বর্তমানের এই দ্বিতীয় কোল্ড ওয়ারের শুরুটা বছর বিশেক আগে থেকেই হয়। যদিও স্পষ্ট হয়েছে গত এক দশকের বেশি। এর আগে, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেছিলেন, পৃথিবী হয়তো আর খুব শিগগিরই কোনও কোল্ড ওয়ারে প্রবেশ করবে না। তার বদলে বড় শক্তি বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর এক ধরনের আধিপত্য গড়ে উঠবে তার ‘বেলি স্টেটগুলোর’ ওপর। তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে ‘বেলি স্টেটগুলোর’ রাষ্ট্রক্ষমতাসহ অনেক কিছু। এবং এই আঞ্চলিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে ওই সময়ের বিশ্বের একক শক্তি আমেরিকা সবসময়ই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করবে। সেক্ষেত্রে অঞ্চল ভেদে আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভর করে আমেরিকা এগিয়ে যাবে। এছাড়া আমেরিকা আরও মনে করেছিল, তার নিজের সামরিক শক্তি ও সরাসরি সামরিক উপস্থিতিই তার জন্যে যথেষ্ট হবে।
কিন্তু গত এক দশকে চীনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি এতই দ্রুত ঘটছে, যা গত দুই দশক আগের হিসাব-নিকাশ অনেক বদলে দিয়েছে। যেমন, বিশ বছর আগের আঞ্চলিক শক্তি চীন, ভারত ও রাশিয়ার বেলি স্টেটগুলোর হিসাব ছিল ভিন্ন। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেছিলেন, রাশিয়ার বেলি স্টেটের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাশিয়ার ওপর। সেক্ষেত্রে অনেকে মনে করেছিলেন, রাশিয়া হয়তো ইস্টার্ন ইউরোপের কিছু দেশের ওপরও তাদের কর্তৃত্ব রাখবে। তেমনি সাউথ এশিয়ার ছোট আঞ্চলিক শক্তি ভারতও তার বেলি স্টেটগুলোর ক্ষেত্রে একই ভূমিকা রাখবে। এই দুই ক্ষেত্রে অতীতের রাজনৈতিক যোগ ও সাংস্কৃতিক মিলনকেই বড় শক্তি হিসেবে মনে করা হয়েছিল। পাশাপাশি ছিল বাণিজ্যিক সম্পর্ক। অন্যদিকে জাপান ও কোরিয়ায় আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌশক্তি’র বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সাউথ ইস্ট এশিয়া চীনের বেলি স্টেট হলেও সেখানে আমেরিকার আধিপত্যই থাকবে। আর এভাবেই গত দশক পর্যন্ত চলেছিল।
গত পাঁচ বছরে দ্রুত এই হিসাব সেখানে বদলে যাচ্ছে। লাও ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী বর্তমানে সাউথ ইস্ট এশিয়ায় কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ডিপ্লোমেসি, ইকোনমি ও ডিফেন্স, তিন দিক থেকেই আমেরিকার থেকে অনেক বেশি এগিয়ে চীন। তাছাড়া চীন তাদের উলফ ওরিয়র ডিপ্লোমেসিতে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে খুবই সাফল্যের সঙ্গে সে দেশের দুর্নীতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি নেক্সাস গড়ে তুলেছে। আর এ সত্য এখন স্পষ্ট যখন কোনও দেশের সরকার প্রধান থেকে শুরু করে রাজনীতির ও প্রশাসনের বড় অংশ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তখন ব্যবসায়ীরা খুব সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের গাভীর পরিবর্তে বাছুরের অবস্থানে নিয়ে যায়। অর্থাৎ তখন গাভী নিজেই দুধ দেবার জন্যে বাছুরের পিছে পিছে দৌড়ায়। ব্যবসায়ীরা রাজনীতিকদের ফান্ড জোগান দেবে এটাই স্বাভাবিক। আর রাজনীতিকদের এ ফান্ড জোগান দিয়ে তারা তাদের কিছুটা ব্যবসায়িক সুবিধাও আদায় করার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে কম দুর্নীতিগ্রস্ত ও শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামোর দেশে ব্যবসায়ীদের অবস্থান থাকে গাভীর মতো। গাভী যেমন দুধ দেবার জন্যে বাছুরের পিছে পিছে দৌড়ায়– ব্যবসায়ীরা ঠিক তেমনি রাজনীতিকদের পিছে পিছে দৌড়ায়। অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর অবস্থান আগেই উল্লেখ করেছি। সেখানে রাজনীতিকরাই গাভী হয়ে যায়। তারাই ব্যবসায়ীকে দুধ দেবার জন্যে তাদের পিছে পিছে দৌড়াতে থাকে। স্বাভাবিকভাবে যখনই কোনও দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যবসায়ীদের অধীনে চলে যায় সে সময়ে ব্যবসায়ীরা শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত ও লুটেরা হয় না, তারাই হয়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী অংশ। আর এই দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতাশালী অংশের সঙ্গেই অসাধু যোগ গড়ে তোলাই এসব দেশে চীনের ডিপ্লোমেসির অংশ। এসব মিলে বর্তমানের বাস্তবতা, দরিদ্র ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলো কোনোমতেই চীনের অর্থকে অস্বীকার করতে পারছে না এবং পারবে না।
অন্যদিকে পরিবর্তিত এই পৃথিবীকে আরও বদলে দেয় হংকংয়ের কোনোরূপ স্বকীয়তা না রাখা। এবং তার জন্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগ। এর পরপরই রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ। ইউক্রেন এখন বাধ্য হয়ে ন্যাটোর সদস্য হবার জন্য সব কিছু করছে। এবং হয়তো দ্রুতই ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হয়ে তার অস্তিত্বকে দৃঢ় করবে।
এমনি একটি পরিবর্তিত সময়ে আমেরিকার প্রয়োজনীয় ও ঘনিষ্ঠ হলেও ভারতের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্র যেমন ভিন্ন, তেমনি তার ব্যবসায়িক স্বার্থও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। যেমন, আমেরিকার অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এ মুহূর্তে আমেরিকার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বন্ধু দেশ তিনটি। ভারত, ইসরাইল ও পোল্যান্ড। এরপরও বাস্তবতা হলো আমেরিকা কখনও চিন্তা করবে না, ব্রিটেনের মতো হবে ভারত তার জন্যে। এমনকি আমেরিকা এ চিন্তাও করবে না ভারত ন্যাটোর সদস্য হবে। তাই ইন্দো-প্যাসিফিকের মূল উদ্যোক্তা শুধু নয়, ভারত সরাসরি যোগ না দেওয়া অবধি ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক ও বাণিজ্যিক জোট কোয়াডের কার্যক্রম শুরু হয়নি। তারপরও অপর প্যাসিফিক সামরিক জোট আকুস (অটকটঝ)-এ কিন্তু ভারত নেই। তাছাড়া আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা'র মধ্যেও ভারত কিন্তু শুরু থেকে সব ধরনের ব্যবসা করে আসছে ইরানের সঙ্গে। আবার বর্তমানে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও ভারত তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ঠিকই বজায় রেখেছে রাশিয়ার সঙ্গে।
আর এই বাস্তবতার পরেও ভূ -রাজনৈতিক কারণে যেমন ইসরাইল ও পোল্যান্ড আমেরিকার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বন্ধু, ভারতও তেমনি এ এলাকায় আমেরিকার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বন্ধু। এই প্রয়োজনীয়তা মনমোহন সিংয়ের আমল থেকে ভারত ও আমেরিকা উভয়ে উপলব্ধি করলেও এবারের উপলব্ধি বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ছিল। কারণ, তখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আধিপত্য যেভাবে দেখা বা হিসাব করা হচ্ছিল, বর্তমানের প্রেক্ষাপট একেবারে ভিন্ন। বর্তমানের এই দ্বিতীয় কোল্ড ওয়ারে- প্রথম কোল্ড ওয়ারে ভারতের নেতৃত্ব সামরিক জোটের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করে যে ভুল করেছিল– ওই ভুল দ্বিতীয়বার ভারত করার পথে হাঁটেনি। কারণ, ১৯৫৮ সালে আমেরিকা যেভাবে ভারতের দিকে হাত বাড়িয়েছিল, ভারত যদি সেটা গ্রহণ করতো, তাহলে আজ বিশ্ব প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতো। এমনকি ভারতের ভাষায় তারা পাকিস্তানকে দুই ভাগ করতে সমর্থ হয়েছে ১৯৭১ সালে। বাস্তবে ১৯৫৮-এ ওই বন্ধুত্ব হলে– এর বহু আগে পাকিস্তানের ভূগোল অনেক বদলে যেতো। তাই ১৯৪৮ বা ১৯৫৮-এর ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে এবার ভারত ন্যাটো বা আকুসের মতো না হয়েও আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পার্টনার হবার পথে চলেছে। এবং মোদির এই সফরের মূলও ছিল সেটাই।
যদিও আমেরিকার স্বাধীন গণমাধ্যমের অনেক আঘাত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সহ্য করতে হয়েছে। সহ্য করতে হয়েছে বাইডেনকে। বাস্তবে যা গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য। আর গণতন্ত্রের এই সৌন্দর্যগুলো কিছুটা হলেও আমেরিকা বাঁচিয়ে রেখেছে বলেই সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভিয়েতনাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক ভুল করলেও আমেরিকা গণতান্ত্রিক বিশ্বের অন্যতম দেশ হিসেবেই নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।
তাই আমেরিকান প্রেসের সব সমালোচনাকে সম্মান করেই বাইডেন ও মোদি বা আমেরিকা ও ভারত সফল হয়েছে মোদির এ সফরে আধুনিক সামরিক চুক্তি করতে। যার ভেতর দিয়ে ভারত রাশিয়ানির্ভর (এককালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) সামরিক অবস্থান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। এবং নিজে সমর্থ হবে সমরাস্ত্র ও সমরাস্ত্র সংক্রান্ত ইনফরমেশন টেকনোলজিকে আধুনিকায়ন করতে।
দরিদ্র জনভারক্লিষ্ট ভারতের এভাবে আমেরিকার হাত ধরে সামরিক শক্তি হবার পথে হাঁটার কাজটি তার নিজের দেশেও উদার গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে সমালোচিত হবে। সমালোচিত হবে সারা বিশ্বের উদার গণতান্ত্রিক মানুষের কাছেও। তারপরেও পরিবর্তিত বিশ্বে বা দ্বিতীয় এই কোল্ড ওয়ারে হয়তো ভারতের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এটাই তাদের জন্যে সঠিক পথ। কারণ, চীন যেখানে প্রতিমুহূর্তে শুধু নিজে নয়, ভারতের নিকট সব প্রতিবেশী দেশে তাদের সামরিক আঙুলগুলো এগিয়ে দেবার চেষ্টা করছে, সেখানে ভারত তার অতীতের পথকে হয়তো আর সঠিক মনে করছে না। তারা মনে করছে, ইতিহাস, কৃষ্টি, সৌহার্দ্য এগুলো দিয়ে খুব বেশি দিন নিজের অবস্থান ধরে রাখা যাবে না। এমনকি নিজের বহিঃনিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়বে। আর এই দুই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে তাকে আধুনিক সমরাস্ত্রনির্ভর সমর শক্তিই হতে হবে। তাতে বন্ধুত্ব না মিললেও সমীহ মিলবে। এমনকি ভবিষ্যতে হয়তো ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের অন্যতম প্লেয়ারও সে হতে পারবে।
বর্তমানের সব হিসাব যে ভবিষ্যতে মেলে তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা যে হিসাব করেছিল তার সবকিছু মেলেনি। পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্র অধিক সমরশক্তি অর্জন করতে গিয়ে শেষ অবধি মুশকিলেও পড়েছে। তারপরও সবসময়ই বর্তমান বাস্তবতাকে রাজনীতি বা কোনও রাষ্ট্র বড় করেই দেখে। আর সে হিসাব-নিকাশ থেকেই হয়তো মোদির আমেরিকা সফরে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে আমেরিকার বিশ্বস্ত ডিফেন্স পার্টনার হবার বিষয়টি। আর সেটাকেই ভারত এ সফরের সফলতা হিসেবেই ধরে নিচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত




