ফ্রান্সের শীর্ষ গোলদাতা তিনি। জাতীয় দলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতায় দুই নম্বরে। জিতেছেন বিশ্বকাপও। মঙ্গলবার সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামের সেমিফাইনালে এবার সেই ফ্রান্সের বিপক্ষে ডাগআউটে দাঁড়াতে হবে থিয়েরি অঁরিকে। তিনি যে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ বেলজিয়ামের সহকারী কোচ!
মাত্র কয়েক মিটার দূরে নিজ দেশের খেলোয়াড়রা, আর অঁরিকে বসে থাকতে হবে বেলজিয়ান বেঞ্চে। কেমন অনুভূতি হবে তার?
জীবনে প্রথমবার অঁরি চাইবেন ফ্রান্সের হার। দেশের অন্যতম কিংবদন্তিতুল্য খেলোয়াড় তিনি। ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপের পর জিতেছেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। ১২৩ ম্যাচে ৫১ গোল করা এ স্ট্রাইকার ফ্রান্সের অগণিত শিশুর আইকন। সাবেক এই অধিনায়ক মঙ্গলবার প্রতিনিধিত্ব করবেন দেশের শত্রুকে।
গত দুই বছর ধরে অঁরি বেলজিয়াম কোচ রবের্তো মার্তিনেসের সহকারী। তার বিশেষ দায়িত্ব হলো ফরোয়ার্ডদের পরামর্শ দেওয়া। রাশিয়া বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালের আগে বেলজিয়ান ট্রেনিং কিট পরা দেখাটা অদ্ভুত। তারও চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো তিনি চাইবেন যেন ফ্রান্স হেরে যায়।
রবিবার ফরাসি টেলিভিশনকে দিদিয়ের দেশম বলেছেন, ‘হ্যাঁ, এটা অদ্ভুত। কারণ সে ফরাসি এবং এখন সে প্রতিপক্ষের বেঞ্চে।’ ফ্রান্সের বর্তমান কোচ আরও যোগ করেছেন, ‘তার জন্যও এটা অদ্ভুত অনুভূতির।’
একই মত দিয়েছেন ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড অলিভিয়ের জিরুদ, ‘তিনি তার মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিচ্ছেন বেলজিয়ানদের। নিশ্চিতভাবে আমি চাইতাম আমাকে যদি তিনি উপদেশ দিতেন। কিন্তু আমি ঈর্ষান্বিত নই। আমার কাছে এটা অবাক করার মতো কিছু নয়। আমি গর্বিত হবো যদি প্রমাণ করতে পারি যে তিনি ভুল দল বেছে নিয়েছেন। এই ম্যাচে আমাদের বিপক্ষে তাকে দেখতে অদ্ভুত লাগবে। তার জন্য এটা বিশেষ ম্যাচ হবে।’
মঙ্গলবারের ম্যাচটি হবে অঁরি বনাম ফ্রান্স এবং অঁরি বনাম দেশমের, যারা দুজন ফ্রান্স ও জুভেন্টাসে সতীর্থ ছিলেন। তারা একে অপরকে ভালো জানেন-চেনেন। যদিও তারা একই প্রজন্মের নয়। দেশম অঁরির চেয়ে ৯ বছরের বড়, কিন্তু একে অপরকে সম্মানের চোখে দেখেন।
ফ্রান্সে একসঙ্গে খেলে অঁরি-দেশম কখনও হারেননি (২১ ম্যাচে ১৬ জয়, ৫ ড্র)।১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ও ২০০০ সালের ইউরো ট্রফি হাতে নিয়েছেন একসঙ্গে। দুইজন এখন দুইপ্রান্তে, তাহলে কি অঁরি বিশ্বাসঘাতক? আর্সেনালের সাবেক কোচ তেমনটা মনে করেন না, ‘না। কোনও ধরনের চাপ ছাড়া কাজ শেখার দারুণ একটা সুযোগ এটা তার জন্য।’
অঁরি যে ফ্রান্সকে ছেড়ে বেলজিয়ামকে বেছে নিয়েছেন, সেটা নয়। কেউ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বারবার বলেছেন, কখনও ফ্রান্স তাকে প্রস্তাব দেয়নি। ফরাসি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নোয়েল লু গ্রায়েত রবিবার বলেছেন, ‘ফরাসি ফেডারেশনের সঙ্গে তার যোগাযোগ কম ছিল। আমরা তার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এটাই জীবন। দীর্ঘদিন সে ইংল্যান্ডে ছিল। ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ (তার সঙ্গে) কম ছিল।’
ফ্রান্সের সঙ্গে অঁরির গল্পটা শুরু স্বপ্নের মতো, আর শেষ দুঃস্বপ্নে। ১৯৯৮ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে নিজ দেশে বিশ্বকাপ জিতলেন। আর ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের অনুশীলন ক্যাম্পে খেলোয়াড়দের ধর্মঘটের পর শেষ হয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
তার আগের বছরই জনপ্রিয়তা হারান অঁরি। ২০০৯ সালে বিশ্বকাপ প্লেঅফে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তার হ্যান্ডবল ছিল অন্যতম কারণ। নিজ দেশের মানুষের কাছে অবাঞ্ছিত হন তিনি। ফ্রান্সকে অনেক সাফল্য এনে দিয়েও প্রাপ্য বিদায় জোটেনি অঁরির কপালে।
৪০ বছর বয়সী অঁরি আজকাল হয়তো একজন ফরাসির চেয়ে নিজেকে ইংলিশ ভেবে স্বস্তিবোধ করেন। গত ২০ বছরে বেশির ভাগ সময় তার কেটেছে লন্ডনে। এখন তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বেলজিয়ামের সঙ্গে, হয়তো তাদের প্রতি আনুগত্যও। কিন্তু আসল কথা, তিনি এখনও ফরাসি এবং দেশের ফুটবলকে দেওয়ার অনেক সুযোগ আছে তার সামনে। কারও মনে হতে পারে, ফরাসি ফুটবল এখনও অঁরির কাছে অনেক কিছু। কিন্তু মঙ্গলবার পেশাগত জায়গা থেকে তিনি ফ্রান্সের শত্রু!







