সামাজিক দূরত্বের নিয়ম না মেনেই কেনাবেচা চলছে বাজারে

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ০৯:০০, মার্চ ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৭, মার্চ ২৭, ২০২০

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। তবে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে খোলা রয়েছে কাঁচাবাজার, খাবারের হোটেল, ওষুধের দোকান, হাসপাতালসহ জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসব স্থানে মেনে চলা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্বের নিয়ম। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুখোমুখি দাঁড়ালে একজন থেকে অপরজনের দূরত্ব হতে হবে ছয় ফুট আর সারি বেঁধে দাঁড়ালে তিন ফুট দূরত্ব থাকা চাই।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে শুক্রবার (২৭ মার্চ) জানানো হয়েছে, দেশে সীমিত আকারে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে। এমন অবস্থায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে না চললে করোনাভাইরাস আরও বেশিসংখ্যক মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে।

আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও কাঁচাবাজারসহ জরুরি সেবা চালু আছে। তবে এসব স্থানে গেলে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। সামনাসামনি দাঁড়ালে একজন থেকে অপরজনের দূরত্ব হওয়া চাই দুই মিটার বা ছয় ফুট। নির্দিষ্ট দূরত্ব থাকলে হাঁচি-কাশির জীবাণু এড়ানো যায়। এখন এটাই বেশি জরুরি। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি আসা কেউ অন্যদের থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে চলাফেরা করলে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।’

সামাজিক দূরত্ব প্রসঙ্গে এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মন্তব্য, ‘সামাজিক দূরত্ব হলো বড় আকারের জনসমাবেশ বন্ধ করা। সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ এজন্য পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষকে নিজেদের সুরক্ষার জন্যই জনবহুল অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলতে হবে।’

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এসব দিনে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে না যেতে জনগণকে অনুরোধ করা হয়েছে।

গতকাল ও আজ (২৭ মার্চ) সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও ফার্মেসি ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছেন না। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েই প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন তারা। কিছু এলাকায় পুলিশ ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই বেশিরভাগ মানুষের। দোকানিরাও এ ব্যাপারে কাউকে সতর্ক করছে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর মনে করেন, সাধারণ জনগণ যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করে সেজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। একই অভিমত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক আব্দুন নূর তুষারের। তার মন্তব্য, দূরত্বের সঠিক তথ্য না জানার কারণে তা মানছে না অনেকে।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যায় গুলশান-২ এলাকায় বেশ কয়েকটি ফার্মেসির সামনে বৃত্ত এঁকে দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগ। একজনের পর আরেকজন ক্রেতা যাতে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে ওষুধ কিনতে পারে এবং নিজেকে সংক্রমণমুক্ত রাখতে পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গুলশান বিভাগের সহকারী কমিশনার (অ্যাডমিন) সৈয়দ মামুন মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পর্যায়ক্রমে গুলশান এলাকার অন্যান্য স্থানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সুবিধার্থে বৃত্ত অঙ্কন করে দেওয়া হবে। তার কথায়, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে আমরা গুলশান-২ এলাকায় বৃহস্পতিবার পাঁচটি ফার্মেসিতে সামাজিক দূরত্ব বজায়ের জন্য বৃত্ত এঁকে দিয়েছি। কোনও ফার্মেসি বা দোকানে একাধিক ক্রেতা এলে বৃত্তে দাঁড়িয়ে থেকে একজনের পর একজন প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনবেন। এর সুবাদে নিজে সুরক্ষিত থাকার পাশাপাশি অন্যকেও নিরাপদে রাখা যাবে।’

 

বাজারে ও ফার্মেসিতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে করণীয়

খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ কেনা, চিকিৎসা, মৃতদেহ সৎকারের মতো জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. আব্দুন নূর তুষার। তিনি একটি মডেলের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘যেকোনও দোকান বা ফার্মেসির প্রবেশমুখে অবশ্যই আলাদা কাউন্টার থাকতে হবে। কাউন্টারে কাচ থাকা চাই। এখানে ক্রেতারা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াবেন। একজন আরেকজনের থেকে তিন ফুট দূরত্বে সারি বেঁধে দাঁড়াবেন। আর মুখোমুখি দাঁড়ালে ছয় ফুট দূরত্ব থাকতে হবে। লাইনে দাঁড়িয়ে সবার প্রেসক্রিপশন কাউন্টারে জমা দিতে হবে। ডেলিভারিম্যান প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ এনে নাম ধরে ডাকবে, এরপর ক্রেতা মূল্য পরিশোধ করে চলে যাবেন। যারা ভেতর থেকে ওষুধ এনে দেবে তাদের হাতে গ্লাভস থাকতে হবে। ওষুধ হাতে নেওয়ার পর ক্রেতা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে ওষুধ নিয়ে বাসায় যাবে। কোনোভাবেই গাদাগাদি বা ঘেষাঘেষি করে দাঁড়ানো যাবে না।

মাছ-মাংসের দোকানে কাউন্টার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক ডা. আব্দুন নূর তুষার। অর্ডার পেয়ে বিক্রেতা ওজন দিয়ে কাউন্টারে এসে ক্রেতার হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দেবে। একই পদ্ধতিতে চলবে মাছ বেচাকেনা।

সবজির ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের আধা কেজি বা এক কেজির নিচে কোনও কিছু বিক্রি না করার নির্দেশনা দিতে হবে। বিক্রেতা আধাকেজি বা এক কেজির প্যাকেট আগেই মেপে সাজিয়ে রাখবে। ক্রেতা চাহিদা অনুযায়ী মূল্য পরিশোধ করে প্যাকেট নিয়ে ঘরে ফিরবে।

বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য গ্রহণের পর ক্রেতাকে হাত পরিষ্কার করে বাসায় ফিরতে হবে। বিক্রেতাদেরও নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা জরুরি এবং তাদের হাতে গ্লাভস পরে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

/জেএইচ/

লাইভ

টপ