সেকশনস

জলরঙে স্থিরচিত্র

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২০, ১৮:৫৬

গভীর রাতে অজানা কোনো এক কারণে নুরীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। সাধারণত প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেই তার ঘুম ভাঙ্গে। আজ সেটা হয়নি। সে ঘুম থেকে একটু চমকেই ওঠে। দুঃস্বপ্ন দেখেই কি ঘুম ভাঙল? কিছুই বুঝতে পারে না। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, নিশুতি রাত। গত চার দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে। চারদিক কাঁদাপানিতে মাখামাখি। স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে পাটি পেতে, বড় বোন রোজী আর নানী লুৎফার সাথে জড়াজড়ি করে ঘুমায় চার বছরের ছোট্ট নুরী। তার বুকটা ধুকধুক করছে। কী যেন এক অজানা অস্বস্তি তার মনের মধ্যে!  

কোথাও কি কেউ গোঙ্গাচ্ছে, কাঁদছে? রাস্তার কুকুরটা এমন করুণ সুরে ডাকছে কেন? নুরী উঠে বসে। সাথে সাথে একটা হাত তাকে টেনে ধরে। রোজী চাপা কণ্ঠে বলে ওঠে,

—উঠস ক্যান, গুমা।  

—আপা, কেউ কি কানতাছে?  

—না। তুই স্বপ্নে দেখছোস। অহন গুমা।

তবুও নুরীর অস্বস্তি যায় না।—এটা কি নানীর কণ্ঠ?  

—এত জোরে চিল্লাইস না মাগী।  

নুরী এবার অন্ধকারে তাদের ঘরটা দেখার চেষ্টা করে। রোজী তার পাশে শক্ত হয়ে শুয়ে আছে। নানীকে দেখতে পায় না কোথাও। ছোট্ট এই ঘরটিতে ওরা দু’বোন নানীর সাথে থাকে। ঘরটার একটা পাশে বেড়া দিয়ে আলাদা করে আরেকটা ঘর বানানো হয়েছে। সেখানে কোনো রকমে একটা পাটি বিছিয়ে নুরীর মা আলেয়া ঘুমান। চারজন নারীর বেদনার বুনটে ঠাঁসা একটি জীবন।   

মা যে কেন ওদের সাথে ঘুমান না? নুরী তা বুঝতে পারে না। তার প্রায়ই মায়ের বুকে মুখ গুজে ঘুমাতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু সেটা কখনই সম্ভব হয়নি। মা থেকেও নুরীর জীবনটা মাতৃহারা সন্তানের মতই শূন্যতায় ভরা। ‘মা যে এমুন ক্যান? কী অহে একলগে হুইলে? এট্টু চাপাচাপি কইরা সবাই একলগেই তো গুমান যায়’। মায়ের ওপর খুব রাগ হয়।

গোঙ্গানির শব্দ কি আবারও কানে আসে? ভয়ে নুরীর গা ছমছম করে উঠে। ধমক খাওয়ার ভয়ে রোজীকে আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। নানীও পাশে নেই যে জিজ্ঞেস করবে। নানী প্রায় রাতেই ঘুমান না। কখনো অন্ধকার ঘরে বসে বসে জিকির করেন, কখনো বারান্দায় বসে একা একা কথা বলেন। তখন নানীকে কেমন অশরীরী কিছু মনে হয়! লক্ষ্মীপ্যাঁচাটার সাথে কী সব যে বলেন! লক্ষ্মীপ্যাঁচা যখনই ডেকে উঠে, নানী জিজ্ঞেস করেন,     

—কী রে, সুখ না দুখ?

উত্তরে কী বোঝে, কে জানে, নানী একা একাই হাসেন, আবার কখনো নিরবে কাঁদেন। নানী হয়ত আজও বাইরে বসে লক্ষ্মীপ্যাঁচাটার সাথেই কথা বলছেন।  

মা বলেছেন, কাল মেলায় নিয়ে যাবেন। আহা! এই প্রথম মা তাদেরকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবেন। নুরীর আনন্দ আর ধরে না! তার কত শখ, মেলায় গিয়ে নাগরদোলায় চড়বে, হাওয়াই মিঠাই খাবে, খেলনা কিনবে। মা তাকে বলেছেন, যা চায় সব কিনে দেবেন। সেই আনন্দেই কি নুরীর আজ ঘুম আসছে না? নুরী উৎসুক হয়ে বোনকে জিজ্ঞেস করে, 

—আপা, কাইলকা কুনসমে মেলায় যামু?

—চুপ থাক, গুমাইবার কইছি না! গুমা। বিয়ানে দেখা যাইব।

বোনের ধমক খেয়ে চুপ হয়ে যায়। রোজী তার চেয়ে মাত্র ছয় বছরের বড়। কিন্তু ভাবসাবে মনে হয় ষাট বছরের বুড়ি। সবসময়ই একটু গম্ভীর, চুপচাপ।

আদর, সোহাগ কী জিনিস নুরী তা জানে না। বাবা মরে গেছে সেই কোনকালে! নুরী তাকে চোখেও দেখেনি। বাবার আদর কেমন? নুরীর খুব জানতে ইচ্ছে করে। মা’ও কেমন যেন! সবসময়ই একটু খিটখিটে মেজাজের। কখনই কাছে নিয়ে আদর করেন না। তবুও নুরী মাকে ভীষণ ভালোবাসে। তার চোখে তার মা দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী নারী। মা যেদিক দিয়ে হেঁটে যান, চারপাশ আলোকিত হয়ে যায়। মানুষ তো নয়, যেন পরী। কিন্তু কেন যেন মা তাদের দু’বোনকে সহ্যই করতে পারেন না। তাই নানীই একমাত্র আশ্রয়। নানীর কাছে প্রায়ই জানতে চায়,    

—মা ছোটবেলায় কিমুন আছিল? একটু কওনা।       

আলেয়ার শৈশবটা অভাবে কাটলেও, আনন্দে ভরা ছিল। বাবা রহমত ছিলেন খেয়াঘাটের মাঝি। বাবা-মা’য়ের আদরিণী কন্যা আলেয়া। চঞ্চল, উচ্ছল একটি মেয়ে, তার খিলখিল হাসি ঘর আলো করে রাখত। বাবা নৌকা চালাতেন আর গলা ছেড়ে গান গাইতেন। বাবার সাথে সাথে আলেয়াও গান গাইত। একসময় তার গান শুনে, গ্রামের মানুষ বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে গান গাইতে নিয়ে যেতে শুরু করল। আলেয়া স্বপ্ন দেখত, একদিন সে অনেক বড় শিল্পী হবে। দেশের মানুষ তাকে এক নামে চিনবে। এমনি একটি অনুষ্ঠানে তার গান শুনে, নুরীর বাবা হোসেন তাকে পছন্দ করে বসে। সাথে সাথে বিয়েরও প্রস্তাব দেয়। আলেয়ার বাবা বিয়েতে রাজী ছিলেন না। কারণ, হোসেন বয়সে যেমন আলেয়ার চেয়ে অনেক বড়, তেমনি দেখতে ছিল কুটকুটে কালো। একরকম জোর করেই তের বছরের আলেয়াকে হোসেন বিয়ে করে। সবাই বলত, 

—বান্দরের গলায় মুক্তার হার পরাইছে।

হোসেন শুনে খুশিই হতো। কিন্তু বরের কাছে যেতে আলেয়ার খুব ভয় লাগত। আলেয়া মা’য়ের কাছে একথা বলে পাত্তা পেত না। লুৎফা বলতেন, 

—ডরানোর কী আছে? আমগোও এইসব হইছে। কয়দিন গেলেই ডর বাইঙ্গা যাইব।

বিয়ের পর প্রতিটা রাত তার কাছে বিভীষিকার মত মনে হতো। এভাবে কখন যেন কোলে চলে এলো রোজী আর নুরী। হোসেন অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। সংসারে অভাব না থাকলেও, আলেয়ার স্বপ্নগুলো কর্পূরের মত উবে গেল। নিজের সাধ-আহ্লাদ্গুলোকে আজলা ভরে ধরে রাখতে চাইলেও তা পড়েই গেল, থেকে গেল শুধু আকুতি।

বিয়ের আট বছরের মাথায় হোসেন কালাজ্বরে মারা গেল। দুইটা বাচ্চা নিয়ে বিধবা হলো আলেয়া। যে মানুষটাকে এতটুকু ভালোবাসতে পারল না, সে তাকে দুইটা বাচ্চার দায়িত্ব দিয়ে চলে গেল।

শ্বাশুড়ির ঝাঁঝালো কথায় শ্বশুরবাড়িতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ল আলেয়ার। তিনি প্রায়ই বলতেন,

—মাগী আমার পোলাটার জানটা নিয়ে নিল।

এক সময় তারা আলেয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। সে দুই মেয়ে নিয়ে বাবা-মায়ের ঘরে ফিরে এলো। বাবার বুকে আছড়ে পড়ল আলেয়া,

—বাবা, আমার কপালটা ইমুন পোড়া ক্যান?  

আলেয়ার বাবা মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু মেয়ের এই দুর্দশা বেশি দিন সহ্য করতে পারলেন না। এক ভরদুপুরে গ্রামের লোকেরা তাকে নৌকাতে মৃত অবস্থায় পেল। বাবার মৃত্যু আলেয়ার কপালে ‘পোড়াকপালী’ নামটি চিরদিনের মত জুড়ে দিল। সবার উপর ভীষণ রাগ হয় আলেয়ার। অভিমান এই জীবনটার উপর। জীবন তাকে শুধু বঞ্চিতই করল। এই কারণে সব কিছুর ওপর তার বিতৃষ্ণা বেড়েই যাচ্ছে। এমনকি নিজের মেয়েদেরকেও মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে। ধীরে ধীরে রক্ত মাংসের আলেয়া ভাবলেশহীন এক পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো।

নুরী তাই নানীর কাছেই বেড়ে উঠছে। নানী পুরোনো কাপড় দিয়ে তাকে কয়েকটি পুতুল বানিয়ে দিয়েছেন। ওরাই তার খেলার সাথী। আর তার খেলার সাথি বাড়ির সজনে গাছটা। বাতাস হলেই গাছটি ঝুনঝুন শব্দে নেচে উঠে। তার তালে তালে নেচে আর গেয়ে উঠে নুরী,   

—সাজনা গাছে বাজনা বাজে ঝুম ঝুমা ঝুম ঝুম...।

প্রকৃতি আর মানবী উৎসবে মেতে উঠে। মুগ্ধ চোখে নিজের অতীতকে দেখে আলেয়া। নিঃশ্বাস নিতে তার কষ্ট হয়। যেন সাঁড়াশি দিয়ে তার বুকটা কেউ চেপে ধরে। সে ধমকে উঠে,

—হইছে, এত খ্যামটা নাচ দিয়োন লাগব না। জীবন তো যাইব মাইনসের বাড়িত কাম কইরাই।

আলেয়া আর তার মা মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। তাতে কোনো রকমে, পেটে ভাতে তারা বেঁচে আছে। জ্ঞান হবার পর থেকে নুরী দেখছে, তারা কখনই দুইবেলা খেতে পায় না। তাই ক্ষুধা সহ্য করার এক কৌশল সে শিখে নিয়েছে। যখনই তার খুব বেশি ক্ষুধা পায়, তখন বেশি করে পানি খেয়ে পুকুরে নেমে পড়ে। নিজেকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়। পানি যেন স্নেহের আধার, শুষে নেয় তার সকল ক্ষুধা। রাতে মা এবং নানী কাজের জায়গা থেকে কিছু না কিছু নিয়ে আসেন। সেটাই চারজনে চেটেপুটে খেয়ে নেয়।    

নানী আজকাল বেশি কাজ করতে পারেন না, তাই কিছু দিন হলো রোজীও মানুষের বাড়িতে কাজ করা শুরু করেছে। নুরীর ভয় কবে আবার তাকে কাজ শুরু করতে হয়। কিন্তু তার কাজ করতে ইচ্ছা করে না, সে স্কুলে যেতে চায়। স্কুলে পড়ানোর মতো অবস্থা তাদের নেই। স্কুলে যাবার আবদার করলে আলেয়া বলেন,

—একটা বাপ দইরা আন, হে তোরে স্কুলে বরতি কইরা দিবোনে। আমার অত মুরদ নাই।

নুরী মাথা নিচু করে রাখে আর ভাবে, ‘এইটা কুনো কথা হইলো? বাবা কেউ দইরা আনবার পারে? মা যে কী কয় না?’

আশেপাশের বাড়ির ছেলে মেয়েরা কত সুন্দর জামা পরে, বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায়। স্কুল বেশি দূরেও না। নুরী প্রতিদিন ওদের পিছু পিছু স্কুলের গেট পর্যন্ত যায়, তারপর স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। স্কুলের দারোয়ান কালাম, নুরীকে দেখলেই খেকিয়ে উঠে,

‘অই ছেরি, এইখানে কী চাস?  যা, ভাগ এইখান থেকা। যেই না মায়ের মাইয়া, তার আবার স্কুলে পড়ার শখ, ভাগ’?

নুরী বুঝে উঠতে পারে না, মায়ের উপর কালামের এত রাগ কেন? পারলেই মা’কে নিয়ে খারাপ কথা বলে। গ্রামের কিছু মহিলাও প্রায়ই নুরীকে খোঁচা মেরে বলে,  

—কী রে, তোর চাচারে চাচা ডাকোস, নাকি বাবা?

বলে হেসে একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ে। এটা কী ধরণের কথা? চাচাকে কেন বাবা ডাকবে? তাছাড়া চাচাকে তার  একটুও পছন্দ না।

বাদল, নুরীর বাবার ছোট ভাই। নুরীদের বাড়ির কাছেই তার একটা মুদি দোকান আছে। নানী প্রায়ই নুরীকে সেই দোকান থেকে তেল, নুন আনতে পাঠান, বলেন—

—চাচারে কবি, অহন বাকিতে সউদা দিতে, মা’য় কয়দিন পর ট্যাকা দিয়া দিব।  

চাচার কাছে যেতে একটুও ভাল লাগে না নুরীর। সে কেমন যেন! বিশ্রীভাবে হাসে,

—মাগনায় আর কত সউদা লইবা? আহো তোমারে একটু মজাও দিয়া দেই?

বলে নুরীকে কোলে বসায়, আদর করে। আদরটুকু নুরীকে কষ্ট দেয়। মাঝে মাঝে তাকে দোকানের পেছনে নিয়ে যায়। বাদলের লোমশ হাত বিষাক্ত সাপের মত নুরীর সমস্ত শরীরে বিচরণ করে। ব্যথা আর আতঙ্কে নির্বাক হয়ে যায় নুরী। বাদল তার কানেকানে বলে দেয়—

—খবরদার কাউরে কবি না, তাইলে এক্কেবারে জানে মাইরা ফালামু।

ভয়ে ছোট্ট নুরী কুঁকড়ে যায়। শরীরের বিভিন্ন জায়গার তার বেশ কিছুদিন ব্যথা থাকে। নিরবে তা সহ্য করে আর চুপিচুপি কাঁদে। এই অসহ্য যন্ত্রণা দূর করতে নুরী পানিরই আশ্রয় নেয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজেকে পানিতে ডুবিয়ে রাখে। পুকুরের পানি পরম মমতায় তাকে জড়িয়ে রাখে, তার সকল কান্না, যন্ত্রণা মুছে দেয়।  

মাঝে মাঝে বাদল নুরীদের বাড়িতে আসে। সে বাড়িতে এলেই আলেয়া তার দুই মেয়েকে ঘরের ভেতর পাঠিয়ে দেন। ‘মা’য় ক্যান যে ওই হারামি বেটাটারে গরে ডুকায়?’ নুরীর খুব অসহ্য লাগে। নুরীর মনে হয় যেন নানীর কাছে শোনা গল্পের সেই রাক্ষস এসেছে। এক্ষুণি তাদের গিলে খাবে। কখনো কখনো গভীর রাতে যখন চারপাশ নিঝুম হয়ে যায়, তখন পা টিপে টিপে বাদল আসে। যে রাতে সে আসে, তারপরের দিনই আলেয়া অনেক বাজার করে আনেন। ওরা তখন একটু ভাল মন্দ খেতে পারে। তাতে কী? নুরী মা’কে বলে,

—মা, বাদল চাচারে আর বাড়িতে আইতে দিবা না, ও একটা কুত্তা।  

আলেয়া নুরীর গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বলেন, 

—ফাজিল ছেড়ি, নিজের চাচারে গাইল দেস। থাপড়ায়া দাঁত ফালায়া দিমু।

নুরী চুপ হয়ে যায়। গালে হাত দিয়ে সে চিন্তা করে, ‘তার সুন্দর শৈশবটাকে বাদল চাচা তছনছ করে দিচ্ছে, মা যদি তা জানত। তাহলেও কি মারত?’ যখন তার জীবনে রোদ, বৃষ্টি খেলা করার কথা, তখন তাকে ঘিরে থাকে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। নুরী প্রায়ই ভাবে, ‘বড় হয়ে বাদলকে সে খুন করবে’।   

আজ মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গেও এসব চিন্তা নুরীর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একবার ভাবে রোজীকে সব বলে দিবে। তখনি হঠাৎ ফজরের আজান শুনতে পায়।

‘বিয়ান হয়া গেছে?’ নিজের মনেই নুরী বলে উঠে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল টেরই পায়নি। পাশে তাকিয়ে দেখে রোজী বা নানী কেউই নেই। সবাই উঠে পড়েছে। অবিরাম বৃষ্টি ঝরেই চলেছে। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে নুরী লোকজনের কথার আওয়াজ শুনতে পায়। এত ভোরে তাদের বাসায় এত লোকজন কেন? নুরী ঘুম ঘুম চোখে বাইরে এসে দাঁড়ায়। বাড়িভর্তি লোকজন, প্রায় সবাই মহিলা। বাড়ির উঠোনে কাঁদাপানিতে মহিলারা দাঁড়িয়ে ফিসফাঁস করছে। উঠোনের দক্ষিণ দিকে ডোবায় অনেকেই উপুড় হয়ে কী যেন দেখছে! একরাশ বিস্ময় নিয়ে নুরী ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যায়। ডোবার কাছে গিয়ে দেখে, তার মা নিথর হয়ে পড়ে আছেন। তার দুধে আলতা গায়ের রঙ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে! ডোবার পানি রক্তে লাল। মনে হচ্ছে, মা আলতার নদীতে ভাসছেন। তবে কি মা’ই রাতে গোঙ্গাচ্ছিলেন? কাঁদছিলেন? নুরী এবার নানীর দিকে তাকায়। মেয়ের মাথাটা কোলে নিয়ে তিনি পাথরের মত বসে আছেন।    

মহিলাদের মধ্যে একজন ফিসফিস করে বলে,

—পোলা হইছিল। পোলা।

আরেকজন বলে,

—প্যাট বাজানের কালে হুশ আছিল না। এত বড় বাচ্চা ফালাইবার গেছে। অহন তো সবই গেল।

সজনে গাছটায় হেলান দিয়ে দাঁড়ানো রোজীর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় নুরী। গাছটার গোড়ায় কাপড়ে প্যাঁচানো একটা পুটলি। রোজী সেটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সজনে গাছটাকে আজ এত স্থির লাগছে কেন? তার ঝুনঝুন শব্দে সকল কথা, সকল দুঃখ, বেদনা দূর করে দিচ্ছে না কেন? স্থিরচিত্রের মতো সবকিছু থমকে গেছে কেন? তাদের জীবনটাও কি থমকে যাবে?    

রোজীর চোখ-মুখ বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাচ্ছে। সে কি কাঁদছে? নুরীও কি কাঁদবে? হয়তো কাঁদবে, সে ধীর পায়ে পুকুর ঘাটের দিকে হাঁটা ধরে।    

//জেডএস//

সম্পর্কিত

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

সম্পর্ক; আপন-পর

সম্পর্ক; আপন-পর

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

স্বর্ণ পাঁপড়ি নাকফুল মেঘজল রেশমি চুড়ি

স্বর্ণ পাঁপড়ি নাকফুল মেঘজল রেশমি চুড়ি

জন্ডিস ও রঙমিস্ত্রীর গল্প

জন্ডিস ও রঙমিস্ত্রীর গল্প

অ্যালার্ম

অ্যালার্ম

জরু সমাচার

জরু সমাচার

ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়

ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়

সর্বশেষ

পুরস্কার লেখককে অনুপ্রাণিত করে : মুহাম্মদ সামাদ

পুরস্কার লেখককে অনুপ্রাণিত করে : মুহাম্মদ সামাদ

কবিতাকে নতুন পথ দেখাতে চেয়েছি : হাসনাইন হীরা

কবিতাকে নতুন পথ দেখাতে চেয়েছি : হাসনাইন হীরা

পাপড়ি ও পরাগের ঝলক

পাপড়ি ও পরাগের ঝলক

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

থমকে আছি

থমকে আছি

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.