X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

আমাদের উপাচার্য’রা

আপডেট : ১২ জুন ২০২১, ১৬:০৩

রুমিন ফারহানা বহুদিন ধরে শিক্ষার মান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার মানের চেয়ে অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ক্লিশে শিক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মসংস্থানে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে, সেই বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনার চেষ্টা করেছি বারবার। ব্রুট মেজরিটির জবাবদিহিতাহীন সরকারের প্রথম সমস্যাই হলো বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা। সে কারণেই হয় বিষয়টিকে যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্য যেটুকু আলোচনার প্রয়োজন তা কখ্নই হয়নি আর নয়তো অবান্তর উত্তর দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বিষয়টা। 

বেশ কয়েক বছর ধরেই আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা খবরের শিরোনাম আলো করে আছেন। নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, বিউটি পার্লার খোলা ইত্যাদি নানা ধরনের নজিরবিহীন উদ্ভট কাণ্ডকারখানার জন্য তারা নিয়মিত বিরতিতে খবরের শিরোনাম হন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত উপাচার্য সম্ভবত নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। উনি একাধারে নির্বাচন (!) পর্যবেক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী ইত্যাদি ইত্যাদি। 

মেয়াদের পুরোটা সময় তুমুল আলোচনায় থাকা কলিমুল্লাহ তার শেষ কর্মদিবসে রাত সাড়ে তিনটায় ক্লাস নিয়ে আমাদের চমকে দিয়েছেন। মেয়াদের চার বছর তাকে নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও তাকে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল ঢাকায় থেকে রংপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা নিয়ে। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার উপস্থিতির বিস্তারিত তথ্য দিয়ে বোর্ড টানিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে দেখা যায় নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর নিয়োগ হয় ২০১৭ সালের ১ জুন এবং তার মেয়াদ পূর্ণ হয় ২০২১ সালের ৩১ মে। এতে চার বছরে উপাচার্য ১৪৪৭ দিনের মধ্যে ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন ২৪০ দিন আর অনুপস্থিত ছিলেন ১২০৭ দিন। 

ভীষণভাবে সমালোচিত এই উপাচার্য দেশের মানুষের সমালোচনা, পত্রিকায় একের পর এক রিপোর্ট, সামাজিক মাধ্যমে ট্রল, এমনকি সরকার সমর্থক শিক্ষকদের চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও পূর্ণ করতে পেরেছেন তার মেয়াদ। এটাই সম্ভবত তার একমাত্র সাফল্য। সেই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট তার সমস্ত অযোগ্যতাকে কতটুকু ছাপিয়ে গিয়েছিল তার ক্ষমতার দৌড়। আর ক্ষমতা হবে নাই বা কেন? গত সংসদ নির্বাচনের পর তার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা নির্বাচনকে বৈধতার সার্টিফিকেট না দিলে তো দেশ এক কঠিন সাংবিধানিক সংকটে পড়তো। একটা কথা না বললেই না, আমি ব্যক্তিগতভাবে ওনার অভিনয় এবং নাচের দক্ষতার প্রশংসা করি। 

জনাব কলিমুল্লাহর মতই অতি আলোচিত আর এক উপাচার্য হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম আব্দুস সোবহান। শেষ কার্যদিবসের আগের রাতে ৯ জন শিক্ষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিভিন্ন পদে মোট ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। এর আগে ভিসি সোবহান উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করে নিজের মেয়ে জামাতাসহ অবৈধ উপায়ে আরও ৩৪ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হয় যা এসব নিয়োগকে অবৈধ অ্যাখ্যা দিয়ে বাতিলের সুপারিশ দেয়। অবসরের পর পুলিশি প্রহরায় আছেন তিনি। তারই সহকর্মীদের ভাষ্যমতে কোনও দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির এমন পুলিশ প্রহরায় থাকা কেবল দুঃখজনকই নয়, নজিরবিহীনও বটে।   

ব্যাধি সংক্রামক, তাই যখন একজন উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে এমন ঘটনা ঘটান, তখন সেই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার কথা অন্য উপাচার্যদের মধ্যেও। দুইদিন আগের খবরে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আর নয় মাস বাকি। মেয়াদের শেষ সময়ে এসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নিয়োগ দিতে তৎপরতা শুরু করেছেন। গত চার মাসে একে একে ৪৭টি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। শিক্ষক নিয়োগে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ আটটি পদে কোনও বয়সসীমা না থাকা সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। 

কয়েক বছর আগে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলোয় স্কুল ও বিউটি পার্লার বানিয়ে তুমুল আলোচনায় এসেছিলেন। শুধু তাই নয়, কর্মবীর এই উপাচার্য নিজেই সেই পার্লারের ক্লায়েন্টদের সিরিয়াল মেইন্টেইনের দায়িত্ব পালন করতেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ বাণিজ্য এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল। 

মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে। কোনও প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে যদি এ ধরনের অভিযোগ থাকে, তাহলে সে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ বলতে খুব বেশি ভাবনার দরকার হয় না। এরই প্রতিফলন সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত সকল বৈশ্বিক সূচকেই স্পষ্ট।  

অতি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেল সাইমন্ডস (কিউএস) বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং ২০২২ প্রকাশ করেছে। তাতে প্রথম ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অবস্থান নেই।

গত বছরের মতো এই বছরের তালিকাতেও দেশের শীর্ষ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১ থেকে ১০০০ এর মধ্যে রয়েছে। কিউএস তাদের তালিকায় ৫০০ এর পরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেনি।

একাডেমিক খ্যাতি, চাকরির বাজারে সুনাম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, শিক্ষকপ্রতি গবেষণা-উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক শিক্ষক অনুপাত ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অনুপাতের ভিত্তিতে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১২ সালে কিউএস’র তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ৬০১ এর মধ্যে। ২০১৪ সালে তা পিছিয়ে ৭০১তম অবস্থানের পরে চলে যায়। ২০১৯ সালে তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান আরও পেছনের দিকে চলে যায়।

শীর্ষ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ভারতের আটটি ও পাকিস্তানের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশের মতো পুরো তালিকা বিবেচনায় নিলে এই দেশ দু’টির বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা অনেকটাই বাড়ত। 

এর আগে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ২০২০ সালের গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স (জিকেআই) প্রকাশ করে। বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮টি দেশের মধ্যে ১১২তম। তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই সূচকে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান এমনকি পাকিস্তানও আছে আমাদের চাইতে ভালো অবস্থানে। অর্থাৎ বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন।  

টাইমস হায়ার এডুকেশন এর সর্বশেষ র‍্যাংকিং এ বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার এক নির্মম প্রতিফলন ঘটেছে। বিশ্বের সেরা ১৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আছে একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। অথচ এই তালিকায় ভারতের ৫৬টি, পাকিস্তানের ১৪টি, মালয়েশিয়ার ১৩টি, শ্রীলংকার ২টি ও নেপালের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে। কষ্ট হয় যখন দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১ হাজারের বাইরে, কিন্তু নানা কারণে সমালোচিত দেশ পাকিস্তানের ৭টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১ হাজারের মধ্যেই। এর মধ্যে কায়েদে আজম  বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৪০০ থেকে ৫০০ এর মধ্যে।

এই পিছিয়ে পড়া হঠাৎ কোনও ঘটনা নয়। গত এক যুগ ধরে সর্বত্র যে ভয়াবহ দলীয়করন, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির নির্লজ্জ দাপট তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এমনই হওয়ার কথা।

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বৈশ্বিক সংকটেও বেশ ভালো আছে বাংলাদেশ
বৈশ্বিক সংকটেও বেশ ভালো আছে বাংলাদেশ
দেশে ফিরলেন ভারতে পাচার হওয়া ৫ তরুণী
দেশে ফিরলেন ভারতে পাচার হওয়া ৫ তরুণী
বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাইবার যুদ্ধ শুরু করুন: ফারুক খান
বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাইবার যুদ্ধ শুরু করুন: ফারুক খান
বাইডেন, ট্রাম্পসহ ৯ শতাধিক মার্কিনির রাশিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
বাইডেন, ট্রাম্পসহ ৯ শতাধিক মার্কিনির রাশিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ