X
বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

প্রিয় আওয়ামী লীগ, হাইব্রিড দোকানদারদের সামলান

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১৮:২৮
ফারাবী বিন জহির বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক অনন্য উজ্জ্বল রাজনৈতিক দলের নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের ইতিহাসে এমন কোনও অধ্যায় পাওয়া যাবে না, যেখানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অবদান নেই। এমনকি বাংলাদেশ নামক  দেশটির অভ্যুদয়ের পেছনে রয়েছে আওয়ামী লীগের বিরাট অবদান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়েও যেকোনও রাজনৈতিক সংগ্রামে আওয়ামী লীগ উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে। যখনই  দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে তখন গণতন্ত্র রক্ষার জন্য বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এই লড়াই করতে গিয়ে তাদের অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে, পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক বন্ধুর পথ।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলির কে এম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। সেই দলের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তীতে যিনি হয়ে ওঠেন জনগণের প্রাণের নেতা ‘বঙ্গবন্ধু’। বিভিন্ন ত্যাগ, সংগ্রাম আর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণের স্পন্দন। বাঙালি জাতির ওপর তর্জনী তুলে কথা বলার ক্ষমতা যার ছিল, যিনি পুরো জাতিকে নিজের আত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন। যার কথা শুরু হতো ‘আমার ভাই ও বোনেরা’ অথবা ‘আমার দেশ’ দিয়ে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় একজন বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছিলেন একজন সাধারণ কর্মী থেকে প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি বা পরিবারতন্ত্র থেকে নয়।

আমরা যদি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সফল প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের দিকে লক্ষ করি তাও আমরা দেখবো তিনি তৃণমূল থেকে রাজনীতি করা অসম্ভব কর্মীবান্ধব এক নেত্রী। তিনি ১৯৬৬-৬৭ সালে ছাত্রলীগ থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রী সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালে ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা তথা তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতির কন্যা হিসেবে চাইলেই এমপি, মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের বড় কোনও পদে অধিষ্ঠিত হয়ে রাজনীতি শুরু করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি।

তিনি তার পিতার রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করেছেন বলেই রাজনীতি শুরু করেছেন তৃণমূল পর্যায় থেকে। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন একজন কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন দলীয় প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন তখন তিনি দেশে উপস্থিত ছিলেন না। সুতরাং তার বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তারের সুযোগ ছিল না। আওয়ামী লীগের কর্মী এবং সমর্থকরাই তাকে দলীয় প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। এটি সম্ভব হয়েছে শুধু  তৃণমূলে তার অভাবনীয় জনপ্রিয়তার কারণে। জননেত্রী শেখ হাসিনা ভীষণ কর্মীবান্ধব নেতা হওয়ার কারণে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা জানতেন তিনি পারবেন আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে দলের হাল ধরতে, দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে। এমনকি টানা এত বছর ধরে সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সফলভাবে দলের হাল ধরে থাকার পরও তার জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি, বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ যখন তিনি নিজেই আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্বের কথা ভাবতে বলেন, তার কর্মীরা সমস্বরে ‘না না’ বলে ওঠেন।

আওয়ামী লীগের সব স্তরের নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করেন তাদের শেষ ভরসাস্থল জননেত্রী শেখ হাসিনা। আর এসব সম্ভব হয়েছে তার কর্মীবান্ধব গুণটির কারণেই।

মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ কোনও স্বৈরাচারের ঔরস থেকে ক্ষমতার হালুয়া রুটি খেতে খেতে জন্ম নেওয়া কোনও দল নয়। বরং এটি গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে জন্ম নেওয়া একটি দল। এই দলের পরতে পরতে আছে সর্বোচ্চ নেতা থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের মূল শক্তির উৎস হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অভাবনীয় গ্রহণযোগ্যতা। এই তৃণমূলের শক্তির বলে বলিয়ান হওয়ার ফলেই শত প্রতিকূলতাও আওয়ামী লীগকে বাংলার ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং যতই ধ্বংসের চেষ্টা করা হোক না কেন, আওয়ামী লীগ  ফিনিক্স পাখির মতই জেগে উঠেছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে। যে নেতৃত্বের ছিল জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। যে নেতৃত্ব জনগণের হৃদস্পন্দন বুঝতেন এবং সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।

সেই নেতৃত্বের হাত ধরেই আওয়ামী লীগ প্রায় ১০ বছরের অধিক সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় আওয়ামী লীগ দল হিসেবে একটি স্বর্ণালি সময় পার করছে। তবে এটিও সত্য যে অধিক  সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে স্বভাবতই এক ধরনের হাইব্রিড চাটুকার শ্রেণি আওয়ামী লীগের পতাকা তলে আশ্রয় লাভের বাসনায়  বিভিন্নভাবে চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। এ কথা অস্বীকারের জো নেই যে কিছু  কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়ে যাচ্ছে। এই নব্য হাইব্রিডদের কারণে ত্যাগীদের কোণঠাসা হওয়ার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে হরহামেশাই। এই  চাটুকার হাইব্রিড শ্রেণির  ‘ধান্দার’ অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে রাজনৈতিক দোকান। যা তা বিষয়কে কেন্দ্র করে ‘লীগ’ শব্দটি জুড়ে তারা খুলে বসছে তাদের এই রাজনৈতিক দোকান। এমন সব শব্দের পাশে ‘লীগ’ শব্দটি তারা জুড়ে দিচ্ছে, যা শুধু কৌতুকপূর্ণ নয়, অপমানজনকও বটে। তাদের এই অদ্ভুত অদ্ভুত সব ‘লীগ’ গড়ে তোলার কারণ শুধুই নিজেকে বড় আওয়ামী লীগার সাজিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি হাসিল। এদের দলের প্রতি বিন্দুমাত্র ত্যাগ বা আনুগত্য কোনোটি’ই নেই। বরং এই চাটুকার হাইব্রিড শ্রেণির অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এদের অনেকেরই আওয়ামী লীগের নামেই ছিল ব্যাপক গাত্রদাহ। এখন এরাই রাজনৈতিক দোকান খুলে দলের নাম ভাঙিয়ে অথবা দলকে বিতর্কিত করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। আওয়ামী লীগের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যায়, আওয়ামী বিরোধী শক্তি আওয়ামী লীগের এত ক্ষতি করতে পারেনি যতটা ক্ষতি করেছে দলের অভ্যন্তরে থাকা এই বেইমান চাটুকার হাইব্রিড শ্রেণির লোকেরা।

বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আর নেই। কারণ, দিন দিন এসব রাজনৈতিক দোকানের সংখ্যা  এবং এসব দোকানদারের কুকর্মের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। এদের এসব কুকর্ম দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে পদে পদে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

তাই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উচিত এদের বিষয়ে কঠোরতর সিদ্ধান্ত নেওয়া। শুধু এই হাইব্রিড দোকানদারদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে হবে না। এই হাইব্রিড দোকানদাররা কার আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে লালিত পালিত হচ্ছে, কার ইশারায় এরা এসব অদ্ভুত  অদ্ভুত রাজনৈতিক দোকান পরিচালনার সাহস পাচ্ছে, এই বিষয়গুলোও চিহ্নিত করে তাদের সেই গডফাদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। ফসলি জমিতে  বিষাক্ত আগাছা যদি ঠিকমতো পরিষ্কার না করা হয় তাহলে এই আগাছা যেমন জমির সব ফসল নষ্ট করে দেয়,  ঠিক তেমনি হাইব্রিড দোকানদার নামক রাজনৈতিক আগাছা যদি ঠিকমতো পরিষ্কার না করা হয় তাহলে তা একদিন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সব অর্জন ম্লান করে দেবে এরা।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মরহুম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যথার্থই বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ শুধু কোনও একটি দল নয়, আওয়ামী লীগ একটি ত্যাগের নাম, আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম, যে অনুভূতি ত্যাগের এবং আত্মত্যাগের।’ কিন্তু এই হাইব্রিড দোকানদারদের কারণে সেই ত্যাগ এবং আত্মত্যাগের অনুভূতি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এই হাইব্রিড দোকানদারদের আস্ফালন আওয়ামী লীগের মূল চালিকাশক্তি তৃণমূল নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে ফেলে, যা দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলে। তাই নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের এখনই উচিত চাটুকার হাইব্রিড শ্রেণির দোকানদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।      

লেখক: গবেষক
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনায় জীবন বনাম জীবিকা সংকট

করোনায় জীবন বনাম জীবিকা সংকট

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:২৩

মো. জাকির হোসেন দীর্ঘ দুই দশক পর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে আসার পর বিশ্বের নানা প্রান্তে তাদের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য-বিতর্ক চলছে। ইয়েমেনসহ কিছু দেশে জিহাদিরা তালেবানের বিজয়ে আতশবাজি পুড়িয়েছে, সোমালিয়ায় মিষ্টি বিতরণ করেছে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এ ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশের কিছু মানুষ তালেবানে এতটাই মজেছে যে, পারলে কিছু তালেবান ভাড়া করে এখনই সরকারকে বিদায় করে দেয়। 

আমি তালেবানের সমর্থক নই। আবার তালেবানের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তাদের পক্ষেও নই। যেসব কারণে আমি তালেবানকে সমর্থন করতে পারছি না, তা হলো – এক. ইসলামি শরিয়া আইন বাস্তবায়নের নামে তালেবান নিজেরাই কোরআন-হাদিসের বিধান লঙ্ঘন করছে। আমি কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। তালেবানের ভয়ে মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে মরিয়া। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাসুল (সা.) উদ্দেশ করে বলেন, ‘আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি তাদের প্রতি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার পাশ থেকে সরে যেত।...’ (সুরা আল ইমরান: ১৫৯) 

রূঢ় ও কঠোরচিত্ত তালেবানের নৃশংসতা, নিপীড়ন, নির্যাতনের ভয়ে মানুষ নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে যেতেও কুণ্ঠিত নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কোনও ভাই যেন তরবারি দিয়ে তার ভাইয়ের প্রতি ইঙ্গিত না করে। কেননা, তোমরা জান না, শয়তান তার মধ্যে হাত রেখে টানতে থাকে, তারপর সে জাহান্নামের গর্তে পড়ে যায়। (মুসলিম, ৬৫৬২)। 

পাঞ্জশির তালেবান যোদ্ধাদের দখলে এই খবর শোনার পর কাবুলের তালেবানেরা ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে বিজয় উদযাপন করে। এতে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪১ জন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘…যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দণ্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করে, সে যেন পৃথিবীর সব মানুষকেই হত্যা করলো। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো ।… (সুরা মায়েদাহ: ৩২)। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: ‘দুনিয়া ধ্বংস করার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণ্যতর কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিযি, ১৩৯৫)। অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি আকাশ ও পৃথিবীর সবাই মিলেও কোন মু’মিন হত্যায় অংশগ্রহণ করে তবু আল্লাহ তা’আলা তাদের সবাইকে মুখ উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’(তিরমিযি, ১৩৯৮)। 

আল্লাহ বলেন, “প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মের জন্য দায়ী থাকবে। কেউ অন্যের (পাপের) বোঝা বহন করবে না।…।”(সুরা আনআম: ১৬৪)। তালেবানদের প্রতিপক্ষকে সহায়তা করার অপরাধে অভিযুক্ত আফগান নাগরিককে না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে তালেবান, যা কোরআনের বিধানের লঙ্ঘন। পাঞ্জশিরে আফগানিস্তানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহর ভাই রুহুল্লাহ আজিজীকে হত্যার পর পরিবারকে তার দেহ দাফন করতে দেয়নি তালেবান। তারা বলেছে, তার শরীর পচা উচিত। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক আছে।’ এর একটি হলো, ‘মৃত্যুবরণ করলে তার জানাজায় উপস্থিত হওয়া।’ (মুসলিম, ৪০২৩) শান্তি, সম্প্রীতি, ক্ষমা, সহনশীলতা ও ভালোবাসার নাম ইসলাম। উগ্রতা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধপরায়ণতা, সাম্প্রদায়িকতা ইসলাম নয়। অবিশ্বাসীরা রাসুল (সা.)-কে নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে, নামাজরত অবস্থায় তাঁর মাথায় উটের পচা-গলিত নাড়িভুঁড়ি ও আবর্জনা নিক্ষেপ করেছে, তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে, তাঁকে পাথর দিয়ে আঘাত করেছে। মাতৃভূমি ত্যাগ করতে যারা বাধ্য করেছিল, মুসলমানদের ঘরবাড়ি থেকে যারা বিতাড়ন করেছে, লুটপাট করেছে, মুসলমানদের সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে, রাসুল (সা.)-এর চাচা হামজা (রা.)-এর কলিজা যে চিবিয়েছে, উহুদের যুদ্ধে শহীদ সাহাবাগণের মৃতদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে যারা খণ্ড-বিখণ্ড-বিকৃত করেছে, মক্কা বিজয়ের পর হাতের কাছে পেয়েও তিনি তাদের কোনও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। বরং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে সবাইকে উদারতা ও ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিয়ে বলেছিলেন, আজ তোমাদের ওপর আমার কোনও অভিযোগ নেই, তোমরা মুক্ত। 

চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদিজার (রা.) মৃত্যুর পর কুরাইশরা রাসুলের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। মক্কার মাটিতে তিনি আর টিকতেই পারছিলেন না। তিনি তায়েফবাসীর কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১০ দিন পর্যন্ত তিনি ঘুরে ঘুরে ইসলামের আহ্বান জানাতে থাকেন। কিন্তু তারা তাঁর কথায় কোনোই কর্ণপাত করলো না; বরং তারা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিল। অবশেষে তারা সন্ত্রাসী দুষ্ট যুবকদের লেলিয়ে দিলো। যুবকরা রাসুল (সা.)-কে পাথরের আঘাতে জর্জরিত করে তুললো। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর জীবন-আশঙ্কা দেখা দিলো। মহানুভব রাসুল (সা.) তায়েফবাসীদের এহেন আচরণ সত্ত্বেও আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ক্ষমা ও করুণা প্রার্থনা করেন। 

অথচ তালেবান কাবুল দখলের পর প্রতিশোধ নিতে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে, সাংবাদিকদের পিটিয়ে মারাত্মক জখম করেছে। 

দুই. ইসলামে জিহাদ ইবাদত। ইবাদত কবুলের অন্যতম শর্ত হলো উপার্জন হারাম হতে পারবে না। একাধিক রিপোর্টে প্রকাশ, তালেবান বেশিরভাগ অর্থ সংগ্রহ করেছে মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি ও অপহরণের পর মুক্তিপণ থেকে। স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগান রিকন্সট্রাকশন (সিগার)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মাদক ব্যবসা এবং চোরাচালানের মাধ্যমে বছরে ১০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে তালেবান। রিপোর্ট অনুযায়ী, তালেবানের বার্ষিক রাজস্বের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। ইসলামে এর সবই হারাম। 

তিন. শরিয়া আইনের বিধান রাতারাতি কার্যকর করতে চায় তালেবান। শরীরে জটিল অসুখ হলেও সেরে ওঠতে সময় লাগে। আর অন্তরের অসুখ তো ভয়ংকর, তা দূর করতে সময় দরকার। শত শত বছর ধরে মানুষ ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে। বহু শতাব্দী ধরে ইহুদি, নাসারা, মুশরিক, অবিশ্বাসীদের জীবনযাপন, সভ্যতা-সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে যে অন্তর, তা কী চাবুক মেরে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন করা যাবে? কোরআন-হাদিসে নবী-রাসুলদের ঘটনা সাক্ষ্য দেয়, তাঁরা যুগ যুগ ধরে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছেন। তা সত্ত্বেও কোনও কোনও নবী-রাসুলের আহ্বানে হাতে গোনা কয়েকজন সাড়া দিয়েছেন। এমনকি কোনও নবীর আহ্বানে একজনও সাড়া দেননি। 

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: একদিন রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমার কাছে সব উম্মতের লোকদের পেশ করা হলো। আমি দেখলাম, কোনও নবীর সঙ্গে মাত্র সামান্য কয়জন (৩ থেকে ৭ জন অনুসারী) লোক রয়েছে। কোনও নবীর সঙ্গে একজন অথবা দুই জন লোক রয়েছে। কোনও নবীকে দেখলাম তাঁর সঙ্গে কেউই নেই!...।’ (বুখারি, ৫৭০৫; ৩৪১০; তিরমিযি, ২৪৪৬; মুসনাদে আহমাদ, ২৪৪৪)। 
মক্কায় আল্লাহর আইন চালু করতে না পেরে রাসুল (সা.) মদিনায় গিয়ে সফল হন। মদিনার সংহতির চিন্তা করে রাসুল (সা.) সেখানকার অধিবাসীদের নিয়ে তথা পৌত্তলিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং মুসলিমদের মধ্যে এক লিখিত সনদ বা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ সনদকেই ‘মদিনা সনদ’ বলা হয়। মদিনা সনদে বলা হয়, স্বাক্ষরকারী ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক ও মুসলিমরা মদিনা রাষ্ট্রে সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবেন এবং একটি জাতি (উম্মাহ) গঠন করবেন। সব শ্রেণির লোক নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন। 

চার. তালেবান নারী শিক্ষা নিয়ে গড়িমসি করছে। নারীরা শিক্ষা বঞ্চিত হলে নারীদের জন্য নারী ডাক্তার, নারী শিক্ষক কীভাবে তৈরি হবে? পর্দা বজায় রেখে শিক্ষাগ্রহণ কি ইসলামে নিষিদ্ধ? 

পাঁচ. জোর করে চাপিয়ে দিয়ে, ভয় দেখিয়ে ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায় তালেবান। রাসুল (সা.) যখন পৃথিবীতে আসেন তখন জাহেলি তথা অন্ধকারের যুগ ছিল, তাগুতের শাসন ছিল। রাসুল (সা.) কি এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য জোর করে, নেতিবাচক পন্থায়, নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, না সুন্দর ব্যবহার, উত্তম চরিত্র, আল্লাহর পথে আহ্বান, আত্মগঠন ও সমাজ-সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন? তালেবান তাহলে কার অনুসরণ করছে? আল্লাহর আইন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হলে তা শুধু আল্লাহর কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথেই করতে হবে। ইসলামের নামে কোনও শায়খের খামখেয়ালিপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শবিরোধী পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পিটিয়ে, আঘাত করে, ভয় দেখিয়ে, নিষ্ঠুরতা বা নৃশংসতার মাধ্যমে নয়, বরং দাওয়াতের ভিত্তিতে মদিনার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইসলামি জীবন ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিলেন, এবং রাসুল (সা.)-কে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। 

আল্লাহ তা’আলা রাসুল (সা.)-কে বলেন: “আপনি মানুষকে দাওয়াত দিন আপনার রবের পথে হিকমত ও উত্তম কথার মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করুন উত্তম পদ্ধতিতে।…” (সুরা নাহল: আয়াত ১২৫)। উত্তম তর্ক হচ্ছে- কোমলতা ও দয়ার মাধ্যমে, ইসলামের বুনিয়াদি দিকগুলো তুলে ধরা। অবশ্যই নম্রতার সঙ্গে মানুষকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে হবে। এমনকি মহান রব মুসা (আ.) ও তাঁর ভ্রাতা হারুন (আ.)-কে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম অত্যাচারী শাসক নিজেকে আল্লাহ বলে দাবিকারী ফিরাউনকে পর্যন্ত নম্রতার সঙ্গে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা উভয়ে ফিরাউনের নিকট যাও, সে তো সীমা লঙ্ঘন করেছে। তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।” (সুরা ত্বহা: আয়াত ৪৩-৪৪)। 

বাস্তব জীবনে কোনও কিছুর ভিত তৈরি হয়ে পূর্ণতা পেতে যেমন সময়, পরিশ্রম ও ধৈর্যের প্রয়োজন তেমনি মানুষের অন্তরগুলো গড়ে তুলতে এবং সেগুলোকে সত্যের পথে নিয়ে আসতে সময়, ধৈর্য ও ত্যাগের প্রয়োজন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘…যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে সে-ই প্রকৃত মুমিন।’ (তিরমিযি,২৫৫১; নাসাঈ, ৪৯০৯)। অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেবল হতভাগ্য ব্যক্তির হৃদয় থেকেই দয়া তুলে নেওয়া হয়।’ (তিরমিযি, ১৯২৩)। 

ছয়. চীন সরকার উইঘুর মুসলিমদের নামাজ-রোজা পালনে বাধা দিচ্ছে, হারাম খাদ্যগ্রহণে বাধ্য করাসহ নিষ্ঠুর নির্যাতন করছে। অথচ তালেবান তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে। ইসলামে সব অমুসলিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ নয়। এমন অমুসলিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা মেলামেশা করা যাবে, যে ইসলামকে কটাক্ষ করে না, উপহাস করে না, কটূক্তি করে না, মুসলিমকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে নিতে চায় না। কিন্তু তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যাবে না যে ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলে, কাজ করে। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, “…আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালেম।” (সুরা মুমতাহিনা: ৮-৯)।

তালেবান শরিয়া আইন চালুর কথা বলছে। মুসলমান হিসেবে আমার অবশ্যই এর বিরোধিতা করা উচিত নয়। পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৪৪নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই কাফির।” পরবর্তী ৪৫নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” এর পরবর্তী ৪৭নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই ফাসিক (পাপাচারী)।” ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, ‘যে কেউ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অস্বীকার করবে সে অবশ্যই কাফের হয়ে যাবে। আর যে কেউ তা স্বীকার করবে, কিন্তু বাস্তবায়ন করে তদানুসারে বিধান দিবে না সে জালেম ও ফাসেক হবে’ (তাবারি)। 

তালেবান মুখে শরিয়া আইনের কথা বললেও তাদের অনেক কর্মকাণ্ড কেবল ইসলামের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণই নয়, কিছু ক্ষেত্রে তা কোরআন-হাদিসের বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। শরিয়ার বিধান চালুর নামে কোনও শায়খের খামখেয়ালিপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শবিরোধী পন্থা সমর্থনযোগ্য নয়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

পরীমণি, ‘সরি মণি’

পরীমণি, ‘সরি মণি’

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের

বিষয়টি ‘কথার কথা’ নয়

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:৩৪

রেজানুর রহমান আমার আজকের লেখাটা একটু অন্যরকম। সবার পছন্দ নাও হতে পারে। কারণ, সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা আমরা অনেকেই পছন্দ করি না। গানবাজনা, নাটক, চলচ্চিত্র, শিল্পকলা এসব নিয়ে কথা বলার কী কোনও মানে হয়? শুধু শুধু সময় নষ্ট। যারা এমনটা ভাবেন, আমার ধারণা তারা একটু স্বার্থপর। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংস্কৃতি কর্মীরাই ছিল প্রথম সারির সৈনিক। যেকোনও সংকটকালেই তাদের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু প্রয়োজন শেষ, আর সংস্কৃতি কর্মীদের কথা মনে থাকে না।

এই করোনাকালের কথাই ধরি। গত দেড় বছর অন্যান্য সেক্টরের মতো দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনও ঝিমিয়ে ছিল। সিনেমা হল বন্ধ, নাটকের মঞ্চায়ন বন্ধ। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলেছে। সবার একটাই প্রত্যাশা ছিল, নিশ্চয়ই আবার সবকিছু স্বাভাবিক হবে। আবার জমবে মেলা, বটতলা হাটখোলায়। আশার কথা, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় দেশের সবকিছুই এখন স্বাভাবিক গতিতে চলমান হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অবস্থা খুবই করুণ। দীর্ঘ দেড় বছরের বিরতি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে এতটাই কাহিল করে তুলেছে যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। খেয়াল করলেই দেখবেন, রাজনৈতিক, সামাজিক, এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানেও আমরা শিল্পীদের ডেকে আনি। নাচ গান, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া কোনও কিছুই জমে না। সে কারণে যেকোনও আয়োজনের আগে শিল্পীরা হয়ে ওঠেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর কারও কারও কাছে আদরের শিল্পীরাই হয়ে ওঠেন অনেক ঝামেলার। ‘আরে ভাই এত টাকা টাকা করেন কেন? টাকা দিবো না এ কথা বলেছি নাকি? চিন্তা করবেন না। কাল, পরশু টাকা পেয়ে যাবেন...’।

এখন প্রশ্ন হলো শিল্পীদের কি সংসার নেই? তাদের কি খেতে হয় না? তাদের কি বাড়ি ভাড়া দিতে হয় না? এই করোনাকালে নাটক, সিনেমা ও সংগীতাঙ্গনের মানুষরাই সীমাহীন বিপাকে পড়েছে। আয় রোজগারের পথ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন অনেকে। একটাই আশা ছিল, করোনার সংক্রমণ কমে গেলে নিশ্চয়ই সবকিছু আবার স্বাভাবিক হবে। রাষ্ট্র নিশ্চয়ই শিল্পীদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু তার তো কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। নাটকের মঞ্চ খুলে গেছে। সিনেমা হল খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা কি জানি এই সেক্টরের মানুষগুলো কতটা আর্থিক বিপদে আছেন? সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কথাই বলি। গত দেড় বছরে অনেকে ভাড়া দিতে না পারায় অফিস ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে নাটকের সেট, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সরঞ্জামাদি, যেমন- হারমোনিয়াম, তবলা ইত্যাদি নষ্ট হয়ে গেছে। আর্থিক সংকটে আবার ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি পাচ্ছে না অনেক সাংস্কৃতিক ও নাট্য সংগঠন। তাই দাবি উঠেছে আর্থিক প্রণোদনার। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ৩টি মিলনায়তন ঢাকার নাট্যকর্মীদের অনেক আস্থার জায়গা। কর্তৃপক্ষ মিলনায়তনগুলো খুলে দিয়েছেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে অনেক সংগঠনের পক্ষে এখন  নিয়মিত নাটক করা সম্ভব হবে না। এটাই চরম বাস্তবতা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মঞ্চপাড়ায় হল ভাড়া মওকুফ অথবা বিশেষ প্রণোদনার দাবি উঠেছে। দেশের শীর্ষ সারির দুটি নাট্য সংগঠন যথাক্রমে ঢাকা থিয়েটার ও আরণ্যক সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হল ভাড়া মওকুফ অথবা বিশেষ প্রণোদনা না পেলে তারা বরাদ্দপ্রাপ্ত তারিখে মঞ্চ নাটক করবে না!

ঢাকা থিয়েটার-এর প্রধান নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেছেন, ঢাকাস্থ শিল্পকলা একাডেমি ও সারাদেশে শিল্পকলা একাডেমির হল ভাড়া মওকুফ করা ও সব সাংস্কৃতিক সংগঠনকে করোনা প্রণোদনা না দেওয়ার প্রতিবাদে আমরা ১৭ সেপ্টেম্বর শিল্পকলায় নাটক করবো না। তিনি আরও বলেছেন, করোনা মহামারির কারণে দেশের প্রায় সব সাংস্কৃতিক সংগঠনই আর্থিক সংকটে পড়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষার পরেই আমরা সংস্কৃতির কথা বলি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে আমরা যে ধরনের আন্তরিকতা দেখিয়েছি, তার ছিটেফোঁটাও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। যদিও শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির এমন তুলনা করা ঠিক হয়। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিরও উন্নয়ন তো জরুরি। অনেকেই হয়তো ব্যাপারটা খেয়াল করছেন না। অথবা খেয়াল করলেও দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। সমস্যা বাড়িয়ে তুলেছে আকাশ সংস্কৃতি। মোবাইল ফোন সংস্কৃতির আগ্রাসন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আকাশ সংস্কৃতিই ভেসে আসছে মোবাইল ফোনে। আমাদের ভালো সিনেমা নেই, সাংস্কৃতিক চর্চা নেই, মঞ্চ নাটক নেই। ফলে প্রায় প্রতিটি পরিবারে আকাশ সংস্কৃতিই প্রভাব ফেলছে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম ভিনদেশের তারকাদের যেভাবে চিনে নিজ দেশের তারকাদের সেভাবে চিনে না! তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশের চেয়ে বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। এমন একটা নাজুক পরিস্থিতিতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বলিষ্ঠ ভূমিকা দরকার। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? কথায় আছে, অভাব দেখা দিলে গভীর প্রেমও দরজা-জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়। করোনা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কাজেই আর্থিক প্রণোদনা ছাড়া বোধকরি সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে জাগিয়ে তোলা যাবে না। এটা ‘কথার কথা’ এমন বিষয় না। জরুরি ভেবে দেখার বিষয়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

এক হাত পরীর, অন্য হাত কার?

এক হাত পরীর, অন্য হাত কার?

দেশের বড় সেতুগুলোর নিরাপত্তা কি আছে?

দেশের বড় সেতুগুলোর নিরাপত্তা কি আছে?

মডেল মানেই কি রাতের রানি?

মডেল মানেই কি রাতের রানি?

কাজের কথা

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:১৭

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মাথা তুলছে বেকারত্ব, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। করোনার বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ায় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ছে। শহর, উপ-শহর ও গ্রাম– সারা দেশেই কাজের গতি এসেছে। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ তৈরির পথ এখনও মসৃণই হয়নি। কর্মসংস্থানের ছবিতে অর্থনীতির গতির প্রতিফলন কম। খেটে খাওয়া মানুষ যদিওবা কিছু একটা করে টিকে থাকছে, বেশি বিপদে পড়েছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস)-এর এক জরিপে উঠে এসেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশ অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশই বেকার থাকছেন। ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি পান। ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এখনও অন্য কোনও বিষয়ে স্নাতকোত্তর বা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করছেন কিংবা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ৩ শতাংশ স্ব-উদ্যোগে কিছু করছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে এখন মোট শিক্ষার্থী আছেন ২০ লাখের মতো।

ছবিটা উদ্বেগজনক। যোগ্য চাকরি জোগাড় করা দুরূহ কাজ। কিন্তু উপরোক্ত চিত্র জানিয়ে দেয় যে উপযুক্ততা অনেক দূরের ব্যাপার, একটা কাজই জোগাড় হচ্ছে না বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীর। সমস্যাটি কেবল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নয়। অন্যান্য পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন, তাদের চাকরির বাজারও ভালো নয়।

বিআইডিএস প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান। তার গবেষণার মূল্য এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। সেই সংস্থা যখন এমন তথ্য দেয়, তখন তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হয়। বাংলাদেশে বেকারত্বের হার সাধারণত শিক্ষিতদের মধ্যেই বেশি হয়ে থাকে। এখানেই শিক্ষা আর কাজের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের ভাবতে হয়। অর্থনীতির আলোচনায় কর্মসংস্থানের সমস্যা নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেখানে নীতি-নির্ধারকদের দিক থেকে যতটা প্রতিশ্রুতি থাকে, ততটা থাকে না সমাধানের ইঙ্গিত। সম্পদ আর কর্মসংস্থান সৃষ্টিই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আসল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ এখন উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ। মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেশি। সেই বাস্তবতায় কর্মসংস্থানে সাফল্যই প্রত্যাশিত। বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি পেতে তরুণ সমাজের মধ্যে আকাঙ্ক্ষাই বলে দেয় কর্ম সৃজনের জন্য যে শক্ত ব্যক্তি খাত প্রয়োজন, সেটা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি কিংবা যেটুকু গড়ে উঠেছিল সেটা নষ্ট করেছি।

বেকারত্ব কমানোর সরকারি প্রচেষ্টা থাকবে, সেটাও ঠিক। কিন্তু বিআইডিএসের গবেষণা-ফল বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশে এখন শিক্ষার সঙ্গে চাকরি বা কর্মসংস্থানের সম্পর্কগত ধারণা বদলে যাচ্ছে। শিক্ষিত হলেই কাজ মিলবে, এমন ধারণা আর থাকছে না। অ্যাকাডেমিক জীবনে ভালো ফল করলেই ক্যারিয়ার-গ্রাফ ভালো হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। যে যে বিষয়ে পড়ছে, সে বিষয়ে কাজ পাচ্ছে না বা সেই ক্যারিয়ার তার কাছে আকর্ষণীয় লাগছে না। তাই প্রকৌশলী বা চিকিৎসক বিসিএস দিয়ে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র দফতরে, প্রশাসনিক বা পুলিশ ক্যাডারে।

প্রাণিবিজ্ঞানে পড়ালেখা করে কাজ করছেন ব্যাংকে বা বিমা খাতে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মের কোনও সাযুজ্য নেই। অথচ শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যই এই সাযুজ্য, উপযুক্ত সম্মান এবং যোগ্যতা অনুসারে অর্থ উপার্জন নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থানের জন্য দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যশাস্ত্রের জয়জয়কার। প্রচুর ছেলেমেয়ে বিবিএ আর এমবিএ করে বের হচ্ছে প্রতিবছর। তাদের প্রায় সবাই চায় চাকরি। আত্মকর্মসংস্থান, অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে যে ধরনের ব্যক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন, সেখানেও সমস্যা আছে।

বিআইডিএস বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে যারা বেকার থাকছেন, তাদের অধিকাংশই ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে পড়াশোনা করা। অর্থাৎ ব্যবসায় প্রশাসনে পড়া শিক্ষার্থীরাই তুলনামূলক বেশি চাকরি পাচ্ছেন। নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করার ক্ষেত্রেও ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, শিক্ষিতদের বড় একটা অংশ যদি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে, তাহলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এত রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক বিনিয়োগের পর একটি ছেলে বা মেয়ে বেকার থাকলে তা শুধু কষ্টদায়ক নয়, বরং বলতে হবে সম্পদের অপচয়।

এত এত উচ্চশিক্ষিত প্রতিবছর সৃষ্টি করে উপকার কী হচ্ছে, সে প্রশ্ন নিশ্চয়ই উঠতে পারে। এত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থাকার পরও আমাদের করপোরেট-জগতে বিপুল বিদেশিকে ডেকে আনতে হচ্ছে উচ্চ বেতনে। এ বিষয়টা ভাবা দরকার। কেন এমন হচ্ছে সেই কারণ খুঁজে বের করা দরকার।

আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখছি, গরিবেরা বেকার থাকে না। দরিদ্রদের মধ্যে বেকার কম। বেকার সমস্যা বলে সচরাচর যাকে আমরা চিনি, তা আসলে যারা শিক্ষিত এবং তারাই আসলে কাজ পান না। আর বড়লোকদের বেকার হওয়ার সুযোগই নেই। ভাবনা মধ্যবিত্তকে নিয়ে, যাদের কাজের সুযোগ প্রসারিত হচ্ছে না। কারিগরি বিদ্যায় দক্ষ একজন বড় বেতনের কাজ পায়, তার কাজের অভাবও হয় না; কিন্তু তার কোনও সামাজিক মর্যাদা সৃষ্টি হয় না। আর এভাবেই শিক্ষিত বেকার তৈরি হয়। শিক্ষিত বিশাল এক জনগোষ্ঠীর অকারণ অযোগ্য উচ্চাশা উচ্চারিত আকাশে-বাতাসে।

এত মানুষ, অথচ উদ্যোক্তারা বলেন, তারা চাকরিপ্রার্থী লাখ লাখ পেলেও সত্যিকারের কাজের লোক পান না। ভালোভাবে বুঝতে হবে কেন বিভিন্ন ধরনের কাজে শ্রমের বাজারে চাহিদা আর জোগানে মিল থাকছে না। পরিকল্পনায় যারা আছেন, তারা শিক্ষা নিয়ে ভাবুন, ভেবে ঠিক করুন দেশে শিক্ষিত বেকারের জোগান বাড়বে, নাকি এমন শিক্ষা ব্যবস্থা হবে, যেখান থেকে সত্যিকারের কর্মী বাহিনী সৃষ্টি হবে।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

স্কুল যখন খুলছে

স্কুল যখন খুলছে

৪৩ বছরে বিএনপি

৪৩ বছরে বিএনপি

জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসক

জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসক

আমেরিকার মিশন ইমপসিবল

আমেরিকার মিশন ইমপসিবল

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:০৭
লীনা পারভীন বর্তমানে গোটা বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগের এক নাম্বার মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। আমেরিকার তৈরি এই এক ফেসবুকের মাধ্যমে একদিকে যেমন কোটি কোটি মানুষ বিশ্বব্যাপী যুক্ত হচ্ছে, আবার এর মাধ্যমে চলে নানা রকম বাণিজ্যও। আধুনিক বিশ্বে তাই ফেসবুকের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশে মোট ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ কোটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত। ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে বাংলাদেশ ফেসবুকের মতো একটি মাধ্যমের জন্য বিশাল সম্ভাবনার বাণিজ্য। অথচ এই মিডিয়ার ওপর বাংলাদেশের কোনও কর্তৃপক্ষের নেই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা।

অন্যান্য দেশের মতো ফেসবুক এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। যেকোনও ইস্যুতেই পাবলিক অপিনিয়নের একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম এই ফেসবুক। অতি অল্প সময়ে বেশি সংখ্যক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের এমন সহজ মাধ্যম এখনও সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য চলে এই ফেসবুককে কেন্দ্র করে, যাকে এফ কমার্স বলা হয়। অথচ উপকারী এই মাধ্যমটির বিরুদ্ধে এরইমধ্যে উঠেছে নানা অভিযোগ। ফেসবুকের জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে নানা সময়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব বা ফেইক সংবাদ প্রচার করে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে অস্থির করে তোলার চেষ্টাও দেখেছি। ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের পেইজ বা গ্রুপের মাধ্যমে চলছে ব্যক্তি, সরকার বা রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন ধরনের হেইট স্পিচ। মিথ্যা সংবাদকে অতি দ্রুত বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম এখন ফেসবুক। কোটাবিরোধী আন্দোলন বা সাম্প্রতিক এমন অনেক আন্দোলনের সময় আমরা সেসবের উদাহরণ পেয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সাকিব আল হাসানের মতো ব্যক্তিত্বদের নিয়েও সরাসরি আক্রমণমূলক বক্তব্য ও ভিডিও ফেসবুকের বুকে ঘুরেছে অহরহ, কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নিয়েছে ফেসবুক, না নিতে পেরেছে আমাদের সরকার বা কর্তৃপক্ষ। সরাসরি হত্যার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে সেখানে। বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালগুলোর সংবাদ যখন শেয়ার হয়, সেখানে কমেন্ট সেকশনগুলোতে গেলে রীতিমতো আতঙ্কিত হতে হয় যে এটা কোন দেশ? অথচ সেখানে ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড কাজ করে না। রিপোর্ট করেও কোনও সুরাহা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা লেখালেখি করছেন বা বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যারা পোস্ট করেন, এমন অনেকের লেখাকে কেন্দ্র করে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভঙ্গের নামে আইডি রেস্ট্রিক্ট করা হচ্ছে। কারও পোস্ট রিচ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি বিভিন্ন মেয়াদে ব্যান দেওয়া হয়েছে।

ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড আসলে কী? এই স্ট্যান্ডার্ডের উদ্দেশ্য কী? এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে সব ব্যবহারকারীর মধ্যে একটি স্বচ্ছ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তারাই বলছে এই স্ট্যান্ডার্ড দেশ বা সীমা নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য। সহিংসতা তৈরি করতে পারে এমন সব ধরনের কনটেন্টকে তারা নিয়ন্ত্রণ করবে। বাস্তবে আমরা কী দেখছি? ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যার ছবি পোস্ট দিলে সেটাকে স্ট্যান্ডার্ডের অজুহাতে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে, মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদ নিয়ে কোনও লেখা দিলে সেখানে তারা স্ট্যান্ডার্ডের নীতি দেখাচ্ছেন, কিন্তু কাউকে সরাসরি মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া ভিডিও বা পোস্ট থেকে যাচ্ছে অনায়াসে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে একজন ব্লগার অমি রহমান পিয়াল। সম্প্রতি তিনি লিখিত একটি কলামে ফেসবুক নিয়ে যে অভিযোগ এনেছেন সেটি মারাত্মক। মাসের পর মাস তাকে ব্যান করে রাখা হচ্ছে কেবল মুক্তিযুদ্ধ বা সরকার পক্ষীয় পোস্টের জন্য। তিনি অভিযোগ করেছেন, অনেকবার অ্যাপ্লাই করার পরও তাই আইডি ভ্যারিফাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। লাখো ফলোয়ারের আইডি হয়েও তার সব লেখা ফলোয়ারদের কাছে পৌঁছায় না। এমনকি কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের অজুহাতে তার মেসেঞ্জারকেও ব্লক করে দেওয়া হয়েছে অথচ মেসেঞ্জার কিন্তু পাবলিক স্পেস না। মেসেঞ্জারে একজন ব্যবহারকারী অনেক ধরনের মেসেজ আদান-প্রদান করেন, যা মূলত ওয়ান টু ওয়ান হয়ে থাকে। এ বিষয়টি অত্যন্ত ভয়ংকর। ফেসবুক ঘোষণা দিয়ে থাকে তাদের ডাটা প্রাইভেসি আছে। একজনের মেসেঞ্জারে কী আদান-প্রদান হয় সেটি নিশ্চয়ই কেউ রিপোর্ট করেনি বা কারও অনুভূতিতে আঘাত করেনি। তার মানে ফেসবুক নিজেই এটি মনিটরিং করছে এবং নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এখানে ডাটা প্রাইভেসি কোথায়? মেসেঞ্জারের তথ্য যে কোথাও পাচার হচ্ছে না সেই বিশ্বাস কিন্তু এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

অভিযোগ উঠেছে ফেসবুকের নিয়োগকৃত এ অঞ্চলের বাংলাদেশি মডারেটরদের বিরুদ্ধে। মূলত ফ্যাক্ট চেকিংয়ের নামেই এসব করছে তারা। আমি নিজেও এর ভিকটিম। একটি অত্যন্ত সাধারণ পোস্টের অজুহাতে আমাকে ব্যান করা হয়েছিল, এমনকি বর্তমানে আমি কোনও লাইভ স্ট্রিমিং চালাতে পারি না। কেন এই দ্বিচারিতা? বহুবার আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এগুলো নিয়ে, কিন্তু তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাছে কি ফেসবুক এতটাই শক্তিশালী হয়ে গেলো? ফেসবুকের বিরুদ্ধে এমন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছিল ভারতেও। এমনকি আমেরিকার নির্বাচনের সময় তো তুলকালাম ঘটেছিল। কই, সেসব দেশ তো ফেসবুকের পরোয়া করেনি। ফেসবুক ঠিকই সেসব দেশের নিয়ম শ্রদ্ধা করতে বাধ্য হয়েছে। তাহলে আমাদের জন্য কেন সেটা প্রযোজ্য হবেনা? অন্তত ফেসবুকের এ দেশীয় যেসব ফ্যাক্ট চেকার আছে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড তো সরকার চেক করতেই পারে। তারা কারা? কী তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা তারা যে পক্ষপাতিত্ব করছে, এর প্রমাণ তো আমাদের কাছে প্রচুর আছে। সেসব নিয়ে কেন আমরা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারছি না? ভূরি ভূরি ভিডিও/পেইজ/গ্রুপ আছে যারা অহরহ কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভঙ্গের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে, অথচ সেগুলোর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করলেও অগ্রাহ্য হচ্ছে।

সামনে নির্বাচন। আমার আশঙ্কা মৌলবাদ বা উগ্রবাদীরা এর সুযোগ নিতে শুরু করেছে। অনলাইনে ফাইটারদের কোণঠাসা করে দেওয়া হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে দেশে যেকোনও সময় একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। সরকারের উচিত এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় আনা। অন্যথায়, সরকারের অন্যতম সফল ডিজিটাল বাংলাদেশের ফলাফল তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে। 
/এমওএফ/

সম্পর্কিত

অস্তিত্ব সংকটে আফগান নারীরা?

অস্তিত্ব সংকটে আফগান নারীরা?

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৩৮

আনিস আলমগীর

নাইন ইলেভেনের দিন শপথগ্রহণের ঘোষণা করেও তালেবান গঠিত আফগানিস্তানের নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পিছিয়ে এসেছে। কারণ হিসেবে তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, অভিষেক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শেষ করা যায়নি। এছাড়া চীন-রাশিয়াসহ আমন্ত্রিত দেশগুলোর পক্ষ থেকেও আসেনি যোগদানের ইতিবাচক সাড়া। ক্ষমতা দখলের এক মাস পরেও তারা সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করতে না পারাটা ব্যর্থতা। তারচেয়েও বড় ব্যর্থতা নতুন সরকারের চেহারায় নতুনত্ব না দিয়ে পুরনো চেহারা দেওয়া।

কয়েক সপ্তাহ ধরে তালেবান একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সরকার উপহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেটি শরিয়তের সীমাবদ্ধতার মধ্যে হলেও নারীর অধিকারকে সম্মান করবে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে এবং আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেবে না। ১৫ আগস্ট ২০২১ ক্ষমতা দখলের পর, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব ঘোষণা করে তালেবান। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সরকারে স্থান পেয়েছে সব পুরুষ এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১-এর নৃশংস তালেবান শাসনের প্রবীণরা প্রাধান্য পেয়েছে। এরা প্রায় সবাই দেশের প্রভাবশালী জাতিগত গোষ্ঠী পশতুন, একজন এফবিআইর মোস্টওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছেন, চার জন এক দশকেরও বেশি সময় গুয়ান্তানামো বে কারাগারে কাটিয়েছেন এবং অধিকাংশই জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।

এদের মধ্যে সীমান্ত ও উপজাতীয় বিষয়ক নতুন মন্ত্রী মোল্লা ফজল ও মোল্লা নরুল্লাহ নুরিকে মনে করা হয়, তালেবানরা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারা হাজার হাজার সংখ্যালঘু শিয়াকে হত্যা করেছিল। নতুন গোয়েন্দা প্রধান আব্দুল হক ওয়াসিকের বিরুদ্ধে আল কায়েদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী মোল্লা খায়রুল্লাহ খাইরখোয়াকে ফাঁস হওয়া মার্কিন সামরিক নথিতে আফগানিস্তানের আফিমের অন্যতম মাদক সর্দার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। খোস্টের নতুন গভর্নর মোহাম্মদ নবী ওমারি হাক্কানি নেটওয়ার্কের সন্দেহভাজন নেতা।

তারা কাবুলে স্বাধীনতার দাবিতে নারীদের বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করেছে এই অপরাধে দুই সাংবাদিককে বর্বর কায়দায় পিটিয়েছে। এসবের মাধ্যমে তালেবান গোষ্ঠী বার্তা দিলো যে আমরা বদলাইনি।

১৫ আগস্ট তালেবানের কাবুল দখলের পর মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর সঙ্গে ২০ বছরের যুদ্ধের বিজয়ী সমাপ্তি ঘটেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, মোল্লারা আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে কোনও ছাড় দিয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত সপ্তম শতাব্দীর ইসলামি আমিরাতি শাসনের দৃষ্টিভঙ্গিকে দুর্বল করতে চাচ্ছে না। মনে হয় তারা ভাবছে যে দু'দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাত থেকে তালেবান এগিয়ে যাবে বলে পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে আশান্বিত হয়েছে, সেটাই তাদের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা আনার জন্য যথেষ্ট।

মনে হচ্ছে তালেবানের পাশাপাশি পশ্চিমাদের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা। যদি আফগানিস্তানের জনগণ আরও একবার নিপীড়নের শিকার হয়, তাহলে বৈদেশিক সাহায্য ও স্বীকৃতির জন্য ক্ষুধার্ত তালেবানকে অবশ্যই পরাভূত হতে হবে। নয়তো মানবাধিকারের সর্বজনীন নিয়মগুলোর কোনও মানে হবে না। এমনকি দেশে কোনও সৈন্য বা দূতাবাস না থাকলেও কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে।

তালেবান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশটিতে অর্থপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের প্রায় এক হাজার কোটি ডলার আটকে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে জরুরি সহায়তা তহবিলের ৪৪ কোটি ডলারও আটকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আফগানিস্তান সম্পর্কিত জাতিসংঘের বিশেষ দূত ডেবোরাহ লিওনস গত ১৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আফগানিস্তানে অর্থপ্রবাহ চালুর একটি উপায় বের করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দেশটি মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তালেবানের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর মধ্যে কাতার অন্যতম। তালেবান ক্ষমতা দখলের পরে প্রথম বিদেশি অতিথি হিসেবে ১২ সেপ্টেম্বর কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল সফর করে নবগঠিত তালেবান সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ, সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ও দেশটির জাতীয় পুনর্মিলন পরিষদের প্রধান আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

দীর্ঘ সময়ব্যাপী কাতারের রাজধানী দোহায় আমেরিকা ও তালেবানের মধ্যে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন বিশেষ মার্কিন দূত জালমে খলিলজাদ আর তালেবানদের পক্ষে ছিলেন তালেবান উপনেতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার। বারবার ভেঙে যাওয়া আলোচনা জোড়া লাগিয়েছে কাতার। শেষ পর্যন্ত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ উভয় পক্ষ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। বর্তমান সমস্যা থেকে নতুন তালেবানদের উদ্ধারে কাতার কতটা সফল হয় এখনও দেখার আছে।

আফগানদের পূর্ব পুরুষের নাম ‘আফাগেনা’, যিনি বনি-ইসরাঈলের বাদশা তালুতের পৌত্র ছিলেন। আফগানরা ইহুদি বংশোদ্ভূত জাত। এ জন্য পশতু ভাষায় বহু হিব্রু শব্দের সংমিশ্রণ ঘটেছে। আফগানরা যে ইসরায়েলের পুত্রগণের শাখা-প্রশাখা, এ কথা তার এক লেখায় বলেছেন আল্লামা ইকবাল।

ইহুদি বংশধারার লোকেরা রক্ষণশীল। অত্যন্ত আধুনিক ধ্যান-ধারণার মানুষ হয়েও ইহুদিরা ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তালেবানরাও দেখা গেছে যে ধর্মীয় অনুশাসনে অনুরক্ত। কিন্তু তাদের আধুনিক ধ্যান-ধারণা সীমিত। তালেবানদের এই বোধোদয় হলে ভালো হতো যে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তারা সারা জীবন যুদ্ধ করেও পারবে না। কাতারের শান্তিচুক্তি তাদের জন্য সর্ব অবস্থায় মানা ‘ওয়াজিব’। কী কূটনৈতিক, কী ধর্মীয়- উভয় দিক থেকে পালনীয় কর্তব্যকে অবহেলা করলে তালেবান গোষ্ঠী আবারও পিছিয়ে যাবে। তারা সবকিছু যুদ্ধের আয়না দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এ কারণে তারা সব সময় দৌড়ের ওপর থাকছে।

তালেবানদের অস্থায়ী রাজধানী ছিল হেলমান্দ প্রদেশের মুসাকালা। সে এলাকা আফিম ব্যবসার জন্য বিখ্যাত। দুনিয়ার ৯০ শতাংশ আফিম উৎপাদন হয় আফগানিস্তানে। তালেবানদের প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে আফিম। আফিম ব্যবসার টাকা দিয়ে তালেবানরা চলে, অথচ এই ব্যবসার রোজগারের বৈধতা নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মাঝে বিতর্ক রয়েছে। বিতর্কজনক রোজগার থেকে বিরত থাকা খোদাভীতির লক্ষণ। ক্ষুধার্ত মানুষের মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া জায়েজ, এমন সিদ্ধান্তে যদি তালেবানরা আফিম ব্যবসার টাকা ব্যবহার করে থাকে, তবে অনুরূপ সিদ্ধান্তে আধুনিক জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জায়েজ। কারণ, মুসলিম সমাজ আধুনিক জীবন ব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে। অথচ তালেবানরা আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে খুবই শঙ্কিত। আধুনিকতাকে গ্রহণ করলে তারা আফিমের অবৈধ চাষ থেকে বৈধ চাষের দিকেও হাঁটতে পারে।

ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক শের শাহ সুরি ছিলেন আফগানেরই সন্তান। যে জাতির আত্মগ্লানির পরিবর্তে আত্মবিস্মৃতির প্রাদুর্ভাব হয়, সে জাতি আর টিকে থাকে না। এখন আফগানদের টিকে থাকার জন্য নিজেদের মাঝে বিরোধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে নতুন তালেবান সরকারের ভূমিকা রয়েছে সবচেয়ে বেশি। নয়তো যুদ্ধে যুদ্ধে দিন যাবে তাদের।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত
 [email protected]

/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

তালেবান শাসনে কি আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা আসবে?

তালেবান শাসনে কি আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা আসবে?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

শেষ হলো সংসদ অধিবেশন

শেষ হলো সংসদ অধিবেশন

গৃহহীনদের ঘরের ‘দুর্নীতি তদন্ত’ দুদক বন্ধ করবে কেন, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর

গৃহহীনদের ঘরের ‘দুর্নীতি তদন্ত’ দুদক বন্ধ করবে কেন, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর

খালেদা জিয়ার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

খালেদা জিয়ার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সাংবাদিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলবের বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি: তথ্যমন্ত্রী

সাংবাদিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলবের বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি: তথ্যমন্ত্রী

মিথিলার বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ, মুখ খুলছে ‘অমানুষ’ টিম

মিথিলার বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ, মুখ খুলছে ‘অমানুষ’ টিম

তালেবানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে মুখ খুললেন মোল্লা বারাদার

গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন মোল্লা বারাদার

চন্দ্রিমায় জিয়াউর রহমানের কবর নিয়ে সংসদে বিতর্ক

চন্দ্রিমায় জিয়াউর রহমানের কবর নিয়ে সংসদে বিতর্ক

রাতারাতি বড়লোক হতে ইয়াবা ব্যবসায় হাসপাতালের পিয়ন

রাতারাতি বড়লোক হতে ইয়াবা ব্যবসায় হাসপাতালের পিয়ন

ইয়োগায় যা করা যাবে না

ইয়োগায় যা করা যাবে না

নাটকীয় ফাইনালে ব্রাভো-গেইলদের শিরোপার হাসি

নাটকীয় ফাইনালে ব্রাভো-গেইলদের শিরোপার হাসি

সমুদ্র আইন সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে

সমুদ্র আইন সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে

বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাচ্ছে শুভর ‘মিশন এক্সট্রিম’

বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাচ্ছে শুভর ‘মিশন এক্সট্রিম’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune