ই-কমার্স নীতিমালায় নেই ‘কী বিক্রি করা যাবে, কী বিক্রি করা যাবে না’

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ০৮:০০, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৩, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯

ই-কমার্স নীতিমালায় নেই ‘কী বিক্রি করা যাবে, কী বিক্রি করা যাবে না’ই-কমার্স তথা ডিজিটাল কমার্সের নীতিমালায় কী পণ্য ও সেবা বিক্রি করা যাবে আর কী কী বিক্রি করা যাবে না তার কোনও উল্লেখই নেই। আর এটাকেই সুযোগ হিসেবে নিয়ে অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও মার্কেটপ্লেস তাদের সাইটে সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি বিক্রি করছে যৌন উত্তেজক ওষুধের মতো পণ্যও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালায় না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের এগুলো বিক্রি করা ঠিক নয়। এটা চলতে থাকলে জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং সাইটগুলো সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। 

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু যৌন উত্তেজক ওষুধই নয়, নিষিদ্ধ পণ্য, অস্ত্রও কেনাবেচা হতে পারে সাইটে। সেসব কে দেখবে? যদিও ই-কমার্স নীতিমালায় বলা আছে, কোনও উদ্যোক্তা তাদের সাইটে নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি করতে পারবে না। তবে এর সংজ্ঞায় বলা নেই কোনগুলো নিষিদ্ধ পণ্য। এসব পরিষ্কার হওয়া দরকার। তা না হলে এক সময় ই-কমার্স খাত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কারণে দাগ পড়তে পারে গোটা ই-কমার্স খাতের গায়ে।

সম্প্রতি দেশের প্রতিষ্ঠিত দুটি ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস দারাজ ডট কম ও ই-ভ্যালির বিরুদ্ধে যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ছোট ছোট সাইট ও ফেসবুক নির্ভর এফ-কমার্স উদ্যোগেও মাঝে মাঝে এ ধরনের পণ্য বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের নিউজ ফিডে প্রায়ই এ ধরনের অফার দেখা যায়।  

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অনলাইনে কী বিক্রি করা যাবে কী করা যাবে না তা দেখার দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। আমরা ডিজিটাল কমার্সের নীতিমালা, বিধিবিধান তৈরি করে দিয়েছি। এখন সেসবে কী বিক্রি হবে তা দেখবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে তিনি মনে করেন, যেসব পণ্য অফলাইনে বিক্রি করা যাবে না সেসব অনলাইনেও বিক্রি করা যাবে না। সাধারণত এটা হওয়া উচিত নয়।

ই-কমার্স নীতিমালায় নেই ‘কী বিক্রি করা যাবে, কী বিক্রি করা যাবে না’এ বিষয়ে জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ডিজিটাল কমার্স নীতিমালায় উল্লেখ করা নেই কী পণ্য বিক্রি করা যাবে আর কী পণ্য বিক্রি করা যাবে না। ফলে এই সুযোগটাই অনলাইনগুলো নিয়ে থাকতে পারে। তিনি মনে করেন, এটা অনৈতিক। এমনটা হওয়া উচিত নয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ই-ভ্যালির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ রাসেল বলেন, আমাদের সাইটে এ ধরনের পণ্য বিক্রি হয় না, হওয়ার কথাও না। যদি বিক্রি হয়ও তাহলে তা ডেলিভারি হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের সাইটটা মার্কেটপ্লেস। এখানে সাড়ে ৮ হাজার সেলারের (বিক্রেতা) কয়েক হাজার পণ্য আছে। আমাদের যে লোকবল আছে তা দিয়ে সব চেক করা সব সময় সম্ভব হয় না। তবে এ ধরনের কিছু পেলে সঙ্গে সঙ্গে সেই সেলারকে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে যা হয়েছে বা হচ্ছে তা আমাদের অগোচরে। এ বিষয়ে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নেবো। তিনি ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আরও সতর্ক থাকবেন এবং আরও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে পণ্যগুলো খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা রাখবেন বলে জানান।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ও ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস আজকের ডিলের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে একটা সোশ্যাল নর্ম থাকা উচিত। সেটা মেনে চললে এ ধরনের পণ্য অনলাইনে বিক্রি হওয়ার কথা নয়।

ফাহিম মাশরুর বলেন, অনলাইনে পণ বিক্রির এসব কথাবার্তাও এক ধরনের কনটেন্ট। সেই কনটেন্ট অশালীন হলে তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের। এগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও আইসিটি বিভাগের দেখভাল করা উচিত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এখানে কিছু করার নেই। তাদের অথোরিটি নেই কিছু করার। তিনি মনে করেন, বরং এ ক্ষেত্রে কনটেন্টকে আওতায় এনে বিটিআরসি কিছু একটা করতে পারে।

ফাহিম মাশরুর জানান, ডিজিটাল কমার্সের নীতিমালায় বলা আছে নিষিদ্ধ কোনও কিছু বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু নিষিদ্ধ জিনিস কী তার সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। ফলে কেউ কেউ এই সুযোগটা নিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালায় এ ধরনের কিছু না থাকার সুযোগে কেউ যদি অনলাইনে অস্ত্র বিক্রি করে বা বিজ্ঞাপন দেয় তাহলে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে কিভাবে। ফলে বিষয়টি উদ্বেগের। আজ  যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি হচ্ছে, সাহস বেড়ে গেলে কাল আরও অন্য ধরনের পণ্য বিক্রি হবে, নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েও তখন তা বন্ধ করা যাবে না।

ই-কমার্স নীতিমালায় নেই ‘কী বিক্রি করা যাবে, কী বিক্রি করা যাবে না’অভিযোগের বিষয়ে দারাজ ডট কমের জনসংযোগ বিভাগে গত ২৮ নভেম্বর ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠিয়েও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে দারাজের বিরুদ্ধে এ ধরনের যৌন ‍উত্তেজক ওষুধ বিক্রির অভিযোগ ওঠে। সেসময় প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ বিভাগ একটি বিবৃতি পাঠায়। ‘সেক্স মেডস কন্ট্রোভার্সি’ শিরোনামে যে বিবৃতি পাঠায় তাতে উল্লেখ করা হয়, ‘দারাজের প্ল্যাটফর্মে পণ্য তালিকাভুক্তিকরণের পলিসি অনুসারে, যদি পণ্যটির সঠিক বিবরণ দেওয়া থাকে তাহলে অননুমোদিত অথবা কোনও অশ্লীল পণ্য প্রদর্শন সম্ভব নয়। আমাদের টেকনিকাল যে সিস্টেমটি আছে তাতে কিছু পূর্বনির্ধারিত শব্দ দেওয়া আছে যা অননুমোদিত এবং অশ্লীল পণ্য তালিকাভুক্তিকরণে বাধা সৃষ্টি করে। কিছু বিক্রেতা অনৈতিকভাবে সঠিক তথ্য প্রদান না করে এবং আমাদের সিস্টেম বাইপাস করে এসব অনৈতিক এবং অননুমোদিত পণ্য তালিকাভুক্ত করেছে। দারাজে এসব অননুমোদিত পণ্যগুলোকে ম্যানুয়ালি পর্যবেক্ষণ করতে হয়। যদি দারাজ এরকম কোনও কার্যক্রম চিহ্নিত করে তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয় এবং এ ধরনের বিক্রেতা ও পণ্যকে ব্লক করে দেয়। তবে এধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে সিস্টেমগত কারণে কিছুটা সময় লাগে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যদি কখনও দারাজ ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য বিক্রির মাধ্যমে তার ব্যবসা পরিধি বড় করতে চায় তাহলে তা অবশ্যই ডিজিডিএ’র কাছ থেকে যথাযথ লাইসেন্স গ্রহণের মাধ্যমে করবে।’

প্রসঙ্গত, বর্তমানে ই-ক্যাবের সদস্য সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এছাড়াও নিবন্ধনের বাইরে কয়েক হাজার ই-কমার্স সাইট রয়েছে বলে জানা গেছে।

/টিএন/আপ-এনএস

লাইভ

টপ