নির্বাচনি ইশতেহারে সংস্কৃতি অঙ্গন ব্রাত্য কেন?

শাকিলা জেরিন
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫৬আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:৪৪

রাজনীতির মঞ্চে এখন নির্বাচনি উত্তাপ। চায়ের কাপ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সর্বত্রই এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমীকরণ। ইশতেহারের পাতা ভরে উঠছে উন্নয়ন, অর্থনীতি, নিরাপত্তাসহ নানান প্রতিশ্রুতির অঙ্কে। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আলোচনায় একটি বিষয় আশ্চর্য রকম অনুপস্থিত- এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কোথাও নেই দেশের শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির কথা। যেন একটি রাষ্ট্র শুধু অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, পররাষ্ট্রনীতি আর জিডিপির যোগফল; মানুষের মন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সেখানে গৌণ।

একটি জাতি যখন তার গণতান্ত্রিক উত্তরণের স্বপ্ন দেখে, তখন তার আত্মপরিচয়ের প্রধান স্তম্ভ ‘সংস্কৃতি’ কেন ব্রাত্য হয়ে পড়ে, সেই প্রশ্নই এখন উঠে আসছে।  

শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি কোনও বিলাসিতা নয়; এগুলো জাতির আত্মা। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি সে দেশের মানুষের চিন্তা, কল্পনা ও সৃজনশীলতায়। অর্থনীতি মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করে, সংস্কৃতি শেখায় কীভাবে বাঁচতে হয়। শিল্পী, লেখক, নাট্যকার, সংগীতশিল্পীরা কেবল বিনোদন দেন না- তারা সমাজের আয়না। তাদের কাজে ধরা পড়ে সময়ের ক্ষত, স্বপ্ন আর প্রতিবাদ। রাজনৈতিক দলগুলো যখন সংস্কৃতিকে এড়িয়ে যায়, তখন তারা আসলে নাগরিককে কেবল ভোটার হিসেবে দেখে, মানুষ হিসেবে নয়। অথচ একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য দরকার সচেতন, সংবেদনশীল নাগরিক—যার ভিত্তি গড়ে ওঠে সাহিত্যপাঠ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়।

একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকতে পারে, কিন্তু তার যদি উন্নত রুচি ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি না থাকে, তবে সেই সমাজ উগ্রতা আর অসহিষ্ণুতার ঊর্বর ভূমি হয়ে ওঠে। এর প্রমাণ বাংলাদেশ পেয়েছে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাস্তায় নেমেছিল। প্রতিবাদ মিছিল, গান, পথ নাটক, গ্রাফিতিতে আশার আলোয় জেগে উঠেছিল দেশ। বছর ঘুরতেই গ্রাফিতির ফিকে হয়ে যাওয়া রঙের সাথে ফিকে হয়ে গেছে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমরা সংস্কৃতির ওপর নজিরবিহীন আঘাত লক্ষ করেছি।

বাংলাদেশের দুই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রগতিশীল ধারার ধারক- বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও ছায়ানটের কার্যালয়ে ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বারবার উগ্রবাদী বা স্বার্থান্বেষী মহলের নিশানা হয় এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ হলো বাউল গান ও লালন দর্শন। সাম্প্রতিক সময়ে কুষ্টিয়া ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন স্থানে বাউল আখড়া ভাঙচুর এবং সাধুদের লাঞ্ছিত করার খবর পাওয়া গেছে। মরমী সাধকদের জীবনযাপনকে ‘অশ্লীল’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে ট্যাগ দিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বিচারগানের অনুষ্ঠানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে। বাউলশিল্পী আবুল সরকারের ভক্তদের ওপরও হামলা করা হয়।

সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসনের আরেক উদাহরণ সিনেমা হলে হামলা। জুলাই আন্দোলনের সময় ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছিল পাঁচটি সিনেপ্লেক্স। নারায়ণগঞ্জের গুলশান সিনেপ্লেক্স, সিরাজগঞ্জের রুটস সিনেক্লাব, রাজশাহীর স্টার সিনেপ্লেক্স, নাটোরের আনন্দ সিনেপ্লেক্স এবং চট্টগ্রামের সিলভার স্ক্রিন। বাদ যায়নি থিয়েটার অঙ্গনও। ১ নভেম্বর দেশ নাটক প্রযোজিত নাটক নিত্যপূরাণ মঞ্চায়নের সময় শিল্পকলা একাডেমির সামনে বিক্ষোভ করেন ২০ থেকে ২৫ ব্যক্তি। বিক্ষোভের মুখে নাটকটির মঞ্চায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক বন্ধ, নাটক ও চলচ্চিত্রের নারী তারকাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ, ‘তৌহিদী জনতা’ তথা ‘বিক্ষুব্ধ মুসল্লিদের’ দাবির মুখে দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করার মতো অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। ধ্বংস করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা, ভাস্কর্য, মাজারসহ নানান স্থাপনা। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে সারা দেশে প্রায় পনেরশ ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়েছে। এর মধ্যে যেমন ছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য, তেমনি ছিল শিল্পীর হাতের সাধারণ শিল্পকর্মও। বন্ধ হয়েছে একের পর এক কনসার্ট, গত ২৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলা স্কুলের ১৮৫তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী জেমসের কনসার্টে উচ্ছৃঙ্খল জনতার ইট নিক্ষেপ ও হামলায় পণ্ড হয়েছে। এর বাইরেও শিল্প-সংস্কৃতির ওপর হামলার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে। এই ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক হলেও নতুন কিছু নয়। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে। বাউলদের ওপর আক্রমণের ইতিহাসও রয়েছে। শিল্প-সংস্কৃতির ওপর এমন পরিকল্পিত বা স্বতঃস্ফূর্ত আঘাত প্রমাণ করে যে, আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের তালিকায় ‘সংস্কৃতি’ কতটা পিছিয়ে। অথচ কোনও দলের নির্বাচনি প্রচারণায় নেই দেশের শিল্প-সংস্কৃতি রক্ষার, চর্চার পরিবেশ গড়ে তোলার কোনও প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক দলগুলো যখন সংস্কৃতিকে এড়িয়ে কেবল পেশিশক্তি আর অর্থনৈতিক সংখ্যাতত্ত্বের রাজনীতি করে, তখন সমাজ মানসিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

আমাদের মনে রাখা জরুরি যে এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছিল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন- ‘ভাষা আন্দোলন’ দিয়ে। ১৯৫২-এর একুশ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সংস্কৃতি ছিল আমাদের অন্যতম অস্ত্র। আজ যদি রাজনীতির ময়দান থেকে সংস্কৃতি হারিয়ে যায়, তবে আমরা কি সেই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হচ্ছি না?

রাজনৈতিক মুক্তি হয়তো একটি আন্দোলনে আসে, কিন্তু সাংস্কৃতিক মুক্তি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। সাংস্কৃতিক মুক্তি ছাড়া মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকে ঔপনিবেশিক বা স্বৈরাচারী মানসিকতা দূর হয় না। যখন শিল্প-সাহিত্যের চর্চা রুদ্ধ হয়, তখন উগ্রবাদ এবং অসহিষ্ণুতা সেই শূন্যস্থান দখল করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘সংস্কৃতিহীন রাজনীতি’ আমাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে যেখানে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা নেই, আছে কেবল ঘৃণার চাষাবাদ।

রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রশ্ন—সংস্কৃতি কি কেবল নির্বাচনের আগে শিল্পীদের মঞ্চে আনার মাধ্যম? একটি নির্বাচনি থিম সং মাত্র? আপনাদের ইশতেহারে কেন গ্রাম বাংলার লোকসংগীত রক্ষা, লাইব্রেরি আন্দোলন কিংবা প্রান্তিক শিল্পীদের সুরক্ষায় কোনও দিকনির্দেশনা নেই?

নির্বাচনি ইশতেহার শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রোডম্যাপ নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ দর্শন। সেখানে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জায়গা না থাকলে সেই দর্শন অসম্পূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত— সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা, শিল্পীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার পরিকল্পনা দেওয়া, শিক্ষা ব্যবস্থায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির গুরুত্ব বাড়ানোর রূপরেখা উপস্থাপন করা, ভাষা ও লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি ঘোষণা করা। এগুলো কোনও অতিরিক্ত দাবি নয়; এগুলো একটি সভ্য রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়।

একটি জাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকার জন্য কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জিডিপি বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি সংবেদনশীল সমাজ, যা তৈরি করতে পারে কেবল শিল্প, সাহিত্য ও আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। আমরা এমন এক আগামীর বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে দেশের প্রতিটি জনপদে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি থাকবে, যেখানে শিল্পীদের নিরাপত্তা এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে। অন্যথায়, আমরা হয়তো একটি উন্নত রাষ্ট্র পাবো, কিন্তু হারাবো আমাদের বাঙালি সত্তাকে।

এই লেখাটি যখন লিখতে বসি তখন অব্দি বিএনপি তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, প্রচারণাই লক্ষ করছিলাম। এরপর একে একে এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী এবং শেষে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। অন্য দলগুলো তাদের ইশতেহারে সংস্কৃতির বিষয়টি উপেক্ষা করলেও বিএনপি তাদের ইশতেহারে সংস্কৃতির মতো বিষয়টি রেখেছে, যা সত্যি সাধুবাদ জানানোর মতো। তবে বিএনপি তাদের ইশতেহারে ৪টি পয়েন্টে বলা হয়েছে ঐতিহ্য রক্ষা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যকর বিনোদন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির কথা। তবে বিশদভাবে বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা না থাকায় কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দেশীয় সংস্কৃতির পরিপন্থি বা জাতীয় সংস্কৃতির সংজ্ঞা ও পরিসর কী? জাতীয় মূল্যবোধবিরোধী চর্চা বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু জাতীয় মূল্যবোধ বলতে কী বোঝানো হয়েছে। অতীতের বাংলাদেশের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইচ্ছে ও পছন্দ অনুযায়ী এবং দলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েরই প্রচারণা চালায়, চর্চার পরিবেশ তৈরি করে। শুধু সংস্কৃতিই নয়, দেশের ইতিহাসও দলগুলো তাদের স্বার্থে বদলে ফেলে। তাহলে জাতীয় মূল্যবোধের পরিসর কে নির্ধারণ করবে?

লেখক: সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের ৩১ দফা অঙ্গীকারও মানছে না: আখতার হোসেন
বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের ৩১ দফা অঙ্গীকারও মানছে না: আখতার হোসেন
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
সর্বশেষসর্বাধিক