‌‘১০০০ টাকা ভাড়া মারছি, জমা ১২০০, আমরা খামু কী’ 

ইমরান আলী
২১ আগস্ট ২০২৬, ১৭:০০ আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ২৩:১৯

রাজধানীর খিলগাঁও নয়াপাড়ার বাসিন্দা সিএনজিচালক মোতালেব হোসেন। হাজিপাড়া সিএনজি স্টেশনে গ্যাস নিতে সিরিয়াল দিয়েছেন বৃহস্পতিবার রাত ৮টায়। বিটিভির একটু সামনে সিরিয়াল দিলেও রাত ১০টা পার হলেও তিনি এগিয়েছেন রামপুরা বাজার পর্যন্ত। 

ঘটনাস্থলে কথা হয় মোতালেবের সঙ্গে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে ডেমরায় সিরিয়াল দিয়ে গ্যাস পেয়েছি বিকাল ৫টার দিকে। গ্যাস ‍পাই ৮০ টাকার। ওই গ্যাসে প্রথমে ৩৫০ টাকায় যাত্রী নিয়ে বসুন্ধরা সিটিতে যাই। সেখান থেকে গুলশান-১-এ আরেকজন যাত্রী নিয়ে যাচ্ছিলাম। এরপর সিএনজিতে গ্যাসের লালবাতি দেখে দ্রুত হাজিপাড়ার দিকে আসতে থাকি। বাড্ডা ইউলুপ থেকে রামপুরার দিকে নামতেই শেষ হয়ে যায় গ্যাস। বন্ধ হয়ে যায় গাড়ি। এরপর একটি অটো দিয়ে সেই গাড়ি টেনে নিয়ে গ্যাসের সিরিয়াল দিয়েছি।

তিনি বলেন, এই হলো গ্যাসের করুণ চিত্র। গ্যাস নেবো, নাকি গাড়ি চালাবো, কোনটা করবো? কিছুই ভাবতে পারছি না। তিনি বলেন, আমার মতোই অবস্থা সব সিএনজি চালকদের। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বড় বিপদে সিএনজি চালকরা। প্রাইভেটকার তেলে চললেও সম্পূর্ণ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল এই সিএনজিগুলো। চলমান গ্যাস সংকটে তারা একদিকে ভাড়া মারতে পারছেন না, অপরদিকে দিনের জমার খড়গ রয়েছে মাথার ওপর। এ দুই মিলিয়ে তাদের এখন নাভিশ্বাস উঠেছে। 

সিএনজি চালক কালাম বলেন, গ্যাস সংকট কবে যাবে, কবে আমরা ভালোভাবে গাড়ি চালাতে পারবো, কেউ কিছুই বলছে না। আর আমাদের দুর্ভোগ চলছেই। আমরা আমাদের গাড়ির জমাই উঠাতে পারছি না। ছেলেমেয়েকে কী খাওয়াবো। আমরা তো চুক্তিতে গাড়ি চালাই। গাড়ি চললেও মালিককে জমা দিতে হবে, না চললেও দিতে হবে। মালিক তো দেখবে না গ্যাস সমস্যা। এখন আমাদের দুর্দশার শেষ নেই। সরকারকে আমাদের দেখা উচিত। 

জানা যায়, রাতের বেলায় কিছু স্টেশনে গ্যাস মিললেও যথারীতি দিনের বেলায় একই অবস্থা। অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন কোনও গ্যাস দিচ্ছে না। গ্যাস না থাকার কারণে অনেক স্টেশন বন্ধও রয়েছে। 

শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এবং চালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

ইনট্রাকো ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ সিএনজিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘গতকাল শুধু ৬০ টাকার গ্যাস পাইছি। ওই গ্যাস দিয়া এক হাজার টাকা ভাড়া মারছি, জমা ১২০০ টাকা। মালিকই খাবে কী, আর আমিই খামু কী।’ 

সকাল থেকে উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোথাও পাম্প চালু থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সিএনজি, ট্রাক ও অন্যান্য গ্যাসচালিত যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ রয়েছে। আব্দুল্লাহপুরের পূর্ব পাশে খন্দকার ফিলিং স্টেশন এবং বিমানবন্দর-খিলক্ষেত এলাকার বিভিন্ন পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করেও চালকরা গ্যাস পাচ্ছেন না।

খন্দকার ফিলিং স্টেশনের অপারেটর মনির হোসেন বলেন, আমাদের কাছেই যদি গ্যাস না থাকে, তাহলে গ্রাহকদের কীভাবে গ্যাস দেবো? গত দুই সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না। গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন সিএনজি চালকরা। আমাদের পাম্প একেবারে বন্ধ রয়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আব্দুল্লাহপুর এলাকার পশ্চিম পাশে অবস্থিত আরএসআর ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে বিক্রয়কর্মী জানে আলম বলেন, দুপুর ১টার দিকে কিছুক্ষণ গ্যাসের চাপ ছিল, পরে আবার চলে গেছে।

ডেমরার রাসেল ফিলিং ও সিএনজি স্টেশনে এবং হাজী সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দিনভর সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। গ্যাস না থাকার কারণে আগের মতোই দেখা গেছে চারটি হোসের মধ্যে একটি সচল রাখতে পারছে রাসেল ফিলিং স্টেশন। একইসঙ্গে মীরপাড়া এলাকায় অবস্থিত হাজি ফিলিং স্টেশনেও গ্যাস পেতে যানবাহন চালকরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে অনেকে ফিরে যাচ্ছেন। সেখানেও প্রেসার ফল করায় এক হোস পাইপ লাইন দিয়ে গ্যাস ফিলিং করতে হয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে ডেমরায় গ্যাস নিতে আসা সিএনজিচালক মো. সারোয়ার আরিফ জানান, আমরা কি পরিবারসহ না খেয়ে মরবো?

ইউরেকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনের প্রাইভেটকারের লম্বা লাইনের শেষ প্রান্তে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছে প্রাইভেটকার নিয়ে আবুল কালাম, কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি হতাশার সুরে জানান, কয় ঘণ্টা লাগবে তা বলা যাচ্ছে না।

মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকার এবিএন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার শহীদুল জানান, গ্যাসের চাপ এত কম যে কিছুক্ষণ সরবরাহ করার পর অটো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আবার চালু হচ্ছে- এভাবেই চলছে। রাজধানীর মালিবাগ, মুগদা, বিশ্বরোড, মতিঝিল, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী, গোড়ানসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গ্যাস সংকটের এমন চিত্র দেখা গেছে। গ্যাস না থাকায় অনেক স্টেশন বন্ধ রয়েছে। যেসব স্টেশন চালু রয়েছে, সেখানেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় ধীরগতিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সকাল থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়িকে।

মালিবাগ হাজীপাড়া সিএনজি ফুয়েলিং স্টেশন, বিশ্বরোডের শান্ত সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন, আর কে মিশন রোডের এন.এস. সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার এবং মানিকনগরের বেস্ট ইস্টার্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে সীমিত পরিসরে সরবরাহ করা হচ্ছে। আবার কোনও কোনও স্টেশনে সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে।

/আইএএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
জ্বালানি খাতে আট মাসে ৪১২ কোটি ডলার ভর্তুকি
আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ বিক্রির জায়গা থাকবে না: চিফ হুইপ
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় রূপপুর ঐতিহাসিক মাইলফলক: সচিব
সর্বশেষ খবর
বাংলাবিজ: কেবল পোর্টাল নয়, চাই প্রকৃত প্রশাসনিক রূপান্তর 
বাংলাবিজ: কেবল পোর্টাল নয়, চাই প্রকৃত প্রশাসনিক রূপান্তর 
শেরপুরের পাহাড়ঘেরা এই তীর্থস্থানে মিলবে প্রকৃতি ও প্রশান্তির ছোঁয়া
শেরপুরের পাহাড়ঘেরা এই তীর্থস্থানে মিলবে প্রকৃতি ও প্রশান্তির ছোঁয়া
লিটনের স্ক্যানে বড় সমস্যা নেই
লিটনের স্ক্যানে বড় সমস্যা নেই
দিলীপ আগরওয়ালার ৩ দিনের রিমান্ড আবেদন
দিলীপ আগরওয়ালার ৩ দিনের রিমান্ড আবেদন
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির