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাংবাদিক আরিফকে সাজা দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১১:৩৭, মার্চ ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৭, মার্চ ১৫, ২০২০

আরিফুল ইসলাম

মধ্য রাতে বাড়িতে হানা দিয়ে তুলে নিয়ে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড প্রদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ১৭ জনকে রিটে বিবাদী করা হয়।

রবিবার (১৫ মার্চ) বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক  হারুন উর রশীদের পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন।

ইশরাত হাসান বলেন, ‘বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি সরদার মো. রশিদ জাহাঙ্গীরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি হতে পারে।’

এছাড়াও রিটে ফৌজদারি কার্যবিধি, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এবং সংবিধানের ৩১,৩২, ৩৩, ৩৫ এবং ৩৬ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১৭ জনকে বিবাদী করা হয়েছে ।’

টাস্কফোর্সের নামে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে দেওয়া সাজা এবং জেল প্রদান কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আরজি জানানো হয়েছে।

রিটে টাস্কফোর্সের নামে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে দেওয়া সাজা সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৫ এবং ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভুত হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়াও সাংবাদিকদের সুরক্ষায় নীতিমালা তৈরিতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না, রিটে সে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

রিটে কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পরভীন, কুড়িগ্রামের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার নিজাম উদ্দিন এবং কুড়িগ্রামের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমাকে হাইকোর্টে হাজির হয়ে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে সাজাপ্রদানের বিষয়ে  ব্যাখ্যা দিতে হাইকোর্টে তলব, আরিফুল ইসলামকে সাজা দেওয়া ভ্রাম্যমাণ আদালত মামলার নথি (০৬/২০২০) ও টাস্কফোর্স পরিচালনার নথি তলব করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। 

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) মধ্যরাতে বাড়িতে হানা দিয়ে মারধর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে। তার বাসায়  আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ আনা হয়। এরপর গভীর রাতে  জেলাপ্রশাসকের অফিসে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সাংবাদিক আরিফকে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে রাখা হয়েছে বলে জানান কুড়িগ্রামের জেলার লুৎফর রহমান।

এদিকে, আরিফের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু ওই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাতের খাওয়া শেষে আমরা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় দরজায় আঘাত। কারা দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে বুঝতে না পেরে আরিফ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে ফোন দেন। থানা থেকে ওসি বলেন, তারা কাউকে পাঠাননি। এরপরই দরজা ভেঙে ৭/৮ জন লোক ঢুকে ‘তুই খুব জ্বালাচ্ছিস’ বলে পেটাতে থাকে। এরপর তাকে নিয়ে চলে যায়। ভেতরে-বাইরে মিলে ২০-৩০ জন ছিল। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, আরিফুলকে এক বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এরপর শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে কুড়িগ্রাম কারাগারে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করতে যান নিতু। সেখানে আরিফুল ইসলাম তার স্ত্রীকে জানান, মধ্যরাতে তাকে বাসা থেকে জোর করে আনার পথে জেলা প্রশাসক কার্যালয় পর্যন্ত লাথি-থাপ্পর, ঘুষি মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে প্রথমে তার দুই চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর প্যান্ট ও গেঞ্জি খুলে তাকে বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এসব দৃশ্য ভিডিও করা হয় বলে জানিয়েছেন আরিফুল। তিনি আরও জানান, যারা তাকে নির্যাতন করেছে, তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তা।’

আরিফের স্ত্রী অভিযোগ করেন, তারা কোনও তল্লাশি অভিযান চালাননি। পরে ডিসি অফিসে নেওয়ার পর তারা দাবি করেন, আরিফুলের বাসায় আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন একটি পুকুর সংস্কার করে নিজের নামে নামকরণ করতে চেয়েছিলেন। আরিফুল এ বিষয়ে নিউজ করার পর থেকেই তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন ডিসি। এছাড়া, সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করতে চেয়েছিলেন সাংবাদিক আরিফ। এ বিষয়ে জানতে পেরে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে তাকে বেশ কয়েকবার ডেকে নিয়ে সতর্ক করা হয়। তবে এ বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

এদিকে মধ্যরাতে মাদকবিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযানে আরিফুল ইসলামকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

আরও পড়ুন:

প্রতিশোধ নিতেই আইনের অপপ্রয়োগ!

‘ডিসি অফিসে নিয়ে সাংবাদিক আরিফকে চোখ বেঁধে বিবস্ত্র করে পেটানো হয়’

মধ্যরাতে আরিফকে গ্রেফতার করে সাজা: রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ

আরিফের ওপর অন্যায় হয়ে থাকলে ডিসিকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে: প্রতিমন্ত্রী

‘রাতে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকতে পারেন না মোবাইল কোর্ট’

মোবাইল কোর্টে আরিফকে সাজায় ক্ষুব্ধ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, তদন্তের নির্দেশ

কুড়িগ্রামের ডিসির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে বললেন আইনমন্ত্রী

‘তুই অনেক জ্বালাচ্ছিস- বলে মারতে মারতে নিয়ে যায় আরিফকে’

মধ্যরাতে বাড়ি থেকে সাংবাদিককে ধরে নিয়ে মোবাইল কোর্টে এক বছরের জেল

মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফুলকে তুলে নিয়ে গেলো মোবাইল কোর্ট

আরিফের আটক ও সাজার আইনি ব্যাখ্যা দিতে পারেননি ডিসি সুলতানা

কাবিখা’র টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসি’র নামে নামকরণ!

/বিআই/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ