সরকারি তথ্য-উপাত্তে দেখা যায় দেশে কোনও রোগী ১০০ টাকা খরচ করলে তার ৬৯ টাকায় ব্যয় হয় নিজের পকেট থেকে। আর ২০ টাকা বহন করে সরকার– যা স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু খরচে দক্ষিণ এশিয়া তো বটে পুরো বিশ্বে সবচেয়ে নিচের দিকে। গেলো ২ দশকে এ খরচটা আবারও কমেছে আনুপাতিক হারে। ২০০০ সালে ৩৩ টাকা থেকে ২০২০ সালে ২৩ টাকা ৩০ পয়সা নেমেছে।
আন্তর্জাতিক মান বিচার করলে দেশের মোট বাজেটের অন্তত ১২ থেকে ১৫ ভাগ বরাদ্দ থাকা উচিত স্বাস্থ্য খাতের জন্য। তবে বাংলাদেশে এই হার ৫ শতাংশের আশেপাশে। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক হিসেবে দেশের এক একজন মানুষের জন্য শুধু চিকিৎসায় সরকারের প্রতি মাসে খরচ ৩৫০ টাকার মতো। প্রশ্ন হলো এ টাকাতে আদৌ কি ন্যূনতম চিকিৎসাও সম্ভব?
২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে স্বাস্থ্য খাতে মাত্র ৩৩ শতাংশ অর্থ খরচ হয়েছে। খরচ হয়নি ৬৭ শতাংশ। অপ্রত্যাশিতভাবে যে অর্থ বরাদ্দ পেয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেই সাড়ে ছত্রিশ হাজার কোটি টাকার এভাবে অপচয় পৃথিবীর কোথাও কি আর হয়েছে?
খরচের সিংহভাগ অংশ যেখানে চলে যায় সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতায়, সেখানে সাধারণ রোগীর কপালে কতটুকু অর্থ জুটতে পারে তা অনুমেয়। আবার স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়নে যে ধরনের খরচ সরকারের করা উচিত তা কখনোই হচ্ছে না। ফলাফল বাজেটের অংক মোটা হচ্ছে কিন্তু খরচ করতে না পারার ফলে যে ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে তা পুরো স্বাস্থ্য খাতকে ভঙ্গুর করে দিচ্ছে।
হাসপাতালের উন্নয়ন, যন্ত্রপাতির উন্নয়ন, রোগীর সেবার মান বৃদ্ধি ও নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরিতে সরকারের যেখানে বিনিয়োগ আরো সঠিক, স্বচ্ছ, এবং বড় হওয়া উচিত সেখানে স্বাস্থ্য খাতে অর্থ খরচ করতে না পারার ব্যর্থতা সকলকেই আসলে ভাবাচ্ছে।
মহামারি পরবর্তী সময়ে সরকার স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নে যে ধরনের খরচের কথা বলেছিল এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করে যে অবস্থানে নিয়ে এসেছিল তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় খরচের টাকা কোনও ঠিকাদারকে দিতে পারেনি সরকার। সেই সাথে এখন বহির্বিশ্বের সংকটের দোহাই দিয়ে স্বাস্থ্য খাতকে যেভাবে ভঙ্গুর করে দেওয়া হচ্ছে তা অবশ্যই পরিকল্পিত। ফলাফল চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে সাধারণ মানুষ। সংকটের মাঝে দেশের অর্থনীতি সুপরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ফাঁকফোকর দিয়ে আবারও যে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে তা সোজা চোখেই দেখা যায়।
গত বছর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় সাড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এই বছরের বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার বায়ান্ন কোটি টাকা। প্রায় ৭ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট দিয়ে আদতে কোনও উন্নয়ন তো হবেই না বরং অর্থ পড়ে থাকার যে উপায় সৃষ্টি হবে তা নিয়ে তৈরি হবে জটিলতা।
বেসরকারি খাত বারবার এগিয়ে আসবে এবং স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নে একলা কাজ করে যাবে। সরকারি নীতি নির্ধারণের ভুলে সাধারণ জনগণ দেশের অর্থ বিদেশে খরচ করে যখন স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে আসবে তখন আদতে কারোই উপকার হবে না।
আমাদের উচিত অগ্রাধিকারমূলক ভিত্তিতে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে অর্থব্যয়ের যে বিষয়টুকু রয়েছে সে জটিলতাটুকু কাটানো। আধুনিক যন্ত্রপাতি, অভিজ্ঞ ডাক্তার, মান উন্নয়ন এবং গবেষণার মাধ্যমে পুরো স্বাস্থ্য খাতকে সঠিকভাবে সাজানো।
বৈশ্বিক যে পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে তাতে দেশের ভেতরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে অগ্রাধিকার মূলক প্রকল্প এবং অর্থের সুষম বন্টন না হলে আমরা এক ভঙ্গুর জাতি সামনে দেখতে পাবো। সতর্ক এখনই হতে হবে এবং সঠিকভাবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে কার্যক্রমের যে ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে তা আরও জোরালো ও শক্ত করতে হবে।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ গ্রাসরুট উইমেন এন্টারপ্রেনিওয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন




