আদালতের আদেশও মানছে না বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান!

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ২০:১৭, জুলাই ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩৯, জুলাই ১৫, ২০২০

আদালতবেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির দুর্নীতির কারণে শিক্ষক-কর্মচারীরা নির্যাতনের বেড়াজালে ঘুরপাক খাচ্ছেন বছরের পর বছর। আবার কখনও কখনও প্রতিষ্ঠানের প্রধানই হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র ও বিধিবিধান অমান্য করা ছাড়াও আদালতের আদেশও মানছে না অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) শিক্ষক নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও তাদের নিয়োগ ও আর্থিক দুর্নীতির লাগাম টানতে পারছে না সরকার।

গত কয়েক মাসে মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর থেকে জারি করা বিভিন্ন আদেশে দেখা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির দুর্নীতির অভিযোগে কয়েকজন অধ্যক্ষের বেতন স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু শিক্ষকের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি ও বেতন স্থগিত হয়েছে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির কারণে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের গত ৯ জুলাইয়ের একটি আদেশে দেখা গেছে, যশোরের ইছালী মডেল কলেজের পরিচালনা পর্ষদ অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য ২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বিজ্ঞপ্তির পর শাহিন আক্তার নামে একজন প্রার্থী ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে যশোরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। আদালত যথারীতি প্রতিষ্ঠানটির সব নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু আদালতের আদেশ না মেনে গভর্নিং বডি অধ্যক্ষ নিয়োগ সম্পন্ন করে। এমনকি ওই অধ্যক্ষ এমপিওভুক্তও হন। পরে মামলার শুনানিতে অন্তর্বর্তী আদেশে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদের বেতন ভাতা স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন আদালত। এরপর ওই মামলা জেলা জজ আদালত এবং হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।

নিম্ন আদালতের মামলা ও হাইকোর্টের সিভিল অর্ডার পিটিশনে গত বছরের ১১ নভেম্বরের রায় ও আদেশে সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে সহকারী জজ আদালতকে ছয় মাসের মধ্যে ওই মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। এতে বলা হয়, মামলাটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অধ্যক্ষ বেতন পাবেন না।

অথচ অধ্যক্ষের নিয়োগ প্রক্রিয়ার ত্রুটির জন্য বর্তমান ও আগের পরিচালনা কমিটিকে দায়ী করেছেন অধ্যক্ষ। এমনকি চলমান মামলার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি জন্য বিগত পরিচালনা কমিটিকে দায়ী করেছেন তিনি।

ইছালী মডেল কলেজের অধ্যক্ষ আহম্মদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি বিধিবিধান উপেক্ষা করে শাহীন আক্তার নামে একজন শিক্ষককে (যিনি অন্য একটি মাদ্রাসায় চাকরি করেন) নিয়োগ দেয় আগে কমিটি। কিন্তু বর্তমান কমিটি ওই নিয়োগ অবৈধ হিসেবে গণ্য করে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিলে মামলার সূত্রপাত ঘটে। আগের কমিটির এই নিয়োগের বিষয়ে আমি জানতাম না। আদালতের বিষয়টি অমান্য করার জন্য কমিটি দায়ী। এখানে আমার কিছুই করার না থাকলেও আমিও ভোগান্তিতে পড়েছি।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের গত ১১ জুনের আরেকটি আদেশে দেখা যায়, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুলারহাট আদর্শ কলেজের পরিচালনা কমিটির দুর্বলতার কারণে অধ্যক্ষ বেপরোয়াভাবে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়া প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তার এমপিও’র আবেদনে সুপারিশ না করে অন্য একজনকে নিয়োগ দেন অধ্যক্ষ। শুধু তা-ই নয়, নতুন নিয়োগ দেওয়া শিক্ষকের পক্ষে সুপারিশ করে তাকে এমপিও পাইয়ে দেন অধ্যক্ষ। বিষয়টি নিয়ে অনেক আগেই ওই কলেজের প্রভাষক হাসনা হেনা মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর তদন্তের উদ্যোগ নেয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। অধ্যক্ষের কাছে শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র চাওয়া হলেও তিনি মাধ্যমিক ও শিক্ষা অধিদফতরকে তা দেননি।

শেষ পর্যন্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের মতামত চায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। সর্বশেষ গত ১১ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ দুলারহাট আদর্শ কলেজের অধ্যক্ষ একেএম শাহে আলমের এমপিও স্থগিতের নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে কেনও তার এমপিও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে না, তা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে জানতে চায় মন্ত্রণালয়।

প্রভাষক হাসনা হেনা অভিযোগ করেন, ‘অধ্যক্ষ আমাকে এমপিও’র সুপারিশ করেননি। নিয়োগের কয়েক মাস পর থেকে তিনি আমাকে কলেজে যেতে দিতেন না।’ এ বিষয়ে একেএম শাহে আলমের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে, রাজধানীর উত্তরা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘন করে ২০১৯ সালের ৫ মে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়। ২০১৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও গভর্নিং বডি তখন সেই নির্দেশের তোয়াক্কা করেনি। সর্বশেষ ঢাকা শিক্ষা বোর্ড অধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গত ১ জুলাই গভর্নিং বডির সভাপতিকে নির্দেশ দেন। যদিও গভর্নিং বডির সভাপতি সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘন করে জেনে-বুঝে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেন।

এছাড়া, বরিশালের বাকেরগঞ্জের শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজামুল কাদিরের বিরুদ্ধে আয়-ব্যয়ে দুর্নীতির কারণে বেতন ভাতা সাময়িক স্থগিত করা হয় গত ২ ফেব্রুয়ারি। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘি কলেজের প্রভাষক আবুল কাসেমের নাম বাদ দিয়ে অন্য একজনের নাম এমপিও আবেদনের তালিকায় পাঠানোর ঘটনায় গত ১৭ জুন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। রাজধানীর ন্যাশনাল ব্যাংক পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিওভুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের নির্দেশ দেয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। গত ২৪ জুন ঢাকা অঞ্চলের পরিচালককে এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফরিদপুর সদরের চন্দ্রপাড়া সুলতানিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানার অধ্যক্ষ পদে বিধিভঙ্গ ও তথ্য গোপন করে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে গত ৪ জুলাই সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে একজন সহকারী পরিচালককে। শরীয়তপুর সদর উপজেলার শরীয়তপুর ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার ‘ভুয়া ভারপ্রাপ্ত সুপার’ দাবি করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে অ্যাডহক কমিটির অনুমতি ও পরবর্তীতে অনুমোদন চেয়ে আবেদন দাখিল করেন এক ব্যক্তি। এই ভুয়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কাগজপত্রসহ ভারপ্রাপ্ত সুপার তহিরুন নেছা বোর্ডে অভিযোগ জানালে বিষয়টি সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। গত ২৩ জানুয়ারি জেলা প্রশাসককে সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভুরারঘাট এম ইউ বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বহিষ্কৃত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও পাঁচ জন শিক্ষকের স্থগিত এমপিও পাইয়ে দিতে মাদ্রাসা অধিদফতরের দুটি চিঠি জাল করা হয়। চিঠি জাল প্রমাণের পর জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গত ২২ মার্চ জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত, এমপিও স্থগিত, অভিযোগ তদন্ত এবং শোকজের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালের শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন এবং শিক্ষা আইন দ্রুত চূড়ান্ত না করা গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেপরোয়া এই অবস্থা নিরসন সম্ভব হবে না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমরা আইনের মধ্যে থেকে যতটা সম্ভব বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে চেষ্টা করছি। যথাযথ ব্যবস্থাও নিচ্ছি।’

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির প্রতিটি অনিয়মের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। প্রতিষ্ঠান নীতিমালা-বিধিবিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব চলমান রয়েছে। শিক্ষা আইন বাস্তবায়ন হলেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমে যাবে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন ও কলেজ) অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। তবে শিক্ষা আইন হলে নিয়োগ, আর্থিক দুর্নীতিসহ অন্যান্য অনিয়ম কমে যাবে।’

/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ