X
শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪
৩০ চৈত্র ১৪৩০
একান্ত সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

আমরা যুদ্ধ করতে চাই না

সালমান তারেক শাকিল
১১ জুন ২০১৬, ১২:৩৩আপডেট : ১২ জুন ২০১৬, ১৬:৪৪

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমান সরকার গণতন্ত্রকে সঙ্কুচিত করে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি  বলেন, এই সরকার গণতান্ত্রিক স্পেসগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপিকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। জটিল এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন। কিন্তু আমরা তো যুদ্ধ করব না। যুদ্ধ করতে চাই না। তাদের মতো গণতন্ত্রের রাস্তা বন্ধ করতে চাই না। আমরা চাই গণতন্ত্র ফেরাতে। চাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে এটিই আমার চ্যালেঞ্জ। বৃহস্পতিবার (৯ জুন) সকাল ১০টায় রাজধানীর উত্তরায় তার বাসভবন ‘কুসমিত’-এর বৈঠকরুমে বসে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

বর্তমান সরকারের মত স্বৈরাচারী ধরণ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোয় দেখা গিয়েছিল

বাংলা ট্রিবিউন: ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করেছেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিলেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভায় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে। এই ফিরে আসা কেন এবং কোন চিন্তা থেকে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: যে পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে, সেখানে একটা রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ছিল। আমার বাবা একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। দাদাও রাজনীতিতে ছিলেন। আমার চাচা দুজন। তারাও যুক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। আমার বড় মামাও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। যে কারণে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৩ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত হই। পরবর্তী সময়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলাম। তারপরই দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি।
আমি মুক্তিযুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছি। এর আগেই ১৯৭০ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনে শিক্ষকতার জন্য পরীক্ষা দেই। স্বাধীনতার পরে এসে দেখি আমার অ্যাপয়েনমেন্ট হয়েছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকতাকে আমি ভালো পেশা মনে করি। শেষে জয়েন করি। পরিবর্তী সময়ে আপনারা সবাই জানেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তনে এই অবস্থা আসা। ১৯৮৮ সালে চাকরি থেকে ইস্তফা দেই। তারপর ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে জয়ী হই। ১৯৮৯ আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেই। দল থেকে প্রথম মনোনয়ন পাই ১৯৯১ সালে। আমি জয়ী হতে পারিনি। ৯৬ নির্বাচনেও জয়ী হতে পারিনি। ২০০১ সালে আমি নির্বাচিত হয়ে আসি। মূলত ১৯৮৮ থেকে আমার রাজনৈতিক জীবন প্রত্যক্ষভাবে শুরু।

কুসমিত’র বৈঠকরুমে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

বাংলা ট্রিবিউন: ২০০৯ সালে আপনাকে নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় কমিটিতে। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর আপনাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। প্রচার ছিল, তখন বিএনপির ভাবমূর্তি সংকটে ছিল। ওই সময় থেকে এ বছরের ১৯ মার্চ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ১৯ মার্চে কাউন্সিলের পর মহাসচিব। এই দীর্ঘ সময়ে সংগঠনে কতটুকু ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পেরেছেন বলে মনে করেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব জটিল। এখানে সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা খুব কমই হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৭৫ সালে বাকশাল হলো। তখন থেকেই রাজনীতিতে অনেকবার ইন্টারাপসন হয়েছে। গণতান্ত্রিক যে ব্যবস্থা, যার জন্য দেশের জনগণ ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছিল, সেখান থেকে সরে এসে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল গঠন করা হলো, তখন থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা মোড় পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সুষ্ঠু ধারায় যাওয়ার জন্য তারা আর কোনও সুযোগ পায়নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুরো সময়টা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে যারা সুষ্ঠু রাজনীতি বা গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করতে চায়, তাদের অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

বিএনপির জন্মটাই হয়েছিল দেশে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে বহুদলীয়  শাসন ব্যবস্থা নিয়ে এসেছিলেন। এটা ছিল শুরু। আমরা যারা স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি, তারা জিয়াউর রহমানের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম এবং এর মধ্য দিয়েই আমরা দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। আমরা এতে সফলও হয়েছি। ৯০ সালে স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটে। ৯১ এ বিএনপি জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি আবার সরকার গঠন করে ২০০১ সালে। বিএনপি জনগণের সমর্থনে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এখানে আমরা একটা চেষ্টা করেছি, শুধু বিএনপি নয় সারাদেশে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর আমাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে এখন মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছি। এ সময়ের মধ্যে আমরা গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনীতি করেছি। রোডমার্চ, সমাবেশ, মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে রাজনীতি করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সরকার গণতন্ত্রকে সঙ্কুচিত করেছে। গণতান্ত্রিক স্পেসগুলোকে বন্ধ করেছে। এখন কেউ সরকারের বিরোধিতা করলে তাকে বলা হয় রাষ্ট্রদ্রোহী। কিন্তু সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করাতো আর রাষ্ট্রদ্রোহিতা হতে পারে না। এই জিনিসগুলো আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

দেশকে একটা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা। গণতান্ত্রিক যে স্পেস তাকে প্রসারিত করা এবং গণতন্ত্রে যারা বিশ্বাস করেন, তাদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেওয়া।দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন সেই পরিস্থিতি নেই। এখন প্রতিহিংসার রাজনীতি চলছে, প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতি চলছে। সরকার এতে ইন্ধন যোগাচ্ছে। তারা চায় এ ধরনের একটা পরিবেশ থাকুক। এতে তাদের সুবিধা হয়। তারা খুব জোর গলাতেই বলেছেন যে, তারা উন্নয়ন চান প্রথমে, গণতন্ত্র চান পরে। উন্নয়ন তারা কতটুকু করেছেন, তা জনগণই বলতে পারবে। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হতে পারে না। কিন্তু আমরা তো যুদ্ধ করব না। এ সরকারের মতো আমরা গণতন্ত্রের রাস্তা বন্ধ করতে চাই না। আমরা চাই, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন।

বাংলা ট্রিবিউন: কাউন্সিলের পরে কমিটি দেওয়া হলো। কিছু কমিটি বাকিও রয়েছে। আন্দোলনের কথা বিগত বছর থেকে বলা হচ্ছে। এ অবস্থায় মহাসচিব হিসেবে সংগঠন নিয়ে আপনার কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: বিএনপির মতো বড় একটা দল কারও একার পরিকল্পনায় চলতে পারে না। বিএনপিতে নীতি নির্ধারণী কমিটি আছে, এক্সিকিউটিভ কমিটি আছে, নির্বাহী কমিটি রয়েছে, জাতীয় কাউন্সিল রয়েছে। যেকোনও বিষয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আন্দোলনে আমরা আছি, ফলে নতুন করে আন্দোলন শুরু করব, এটা বলার দরকার নেই। আওয়ামী লীগ বিনা নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছে। এখানে তারা স্বৈরাচারী শাসন চালাচ্ছে। তারও আগে থেকেই আমরা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলন করছি। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকেই আমরা আন্দোলনে রয়েছি। আমরা বলেছি এই সংশোধনী থাকলে দেশে অস্থিতিশীল ও অরাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে ফলে দেশে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ থাকবে না। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। স্টেটের যতগুলো অর্গান রয়েছে সেগুলোকে নিজের মতো ব্যবহার করছে। বিরোধী দল, বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যা-যা করার দরকার, তাই করছে সরকার। ফলে যারা বিরোধী দল করে বা কথা বলে তাদের ওপরই নির্যাতন নেমে আসছে। মামলা দিচ্ছে, কারাভোগ করতে হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ডিজঅ্যাপেয়ার করা হচ্ছে। এটাতো আমরা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে স্বৈরশাসনে দেখেছি। আফ্রিকার দেশগুলোতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের দেশে এই পরিস্থিতির সঙ্গে আমরা কখনও পরিচিত ছিলাম না। এবারই প্রথম দেখছি বিরোধী পক্ষকে গুম করা হচ্ছে, খুন করা হচ্ছে। তাদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মহাসচিব হিসেবে আমার সামনে যেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি, তা হলো দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য কাজ করা। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে, সংঘবদ্ধ করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।

 

বাংলা ট্রিবিউন: দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আপনার বোঝাপড়া কেমন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: এই বিষয়গুলো হল আমাদের একান্তই নিজস্ব বিষয়। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে আমি শুধু এতটুকুই বলবো, আমরা একটা দল করি। দলের মধ্যে ভাতৃত্ববোদ, সৌহার্দ্যবোদ, আনুগত্য দলের নেতাকর্মীদের এটি একশো ভাগ আছে। আমাদের দলের যিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তিনি আমাদের একজন নির্যাতিত নেতা। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অকুণ্ঠ ভালোবাসার কারণেই তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অবশ্যই ভালো। সাংগঠনিক সম্পর্কও ভালো।

বাংলা ট্রিবিউন: ২০১৪ সালের সর্বশেষ নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো সরকারবিরোধী অবস্থানে ছিল। কিন্তু বিগত দুই বছরে দেখছি সরকারের সঙ্গে তাদের সখ্য বেড়েছে। হঠাৎ পশ্চিমারাষ্ট্রগুলোর এই পরিবর্তনকে আপনারা কিভাবে দেখছেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: এটা কোনও পরিবর্তন নয়। একটি দেশের সরকার অন্য একটি দেশের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে নিজেদের স্বার্থেই। বার্মায় যখন মিলিটারি সরকার ছিল, তাদের সঙ্গে কি পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক ছিল না? অবশ্যই ছিল। ইরাক, ইরান, নর্থ কোরিয়া সব দেশের সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক আছে। এই সরকার নির্বাচন ছাড়া অর্থাৎ অনির্বাচিত সরকার। তারপরও তো রয়েছে। সরকারে থাকলে অন্য দেশগুলোর ইনভেস্টমেন্ট থাকে, গ্লোবাল ইস্যু রয়েছে সেগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে হয়। অন্য কারও সঙ্গে কাজ করতে পারে না। তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। তারা প্রতিবারই  বলেছে, যে নির্বাচন হয়েছে তা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য হয়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটা স্টেটমেন্ট আজকের (বৃহস্পতিবার) পত্রিকাতেই আছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই, মানুষের বাকস্বাধীনতা নেই। স্পেশালি বলেছে, পলিটিক্যাল স্পেস এখানে নেই। এর আগে আমেরিকার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিনিও একই কথা বলে গেছেন। বান কি মুনের কয়েকটি স্টেটমেন্টে এই কথাগুলো উঠে এসেছে। তাই আন্তজার্তিকভাবে এই সরকার এখনও গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যেহেতু কাজ করতে হয়, কাজ করার সুবাদে সম্পর্ক রয়েছে।

আমার যে পরিবারে জন্ম হয়েছে, সেখানে একটা রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ছিল

বাংলা ট্রিবিউন: এ সরকারের স্বীকৃতি নেই, সেই সুযোগটা আপনারা কতটুকু নিতে পেরেছেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: বিএনপি একটা কনস্টিটিউশনাল দল। কোনও বৈপ্লবিক দল নয়। জনগণকে সম্পৃক্ত করেই বিএনপিকে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হচ্ছে। জনগণের মাধ্যমেই সরকারকে বাধ্য করতে হবে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে। যেটা হবে সবার কাছে একসেস্টেবল। সেই জায়গাটাতেই বিএনপি যাওয়ার চেষ্টা করছে। সুযোগ নেওয়ার বিষয়টা বলতে কী বলতে চাচ্ছেন, আমি বুঝছি না। পাশ্চাত্য বিশ্ব তাদের মতো করে কাজ করছে। আমরা দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়েই গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আমরা গণতান্ত্রিক দেশগুলোকেও সেটা বলেছি।

 

বাংলা ট্রিবিউন: বরাবরই আপনারা নির্বাচনের দাবি করেছেন। সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারকে নির্বাচনের জন্য চাপ দেবেন,এমন কোনও পরিকল্পনা আছে কি?

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি, তাতে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার মতো কেউ নেই। আমাদের ওপর প্রতিনিয়তই অত্যাচার করা হচ্ছে। মামলা দেওয়া হচ্ছে। সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসে প্রতিদিনই আদালতে হাজিরা দিতে হয়। ফলে সেখানে সবকিছু ছকে বাঁধা পাবেন না। আমরাতো পরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছি। আমরা কাউন্সিল দিয়েছি। কাউন্সিলের আগে আমরা চেষ্টা করেছি জেলার কমিটিগুলো নতুনভাবে সাজাতে। রমজানের পরই জেলার যেসব কমিটি বাকি রয়েছে, সেগুলো সাজানো হবে। রমজানে ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে আমরা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।



বাংলা ট্রিবিউন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কয়েক বছরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের তথ্য-প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির কী মনে করে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: আমরা ইতোমধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলেছি। এটা হচ্ছে তাদের একটা কৌশল। তাদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্যই, তাদের এই ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এভয়েড করার জন্য তারা বিএনপির ওপর দোষ চাপাতে চাচ্ছে। এটা আজকে নতুন কিছু না। একটা ইন্টারেস্টিং বিষয়, যাদের তারা এসব হত্যাকাণ্ডে সঙ্গে জড়িত হিসেবে ধরছে, যেমন রাজশাহীতে প্রফেসর সাহেবকে যে মারে, সে লোককে দুদিন আগে ক্রসফায়ার করেছে। হোসনী দালানে যে লোকগুলোকে গ্রেফতার করেছে, তাদের দুজনকে আগেই মেরেছে। গতকাল (বুধবার ৮ জুন) আবার মিরপুরে দুজনকে মেরেছে। কাশিমপুর কারাগার থেকে কোর্টে যাওয়ার পথে গোলাগুলি করে জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় যুক্ত একজনকে গ্রেফতার করার পর সেখানেই গুলি করে মেরেছে। এখানে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার, যাদের তারা বলছে জড়িত, তাদের বাঁচিয়ে রাখছে না। বিচারের আওতায় আনছে না। তাহলে এটা কি প্রমাণিত হয় না যে সরকারই এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত? সরাসরি জড়িত। কোনওটারই তারা তদন্ত করছে না। ব্লগার হত্যা, বিদেশি হত্যা থেকে শুরু করে কোনটার সুষ্ঠু তদন্ত করে তারা বিশ্বাসযোগ্য ফল নিয়ে আসতে পেরেছে? ফাইনালে রেজাল্ট ইজ জিরো। এখন পর্যন্ত কোনও একজনকে দায়ী করে প্রমাণ করতে পারেনি যে, এই ব্যক্তি বা এই সংগঠনই জড়িত।

পত্রপত্রিকায় উঠছে, আএইএস  আনসারুল্লাহ এ-টিম, বি-টিম। উঠছে কিন্তু তারা এগুলো প্রমাণ করতে পারছে না। সরকার আইএস ইনভলমেন্ট কোনোমতেই স্বীকার করছে না। অথচ পশ্চিমা বিশ্ব বলছে এখানে আইএস  আছে। দিস ইজ ভেরি ইন্টারেস্টিং। তারা পানি ঘোলা করে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। এই সমস্ত সমস্যা তৈরি করে তারা বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে চাচ্ছে। মাহমুদুর রহমান মান্না তো বিএনপি করেন না। তাহলে তিনি এখনও জেলে কেন? ১৪ মাস হয়ে গেল। শফিক রেহমান সাহেব একজন ভদ্রলোক মানুষ। মাহমুদুর রহমান জেলে রয়েছেন,  শওকত মাহমুদ জেলে। কেন? সরকার দাবি করে, সব সময়ই তাদের কাছে তথ্য-প্রমাণ থাকে।তারা বলেছেন পেট্রোলবোমা দিয়ে মানুষ মেরেছে। কে মেরেছে? সুনির্দিষ্ট একটি অভিযোগই তারা আনতে পারেনি। আমরা পত্রিকায় দেখেছি সরকারি দলের লোকেরাই ধরা পড়েছে। কুমিল্লার দেবিদ্বারে বিভিন্ন জায়গায় তারা ধরা পড়েছে বোমা মারতে গিয়ে। তারা এই সুযোগটা নিয়েছে। পুরোপুরি বিএনপির নাম করে বিএনপির ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। সরকারি এজেন্টরা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

বাংলা ট্রিবিউন: বাঁশখালী নিয়ে আপনাদের কোনও কর্মসূচি দেখা যায়নি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: না না, আমাদের তিনটা টিম গেছে। কথা বলেছে। ওখানে যারা আছে, তারা একটা আন্ডারস্টেন্ডিং করে ফেলেছে। পয়সা কড়ি দিয়ে সেটেল করে ফেলেছে।

 

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি ৬৯-এর সময় থেকে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখনকার ছাত্র রাজনীতিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: ওই সময় আর এই সময় এক নয়। ছাত্ররাজনীতির পুরো কাঠামোতেই পরিবর্তন হয়ে গেছে। ছাত্ররাজনীতি বলতে আমরা যা বুঝি, তা এখন আর নেই। ছাত্র সংগঠনগুলো এখন রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে। আমাদের সময় সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করত না। তারা তাদের মতো করেই কাজ করত। জাতীয় সমস্যাগুলো নিয়ে তারা চিন্তা-ভাবনা করত। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলো জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করত। আপনি দেখবেন ৭০ দশকের যারা নেতা ছিলেন, তোফায়েল সাহেব, রাজ্জাক সাহেব তারা সবাই ছাত্র রাজনীতির প্রডাকশন। পরে নূরে আলম সিদ্দীকী, শাহজাহান সিরাজ, মাখন—তারা সবাই ছাত্র রাজনীতির ফসল। মুক্তিযুদ্ধসহ সবই ছাত্র রাজনীতির ফল। রাজনৈতিক দলের অবদান ছিল কিন্তু অনেক পরে। ছাত্ররাজনীতিই মুখ্য। ছাত্ররাজনীতির যে বিশাল ঐতিহ্য, তার লেশমাত্র এখন নেই। এখনতো অভিযোগ আসে যে, তারা চাঁদাবাজ দলে পরিণত হয়েছে। যে দল সরকারে থাকে সে দলের সঙ্গে যুক্ত হয়। চাঁদাবাজি করে, টাকা উপার্জন করে, বিত্তশালী হয়।



বাংলা ট্রিবিউন: এক্ষেত্রে ছাত্রসংসদ নির্বাচনও তো হচ্ছে না…

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: এই নির্বাচন হয় না। হতে দেওয়া হয় না। এটা অন্যতম একটা কারণ। ছাত্রসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও এ নিয়ে কোনও চাপ নেই। তাদের এ নিয়ে কোনও দাবি নেই। কারণটা কী? কারণটা হলো নেতৃত্বটা এমন জায়গায় গেছে,তারা শুধু বিত্তশালী হতে চায়। তারা ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে কনসার্ন নয়। তাদের টাকা পয়সা দরকার, ভালো গাড়ি হলেই হলো। যারা আদর্শ নিয়ে ছাত্র রাজনীতি করে তাদের সংখ্যা অনেক অল্প। খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। মধ্যপন্থী ছাত্র রাজনীতির অভাবের ফলে আজকে আপনার উগ্রপন্থা ভেতরে ভেতরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। যেটাকে আমরা বলছি ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি, উগ্রবাস—এসব কিন্তু ওই জায়গা থেকেই হচ্ছে। যারা লিবারেল পলিটিক্স করেন, তারা এখানে কাজ করতে পারছেন না।

দল নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা জানালেন মির্জা ফখরুল

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বিএনপির একমাত্র মহাসচিব, যাকে দীর্ঘসময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে। আপনার এই রাজনৈতিক জীবন নিয়ে পরিবারের অবস্থান কেমন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: আমার পরিবার আমার প্রতি যথেষ্ট সহনশীল। আমার পরিবার বলতে, আমার স্ত্রী, আমার দুই মেয়ে, আমার মা, আমার ভাই-বোনেরা। আমি যে রাজনীতি করছি, যে সংগ্রামে আছি, যে পথে আছি, সেই সংগ্রামের পথে তারা আমার সমর্থন জাগিয়ে যাচ্ছেন। আই এম ভেরি গ্রেটফুল টু দেম। বিশেষ করে আমার স্ত্রী। তিনি যদি আমার সংসার চালাতে সাহায্য না করতেন, তাহলে হয়তো আমি রাজনীতিই করতে পারতাম না।

বাংলা ট্রিবিউন: সময় পেলে গান শোনেন? বা বই পড়েন?

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: আমি গান শুনতে পছন্দ করি। নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত। মাঝে মাঝে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত শোনার চেষ্টা করি। আমি নিজে ভালো ছবি দেখতে পছন্দ করি। সবসময় সময় পাই না, তবে সুযোগ পেলে গান শুনি, বই পড়ি, ছবি দেখি। 

 

ছবি: নাসিরুল ইসলাম ও রাফসান জানি

/এমএনএইচ/ আপ: এএইচ/

আরও খবর পড়ুন-

তারেক রহমান যে পরিস্থিতিতে দেশে ফিরবেন তারেক রহমান!

 

৫ জুন হত্যার শিকার হন মিতু মিতু হত্যার ঘটনাটি ইসলামে অনুমোদনযোগ্য নয়: আল কায়েদা

সম্পর্কিত
করারোপ নীতি শিক্ষা সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করবে: সলিমুল্লাহ খান
বাংলা ট্রিবিউনকে ওয়াসিকা আয়শা খান‘নারীরা যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন, এর নেপথ্যে শেখ হাসিনা’
‘মেয়েদের নিয়ে কেউই ঝুঁকি নিতে চায় না’
সর্বশেষ খবর
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ভ্রমণে কানাডার সতর্কতা
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ভ্রমণে কানাডার সতর্কতা
যশোরে শুরু হচ্ছে ১০ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা
যশোরে শুরু হচ্ছে ১০ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা
ইউরোপে বৈধ পথে শ্রমিক পাঠানো সহজ হবে
ইউরোপে বৈধ পথে শ্রমিক পাঠানো সহজ হবে
লুটনকে উড়িয়ে দিলো ম্যানসিটি
লুটনকে উড়িয়ে দিলো ম্যানসিটি
সর্বাধিক পঠিত
ঈদের তৃতীয় দিন: দেখতে পারেন যেসব নাটক
ঈদের তৃতীয় দিন: দেখতে পারেন যেসব নাটক
ভরা মৌসুমে অস্থির কেন পেঁয়াজের বাজার?
ভরা মৌসুমে অস্থির কেন পেঁয়াজের বাজার?
বাংলাদেশে বিমান মেরামতের কারখানা করতে চায় কানাডিয়ান কোম্পানি
বাংলাদেশে বিমান মেরামতের কারখানা করতে চায় কানাডিয়ান কোম্পানি
ইসরায়েল থেকে ফ্লাইট আসার ব্যাখ্যা দিলো বেবিচক
ইসরায়েল থেকে ফ্লাইট আসার ব্যাখ্যা দিলো বেবিচক
হুন্ডি প্রতিরোধে কী করছে সরকার?
হুন্ডি প্রতিরোধে কী করছে সরকার?