সেকশনস

প্রেম, উন্মাদ ও বিমান ছিনতাই চেষ্টা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ১৩:৩৮




চিররঞ্জন সরকার বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ‘ময়ূরপঙ্খী’ নামে একটি বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ওই ছিনতাইকারী এবং তার সঙ্গে থাকা ‘অস্ত্র’ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল নাইম হাসান বলেছেন, কথিত বিমান ছিনতাইকারী পাইলটের মাথায় অস্ত্র ধরে তার স্ত্রীর সঙ্গে সমস্যা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের আরও জানান, কথিত ছিনতাইকারীকে খানিকটা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়েছে। সাধারণত ছিনতাই ঘটনায় যেমনটা দেখা যায়, তেমনভাবে সে যাত্রী বা ক্রুদের জিম্মি করার সে রকম চেষ্টা করেনি।
এর কিছুক্ষণ পর চট্টগ্রাম সেনা দফতরের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান জানান, কমান্ডোদের আত্মসমর্পণের অনুরোধে সাড়া না দেওয়ায় এনকাউন্টারে ওই ব্যক্তি প্রথমে আহত এবং পরে মারা যান। তার কাছে একটি পিস্তল পাওয়া গেছে।
পরবর্তী সময়ে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করে। এজাহারে বলা হয়, একজন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী বিমানের মাঝখান দিয়ে দৌড় দিয়ে সামনের ককপিটে ঢোকার চেষ্টা করে। তার হাতে বোমা ও অস্ত্রসদৃশ বস্তু দেখা যায়। সে তার কিছু দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে শুনতে হবে বলে চিৎকার করে। উক্ত দুষ্কৃতিকারী দুটো পটকা জাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটায়।
ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী ব্যক্তির কাছ থেকে কিছু বোমা ও অস্ত্রসদৃশ বস্তু আলামত হিসেবে উদ্ধার করা হয়েছে, যা যৌথ বাহিনীর কাছে রয়েছে।
প্রথমে শোনা গিয়েছিল ওই ব্যক্তি পিস্তল দেখিয়ে বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছে। সেই পিস্তল থেকে সে গুলি ছোড়ে বলেও সংবাদমাধ্যমে খবর বেরোয়। এরপর বলা হয়, সে গুলি ছোড়েনি। ‘দুটো পটকা জাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ’ ঘটিয়েছে। বিমান প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, বিমানে ওই যাত্রী উঠেছিলেন খেলনা পিস্তল নিয়ে।
একটা ‘খেলনা পিস্তল’ আর ‘দুটো পটকা জাতীয় বস্তু’ দিয়ে একটি লোক এত বড় একটি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললো? এই বয়ানকেই যদি সত্য হিসেবে মানি, তাহলেও প্রশ্ন দেখা দেয়, এত সিসি ক্যামেরা, তিন চার-স্তরের নিরাপত্তার মধ্যে ওই ‘খেলনা পিস্তল’ আর ‘দুটো পটকা জাতীয় বস্তু’ নিয়ে ওই ব্যক্তি কীভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে উঠে পড়লো? যেখানে একটা নেইলকাটার পর্যন্ত নেওয়া যায় না সেখানে কীভাবে পিস্তল গেলো? খেলনা পিস্তলও তো পিস্তল। যেটায় শব্দ হয় সেটায় লোহা ছিল। ভেতরের লোকজনের সহযোগিতা ছাড়া এটা কি সম্ভব?
নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ‘দাম্পত্য কলহ’ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার দাবি নিয়েই নাকি বিমান ছিনতাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল ওই ছিনতাইকারী। এমন একজন ‘বদ্ধ উন্মাদ’কে জ্যান্ত না ধরে কেন গুলি করে মেরে পাকড়াও করতে হলো এ প্রশ্নেরও কোনও জবাব নেই।
বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনার পর নাটকীয়তা আর চাঞ্চল্যে ভরা সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ছিনতাইয়ের চেষ্টায় নিহত ব্যক্তির নাম মাহাদী ওরফে পলাশ। পলাশ মাহাদী জাহান নামে একটি ফেসবুক আইডি চালাতেন তিনি। সেখানে সে নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়েছে, যা সত্য নয়। ওই আইডিতে শেষ স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে, ‘ঘৃণা নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে’।
শোবিজ জগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে জানা যায়। অপহরণ, প্রতারণা, বিদেশ পাঠানোর নাম করে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতানো, গত তিন বছরে প্রায় ৪০টি দেশে ভ্রমণ ইত্যাদি নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ওই যুবক সম্পর্কে। সে দুটি বিয়ে করে। শেষ বিয়ে করে চিত্রনায়িকা সিমলাকে। চার মাস আগে নাকি তাদের ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। সিমলার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েই নাকি সে এমন ‘বিগড়ে’ যায়।
এই যুবকের আসলে কী হয়েছিল, কেন সে বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টার মতো এমন একটি নাটক করলো, কেনইবা তার দাম্পত্য সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল, এসব প্রশ্নের জবাব হয়তো কোনোদিনই মিলবে না।
প্রবাদ আছে, ভালোবাসা আর যুদ্ধে অসঙ্গত বলে কিছু নেই। কথাটি সর্বাংশে সত্য নয়। সত্য হলে যুদ্ধাপরাধ বলে কিছু থাকে না। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ কখনও ন্যায়-অন্যায়ের ঊর্ধ্বে নয়, যেমনটি নয় ভালোবাসা। এটাই সত্য, সঙ্গতও।
আমাদের দেশে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে একসময় মানুষ বিবাগী হয়ে যেত। পার্বতীকে না পেয়ে শরৎচন্দ্রের দেবদাস যা হয়েছিল। সমাজ-সংসার কোনও কিছুতে মন নেই। নিজের যত্ন পর্যন্ত নেই। অনিয়ম করে করে মদ গিলে নিজেকে তিলে তিলে নিঃশেষ করার মধ্য দিয়ে প্রেমের প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করেছে। এই ধারার প্রেম অবশ্য বহু আগেই সমাজ থেকে বিদায় হয়েছে। তার পরিবর্তে চালু হয়েছে প্রেম-প্রতিহিংসা। গায়ের জোরে প্রেমিকাকে দখল করতে না পারলে চলে শক্তি প্রয়োগ। এখনকার প্রেমিকরা প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে চড়াও হয় প্রেমিকার ওপর। অনেকে খুনি হয়ে যায়। অনেকে এসিড ঝলসে দেয় প্রেয়সীর মুখ। প্রত্যাখ্যাত হলে প্রেমিকরা মেয়েটিকে বিশ্বাসঘাতক মনে করে। ক্রোধান্ধ হয়ে তাকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে। বেপরোয়া হয়।
আমাদের দেশে পুরুষদের কাছে ভালোবাসা বহুলাংশে যুদ্ধ। অবশ্যই অন্যায় যুদ্ধ। এ যুদ্ধ মানে দখল। দখল করবার যুদ্ধ, দখল না ছাড়বার যুদ্ধ। আমাদের দেশে ছেলেরা দখল হারাবার আশঙ্কা দেখামাত্র সক্রিয় হয়। এমনিতে পুরুষ ‘না’ শুনতে পছন্দ করে না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার হক শুধু তারই আছে বলে মনে করে। প্রেমিকা যদি না বলে, সেটি প্রথমত সরাসরি তার পৌরুষে গিয়ে আঘাত করে। দ্বিতীয়ত, না বলবার স্পর্ধা আদৌ সে দেখাবে কেন, এই মৌলিক প্রশ্নটি তাকে সংক্ষুব্ধ করে তোলে। দুঃখ, বেদনা ইত্যাদি অনেক পরের কথা। পুরুষ বিরহে কাতর হতে পারে, প্রত্যাখ্যান বা প্রতারণায় সাধারণত পরাজয়ের মনোভাবটিই মুখ্য হয়। মেয়েটি অন্য পুরুষের প্রতি আসক্ত হওয়া মানে পরিত্যক্ত প্রেমিকের দ্বিগুণ জ্বালা। সে শুধু মেয়েটির কাছেই পরাজিত নয়, অন্য একটি পুরুষের কাছেও পর্যুদস্ত। পুরুষতন্ত্রে এটাই মরণফাঁদ। সে পুরুষকে হারতে শেখায় নাই। পরাজয়কে বরণ করবার মধ্যেও যে কোনও শিল্পিত সৌন্দর্য থাকতে পারে, তা চেনায় নাই। পুরুষ শুধু জানে, এ বসুন্ধরা বীরভোগ্যা। পুরুষকে তার অভীষ্ট ছিনিয়ে নিতে হবে। একান্ত না পারলে, যা নিজের হস্তগত হয়নি, তা অপরে যেন না পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ছাড়বার উপক্রম করলে তাকে প্রয়োজনে ছিন্নভিন্ন করে দিতে হবে, এসিডে ঝলসে দিতে হবে! না হলে কাপুরুষ দুর্নাম জুটবে!
এক অর্বাচীন যুবক স্ত্রীর ওপর নিজের ‘দখলীস্বত্ব’ কায়েম করতে না পারায় নিজে পাগলের মতো আচরণ করেছে। বিমানে ওঠে অসংলগ্ন আচরণ করেছে। বিমানের পাইলটকে জিম্মি করার চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে। কিন্তু নির্বোধের এই অপরিণামদর্শী আচরণের পরিণতি হয়েছে মৃত্যু। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বুলেটের আঘাতে তাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে।
প্রেম-ভালোবাসা কিংবা প্রত্যাখ্যান ঘটনা সত্যি-মিথ্যে যা-ই হোক, এই ঘটনাটি কিন্তু আমাদের দেশের পুরুষ চরিত্রটিকে আবারও চিনিয়েছে। অনেকে বলাবলি করছে, প্রত্যাখ্যান বা না-পাওয়ার যন্ত্রণা সে সহ্য করতে পারেনি, আরও অনেক প্রত্যাখ্যাত পুরুষের মতোই। যারা তাদের না-পাওয়া মেয়েটিকে বলে—আমাকে প্রত্যাখ্যান করে তুমি মন্ডা-মিঠাই জীবন কাটাবে আর আমি দেবদাস হবো? আমি আঙুল চুষবো? আমি সংযত হবো? কখনোই নয়। আমি তো তাহলে ছোট হয়ে গেলাম। বন্ধুরা আঙুল তুলে বলবে না যে, ‘এই ব্যাটা, ফেকলু, তোকে মেয়েটা পাত্তা দিলো না! তোর ভালোবাসা মাড়িয়ে চলে গেলো।’ তাহলে এই ‘আমি’টা তো সবার কাছে ছোট হয়ে গেলো। আমি যে বড়, সে প্রমাণ তো আমায় করতেই হবে। অতএব, আমি মারবো, এসিড ছুড়বো, বিমান ছিনতাই করবো, প্রধানমন্ত্রীকে বলবো যেন তাকে বলে দেয়, সে যেন আমাকেই কেবল ভালোবাসে। আমি বাটপার হলেও। এমনকি উন্মাদ হলেও।
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে খুন, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, চরিত্রহনন—ইত্যাদি আমরা অনেক দেখেছি। এবার দেখলাম ছিনতাইকারী হওয়া। যেনতেন ছিনতাইকারী নয়, একেবারে বিমান ছিনতাইকারী! এগুলো নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর। এগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। হিংস্রতা, মনোবিকার এবং অপরাধমনস্কতার উৎসভূমি অবশ্যই চিহ্নিত করা উচিত। কিন্তু তাকে মহিমান্বিত করার বিপজ্জনক প্রবণতাটি যেন উঁকি না দেয়। যেন ভুলে না যাই, কারণ যাই হোক, দিনের শেষে মাহাদী বা পলাশ একজন মনোরোগী মাত্র। অপরাধীও বটে!

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/টিটি/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

ডিএনএ রিপোর্ট দ্রুত না পেলে, দেশজুড়ে বিক্ষোভের হুঁশিয়ারি

ডিএনএ রিপোর্ট দ্রুত না পেলে, দেশজুড়ে বিক্ষোভের হুঁশিয়ারি

লামা পৌরসভায় আ.লীগের প্রার্থী জয়ী

লামা পৌরসভায় আ.লীগের প্রার্থী জয়ী

তিস্তা নদী খনন ও তিনবিঘা এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর দাবি

তিস্তা নদী খনন ও তিনবিঘা এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর দাবি

ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার নম্বর ও সময় কমলো

ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার নম্বর ও সময় কমলো

নৌকার পক্ষে কাজ করায় তিন বিএনপি নেতা বহিষ্কার

নৌকার পক্ষে কাজ করায় তিন বিএনপি নেতা বহিষ্কার

কুলিয়ারচরে আ.লীগের সৈয়দ হাসান জয়ী

কুলিয়ারচরে আ.লীগের সৈয়দ হাসান জয়ী

ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ

ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ

১৮০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র: আইআরএনএ

১৮০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র: আইআরএনএ

রবিবার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রটোকল জমা দেবে গ্লোব

রবিবার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রটোকল জমা দেবে গ্লোব

বসুরহাটে ভোটের হার প্রমাণ করে ইভিএম জনপ্রিয় হচ্ছে: ওবায়দুল কাদের

বসুরহাটে ভোটের হার প্রমাণ করে ইভিএম জনপ্রিয় হচ্ছে: ওবায়দুল কাদের

কাকরাইলে মা ও ছেলেকে হত্যা মামলার রায় রবিবার

কাকরাইলে মা ও ছেলেকে হত্যা মামলার রায় রবিবার

‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের নামে চাঁদা দাবি, দুজন রিমান্ডে

‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের নামে চাঁদা দাবি, দুজন রিমান্ডে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.