X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

লকডাউনের সময় বাড়ানোই সব কথা নয়

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ১৬:৩০
সালেক উদ্দিন বর্তমানে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সরকারি হিসেবে প্রতিদিন শতাধিক মৃত্যুর খবর পাচ্ছি। ফলে সরকারকে ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে সর্বাত্মক লকডাউন দিতে হয়েছে। এতে পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হলেও সংক্রমণ এবং মৃত্যু কিন্তু কমেনি। প্রতিদিনই আক্রান্ত এবং মৃত্যু নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। এই লেখাটা যখন লিখছি তখনকার খবর, ‘করোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে’। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন মৃত্যুর রেকর্ড ভাঙছে এবং নতুন রেকর্ড গড়ছে।

১৭ কোটি মানুষের দেশে যারা করোনা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের শরণাপন্ন হন, এটা শুধু তাদের হিসাব। এই হিসাবের বাইরে রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা। তাদের আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা আমরা জানি না। তাই সমগ্র দেশের  করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা এই হিসাবে আসে না। গ্রামগঞ্জ মফস্বল শহরের কথা বাদই দিলাম, রাজধানী ঢাকাতেও অনেক পরিবারের কথাই জানি, তারা করোনার উপসর্গ নিয়ে টেস্ট করাতে যাননি এবং হাসপাতালের রেকর্ডভুক্তও হননি। এদের মধ্যে অনেকে মৃত্যুবরণ করছেন। অনেকে  সুস্থও হচ্ছেন। অতএব, সরকারি হিসাবের চেয়েও সারাদেশে করোনা পরিস্থিতি অনেকগুণ বেশি ভয়াবহ।

সঙ্গত কারণেই সরকারকে আবারও লকডাউনের পথেই পা বাড়াতে হলো। ২২ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউনের সময়সীমা বাড়ানো হলো। ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে সর্বাত্মক যে লকডাউন দেওয়া হয়েছিল, তাতে করোনার সংক্রমণ এবং মৃত্যুকে কমানো সম্ভব হয়নি। বরং এই সময়টিতে প্রতিদিনে  শতাধিক মৃত্যুর সংবাদ আমাদের শুনতে হয়েছে। তাই বলে লকডাউনের প্রয়োজন নেই বলছি না। প্রয়োজন অবশ্যই আছে এবং লকডাউনের সময় আরও বাড়ানো সঠিক সিদ্ধান্তই বটে।

আমাদের এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে, গেলো বছর করোনার প্রথম ঢেউয়ে আমরা লকডাউন দিয়েছিলাম, ৬৬ দিনের সরকারি বেসরকারি সব অফিস আদালত বন্ধ ছিল, মাস্ক পরিধান, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ সতর্কতার সর্বপ্রকার প্রচারণা চালানো হয়েছিল। তারপরও করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেশব্যাপী এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আমাদের এত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো কেন? এর  কারণ হিসেবে যা মনে হয় তা হলো, আমরা যা বলেছি তা করতে পারিনি অথবা করিনি। অর্থাৎ লকডাউনই শেষ কথা নয়। সময় এসেছে করোনার সংক্রমণ রোধে, মৃত্যুরোধে যারা সফল হয়েছে তাদের পদ্ধতি অনুসরণ করা।

স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে ভিয়েতনামের কথা আসে। ভিয়েতনামের সফলতার পেছনে যে  কারণগুলো কাজ করেছে তা নিম্নরূপ:

১. দেশটি শুরুতেই করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেছিল এবং বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে  কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল।

২. আক্রান্তরা কার কার সংস্পর্শে এসে ছিলেন তা তারা চিহ্নিত করেছিল।

৩. চিহ্নিত মানুষদের আইসোলেশন নিশ্চিত করতে পেরেছিল এবং নমুনা পরীক্ষা করে সংক্রমিতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়েছিল।

৪. সীমান্ত যোগাযোগ বন্ধ, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি বিষয় নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিল।

৫. সর্বোপরি করোনা যে একটি নিশ্চিত মরণব্যাধি এবং এর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে যা যা করণীয় সে সম্পর্কে দেশের জনগণকে অতি দ্রুত সচেতন করতে পেরেছিল এবং এই কর্মসূচিতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পেরেছিল।

ভিয়েতনামের মতো এসব প্রচেষ্টা আমাদের পরিকল্পনাতেও ছিল কিন্তু ভিয়েতনাম সফল হয়েছে, আমরা হতে পারিনি। এটি সত্য যে, ভিয়েতনামের স্বল্প জনসংখ্যার মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন যত সহজে সম্ভব হয়েছে, আমাদের বিশাল জনসংখ্যার দেশে তত সহজ হওয়ার কথা নয় । তবে একেবারেই অসম্ভব ছিল না। ভিয়েতনামের স্বল্প জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের  প্রশাসনের জনবলও ছিল অল্প। আর আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রশাসনের লোকবলও তাদের চেয়ে বহু বহুগুণ বেশি। ওরা কঠিন ও দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিল আর আমরা নমনীয়  ছিলাম- এটাই পার্থক্য। তাদের সঙ্গে আমাদের আরও পার্থক্য হলো, আমরা কোনও কিছুই তোয়াক্কা করি না। করোনার মৃত্যুর মিছিল এবং সরকার প্রদত্ত লকডাউনের মধ্যেও আমরা দিনে-রাতে মহল্লায় মহল্লায় আড্ডা দিচ্ছি, বাজারে হুমড়ি খেয়ে একে অপরের ওপর পড়ছি, সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই, মাস্ক, স্যানিটাইজারের ওপরে এখনও অনীহা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের মানসিকতা যখন এমন, তখন সরকারের যত সদিচ্ছাই থাকুক বা যতদিনই লকডাউনের সময়সীমা বাড়ানো হোক, এতে খুব একটি ভালো ফল আসবে বলে মনে হয় না।

এখন প্রয়োজন ভিয়েতনামের সফল পলিসি আমাদের দেশে প্রয়োগ করা। এর জন্য যত কঠোর হওয়া প্রয়োজন তাই হতে হবে। প্রয়োজনে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে, রাজধানীতে বিভাগীয় শহরে জেলা শহরে সেনাবাহিনী নামাতে হবে। নিয়ম ভঙ্গকারীর জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশে জরুরি অবস্থা জারি আর সেনাবাহিনীর কথা মনে এলো এ কারণেই যে, করোনাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক জীবন ধারা প্রতিষ্ঠা। আর এই দুটি মাধ্যম দিয়েই সেই কাজটি করা সম্ভব বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
 
লেখক: কথাসাহিত্যিক
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কাঠগড়ায় তারকারা: দেশ মানে না আপনি মোড়ল!
কাঠগড়ায় তারকারা: দেশ মানে না আপনি মোড়ল!
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শপথবাক্য ঠিকমতো পড়ানো হয় না
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শপথবাক্য ঠিকমতো পড়ানো হয় না
‘প্রবাসী ফুটবলারদের বাঁকা চোখে দেখা হয়’
‘প্রবাসী ফুটবলারদের বাঁকা চোখে দেখা হয়’
ফারিয়ার ঈদ এবার কলকাতায়
ফারিয়ার ঈদ এবার কলকাতায়
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ