নতুন সরকারের কাছে যা চাই, যা চাই না

উমর ফারুক
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৪২আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:০৫

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক আকাশে যে পরিবর্তনের রেখা আঁকা হয়েছে, সেটি নিছক ক্ষমতারেখা নয়; এটি এক দীর্ঘ সঞ্চিত প্রত্যাশা, হতাশা, রাগ, আকাঙ্ক্ষা ও সংশয়ের সম্মিলিত রূপরেখা। বিএনপির এই বিজয়কে যদি কেবল ক্ষমতার রদবদল হিসেবে দেখা হয়, তবে বাস্তবতা ধরা পড়বে না। এই নির্বাচনকে সময়ের এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমানের সংকট এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা একসুতোয় গাঁথা।

এই নির্বাচনের আগে দেশের ভেতর যে মানসিক আবহ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল বহুমাত্রিক। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ, জননিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তি, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়, রাজনৈতিক মেরুকরণে ক্লান্তি, মুক্তিযুদ্ধের বয়ানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, ধর্মীয় আবেগের ব্যবহার, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্ন- সব মিলিয়ে এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক টানাপোড়েন, যার অভিঘাত এখনও পুরোপুরি অস্তমিত হয়নি। ভোটারদের একটি অংশ সক্রিয়ভাবে পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, একটি অংশ শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর একটি বড় অংশ নীরব থেকেছে। এই নীরবতার মধ্যেও বার্তা আছে। গভীরতর বার্তা আছে।

রাজনৈতিক তত্ত্বে বলা হয়, গণতন্ত্রে নির্বাচন অনেক সময় “রেট্রোস্পেকটিভ জাজমেন্ট”- অতীতের মূল্যায়ন। ভোটাররা কেবল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেখে না; তারা বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা বিচার করে। অর্থনৈতিক কষ্ট, কর্মসংস্থানের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা- এসব অভিজ্ঞতা ভোটের বাক্সে অনুবাদিত হয়। কাজেই নতুন সরকারের সামনে প্রথম দায়িত্ব হলো এই রায়ের প্রকৃতি বোঝা। রায়ের ভাষা বোঝা। এটি নিছক সমর্থনের জোয়ার নয়; বরং এক সংশোধনের নির্দেশ বৈকি! নতুন এই সরকারের কাছে জনগণের ব্যাপক প্রত্যাশার চাপ।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা: ঘরের হিসাব বনাম রাষ্ট্রের হিসাব

গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছে। প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ, বাজেট ঘাটতি- এসব নিয়ে আলোচনা চলেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির চেহারা ভিন্ন। মাস শেষে হাতে কত থাকে, বাজারে গেলে কত খরচ হয়, সন্তানের পড়াশোনা শেষ হলে চাকরি পাওয়া যায় কিনা- এসবই তাদের বাস্তব সূচক। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে এই দৈনন্দিন হিসাব বড় ভূমিকা রাখে।

১৯৯০-এর দশকে পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসন থেকে বেরিয়ে বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রবেশের সময় তীব্র মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের মুখোমুখি হয়েছিল। প্রথম কয়েক বছর কষ্ট বাড়লেও কাঠামোগত সংস্কার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেশটিকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল করে। সংকটকে তারা রাজনৈতিক প্রতিশোধে নয়, নীতিগত সংস্কারে রূপান্তর করেছিল।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন, কিন্তু শিক্ষা একই- অর্থনৈতিক সংকটকে রাজনৈতিক স্লোগানে ঢেকে রাখা যায় না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা, আমদানি-রফতানির ভারসাম্য, কৃষি ও শিল্পে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ- এসবকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যদি কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে না পারে, তবে তা স্থায়ী সমাধান নয়। বর্তমানে বাংলাদেশ খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব এবং তা করতেও হবে। জনপ্রত্যাশার সূচনা এখান থেকেই।

তরুণ সমাজ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না নতুন সূচনা?

এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সক্রিয়তা রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন রেখা এঁকেছে। তারা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে সুযোগের রাজনীতি চায়। চাকরি, দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ- এসব তাদের অগ্রাধিকার। দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্বের চাপ যে মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে, তা ইতিহাসে বহুবার রাজনৈতিক বিস্ফোরণের কারণ হয়েছে।

২০১৯ সালে সুদানে দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার নেতৃত্বে ছিল তরুণরা। শাসক পতনের পরও চ্যালেঞ্জ ছিল বিশাল, কিন্তু অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক কাঠামো গঠনের চেষ্টা দেখিয়েছে। তরুণদের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি। আবার ১৯৯৮ সালের পর ইন্দোনেশিয়ায় ছাত্র আন্দোলন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ খুলে দেয়, যা ধীরে ধীরে শক্তিশালী বহুদলীয় ব্যবস্থায় রূপ নেয়।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যদি কেবল নির্বাচনি শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে হতাশা বাড়বে। কিন্তু যদি তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তারা উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে। যদি উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে তাদের সুযোগ দেওয়া না হয়, যদি তৈরি করা না হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে জনতুষ্টিও সম্ভব নয়।

নারী ও সমাজ: নীরব শক্তির রাজনীতি

নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ এই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ছিল। সমাজে নারীর অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। রাজনৈতিক বক্তব্যে নারীর উন্নয়ন উচ্চারিত হয়, কিন্তু বাস্তবে নীতিগত সুরক্ষা ও প্রতিনিধিত্বের অভাব থাকলে আস্থা তৈরি হয় না।

ইতিহাস বলছে, গণহত্যার পর রুয়ান্ডার সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বিশ্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। এর ফলে সামাজিক পুনর্গঠন ও আইন প্রণয়নে নারীর ভূমিকা বাড়ে। বাংলাদেশের বাস্তবতা আলাদা হলেও শিক্ষা স্পষ্ট। নারীর অন্তর্ভুক্তি রাষ্ট্রগঠনের শক্তি। ফলে নারীকে আরও অগ্রগামী করতে হবে। শিক্ষা থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনা, সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অধিকন্তু তাদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে ও শঙ্কামুক্ত করতে হবে।

ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়ানো

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং ঐতিহাসিক বয়ান নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন নতুন নয়। কিন্তু এই নির্বাচন দেখিয়েছে, জাতীয় স্মৃতি এখনও জীবন্ত। ইতিহাসকে একচেটিয়া মালিকানায় পরিণত করা যেমন বিভাজন সৃষ্টি করে, তেমনি তাকে অস্বীকার করাও রাজনৈতিক পরিপক্বতার অভাব প্রকাশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি তাদের অতীতের দায় স্বীকার করে শিক্ষা, গবেষণা ও স্মৃতিরক্ষার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চেতনা পুনর্গঠন করে। অতীতকে স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং ভবিষ্যতের ভিত্তি। ফলে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে আমাদের অগ্রগামিতা অসম্ভব। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের অগ্রগামিতা অসম্ভব।

গণঅভ্যুত্থান ও পুনর্গঠন

সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে জনতার ধৈর্য ভেঙে যায়। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই সময় প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু হলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে; সংলাপ শুরু হলে রাষ্ট্র মজবুত হয়। দীর্ঘমেয়াদে, কিংবা ভবিষ্যতে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান কতটুকু প্রাসঙ্গিক থাকবে তা সময় বলে দেবে; কিন্তু আজ তা প্রাসঙ্গিক। ফলে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের মাধ্যমে প্রতিশোধের চক্র এড়িয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ার চেষ্টা করে। আবার চিলির সামরিক শাসন শেষে গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। এসব উদাহরণ দেখায় সংকটের পর সবচেয়ে জরুরি হলো প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন, সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তা।

পরমতসহিষ্ণুতা ছাড়া আমাদের আর কোনও সংকট নেই

বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক না কেন, সবচেয়ে প্রধান ও মৌলিক সংকট হলো পরমতসহিষ্ণুতার অভাব। ক্ষমতা থাকা মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়; বরং সমালোচনা, ভিন্নমত, এবং বিরোধী দলের অবস্থানকে গ্রহণযোগ্যভাবে সহ্য করার সক্ষমতা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য অপরিহার্য। পরমতসহিষ্ণুতা যদি সরকারের অভ্যাস হয়ে ওঠে, তাহলে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সামাজিক বিভাজনের মতো সমস্যা অনেক সহজে সমাধানযোগ্য হয়ে ওঠে। ইতিহাসে দেখা যায়, যেখানে রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা বিদ্যমান ছিল, সেখানে সংকটগুলো সংলাপ ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে; আর যেখানে এটি ছিল অনুপস্থিত, সেখানে অস্থিরতা ও সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

১৯৯০ সালে পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসন থেকে বের হয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং জনগণ প্রাথমিকভাবে কঠোর মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু নতুন নেতৃত্ব যখন বিরোধী দল এবং সমালোচকদের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে, সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে, তখন দেশটি দ্রুত স্থিতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে পারে। একইভাবে, ২০১১ সালের তিউনেশিয়ার বিপ্লব দেখিয়েছে, যেখানে তরুণ ও শিক্ষিত জনগণ একটি দীর্ঘদিনের শাসনকালের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বই সহিষ্ণুতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের মাধ্যমে প্রাথমিক অস্থিরতা থেকে দেশটিকে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায়।

পরমতসহিষ্ণুতা শুধু রাজনৈতিক নীতি নয়; এটি দেশের সামাজিক বন্ধন, জাতীয় আস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিরও ভিত্তি। রাষ্ট্রযন্ত্র যদি সমালোচনা, নীরব অসন্তোষ বা ভিন্নমতকে শত্রু মনে করে, তবে ক্ষমতা নিজেই বঞ্চিত হয়। কারণ গণতন্ত্রের শক্তির ভিত্তি হলো আস্থা। অন্যদিকে, যেখানে সহিষ্ণুতা আছে, সেখানে সমস্যার সমাধান হয়ে ওঠে স্থায়ী এবং জনগণ সরকারের প্রতি আস্থা হারায় না। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের পর সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন রাজনৈতিক প্রতিশোধকে সীমিত করে, এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় ও মতাদর্শকে অন্তর্ভুক্তি দিলে দেশটি সংহত এবং স্থিতিশীল হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জনগণ দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার প্রতি সহিষ্ণুতার অভাব দেখে আসছে। নতুন সরকার যদি পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক উত্তেজনা, তরুণদের হতাশা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা- এসব সমস্যা সমাধানের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে। অন্যথায়, ছোটখাটো বিতর্ক বা সমালোচনা মাত্রেই রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা জন্ম দিতে পারে।

যা চাই না: পুরোনো অভ্যাসের প্রত্যাবর্তন

রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, মনে করা যে বিজয় স্থায়ী। আত্মতুষ্টি দ্রুত দম্ভে পরিণত হয়। প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে সাজানো হলে দীর্ঘমেয়াদে সিদ্ধান্তগ্রহণ দুর্বল হয়। পেশাদারিত্ব সংকুচিত হলে রাষ্ট্রের সক্ষমতাই কমে যায়। সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র ভাবা আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে ভয় দেখানো স্বল্পমেয়াদে সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে আস্থা কমায়। প্রশ্নকে সহ্য করার ক্ষমতা ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। উন্নয়নের নামে প্রদর্শনবাদও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশাল প্রকল্প, বড় ঋণ, কিন্তু সীমিত উৎপাদনশীলতা- এসব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বোঝা চাপায়। উন্নয়ন তখন বাস্তব নয়, কাগুজে হয়ে পড়ে। রাজনীতিতে ব্যক্তিগত বিদ্বেষের ভাষা যত বাড়ে, নীতির আলোচনা তত কমে। প্রতিপক্ষকে অমানবিক করে তোলা সহজ; কিন্তু সেই সংস্কৃতি সমাজে স্থায়ী বিভাজন তৈরি করে।

মনে রাখতে হবে, সবচেয়ে সূক্ষ্ম সংকেত আসে নীরবতা থেকে। যারা ভোট দেয়নি বা দ্বিধায় ছিল, তাদের মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ। নীরব অসন্তোষ কখনও কখনও প্রকাশ্য প্রতিবাদের চেয়েও গভীর। সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাসে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংযম ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। দক্ষিণ কোরিয়া এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের পর আর্থিক খাতের সংস্কার করে। আর্জেন্টিনা ঋণ পুনর্গঠন ও সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্থিতি ফিরিয়ে আনে। এসব উদাহরণে দেখায়, সংকট সুযোগে রূপ নিতে পারে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।

বাংলাদেশের সামনে এখন তেমনই এক সুযোগ। অর্থনীতিকে মানবিক করা, রাজনীতিকে সংযত করা, তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো, ইতিহাসকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করা, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়া এসব একসঙ্গে সম্ভব, যদি ক্ষমতাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।

শেষ কথা হলো, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। জনগণের বিচারই শেষ কথা। আজ যারা সুযোগ পেয়েছে, তাদের সামনে সময় সীমিত। ইতিহাস অপেক্ষা করছে এই অধ্যায় কি রূপান্তরের গল্প হবে, নাকি আরেকটি পুনরাবৃত্তি। নতুন সূচনা হয়েছে। এখন দেখা যাক, পথ কতটা বদলায়। আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল সংখ্যার খেলা নয়, মানুষের জীবনের মান বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। যেখানে বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, কৃষকের সঠিক মজুরি, এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। আমরা চাই তরুণরা শুধু ভোটের জন্য নয়, দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অংশগ্রহণ করুক। নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ ও আস্থা সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা দেশের অংশ হিসেবে নিজেকে নিরাপদ মনে করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস শুধু বয়ান নয়, মানবিক ন্যায়, সংহতি ও দায়িত্বের শিক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আমরা চাই একটি মানবিক বাংলাদেশে। আমরা চাই স্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি বাংলাদেশ।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

[email protected]

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বশেষসর্বাধিক