‘অপরাধ করেছি আরও করবো’

রেজানুর রহমান
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৪:২৬আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৪:২৭

রেজানুর রহমান যেদিন দেশের শীর্ষ দৈনিক পত্রিকায় খবরটা ফলাও করে প্রকাশ হলো সেদিনই বুঝে ফেলেছিলাম পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে চলেছে। কী ভয়ানক খবর। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী একদল তরুণ অনেকটা প্রকাশ্যেই দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছে– প্রশ্ন ফাঁস করেছি, আরও করবো। আমাদের কেউ কিছু করতে পারবো না। একটি চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছিলেন বয়স্ক দুই ব্যক্তি। হয়তো পাশেই কোনও অফিসে চাকরি করেন। পত্রিকার খবর পড়ে দু’জনই যারপর নাই ক্ষুব্ধ। একজন অন্যজনকে শুনিয়ে বললেন, দেখেছেন এদের সাহস কত! প্রকাশ্যে কী সব বলছে! ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছি আরও করবো’। কেউ আমাদের কিছুই করতে পারবে না... এটা তো ভাই সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার মতোই হয়ে গেলো। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সরকার যেখানে ক্ষুব্ধ সেখানে কোথাকার কোন তরুণ ঘোষণা দিয়ে বলছে, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস করবো, কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না’। আমার কী মনে হচ্ছে জানেন, ছেলেগুলোকে যদি কাছে পেতাম তাহলে গাছের ডালে লটকিয়ে চাবুক পেটাতাম। এরা কোন বাবা-মায়ের সন্তানরে ভাই? এদের মনের ভেতর দেশাত্মবোধ বলে কি কিছুই নাই। ছি... ছি... এদেরকে ক্ষমা করা যায় না।
চায়ের দোকানে খবরটা নিয়ে জোর তর্ক শুরু হয়ে গেলো। এরই মাঝে বয়স্ক এক ব্যক্তি প্রশ্ন ফাঁসকারী তরুণদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতেই তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়ে গেলো। পত্রিকার খবর পড়ে যিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তিনি রীতিমত মারমুখি ভঙিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী তরুণদের পক্ষ নেওয়া ব্যক্তিকে বললেন, আপনি এইটা কী বললেন? অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে কথা বলতেছেন? এইসব কুলাঙ্গারের জন্য দেশের আজকে এই অবস্থা। আপনি আপনার কথা উইথড্র করেন। ভেবেছিলাম তরুণদের পক্ষ নেওয়া ব্যক্তিও ক্ষেপে যাবেন। দুই পক্ষের মধ্যে শেষ পর্যন্ত হাতাহাতি না বেজে যায়। কিন্তু তা হলো না। তরুণদের পক্ষ নেওয়া ব্যক্তিটি চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ভাই আপনি আমাকে ভুল বুঝেছেন। আমি তরুণদের পক্ষ নেই নাই। আমি আপনাকে পরিস্থিতিটা বোঝাতে চেয়েছি। কেন আমি তরুণদের ব্যাপারে কথা বললাম জানেন, ওরা তো প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে যে প্রশ্নপত্র ফাঁস করবে। আমি তো মনে করি ওরাই ‘বাপের ব্যাটা’। অন্যায় করেও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেছে। এখন আমাদের দায়িত্ব কী? ওদেরকে ধরা এবং এমন শাস্তি দেওয়া যাতে আর কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘৃণ্য কাজে জড়িত না হয়। জড়িত হতে চাইলেও শাস্তির দৃষ্টান্ত দেখে যেন ভয়ে বুকটা কাঁপে। কিন্তু আমরা কি তা করতে পেরেছি। প্রচার মাধ্যমের কথাই ধরেন। দেশের শীর্ষ দৈনিকে বিপদগামী ওই তরুণদের ঔদ্ধত্যের খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হলো। ফলে কী হলো ওরা এক অর্থে হিরো হয়ে গেলো। প্রশ্ন করতেই পারেন পত্রিকা কি তাহলে খবর ছাপবে না? অবশ্যই ছাপবে। কিন্তু খবরের পেছনের খবরও আমরা জানতে চাই। বেয়াদব যে তরুণেরা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে আপত্তিকর ঘোষণা দিল তারা এখন কোথায়? তাদের কি শাস্তি হয়েছে? পত্রিকায় তাদের ছবি দেখেছি। পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করেছে। পরের খবরটা কী? গ্রেফতার করার পর সেই তরুণদেরকে কি জামাই আদরে রাখা হয়েছে নাকি তাদের সাজা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর তো জানা দরকার ভাই। অপরাধের শাস্তি না হলে অপরাধ তো কমবে না। এইটা কেন বোঝেন না আপনারা...

চায়ের দোকানের সামনে রীতিমত জনসভা টাইপের একটা ভিড় দেখা দিয়েছে। সবাই মুগ্ধ হয়ে লোকটির কথা শুনছিল। তার কথা শেষ হতে না হতেই টেলিভিশনে সম্প্রচার হওয়ার মতো টকশো শুরু হয়ে গেলো। সরকারের পক্ষে বিপক্ষে বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে জোর বিতর্ক শুরু করে দিল জনগণ। এক পক্ষের বক্তব্য– শিক্ষামন্ত্রীর কি লজ্জা নাই? তিনি এখনও কেন পদত্যাগ করছেন না। সঙ্গে সঙ্গেই অন্যপক্ষ প্রতিবাদ করে বলল, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?

জনতার বিতর্ক থামেনি। আমার মনেও অনেক প্রশ্ন। বিশেষ করে ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী সেই তরুণদেরকে কোনোভাবেই ক্ষমা করতে পারছি না। এতবড় দুঃসাহস তারা দেখাল কী করে? ওদেরতো প্রকাশ্যে সাজা হওয়া দরকার। পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করেছে। পরের খবর কী? ওরা কি জামাই আদরে আছে? নাকি ওদের বিরুদ্ধে সাজা প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে? কথাগুলো এই জন্য বলছি যে, পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা এতটাই মহামারীর আকার ধারণ করেছে যে, এটা রোধকরা না গেলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সকল অর্জন অচিরেই ম্লান হয়ে যাবে। সেজন্য এই অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে নতুন আইন তৈরি করে হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

যখন লেখাটি লিখছি তখন আমার লেখার টেবিলে এলো একটি দৈনিক পত্রিকা। প্রধান শিরোনামে স্থান পেয়েছে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত খবর। ‘জামিন পেল চট্টগ্রামের ১০ শিক্ষার্থী। প্রশ্ন ফাঁসের বন্যার পানি শিশুদের গায়ে লাগছে।’ রিপোর্টের শুরুটা এরকম– ‘রাষ্ট্র্রের ব্যর্থতায় বন্যার পানির মতো এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভাসছে দেশ। সেই বন্যার পানি শিশুদের গায়েও লাগছে। সরকারকে আগে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র মুঠোফোনে রাখার ঘটনায় চট্টগ্রাম শহর থেকে গ্রেফতার করা ১১ শিক্ষার্থীর জামিন শুনানিতে চট্টগ্রামের আদালতে একথা বলেছেন আইনজীবী...

পাঠক, ভাবুন তো একবার আমরা শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছি? আমাদের গন্তব্য কোথায়? কোমলমতি একদল ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষার আগের দিন পরীক্ষার হলে যাওয়ার সময় বাসে বসে ফাঁস করা প্রশ্নপত্র নিয়ে রীতিমতো জিজ্ঞাসা হৈ চৈ শুরু করে দিয়েছে। জরুরি জিজ্ঞাসা হলো– এই প্রশ্নের কপি তাদের কাছে এলো কী করে? কারা মুঠোফোনে তাদের কাছে পাঠালো? প্রকৃত অপরাধীকে আমরা ধরতে পারিনি। কিন্তু কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আদালতে নিয়েছি। হতে পারে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এটাও একটি দৃষ্টান্ত। জেল জরিমানার ভয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা হয়তো ফাঁস করা প্রশ্নপত্রের ব্যাপারে আর আগ্রহ দেখাবে না।

কিন্তু ব্যাপারটা বোধকরি এত সহজ না। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্র অব্যাহত গতিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে চলেছে। সরকারেরও উচিত তথ্যপ্রযুক্তিকেই কাজে লাগিয়ে অপরাধ ঠেকানো। সেই সঙ্গে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা জরুরি। অপরাধের শাস্তি না হলে অপরাধ বাড়তেই থাকবে...

লেখক: নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক, আনন্দ আলো।

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
জিয়াউর রহমানের আদর্শ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়: আইনমন্ত্রী
জিয়াউর রহমানের আদর্শ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়: আইনমন্ত্রী
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে:  প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক