দেশের কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নেওয়া এ উদ্যোগের আওতায় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে চলতি মূলধন ঋণ পাবেন।
সোমবার (৮ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এ নির্দেশনা দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন এ তহবিলের নাম ‘সিএমএসএমই খাতে চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল’। প্রাথমিকভাবে তহবিলটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই পর্যাপ্ত চলতি মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন, সেবা কিংবা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তহবিলটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
উদ্যোক্তা পর্যায়ে সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ
নতুন তহবিলের আওতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ পাবে। এরপর তারা উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতি তিন মাস অন্তর সুদ পরিশোধ করতে হবে।
প্রচলিত ব্যাংকের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এবং সাধারণ ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডোগুলোও নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করে বিনিয়োগ আকারে এ সুবিধা দিতে পারবে।
কারা পাবেন এই ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব সচল কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান চলতি মূলধনের সংকটে তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন বা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে না, তারা এ তহবিলের আওতায় ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবে।
এ ছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য কোনো পুনঃঅর্থায়ন বা প্রাক্-অর্থায়ন স্কিমের আওতায় চলতি মূলধন ঋণ গ্রহণকারী উদ্যোক্তারাও প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনায় এ তহবিল থেকে নতুন করে ঋণ নিতে পারবেন।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) তালিকাভুক্ত ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ তহবিলের আওতায় কোনো ঋণ সুবিধা পাবে না।
থাকবে ৩ থেকে ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ড
উদ্যোক্তাদের ব্যবসা গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে ঋণের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ঋণ গ্রহণের পর প্রথম তিন থেকে ছয় মাস কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত চার্জের বাইরে ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো ফি, কমিশন বা সেবা মূল্য আদায় করতে পারবে না।
ব্যাংকের ওপর থাকবে ঋণ আদায়ের দায়
গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করা ঋণের সম্পূর্ণ ঝুঁকি ও আদায়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। ঋণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী জামানত বা সহ-জামানত গ্রহণ করতে পারবে।
কোন ব্যাংক পাবে অগ্রাধিকার
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এ তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ করতে পারবে। তবে যেসব ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) ৭০ শতাংশের বেশি, তারা তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। যদিও কোনো ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সর্বোচ্চ এডিআর সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।
তহবিলের সুবিধা পেতে আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি (পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষর করতে হবে।
ব্যবহার তদারকিতে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তহবিলের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রয়োজন হলে ঋণ অনুমোদনের আগে বা পরে যেকোনো নথিপত্র তলব করা হবে। পাশাপাশি সরেজমিন পরিদর্শন ও নিরীক্ষার মাধ্যমে ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদহার ও তারল্য সংকটের সময়ে তুলনামূলক কম সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার এ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। এর ফলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।









