X
মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩
১৬ মাঘ ১৪২৯

‘একদল-একনেতা’ ও ‘অনিবন্ধিত’দের ২০ দলীয় জোট, অনেকের অফিসও নেই 

সালমান তারেক শাকিল
১৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৫৮আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১৬:০৬

গঠনের পর এখন পর্যন্ত ২০ দলীয় জোট  ৬ বার ভেঙেছে। বেরিয়ে গেছে ৫টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। তবুও ২০ দলীয় জোটে ‘২০ দল’ই থেকে যায়। সেটা কীভাবে? ধরুন, জোটের কোনও শরিক দলের বড় অংশ চলে গেলো, তখন ওই দলেরই একজন নেতাকে নিয়ে দলের নাম একই রেখে জোটের অংশ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে ২০ দলীয় জোট এখন ‘অনিবন্ধিত দলের জোট’ রূপ নিয়েছে। আর ‘একদল-একনেতা’ নির্ভর এসব দল অনেকটা ‘মৌসুমি রাজনীতি’ নির্ভর। তাদের কর্মসূচি-কার্যক্রম কিছুই নেই। অনেকের কার্যালয়ও নেই। আর যেসব সংগঠনের কার্যালয় আছে, জোটের মতো সেগুলোও নিষ্ক্রিয়।

বিএনপি-জোটের শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির, মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ত গোলাম আযম এবং ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন চেয়ারম্যান আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠনের ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে জোট ত্যাগ করেন এরশাদ। তখন জাপা মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে একটি অংশ থেকে যায় জোটে। তাদের মাধ্যমে নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল চারদলীয় জোটের বর্ধিত ‘১৮ দলীয় জোটে’র ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। পর্যায়ক্রমে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দল যোগ দিলে তা ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়।

অফিসই নেই, অথচ প্রস্তুতি নিবন্ধনের

২০১৪ সালে এই জোটে প্রথম ভাঙন আসে। প্রয়াত শেখ শওকত হোসেন নিলুর ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) নিবন্ধিত অংশ জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এরপর একই নামে ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ (অনিবন্ধিত) জোটে থেকে যায়। বিএনপি-জোটের এই শরিক এখন অনেকটাই ‘ওয়ান ম্যান শো’ পার্টি। দলের কার্যালয় নেই। কার্যক্রমও প্রায় নেই বলা চলে।

ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে কোনও কর্মকাণ্ডে পাওয়া যায়নি ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টিকে (এনপিপি)। মতিঝিলে নিজের চেম্বারে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি। তার দলের যুগ্ম মহাসচিব পরিচয়ে ফরিদ উদ্দিন গত ১৪ অক্টোবর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আগামী নভেম্বরেই অফিস নেবো। পুরানা পল্টন এলাকাতেই নেবো। আগামীতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করবো।’

মাওলানা রকিবের ইসলামী ঐক্যজোটের ‘বৈঠক হয় ভাইস চেয়ারম্যানের বাসায়’

২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি বিভিন্ন অভিযোগে জোট ত্যাগ করে প্রয়াত মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী (আমির) ও মুফতি ফয়জুল্লাহর (মহাসচিব) নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোট। এর পেছনে বড় কাটারা মাদ্রাসার পরিচালনা ধরে রাখার বিষয়টিও ভূমিকা রেখেছিল বলে জানান তাদের আরেক নেতা।

২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি ঢাকার গুলশানে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অফিসে সৃষ্ট ‘ইসলামী ঐক্যজোটের’ আত্মপ্রকাশকালীন মুহূর্ত

রাজধানীর একটি মিলনায়তনে যখন জোট ত্যাগের ঘোষণা দেন ঐক্যজোটের নেতারা, সেদিনই সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে ‘ইসলামী ঐক্যজোটে’র আরেকটি অংশের সূত্রপাত ঘটে। সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যজোটের অনিবন্ধিত অংশের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাওলানা আবদুর রকিব অ্যাডভোকেট ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মাওলানা আবদুল করিমের নাম ঘোষণা করা হয়। তারা বিএনপি-জোটে প্রতিনিধিত্ব করার ঘোষণা দেন।

পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন অবধি দল পরিচালনার জন্য কোনও কার্যালয় নিতে পারেনি ইসলামী ঐক্যজোটে’র এই অংশ। এর নেতৃত্বে থাকা মাওলানা আবদুর রকিব অ্যাডভোকেট একইসঙ্গে নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সাধারণত সিলেটে থাকেন। ঢাকায় সুপ্রিম কোর্টে তার চেম্বার রয়েছে। তবে তার নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোট ও নেজামে ইসলাম পার্টির কোনও কার্যালয় নেই। কেন নেই? এর জবাবে আবদুর রকিব অ্যাডভোকেট বাংলা ট্রিবিউনের কাছে দাবি করেন, রাজধানীর পুরানা পল্টনের একটি ভবনে (৫১/৫১) তাদের কার্যালয় ছিল। তার কথায়, ‘আমিই নিয়েছিলাম অফিসটি। কিন্তু ২০১৬ সালে একটি অংশ বিএনপি-জোট ছেড়ে দেওয়ার পর আমরা এটি ব্যবহার করতে পারিনি।’

আবদুর রকিব যোগ করেন, ‘জোট ছেড়ে চলে যাওয়া নেতারা তো সরকারপন্থী। আমরা পরে সেগুনবাগিচায় একটি অফিস নিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার-ঘনিষ্ঠরা অফিস সহকারীদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করেছে। এ কারণে আর কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। তাই আমরা ঢাকার মালিবাগে আমাদের ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান শওকত আমীনের বাসায় দলীয় বৈঠক করি।’

ঠিকানা আছে, অফিস নেই

২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর বিএনপি, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আত্মপ্রকাশের তিন দিনের ব্যবধানে জেবেল রহমান গানির নেতৃত্বাধীন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ) বেরিয়ে যায়। একইদিন গানির সঙ্গে বেরিয়ে যায় খন্দকার গোলাম মোর্তুজার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি-অনিবন্ধিত)। 

ন্যাপ ও এনডিপি জোট ত্যাগ করার দিনেই একই নামে দুইজনকে দিয়ে দুটি দলের প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখে বিএনপি-জোট। শাওন সাদেকীকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অ্যাডভোকেট মশিউর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করে ‘বাংলাদেশ ন্যাপ’ পরিচয়ে জোটের শরিক পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। 

নিবন্ধিত বাংলাদেশ ন্যাপের একজন দায়িত্বশীল নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও বরকত উল্লাহ বুলুর তত্ত্বাবধানে এই অংশটি জোটে শরিক হয়।

জোটের তালিকায় নয়াপল্টন মসজিদ গলির ডানের ভবনটিতে বাংলাদেশ ন্যাপের কার্যালয় উল্লেখ থাকলেও তা পাওয়া যায়নি

জানা যায়, শাওন সাদেকী ন্যাপের মহানগর কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। জোটের তালিকায় এই অংশের ঠিকানা ‘৮৬, নয়াপল্টন মসজিদ গলি’ উল্লেখ থাকলেও এমন কোনও কার্যালয়ের অস্তিত্ব মেলেনি সরেজমিনে। জোটের কাছে ভবনটি ষষ্ঠ তলা জানালেও বাস্তবে এটি চারতলা। ভবনের একজন অধিবাসী জানান, এখানে কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নেই। ফ্ল্যাট বাসায় সাধারণ মানুষ বসবাস করেন।

শনিবার (১৬ অক্টোবর) শাওন সাদেকীকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এদিন মধ্যরাতে তিনি ফিরতি ফোন করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পল্টন এলাকাতেই তার কার্যালয়। এরপর নিজের অনেক কাজের বিবরণ দেন।

খন্দকার গোলাম মোর্তুজার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পর যারা এই নামেই বিএনপি-জোটে প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই অংশটিরও সন্ধান মেলেনি। এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কারী আবু তাহের ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদে শাহ নেওয়াজের নাম আছে জোটের তালিকায়। তাদের কোনও কার্যালয় নেই। আর তাদের কার্যক্রমের ব্যাপারে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর কেউই কিছু জানেন না।

এ প্রসঙ্গে এনডিপি-মোর্তুজা অংশের সাবেক মহাসচিব আবদুল মোকাদ্দিম (বর্তমানে একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন) বলেন, ‘কারী আবু তাহের আমাদের মূল কমিটিতে ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ছিলেন। আর শাহনেওয়াজ নামে আমি কাউকে চিনি না।’

বিএনপি-জোট থেকে বেরিয়ে আসা প্রসঙ্গে আবদুল মোকাদ্দিমের বক্তব্য, ‘কিছু দ্বিধাবিভক্ত সিদ্ধান্তের কারণে জোট থেকে বেরিয়ে আসি। এখন তো জোট নিষ্ক্রিয়। আমরা আলাদাভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

অফিস আছে, কাজ নেই

২০১৯ সালে ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করেন নিবন্ধিত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। এরপর দলটির জায়গায় অন্য কোনও অংশ সৃষ্টি করেনি বিএনপি। ২০২১ সালের ১৪ জুলাই জোট ত্যাগ করেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মূল অংশ। এর স্থলাভিষিক্ত করার দরকার পড়েনি বিএনপির। একই নামে মুফতি ওয়াক্কাছের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ আগে থেকেই জোটে সক্রিয় হয়। তবে তারা জোট-একক উভয় দিকেই নিষ্ক্রিয়।

ঢাকার পুরানা পল্টনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-অনিবন্ধিত অংশের অফিস

চলতি বছরের শুরুর দিকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে কওমি মাদ্রাসার রাজনৈতিক আলেমরা গ্রেফতার-আটকের পর আরও নীরবতা পালন করে মুফতি ওয়াক্কাছের অংশটি। মুফতি ওয়াক্কাছের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা মনসুরুল হাসান রায়পুরী ও মহাসচিব পদে আছেন ড. গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম। তবে মহিউদ্দিন ইকরামই জোটে প্রতিনিধিত্ব করেছেন নিয়মিত।

জমিয়তের পুরনো অফিস ১১৬/২, বক্স কালভার্ট রোড, নয়াপল্টনে এই অংশটির কার্যালয়। করোনা সংক্রমণের পর দু’একটি দোয়া মাহফিল ছাড়া কার্যালয়ে তেমন দলীয় কোনও অনুষ্ঠান করেনি জমিয়তের এই অংশ। দলটির একজন নেতা জানান, মুফতি ওয়াক্কাস জীবিত থাকা অবস্থায় গত বছরের ডিসেম্বরে কাউন্সিল হ‌ওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগামীতে কবে হবে তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।

গত ১ অক্টোবর ষষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছেড়েছে নিবন্ধিত খেলাফত মজলিস। এই দলটিরও কোনও অংশ সৃষ্টি করেনি বিএনপি।

/জেএইচ/
সর্বশেষ খবর
সংবাদ প্রকাশের পর কুমিল্লার হাইওয়ে হোটেলে অভিযান
সংবাদ প্রকাশের পর কুমিল্লার হাইওয়ে হোটেলে অভিযান
ভাড়াটে খুনি দিয়ে ভাতিজাকে খুন করান সাইফুল
ভাড়াটে খুনি দিয়ে ভাতিজাকে খুন করান সাইফুল
অভিনেত্রী আঁখির অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক
অভিনেত্রী আঁখির অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক
শীতপ্রবণ তেঁতুলিয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে বদলে যাওয়া জীবনের গল্প
শীতপ্রবণ তেঁতুলিয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে বদলে যাওয়া জীবনের গল্প
সর্বাধিক পঠিত
মঞ্চে না দেখে আসাদকে ডেকে পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী
মঞ্চে না দেখে আসাদকে ডেকে পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী
মাহফিলে নিলামে এক হালি ডিম ১০ হাজার টাকা!
মাহফিলে নিলামে এক হালি ডিম ১০ হাজার টাকা!
এসআইবিএল থেকে মাহবুব-উল-আলমের পদত্যাগ
এসআইবিএল থেকে মাহবুব-উল-আলমের পদত্যাগ
রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে প্রস্তুত ন্যাটো?
রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে প্রস্তুত ন্যাটো?
এনআইডি’র সঙ্গে সমন্বয় করে পাসপোর্ট সমস্যা দ্রুত সমাধানের সুপারিশ
এনআইডি’র সঙ্গে সমন্বয় করে পাসপোর্ট সমস্যা দ্রুত সমাধানের সুপারিশ