চলে গেল আয়োজনহীন এক পরিবেশ দিবস

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২৩:৫২, জুন ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩৮, জুন ০৭, ২০২০

বিশ্ব পরিবেশ দিবস৫ জুন বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হওয়ার কথা ছিল পরিবেশ দিবসের। কিন্তু কোথাও কোনও আয়োজন নেই। এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল উদযাপন হওয়ার কথা ছিল কলম্বিয়ায়। কিন্তু এখনও চীনাদের পরিবেশ দিবস পালনের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে ইন্টারনেটে। কোভিড-১৯ এর সংক্রমণে বিশ্ব যেমন স্থবির হয়েছে তখন পরিবেশ দিবসেও নেই কোনো আয়োজন।  ফলে বাংলাদেশেও ছিল না কোনও আয়োজন।  

চলতি বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘টাইম ফর নেচার’, অর্থাৎ জীববৈচিত্র সংরক্ষণের এখনই সময়। মিল রেখে বাংলাদেশের স্লোগান ছিল  ‘প্রকৃতিকে বাঁচানোর এখনই সময়।’

প্রতি বছর দিনটিতে বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রধান আয়োজন হয় ঢাকাতে। প্রধান অতিথি থাকেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। প্রত্যেক জেলা শহরে পৃথক পৃথক আয়োজন থাকে। আয়োজন জেলা থেকে ছড়িয়ে পড়ে উপজেলাতে। এবার যার কিছুই আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।

জাতিসংঘ তাদের ওয়েবপেইজে বলেছে, এই দিনটি সমগ্র মানব জাতির দিন। এই দিনটি মানুষের। মানুষ এই দিনে পৃথিবীর প্রতি যত্নশীল হয়ে এমন কিছু করবেন যাতে পৃথিবী নামের গ্রহটি সকলের বাসযোগ্য থাকে। এটা হতে পারে আকেবারে অঞ্চলিক পর্যায়ে, কিংবা জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক অঙ্গণে।

এবার সেই দিনে মানুষ বন্দি ঘরে ঘরে। এই বন্দিদশায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পরিবর্তন এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতে বনের সিংহ বের হয়ে এসে পিচ ঢালা রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সজারে গোলাপি ডলফিন সাঁতরে বেড়াচ্ছে। বলা যেতে পারে করোনা বিশ্ব পরিবেশকে মেরামত করে দিলেও পালন করতে দেয়নি দিবসটি।

২০১৯ সালে  বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় বৃক্ষ রোপণ অভিযান এবং বৃক্ষমেলা উদ্বোধন করেন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো.আব্দুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণীও দিয়েছিলেন। এবার এসবের কোন কিছুই ছিলো না।

পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে আমরা এবার পরিবেশ দিবসের অনুষ্ঠান করতে পারিনি। এবার তো মুজিববর্ষ উপলক্ষে আমাদের পরিকল্পনা অনেক বড় ছিল। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কি হবে তা তো কেউ জানে না। তবে সামনে বড় করে দিবসটি উদযাপন করার ইচ্ছে আছে সরকারের।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাই বিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’ এর বায়ুমান সূচকে (একিউআই) বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম স্থান থেকে সরে ষষ্ঠতে গিয়ে দাড়িয়েছে। সূচকের মান জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে যেখানে ছিল ৩০০ এর উপরে। যা শুধু অস্বাস্থ্যকর নয়, দুর্যোগের পর্যায়ে ছিল বলে বিশেষজ্ঞদের দাবি। সেখানে এখন সেই সূচক নেমে এসেছে গড়ে ৫০ এর নিচে। তবে আজ আবার কিছুটা বেড়ে হয়েছে ১৫১।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, লকডাউনের কারণে যানবাহন কম, ইট ভাটা বন্ধ, কনস্ট্রাকশন কাজ বন্ধ থাকায়  বায়ু দূষণের মাত্রা অনেক কমে গেছে। আমরা এক সময় যেখানে মাত্রার দিক থেকে প্রথম স্থানে ছিলাম এখন তা বেশিরভাগ দিনই ১০০ এর নিচে থাকে। গত দুইদিনেএ বৃষ্টিতে সেটি আরো কমে গেছে। এখন আমরা স্বাস্থ্যকর অবস্থায় আছি। যা আমাদের পরিবেশের জন্য খুবই ভালো খবর। তবে এখন আবার সব খুলতে শুরু করেছে। ফলে কি কি কারণে দূষণ হয় তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারের উচিত এখন এসব বিষয়ে আরো কঠোর হওয়া। তাহলে আমরা সব সময় স্বাস্থ্যকর বায়ু পেতে পারি।

অন্যদিকে করোনার প্রভাবে গত দুই মাস ধরে চিরায়ত শব্দ দূষণের যন্ত্রণার হাত থেকে অনেকটাই মুক্ত রাজধানীবাসী। কোথাও কোথাও শোনা যাচ্ছে পাখির ডাকও। তবে একটু একটু করে জীবনযাত্রা সচল হওয়াতে শব্দ দূষণ কিছুটা বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুল মতিন বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সবাই ঘরে থাকায় শব্দ দূষণ অনেক কমেছে। তবে আবার সব খুলতে শুরু করায় বাড়তে শুরু করেছে। এখনই সময় এই বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার। প্রথম থেকে কঠোর হওয়া গেলে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, পরিবেশবাদীদের চেয়ে আমলাদের গুরুত্ব বেশি দেয় সরকার।  এ কারণে আমরা বার বার বলার পরও আমাদের কথা না শুনে পরিবেশের ক্ষতি হয় অনেক প্রকল্প হাতে নেয় সরকার।

এদিকে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ভয়ংকর থাবা থেকেও প্রতিবারের মতো রক্ষা করেছে সুন্দরবন। আম্পানের প্রভাবে সুন্দরবনের অনেক ক্ষতি হলে তা কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে মনে করছে পরিবেশ অধিদফতর।

সুন্দরবন রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত-এমন প্রশ্নের জবাবে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, রামপালসহ সুন্দরবনবিনাশী সব প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। উপকূলের সব কয়লা বিদ্যুতের কাজ বন্ধ করে বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ কমাতে হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সাল থেকে জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে প্রতিবছর ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। এর আগে এমন দুনিয়া জোড়া এমন আয়োজনহীন পরিবেশ দিবস আর কখনওই উদযাপিত হয়নি।

 

/এসএনএস/এফএএন/

লাইভ

টপ