X
মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

পর্ব—সাত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১১

পূর্বপ্রকাশের পর

 রিডার রেসপন্স থিয়রি : অবভাসবাদ বা ফেনোমেনোলজি

যেমনটা আগেই বলেছি, বিংশ শতকীয় সাহিত্যতাত্ত্বিক ধারণাসমূহ একে অপরের সাথে সময়ানুক্রম রক্ষা করে না। উদাহরণস্বরূপ, রিডার রেসপন্স থিয়রিকে আমরা কোন সময়ের থিয়রি ধরব তা সঠিক করে বলতে পারি না। একদিকে এটি যেমন বিংশ শতকের শেষ দুদশকের আগে উচ্চারিত হতে শুনি না, অপরদিকে তেমনি এটি উচ্চারিত হবার পরে দেখি এর তাত্ত্বিক জন্ম হয়েছিল বিংশ শতকের প্রথম দিকে, শতাব্দীর তৃতীয় দশকে অবভাসবাদ নামক দার্শনিক তত্ত্বের সাথে।

সাহিত্যতাত্ত্বিক ধারণাগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায় : লেখককেন্দ্রিক তত্ত্ব ((author-centred theory), লেখাকেন্দ্রিক তত্ত্ব (text-centred theory), পাঠককেন্দ্রিক তত্ত্ব (reader-centred theory) ও লেখার প্রসঙ্গকেন্দ্রিক তত্ত্ব (context-centred theory)। লেখককেন্দ্রিক তত্ত্বের (author-centred theory) উদাহরণ হিসেবে পুরনো যুগ থেকে বলা যায় রোমান্টিসিজম, আর বিংশ শতক থেকে বলা যায় সাইকো-অ্যানালাইটিকাল থিয়রি। লেখা বা টেক্সট-কেন্দ্রিক তত্ত্বের উদাহরণ যেমন : নিউ ক্রিটিসিজম, রাশিয়ান ফরমালিজম, বাখতিনিয়ান ডায়লজিজম, স্ট্রাকচারালিজম, পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম ইত্যাদি। অবভাসবাদ পাঠককেন্দ্রিক সাহিত্যতত্ত্বের একটি উদাহরণ। মার্কসিস্ট থিয়রি, ফেমিনিস্টিক থিয়রি, পোস্ট-কলোনিয়াল থিয়রি ইত্যাদি সবই লেখার প্রসঙ্গকেন্দ্রিক সাহিত্যতত্ত্বের উদাহরণ।

রিডার রেসপন্স থিয়রির জন্ম অবভাসবাদ থেকে; আর অবভাসবাদ বা ফেনোমেনোলজি নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই যাঁর কথা বলতে হয় তিনি হলেন এডমান্ড হুসার্ল (১৮৫৯-১৯৩৮)। হুসার্ল পেশাগতভাবে গণিতশাস্ত্রবিদ হলেও তিনিই মূলত দর্শনের ফেনোমেনোলজি নামক ধারণার জনক বা প্রবর্তক। দর্শনের এই ধারা প্রবর্তিত হয়েছে তাঁর Pure Phenomenology : Its Method and Its Field of Investigation নামক বিখ্যাত প্রবন্ধের মাধ্যমে। এই প্রবন্ধের মাঝামাঝি হুসার্ল লিখেছেন No object of the category ‘work of art’ could occur in the objectivational world of any being who was devoid of all aesthetic sensibility, who was, so to speak, aesthetically blind. এই বাক্যের ব্যাখ্যায় আমরা বুঝতে পারব ফেনোমেনোলজি কীভাবে পাঠককেন্দ্রিক সাহিত্যতত্ত্বের বিষয়। সাধারণভাবে, অবজেক্ট হলো সেইসব বস্তু যারা চেতনারাজ্যের বাইরে অবস্থিত থাকে। কিন্তু ফেনোমেনোলজি বলে যে, বস্তু তখনই বস্তু হয় যখন তারা আমার চেতনারাজ্যে প্রবেশ করে। যখন আমি বস্তু হিসেবে একটি পেন্সিলের নাম করি তখন মুখ থেকে এমন কোনো বস্তু বের হয় না বা যে শোনে তার কাছে এমন কোনো বস্তু পৌঁছায় না যা হাতে ধরে নিয়েই লেখা শুরু করা যায়। বরং যা মুখ থেকে নিসৃত হয় বা যা শ্রোতার কানে পৌঁছায় তা হলো চেতনায় ধৃত একটি বস্তু যার অস্তিত্ব চেতনার ভিতরেই নির্ভর করে। চেতনায় ধারণের মাধ্যমে এভাবে অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠা বস্তু হলো দর্শনের সংজ্ঞায় ফেনোমেনন। দর্শন অবশ্য বলে যে, মানুষের চেতনা বা অনুভবের ওপর নির্ভরশীলতা ছাড়াও স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠার মতো বস্তু প্রতিটি বস্তুতেই আছে, দর্শনের ভাষায় যার নাম হলো নুমেনন। তবে যেহেতু নুমেনন জাতীয় বস্তু তার অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠার জন্য মানুষের চেতনা বা অনুভবের ওপরে নির্ভর করে না তাই নুমেনন জাতীয় বস্তু আদতে কী বস্তু তা মানুষের পক্ষে জানাও সম্ভব নয়। মানুষের পক্ষে বস্তুজগতের যেটুকু জানা সম্ভব সেটুকু হলো ফেনোমেনন। পেন্সিল নামের বস্তুটির যেটুকু মানুষের অনুভবে ও চেতনার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে মানুষের পক্ষে পেন্সিলের সেটুকুই জানা সম্ভব, আর সেটুকুই হলো পেন্সিলের ফেনোমেনন। পেন্সিলের মধ্যে বস্তুসত্যের আরো যদি কিছু থেকে থাকে তার নাম নুমেনন যা মানুষ কখনো জানতে পারে না। ফেনোমেনোলজি বস্তুর এই নুমেনন রূপকে অস্বীকার করে কারণ এটি মানুষের জ্ঞানের বাইরে। ফেনোমেনোলজি তাই বস্তুর ফেনোমেননকেই স্বীকার করে, নুমেননের বিষয়ে বলে—‘সে নিয়ে আমরা না ভাবি’। নুমেনন সম্পর্কে ভাবনা বন্ধের এই আদেশকে বলা হয় ‘ফেনোমেনোলজিকাল ইপোকে’ (phenomenological epoche)।

এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। উপরের উদ্ধৃত বাক্যে অবজেক্টিভেশনাল ওয়ার্ল্ড বলতে যে বস্তুজগৎকে বোঝানো হয়েছে তা ফেনোমেনোলজিকাল বস্তুজগৎ। এই জগতে বস্তু যেভাবেই অনুভবে বা চেতনায় উপস্থিত হবে সেভাবেই তাকে বস্তু হিসেবে মেনে নেওয়া হবে। এমনকি ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে হ্যালুসিনেশন বা চেতনার ভ্রমে যে তলোয়ার ম্যাকবেথ দেখেছেন তাও ফেনোমেনোলজিকাল বস্তুজগতের অংশ। এটা বস্তুর অস্তিত্ব যা বস্তুর প্রতি ধাবিত অনুভবকারীর আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছাশক্তির (intentionality) ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। ফেনোমেনোলজিতে এই ইচ্ছাশক্তির এতই শক্তি যে তা যে বস্তুর প্রতি ধাবিত হয় সে বস্তু অন্যদশ জনের অনুভবে অস্তিত্বশীল না হলেও নির্দিষ্ট অনুভবকারীর নিকট তা অবজেক্টিভেশনাল ওয়ার্ল্ডের তথা ফেনোমেনোলজিকাল বন্তু জগতের অংশ, অর্থাৎ সে অস্তিত্বশীল বস্তু, যেমন ম্যাকবেথের দেখা তলোয়ার বা লেডি ম্যাকবেথের হাতের রক্ত। ফেনোমেনোলজির এই ধারণাটুকুই রিডার রেসপপ্স থিয়রির দার্শনিক ভিত্তি।

এই ভিত্তির বলেই ফেনোমেনোলজিস্টরা বলে যে, বস্তুর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নির্ণীত হয় অনুভবের ইন্দ্রিয় দ্বারা। অন্য কথায় বস্তুর ছুরত ও ছিফত অনুভবকারীর ইন্দ্রিয়ের ও চেতনার দান। এই কথা যদি দার্শনিকভাবে মেনে নেওয়া হয় তাহলে ফরমালিজম আর নিউক্রিটিসিজমের প্রবর্তকরা সাহিত্যকর্মের অর্থ ও বিষয়বস্তু উক্ত সাহিত্যকর্মের ভিতরে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল ধরে যতসব তত্ত্বকথা বলেছেন তার আর দার্শনিক ভিত্তি থাকে না। কারণ ফেনোমেনোলজিস্টরা বলেন যে, সাহিত্যকর্মটি নিজেই স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল কিছু নয়। তাকে অস্তিত্বশীল হতে হয় অনুভবকারীর তথা পাঠকের চেতনা ও অনুভবের মধ্যদিয়ে। ফলে কোনো সাহিত্যকর্মের অর্থ ও বিষয়বস্তু সবই নির্ভর করবে পাঠকের অনুভবে ও চেতনায় তা কীভাবে অর্থবহ ও অস্তিত্বশীল হয়ে উঠবে তার ওপরে। উপরে উদ্ধৃত হুসার্লের বাক্যটির প্রসঙ্গ টেনে আবারো বলা যায়, যে-মানুষটির চেতনা ও ইন্দ্রিয়ে নন্দনবিষয়ক কোনো অনুভবশক্তি নেই তার কাছে বস্তু জগতে সুন্দর বা শৈল্পিক বলে কোনো বস্তু থাকতে পারে না। এই তত্ত্বের ওপর দাঁড়ানো রিডার রেসপন্স থিয়রির মোদ্দাকথা হলো কোনো শিল্প বা সাহিত্যকর্মের সৌন্দর্য ও অর্থ ঐ কর্মটির মাঝে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল থাকে না, এর সকল সৌন্দর্য ও অর্থ অস্তিত্বশীল হয় পাঠকের পাঠের মধ্যদিয়ে তার চেতনা ও অনুভব রাজ্যের মাধ্যমে। একটু ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, এই তত্ত্বমতে যে কোনো সাহিত্যকর্মের অর্থ ও সৌন্দর্য সাহিত্যকর্মটির পাঠকের চেতনা ও ইন্দ্রিয়ানুভবের দান।

হুসার্লের ফেনোমেনোলজির এই বক্তব্য সাহিত্য সমালোচনা তত্ত্বে প্রথম কাজে লাগান হুসার্লের ছাত্র রোমান ইনগার্ডেন (Roman Ingarden)। ফেনোমেনোলজিভিত্তিক তাঁর সাহিত্যতত্ত্বকে তিনটি পয়েন্টে উপস্থাপন করা যায়। এই তিনের প্রথমটিই হুসার্লের আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছাশক্তি (intentionality) বিষয়ক বক্তব্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। হুসার্ল বলেছেন বাস্তবতা ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষার সাথে সম্পর্কিত, যে বিষয়ে আমরা উপরে আলোচনা করেছি। এই সূত্র ধরে ইনগার্ডেন বলছেন সাহিত্যের কোনো টেক্সট প্রথমত হলো লেখকের কোনো বস্তুর প্রতি আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ও সেই আকাঙ্ক্ষার রেকর্ড। দ্বিতীয় পয়েন্টে ইনগার্ডেন বলছেন যে, কোনো টেক্সটের পাঠ হলো প্রথমত লেখকের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বা আকাঙ্ক্ষার প্রকাশকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস। এই পুনরুজ্জীবনকর্মে হুসার্ল বর্ণিত ‘ইনটেনশলাটি’ তত্ত্বের অংশ হিসেবে এবার পাঠকের আকাঙ্ক্ষা ও ধাবিত হবে নির্দিষ্ট বস্তু বা অর্থের দিকে। কিন্তু সমস্যা হলো লেখকের আকাঙ্ক্ষার বস্তুর দিকেই যে পাঠকের আকাঙ্ক্ষা ধাবিত হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে লেখকের আকাঙ্ক্ষার বস্তুই যে পাঠকের পাঠের মধ্যদিয়ে পুনরুজ্জীবিত হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট লেখায় যেভাবে কোডিং হয় পাঠকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট দ্বারা লেখকের সেই ইনটেনশনাল অ্যাক্টই যে ডিকোডেড হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। ফলে লেখক পাঠকের যোগাযোগের মধ্যে ব্যাপক শূন্যতা তৈরি হয়। অবশ্য ইনগার্ডেন এর নাম দিয়েছেন টেক্সচুয়াল ইনডিটারমিনেসি বা অনিশ্চয়তা। ইনগার্ডেনের তৃতীয় পয়েন্ট হলো এই অনিশ্চয়তা দূরীকরণকে কেন্দ্র করে। টেক্সচুয়াল ইনডিটারমিনেসি দূরীকরণার্থে ইনগার্ডেনের মতে প্রয়োজন হয় পাঠকের নিজস্ব ব্যাখ্যার, যে ব্যাখ্যার নির্মাতা পাঠকের নিজের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট। ইনগার্ডেন এর নাম দিয়েছেন অ্যাক্টিভ রিডিং বা সক্রিয় পাঠ। ইনগার্ডেনের মতে এই অ্যাকটিভ রিডিঙের মধ্যদিয়েই একটি সাহিত্যকর্ম পাঠকের কাছে মূর্ত বা ‘কংক্রিটাইজড’ হয়ে ওঠে। ফলে ইনগার্ডেনের মতে সাহিত্যকর্ম পাঠকের চেতনার ও অনুভবের বাহিরের রাজ্যে অবস্থিত কোনো স্বাধীন সত্তা নয়। এটি বাস্তব হয়ে ওঠে পাঠকের অ্যাক্টিভ রিডিঙের মাধ্যমে। অ্যাক্টিভ রিডিঙের মাধ্যমে লেখকের চেতনার সাথে পাঠকের চেতনার যোগাযোগ হয় এবং সে যোগাযোগে যে শূন্যস্থানগুলো থাকে তা পাঠকের ইনটেনশনাল অ্যাক্টের মাধ্যমে পূর্ণ হয়।

ইনগার্ডেনের এই ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে রিডার রেসপন্স থিয়রির আরেক প্রবক্তা উলফগ্যাঙ ইজার (Wolfgang Iser) এর বক্তব্য। ইনগার্ডেন যার নাম দিয়েছিলেন টেক্সচুয়াল ইনডিটারমিনেসি, ইজার তার নাম দিয়েছেন টেক্সচুয়াল গ্যাপ বা শূন্যতা। এই শূন্যতার কারণে টেক্সটের একটি অর্থপূর্ণ সুসমন্বিত পাঠ বাধাগ্রস্ত হয়, বুঝে ওঠার ধারাটি বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাধাগ্রস্ততার তিনটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, টেক্সটের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা। যেমন, একজন কবি তাঁর কবিতা কতগুলো পর্বে ও স্তবকে ভেঙে থাকেন। একজন ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাসকে অনেক পরিচ্ছেদে ভেঙে থাকেন। এই জাতীয় ভাঙনগুলো অর্থের চলমানতারও এক ধরনের ভাঙন। এই ভাঙা জায়গাটি জোড়া লাগাতে পাঠককে যে চেষ্টা করতে হয় ইনগার্ডেন তার নাম দিয়েছেন অ্যাকিটভ রিডিং আর ইজার এর নাম দিয়েছেন ভাবায়ন বা আইডিয়েশন (Ideation), যা নির্ভর করে পাঠকের কল্পনা ও বিশ্লেষণী শক্তির ওপর। দ্বিতীয় কারণটি হলো ন্যারেটিভ পারসপেক্টিভের বিচ্ছিন্নতা। আমরা জানি দস্তয়েভস্কির উপন্যাসগুলোতে বহুস্বরের পারসপেক্টিভ রয়েছে। লেখকের স্বরই সেখানে একমাত্র স্বর নয়। ফলে স্বর ও চেতনাগতভাবে এই উপন্যাসে বহু এককের বিচ্ছিন্ন রূপ রয়েছে। উপন্যাসটিকে একক সমগ্রতায় বোঝার জন্য এই বহুস্বরকে এবং বহু চেতনাকে জোড়া দেওয়া বা এক সুতায় গাঁথার জন্য পাঠককে চেষ্টা করতে হয়। পাঠককে তার চেতনা রাজ্যে এক ধরনের কোলাজ সৃষ্টি করতে হয়। সে কোলাজ প্রত্যেক পাঠকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই এক ও অভিন্ন নয়, বরং বহুরকম। ইজারের মতে পারসপেক্টিভের বিভিন্নতা ও বিচ্ছিন্নতাকে কোলাজের একক সমগ্রতায় আনয়নও সম্ভব হয় পাঠকের আইডিয়েশন ক্রিয়ার মাধ্যমে। টেক্সচুয়াল গ্যাপের তৃতীয় কারণটি ‘পাঠক কে’ তার ওপর নির্ভরশীল। লেখার ঈপ্সিত পাঠক আর লেখার সত্যিকারের পাঠক ভিন্ন হওয়ার কারণেও লেখার সাথে পাঠকের গ্যাপ তৈরি হয়। একটি ধর্মগ্রন্থের ঈপ্সিত পাঠক ঐ ধর্মের একজন ভক্ত মানুষ। কিন্তু যখন পাঠকটি হন ঐ ধর্মের সাথে অপরিচিত বা অবিশ্বাসী একজন, তখন স্বাভাবিকভাবেই লেখার সাথে পাঠকের অপরিহার্য গ্যাপ সৃষ্টি হয়। এই গ্যাপও পাঠককে পূরণ করে নিতে হয় তার আইডিয়েশন দ্বারা।

রিডার রেসপন্স থিয়রির মূল বিষয়টি হলো ইনগার্ডেন কথিত অ্যাকটিভ রিডিং বা ইজার কথিত আইডিয়েশন দ্বারা লেখার ইনডিটারমিনেসি বা অর্থের অনির্দিষ্টতাগুলো দূর করা বা পাঠকালে অনুভূত গ্যাপগুলো পূরণ করা। এমনকি যদি কোনো টেক্সটে লেখকের ইচ্ছাকৃত অর্থ-অনির্দিষ্টতা রেখেও দেওয়া হয় পাঠক সেই অনির্দিষ্টতার মধ্যে পাঠ সম্পূর্ণ করতে পারে না। তাকে আইডিয়েশনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্টতায় পৌঁছতে হয়। ইনগার্ডেন ও ইজারের এই বক্তব্য থেকে একটা সমস্যার সূত্রপাত হয়। সেটি হলো এই যে, টেক্সটের গ্যাপগুলো বা অর্থ-অনির্দিষ্টতাগুলো এক এক পাঠক যখন এক এক ভাবে পূরণ করবেন তখন ঐ টেক্সটটির সাধারণভাবে গ্রহণীয় কোনো অর্থই তো থাকবে না। ফলে মানুষ টেক্সটটি নিয়ে পারস্পরিক আলোচনার জন্য যেকোনো একটা রেফারেন্স দেবে সেই রেফারেন্সই তো সম্ভব হবে না। এর উত্তরে ইজার বলতে চেয়েছেন যে, পাঠক সম্পূর্ণটা তো তার ইনটেনশনাল অ্যাক্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। পাঠক তো লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হবে। ফলে পাঠকে পাঠকে আইডিয়েশনের ভিন্নতা থাকলেও লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট তাদেরকে মোটামুটি একটা সূত্রে গেঁথে রাখবে। ফলে পাঠক ইচ্ছে করলেই আইডিয়েশনের দ্বারা ভুলপাঠের (misreading) নৈরাজ্যে পৌঁছবে না।

মিসরিডিং-এর প্রসঙ্গটা যেহেতু উঠল সেহেতু হ্যারল্ড ব্লুমের এ সংক্রান্ত ভাবনাটির সাথে একটু পরিচিত হওয়া যেতে পারে। হ্যারল্ড ব্লুমের মিসরিডিং কোনো নেতিবাচক ধারণা নয়, বরং একটি ইতিবাচক ধারণা। হ্যারল্ড ব্লুম বলেছেন যে, সব লেখক অতীতের লেখকদের প্রভাব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে চান। কিন্তু অতীতকে অস্বীকার করে তো আর নতুনের নির্মাণ সম্ভব নয়। তাই লেখকরা যা করেন তা হলো অতীতের লেখাকে যতটা পারা যায় ভাঙতে চেষ্টা করেন, বিকৃত করে (distorting) তার ওপর নতুনের নির্মাণ দাঁড় করাতে চান। ব্লুম এই বিকৃতির নাম দিয়েছেন মিসরিডিং (misreading)। দেখা যাচ্ছে শব্দটা মিসরিডিং হলেও কাজটি রিডারের নয় বরং রাইটারের অর্থাৎ লেখকের। ব্লুমের মতে মিসরিডিং দুরকমের : দুর্বল ও সবল মিসরিডিং। দুর্বল মিসরিডিং মানে লেখকের মৌলিকত্ব কম, আর সবল মিসরিডিং মানে হলো লেখকের মৌলিকত্ব বেশি। ফলে ব্লুমের মতে মিসরিডিং লেখকদের একটা বড় গুণ যে-গুণের বলে লেখকরা অতীতের লেখকদের প্রভাববলয় থেকে নিজেদেরকে যোগ্যতার সাথে রক্ষা করে থাকেন। আগেই বলেছি, ব্লুমের এই মিসরিডিং লেখকের সাথে সংশ্লিষ্ট, পাঠকের সাথে নয়। ফলে এই মিসরিডিং রিডার রেসপন্স থিয়রির পাঠকদের আইডিয়েশন ও লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্টের মধ্যকার সংযোগহীনতায় তৈরি মিসরিডিং নয়।

রিডার রেসপন্স থিয়রির আলোচনায় আরেকজনের কথা বলতেই হয়। তিনি হলেন স্ট্যানলি ফিশ (Stanley Fish)। স্ট্যানলি ফিশের দুটি ধারণা রিডার রেসপন্স থিয়রির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ : অ্যাফেকিটভ স্টাইলিসটিকস (affective stylistics) ও ইন্টারপ্রিটিভ কমিউনিটিজ (interpretive communities)। অ্যাফেক্টিভ স্টাইলিসটিকস মানে হলো কোনো টেক্সটের পাঠ পাঠককে কীভাবে প্রভাবিত করে (affect) এবং সেই প্রভাব কীভাবে পাঠের প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলে সে সম্পর্কিত ধারণা। রিডার রেসপন্স থিয়রির মূলসূত্রেই বলা হয়েছে যে, টেক্সট কোনো স্বাধীন সত্তা নয়। পাঠকের চেতনার মধ্যদিয়ে সে বাস্তব হয়ে ওঠে। পাঠক তার পাঠের মাঝে আরোপ করে তার নিজের কল্পনা, অনুভূতি ও প্রত্যাশা। পাঠ যত আগায় এই কল্পনা, অনুভূতি ও প্রত্যাশা পরিবর্তিত হতে থাকে এবং ফলস্বরূপ টেক্সটটি সম্পর্কে পাঠকের ভাবনায় বা ধারণায়ও পরিবর্তন আসতে থাকে। তার মানে টেক্সটটির প্রতি পাঠকের রেসপন্স অনুযায়ী টেক্সটটি নির্মিত হতে থাকে। পাঠকের রেসপন্স অনুযায়ী টেক্সটের এই নির্মাণই ফিশের মতে অ্যাফেকটিভ স্টাইলিসটিকস। অ্যাফেক্টিভ স্টাইলিসিটকস সেই সমস্যাটি আবার সামনে আনে যে, টেক্সট যদি পাঠকের রেসপন্স অনুযায়ী এভাবে নির্মিত হতে থাকে তাহলে একই টেক্সট তো এক এক জন পাঠকের কাছে এক এক ভাবে নির্মিত হবে আর তার ফলে টেক্সটের কোনো একক ও সর্বজনগ্রহণীয় রূপই থাকবে না। স্ট্যানলি ফিশ এই সমস্যার উত্তর দিয়েছেন তাঁর ইন্টারপ্রিটিভ কমিউনিটি বা বিশ্লেষকগোষ্ঠীসংক্রান্ত ধারণার দ্বারা। ইজার এই সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট দ্বারা। ফিশের ক্ষেত্রেও লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্টই এর সমাধানের ভিত্তি। তবে তার সাথে তিনি আরো কিছু প্রসঙ্গ যুক্ত করেছেন। তিনি বলছেন লেখক ও পাঠক উভয়ই একই ইন্টারপ্রিটিভ কমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত। তারা উভয়ই ধারণ করে একই সাহিত্যিক ধারার ঐতিহ্য ও একই একই সাংস্কৃতিক ভাবনারীতি। ফলে একই টেক্সটের ভিত্তিভূমে দাঁড়িয়ে তাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই। তারা একই বিশ্লেষণী গোষ্ঠীভুক্ত বলে তাদের বিশ্লষণে ও অর্থে একটি যৌথ সংহতির জায়গা থাকবেই। এভাবেই রিডার রেসপন্স থিয়রি অর্থ উদ্ধারে বা টেক্সচুয়াল শূন্যতা পূরণে পাঠকের স্বেচ্ছাচারিতার আশঙ্কাকে নাকচ করেছে। তবে এ উত্তর বা সমাধান অনেকের কাছেই খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাই রিডার রেসপন্স থিয়রি সাহিত্যতত্ত্বে খুব বড় জায়গা করেও নিতে পারেনি। বিংশ শতকের সাহিত্যতত্ত্বে যে ধারণাটি পূর্বের সকল তত্ত্বকে একটি জোর ঝাঁকুনি দিয়েছিল সেটি হলো স্ট্রাকচারালিজম বা কাঠামোবাদ। আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয় স্ট্রাকচারালিজম।

  

স্ট্রাকচারালিজম বা কাঠামোবাদ

সাহিত্যতত্ত্বে কাঠামোবাদের কোনো সোজাসাপ্টা সংজ্ঞা নেই। তবে এইটুকু বলা যায় যে, কাঠামোবাদের মূল কথা হলো কাঠামোর বাইরে কোনো বস্তুর কোনো অর্থ নেই। এর পরের কথা হলো কাঠামো কী। কাঠামো হলো সেই সব নির্মাণ যেখানে নির্মাণের উপাদানগুলো তাদের নিজ স্বাধীন অস্তিত্ব আর ধারণ করে না বরং কাঠামোর মধ্যে লীন হয়ে যায়। যেমন, বলা যেতে পারে একটি দালানের কথা। দালানে ইট আছে, বালু আছে, রড আছে, সিমেন্ট আছে। কিন্তু এইসব উপাদানের আর কারোই কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। সকলের স্বাধীন অস্তিত্ব দালানের মাঝে লীন হয়ে গেছে। তাই দালান একটি কাঠামো। ইটের স্তূপ বা বালুর রাশি কোনো কাঠামো নয়, কারণ ইটের স্তূপে বা বালুর রাশিতে ইট ও বালু সম্পূর্ণ স্বাধীন অস্তিত্বে বর্তমান। একটি দরজা বা জানালাও এমনিভাবে দালান থেকে আলাদা স্বাধীন অস্তিত্বে কল্পনা করলে সে আর দরজা জানালা থাকবে না এবং কাঠামোর অংশ না হওয়ার কারণে কাঠামোর মধ্যে তার যে অর্থ তা আর কার্যকর থাকবে না। এভবেই কাঠামো তার অঙ্গ বা অংশকে তার অর্থের মাঝে লীন করে তোলে। এই বয়ান থেকে কাঠামোবাদ বিষয়ে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয় : ক) একটি কাঠামো অনেক উপাদান বা অঙ্গ দ্বারা তৈরি হয় এবং উপাদানগুলো কাঠামোর অধীন হয়; এবং খ) গঠনকারী উপাদানসমূহ ঐ কাঠামোর অধীন হিসেবেই শুধু নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে এবং কাঠামোটির বাহিরে নিয়ে গেলে ঐ উপাদানের ঐ নির্দিষ্ট অর্থ আর থাকে না।

ফার্দিনান্দ দে সস্যুর ও কাঠামোবাদ : এই কথাগুলো মাথায় রেখে আমরা ফার্দিনান্দ দে সস্যুরের ভাষা সম্পর্কিত ধারণাগুলো আলোচনা করব সাহিত্যতত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত কাঠামোবাদের ভিত্তিটা বোঝার জন্য। সস্যুর সুইজারল্যান্ডের একজন ভাষাবিজ্ঞানী। তাঁর ‘কোর্স ইন জেনারেল লিঙ্গুইস্টিকস’ নামক গ্রন্থের জন্য তিনি দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত। তবে গ্রন্থটি তিনি নিজে লিখে যাননি। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর শিষ্যরা তাঁর বক্তৃতাগুলো জড়ো করে এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। ভাষাবিজ্ঞানে তিনিই প্রথম দুনিয়াকে বলেছেন যে, ভাষা হলো একটি কাঠামো। তাঁর আগে ভাষাবিজ্ঞানীদের ভাবনা ছিল যে, স্বাধীনভাবে অর্থবহ অজস্র শব্দ একত্র হয়ে ভাষার সৃষ্টি হয়। এই শব্দসম্ভার কীভাবে ইতিহাসের পথ বেয়ে ধরে ধীরে ধীরে একত্র হলো এবং ভাষারূপে বিবর্তিত হলো তার পাঠই ছিল ভাষাবিজ্ঞানের কাজ। ভাষাবিজ্ঞানের এই ধারণাকে ডায়াক্রনিক অ্যাপ্রোচ (Diachronic Approach) বলা হয়। সস্যুর এই ডায়াক্রনিক অ্যাপ্রোচের ইতি ঘটিয়ে সিনক্রনিক অ্যাপ্রোচের (Synchronic Approach) জন্ম দিলেন।

ভাষাবিজ্ঞানের এই সিনক্রনিক অ্যাপ্রোচে সস্যুর বললেন যে, শব্দ কোনো অকৃত্রিম অর্থ নিয়ে ভাষায় প্রযুক্ত হয় না, বরং ভাষার কাঠোমোতে স্থান পাওয়ার পরে অন্য শব্দের সাথে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে তার অর্থ সৃষ্টি হয়। এই কথা বোঝানোর জন্য সস্যুর শব্দ নামক ধারণাটিকে নতুন পরিচয়ে অন্য নামে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন শব্দমাত্রই একধরনের সাইন (sign) বা চিহ্ন। কোনো চিহ্ন যখন কোনো বস্তুকে বোঝায় তখন চিহ্নটির সাথে বস্তুটির কোনো অন্তর্গত বা কার্যকারণগত সম্পর্ক থাকে না। তেমনই শব্দ যে বস্তুকে বোঝায় তার সাথে শব্দের কোনো অন্তর্গত বা কার্যকারণগত সম্পর্ক নেই বিধায় সকল শব্দকেই তিনি নাম দিয়েছেন সাইন। প্রতিটি সাইনের দুটি দিক রয়েছে—একটি ধ্বনিগত, আরেকটি বস্তুগত। শব্দ তথা সাইনটি যে ধ্বনিরূপে উচ্চারিত সেই ধ্বনিটিকে তিনি বলেছেন ‘সিগনিফায়ার’ (signifier), আর সেই ধ্বনি যে বস্তুকে নির্দেশ করে তাকে তিনি বলেছেন ‘সিগনিফাইড’ (signified)। ‘কলম’ শব্দটির ধ্বনিরূপ হলো সিগনিফায়ার, আর এই ধ্বনি উচ্চারিত হলে লেখার যে হাতিয়ারটি বোঝায় সেটি হলো সিগনিফাইড। সস্যুর বলেছেন সিগনিফায়ার সিগনিফাইডকে নিজে নিজে বোঝাতে পারে না। সিগনিফায়ারগুলো ভাষার কাঠামোতে প্রবেশের পরে সিগনিফায়ারগুলোর মাঝে যে পারস্পরিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয় সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে সিগনিফায়ারগুলো তাদের সিগনিফাইডকে বোঝানোর যোগ্যতা অর্জন করে। ‘বিশ’ এবং ‘বিষ’ সিগনিফায়ার রূপে একই ধ্বনি, কিন্তু তাদের সিগনিফাইড যে ভিন্ন তা নির্ণীত হয় ভাষার ও বাক্যের অন্যান্য সিগনিফায়ারের সাথে তাদের সম্পর্কের ভিত্তিতে। মনে রাখতে হবে যে, এই সম্পর্ক হলো ভিন্নতার এবং বৈপরীত্যের সম্পর্ক। উদাহরণস্বরূপ সিগনিফায়ার ‘লাল’ তার নিজ ধ্বনিরূপ থেকে কোনো রঙকে বোঝাতে পারে না। সে শুধু কমলা, হলুদ, সাদা, বেগুনি, সবুজ ইত্যাদির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সেই রঙের অবস্থাকে বোঝাতে পারে যা ঐগুলো দ্বারা বোঝায় না। সুতরাং ‘লাল’-এর অর্থ অন্যদের বৈপরীত্যে দাঁড়ানোর যোগ্যতা থেকে উদ্ভূত, ‘লাল’-এর নিজস্ব ধ্বনিরূপ থেকে উদ্ভূত নয়। একইভাবে প্রমাণিত যে, ‘লাল’ ধ্বনিরূপে কোনো অর্থ বহন করে না বরং ভাষার কাঠামোতে অবস্থান পাওয়ার ফলে অর্থ বহনের যোগ্যতা অর্জন করে। সিগনিফায়ারদের বৈপরীত্যের সম্পর্ক থেকে অর্থ উদ্ভবের বিষয়ে আরো স্পষ্ট উদাহরণ বৈপরীত্যের দ্বিপদগুলো (oppositional binaries), যেমন দিন-রাত, ছাত্র-শিক্ষক ইত্যাদি। এসব দ্বিপদের একটির অর্থ অন্যটির মাঝে তার অনুপস্থিতি দ্বারাই শুধু বোধগম্য হয়। ফলে পারস্পরিক বৈপরীত্যই এদের অর্থের নির্মাতা। সস্যুরের মতে ভাষা তার কাঠামোর মধ্যে সিগনিফায়ারদের পারম্পরিক সকল সম্পর্কের বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই সম্পর্ক ভাষার বাহির থেকে কেউ নিরূপণও করতে পারে না, নির্মাণও করতে পারে না।

সস্যুরের সাইন ও সিগনিফায়ারের এই ধারণাকে আরো সম্প্রসারিত করে বলা যায় যে, সাইন ও সিগনিফায়ারের মাধ্যমে ভাষাই আমাদের বাস্তবতাকে নির্মাণ করে। আমাদের ভাষা ছয় ঋতুতে বছরকে ভাগ করেছে বলে ওর মধ্যদিয়েই আমরা বছরকে চিনি, যদিও একটি নির্দিষ্ট ঋতুর শেষদিনের পরের দিনে এমন কিছু দেখি না যা দ্বারা নতুন ঋতুটিকে চিহ্নিত করা যায়। ফলত ঋতুর বাস্তবতা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত নয় এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু দ্বারাও নির্মিত নয়, বরং ভাষা দ্বারা নির্মিত। আবার রঙের বাস্তবতা হাজার রূপ হলেও মাত্র সাতটি সিগনিফায়ার তথা সাতটি নাম দ্বারা রঙের সামগ্রিক বাস্তবতা নির্মিত। এভাবে বাস্তবতা সম্পর্কিত সকল রূপ সিগনিফায়ারের মধ্যে আটকে থাকার কারণে মানুষ তার অনুভবের কোনো বাস্তবতা সিগনিফায়ারের তথা ভাষার বাইরে গিয়ে প্রকাশ করতে পারে না। ফলে প্রমাণিত হয় যে, সকল বাস্তবতাই ভাষার নির্মাণ।

এবার আরেকটি প্রশ্ন আসে। ভাষা যদি তার সম্পর্কগত নিজস্ব নিয়মের মধ্যে সবসময় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় তাহলে হাজারো ব্যক্তির ব্যবহারে হাজারো স্বতন্ত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার উদ্ভব হওয়ার কথা। কিন্তু তা কেন হয় না? এর উত্তর রয়েছে ভাষার কাঠামো সম্পর্কে সস্যুরের প্রদত্ত অপর দুটি ধারণায়। ধারণা দুটোর একটির নাম ‘লাঙ’ (langue) এবং অপরটির নাম ‘পারোল’ (parole)। এই দুটো ধারণা বোঝাতে সস্যুর উদাহরণ টেনেছেন দাবা খেলা থেকে। দাবা খেলায় প্রত্যেকটি ঘুটির চালের একটা নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম অনুসরণ করে একজন মানুষ যখন দাবা খেলে তখন প্রতিটি খেলা তার চাল পরম্পরায় আরেকটি খেলা থেকে আলাদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ এক একটি খেলা রূপে আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিটি খেলা এভাবে আলাদা হলেও প্রতিটি খেলাই সম্পন্ন হয় দাবা খেলার সাধারণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নিয়মের অধীন থেকে। ভাষার ব্যবহারও এমন। প্রত্যেক মানুষের ভাষা তার একক সমগ্রতার বিন্যাসে আরেকজন মানুষের ভাষা থেকে আলাদা কাঠামোতে স্বাধীন যেমন স্বাধীন ও আলাদা প্রতিটি মানুষের নিজের দাবা খেলাটি। একই সাথে প্রতি মানুষের এই নিজ ভাষাটি সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষীদের সমগ্র মানুষের ভাষার সাধারণ কাঠামোর অধীন। সস্যুরের বর্ণনায় ব্যক্তির ভাষাটির কাঠামো হলো পারোল (parole), আর সকল ব্যক্তির ভাষা সংশ্লিষ্ট ভাষাটির বৃহত্তর কাঠামোর যে সাধারণ নিয়মের অধীন সেই কাঠামো হলো লাঙ (langue)। প্রত্যেক পারোলের কাঠামো বৃহত্তর কাঠামো লাঙের অধীন বলেই একজনের ভাষার ব্যবহার আরেকজনের কাছে বোধগম্য ভাষা হয়ে ওঠে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সিকদার আমিনুল হকের কবিতা জীবন ও মৃত্যুর রাজনীতি

সিকদার আমিনুল হকের কবিতা জীবন ও মৃত্যুর রাজনীতি

মধ্যাহ্ন

মধ্যাহ্ন

কামরুল হাসান ও তার ছবির রাজনীতি

কামরুল হাসান ও তার ছবির রাজনীতি

রফিকুল ইসলামের পাণ্ডিত্য ও কৃতিত্ব

রফিকুল ইসলামের পাণ্ডিত্য ও কৃতিত্ব

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

সিকদার আমিনুল হকের কবিতা জীবন ও মৃত্যুর রাজনীতি

সিকদার আমিনুল হকের কবিতা জীবন ও মৃত্যুর রাজনীতি

মধ্যাহ্ন

মধ্যাহ্ন

কামরুল হাসান ও তার ছবির রাজনীতি

কামরুল হাসান ও তার ছবির রাজনীতি

রফিকুল ইসলামের পাণ্ডিত্য ও কৃতিত্ব

রফিকুল ইসলামের পাণ্ডিত্য ও কৃতিত্ব

‘ওয়েস্টল্যান্ড’ ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ উদযাপন

সৌধের আয়োজনে‘ওয়েস্টল্যান্ড’ ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ উদযাপন

বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্য : আঙ্গিকে রাষ্ট্রদর্শন

বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্য : আঙ্গিকে রাষ্ট্রদর্শন

করোনাকালে কেমন কাটছে তার জীবন

করোনাকালে কেমন কাটছে তার জীবন

শেকড় গজানো আঁকড়ে ধরা প্রেম

শেকড় গজানো আঁকড়ে ধরা প্রেম

আলম খোরশেদ ও রওশন জামিল পাচ্ছেন ‘অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার’

আলম খোরশেদ ও রওশন জামিল পাচ্ছেন ‘অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার’

সাইকোঅ্যানালিটিকাল ক্রিটিকাল থিয়রি বা মনঃসমীক্ষণবাদী সাহিত্যতত্ত্ব

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমাসাইকোঅ্যানালিটিকাল ক্রিটিকাল থিয়রি বা মনঃসমীক্ষণবাদী সাহিত্যতত্ত্ব

সর্বশেষ

চিত্রনায়ক ইমনকে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদ

চিত্রনায়ক ইমনকে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদ

ডা. মুরাদ ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ছিলেন, জানালেন সভাপতি-সম্পাদক

ডা. মুরাদ ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ছিলেন, জানালেন সভাপতি-সম্পাদক

‘ছাত্রনেত্রীদের নিয়ে করা মন্তব্যগুলো বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক’

‘ছাত্রনেত্রীদের নিয়ে করা মন্তব্যগুলো বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক’

মুরাদ হাসানকে গ্রেফতারের দাবি এলডিপির

মুরাদ হাসানকে গ্রেফতারের দাবি এলডিপির

তিন বছরেও শেষ হয়নি মুজিব কিল্লার কাজ, বাড়ছে মেয়াদ

তিন বছরেও শেষ হয়নি মুজিব কিল্লার কাজ, বাড়ছে মেয়াদ

© 2021 Bangla Tribune