ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের চারটি মার্কেটের অন্তত ৫ হাজার দোকান। পুরো ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনও হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ৫ হাজার দোকান মানে ৫ হাজার ব্যবসায়ী, দোকানের কর্মচারী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষ ধরলে কয়েক লাখ মানুষের স্বপ্ন, ঈদের আনন্দ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঈদের যেটুকু সময় বাকি আছে, তাতে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। আগের রাতের কোটিপতি ব্যবসায়ী পরদিন পথের ফকির হয়ে গেছেন। নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের আহাজারিতে এখন ভারী বঙ্গবাজার এলাকা। প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। সাধারণ মানুষও বিপুল সহানুভূতি নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে আছেন। ঘুরে দাঁড়াতে ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর নানা উদ্যোগও চোখে পড়ছে।
যত চেষ্টাই হোক বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ পরিবারের ঈদ এবার ভালো যাবে না এটা নিশ্চিত। অনেকেই বলছেন, বিমা সুবিধা থাকলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবেন। কিন্তু বঙ্গবাজারে যে স্টাইলে ব্যবসা হয়, তাতে বিমার সুযোগ নেই বললেই চলে। অতি সাবধানী কেউ যদি বিমা করেও থাকেন, ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটে ব্যবসা করার ‘অপরাধে’ তিনি হয়তো বিমা দাবি পাবেন না। তাছাড়া এই মার্কেটের অধিকাংশ ব্যবসায়ীই ঋণ করে পুঁজি জোগাড় করেছেন। এখন সব পুড়ে গেলেও তাদের কিন্তু ঋণ শোধ করতেই হবে। আবার এই মার্কেটের অনেক ব্যবসায়ী বাকিতে পণ্য আনেন। বিক্রি করে টাকা দেন। এখন সব পুড়ে যাওয়ার পর বাকিতে পণ্য দেওয়া সেই ব্যবসায়ীদের টাকাও ঝুঁকির মুখে পড়ে গেলো। এক আগুন পুড়িয়েছে আসলে অনেক মানুষের স্বপ্ন, অনেক ব্যবসায়ীর পুঁজি।
ব্যবসায়ীদের এই চরম দুঃসময়েও কিছু কথা সামনে আসছে। নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের প্রিয় বঙ্গবাজার মার্কেটে এবারই প্রথম আগুন লাগেনি। ১৯৯৫ সালেও একবার ভয়াবহ আগুনে বঙ্গবাজার পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। ২০১৮ সালেও একবার আগুন লেগেছিল। তার মানে বঙ্গবাজার বরাবরই ঝুঁকির মধ্যে ছিল। ২০১৯ সালেই ফায়ার সার্ভিস বঙ্গবাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে তারা অন্তত ১০ বার নোটিশ পাঠিয়েছে। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স ভেঙে সেখানে একটি আধুনিক বহুতল শপিং কমপ্লেক্স বানানোর উদ্যোগ আটকে আছে হাইকোর্টের রিটের কারণে। বঙ্গবাজার যে একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা এটা ফায়ার সার্ভিসের বলার দরকার নেই। যারা আমরা প্রতিদিন সেখানে যেতাম, তারাও জানি এটি ঝুঁকিপূর্ণ। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের পুরোটাই একটা ‘ভুলভুলাইয়ার জগৎ’। আগুন দরকার নেই, যেকোনও একটা সাধারণ আতঙ্কেও সেখানে মানুষের মৃত্যু ঝুঁকি ছিল। কোনও প্রয়োজনে সেখান থেকে অনেক মানুষের একসঙ্গে বের হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। ভোর ৬টায় না হয়ে আগুন সন্ধ্যা ৬টায় হলেই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারতো। তার মানে জেনেশুনেই ফায়ার সার্ভিসের নাকের ডগায়, আমাদের সবার চোখের সামনে বছরের পর বছর চলছিল ঝুঁকিপূর্ণ বঙ্গবাজার। আমরা সবাই জানি, তারপরও চলছিল। কারণ, এরকম ঝুঁকি নিয়েই আমাদের প্রতিদিন চলতে হয়। কয়েক দিন আগে সিদ্দিকবাজারের বিস্ফোরণের ক্ষত তো এখনও শুকায়নি। বেজমেন্টে পার্কিংয়ের বদলে দোকান বানিয়ে এমন অনেক মৃত্যুকূপ তো আমরা নিজেরাই বানিয়ে রেখেছি। আমরাও জানি, ঝুঁকি আছে, কিন্তু আগুন তো আর প্রতিদিন লাগবে না বা বিস্ফোরণও প্রতিদিন ঘটবে না। লাভক্ষতির হিসাব করেই আমরা প্রতিদিন ঝুঁকি নিচ্ছি। এটা একটা আত্মঘাতী লটারির মতো।
আগুন লেগেছে বলে এখন বঙ্গবাজার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু ঢাকায় এমন ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ মার্কেট আছে আরও ২০টি। দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলালউদ্দিন জানিয়েছেন, ঢাকায় ১৩ হাজার দোকান আছে ঝুঁকির তালিকায়। এখন সমস্যা হলো ২০টি মার্কেট বা ১৩ হাজার দোকান তো রাতারাতি ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। তাহলে কি তারা এই ঝুঁকি নিয়েই ব্যবসা চালিয়ে যাবেন? চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। আবার একসঙ্গে এত ব্যবসায়ীর পুনর্বাসনও প্রায় অসম্ভব। যেমন ধরুন, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে অনেক দিন ধরেই আধুনিক শপিং মল গড়ার চেষ্টা করে আসছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বাধার কারণেই তা পারছে না।
ব্যবসায়ীদের ভয়টা হলো, একবার দোকান ছেড়ে দিলে আবার সেটা ফিরে পাবেন কিনা। কারণ, এখানে অধিকাংশ ব্যবসায়ীরই কোনও আইনি মালিকানা নেই। মূলত দখলস্বত্বে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদা দিয়ে তারা ব্যবসা করেন। এখন আধুনিক শপিং মল হলে আরও বড় ব্যবসায়ীরা খেয়ে ফেলবেন ছোট ব্যবসায়ীদের অধিকার। তাই তারা যেকোনও মূল্যে বিদ্যমান ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে চান, দখল বজায় রাখতে মরিয়া। আবার ধরে নিলাম, ব্যবসায়ীরা আধুনিক ভবন করতে রাজি হলো। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশও উঠে গেলো। তাহলেও তো রাতারাতি ভবন তুলে ফেলা সম্ভব নয়। যত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গেই করা হোক, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের মতো বড় একটি প্রকল্প শেষ করতে কমপক্ষে চার বছর লাগবে। এই চার বছর এই ৫ হাজার ব্যবসায়ী কী করবেন? ফলে বঙ্গবাজারের মতো বড় কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটগুলো চাইলেই ভেঙে ফেলা সম্ভব না। আবার এভাবে দিনের পর দিন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে চলতে দেওয়াও উচিত নয়। এই জটিল সমস্যা সমাধানে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসতে হবে। একবারে না হলেও ধাপে ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটগুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের তালিকা করে, দোকান ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিকল্প ব্যবস্থা করে পুরোনো মার্কেটগুলো ভেঙে নতুন আধুনিক নিরাপদ মার্কেট বানাতে হবে। নইলে আগুন লাগলেই বারবার সন্দেহ উঠবে, আগুন লেগেছে, নাকি মার্কেট খালি করার জন্য লাগানো হয়েছে?
২০টি ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট বা ১৩ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ দোকানের বিষয়টি সমাধান করতে হবে মানবিকভাবে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, সবার আগে নিরাপত্তা, সেফটি ফার্স্ট। জীবিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ জীবন।
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ



