মার্চ ও ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশেষ দুটি মাস। এই দুটি মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার আবেগ, অনুভূতি মুক্তি-সংগ্রামের গল্পগাথা। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, ডিসেম্বরে গিয়ে সেটি বিজয়ের আনন্দে রূপলাভ করে। ফলে মুসলমানদের কাছে রমজান মাস যেমন পবিত্র, তেমনই বাংলাদেশের মানুষের কাছে মার্চ ও ডিসেম্বরও সেরকম পবিত্র মাস হিসেবে গণ্য হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী শাসন অবসানের দেড় বছর পরে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হলো এই মার্চ মাসেই। অথচ অধিবেশনের শুরুর দিনেই জাতীয় সংসদে যেসব ঘটলো, তা অত্যন্ত বেদনার।
জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি তার বীরত্বের জন্য পেয়েছেন বীর বিক্রম খেতাব। সেই হাফিজ উদ্দিন আহমদ যখন স্পিকারের চেয়ারে, তখন এই সংসদে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ড পাওয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া কয়েকজন জামায়াত নেতার জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। মার্চ মাসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে কি মুক্তিযুদ্ধকেই অসম্মান করা হলো না? একজন বীর বিক্রম যখন স্পিকারের চেয়ারে, তখন এই ঘটনা কী করে ঘটলো এবং কোনও ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক ছাড়াই তিনি কী করে এই শোক প্রস্তাব গ্রহণ করলেন?
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনের বৈঠকের পুরো কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করেছে সংসদ টেলিভিশন। সেখানে দেখা গেছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পরে সংক্ষিপ্ত বিরতি শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এ সময় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আরও কয়েকটি নাম যুক্ত করার অনুরোধ জানান। তার প্রস্তাবে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম শোক প্রস্তাবে যুক্ত করার অনুরোধ জানান। স্পিকার তা অনুমোদন করেন।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে উঠে বলেন, শোক প্রস্তাবে কিছু নাম বাদ পড়েছে। সেগুলো বলার জন্য তিনি বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে কথা বলার অনুরোধ করেন। স্পিকার তাকে মাইক দেন। তাহের বলেন, শোক প্রস্তাব একপেশে করে তৈরি করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সংসদকে নিরপেক্ষ ও প্রাণবন্ত করতে আরও সচেতন হওয়া দরকার। এ সময় তিনি আরও কয়েকজনের নাম বলে সেগুলো শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
তার বক্তব্যে মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আবদুস সোবহান, শেখ আনছার আলী, রিয়াসাত আলী, আবদুল খালেক মণ্ডল, হাফেজা আছমা খাতুন, রোকেয়া আনছার, সুলতানা রাজিয়া, রাশেদা খাতুন, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, এ কে এম ইউসুফ, নাজির আহমেদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা এবং মীর কাসেম আলীর নাম আসে। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তোলা শোক প্রস্তাবে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর ছয় জন এবং বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ মোট সাত জনের নাম যুক্ত করার প্রস্তাব আসে। জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, যে নামগুলো বাদ পড়েছে, সেগুলো শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
প্রশ্ন হলো, তিন জন দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব স্বয়ং চিফ হুইপকেই কেন উত্থাপন করতে হলো? এই প্রস্তাব জামায়াতের তরফে আসাটাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত ছিল। এই প্রস্তাব উত্থাপনের পরে সঙ্গে সঙ্গে এতে অনুমোদন না দিয়ে স্পিকার যদি এ বিষয়ে সংসদে আলোচনার একটি পরিবেশ তৈরি করতেন; এই ব্যক্তিদের নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে-বিপক্ষে যদি একটা বিতর্ক হতো—তাহলে দেশবাসী জানতে পারতো মাননীয় স্পিকার কোন যুক্তিতে নামগুলো শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করলেন। কিন্তু বিনা বিতর্কে নামগুলো শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনাটিই বিতর্কের জন্ম দিলো এবং হাফিজউদ্দিন আহমদের মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি জুলাই অভ্যুত্থানের পরে যখন নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করার চেষ্টা হচ্ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের পাকিস্তানি ও জামায়াতি বয়ান প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রীয় আয়োজন শুরু হয়েছিল, তখন তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করেছেন। অথচ সেই মানুষটি যখন স্পিকারের চেয়ারে, তখন মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে শোক প্রস্তাব তিনি কোনও ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক ছাড়াই কেন গ্রহণ করলেন, এই প্রশ্নটি তোলা থাকলো। ভবিষ্যতে তিনি হয়তো এর জবাব দেবেন। হয়তো আমরা তার আত্মজীবনীতে এর প্রশ্নের উত্তর পাবো।
তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে এই প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয় যে যেহেতু বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিজেই একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, অতএব মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে তার দল এবং মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী জামায়াতের অবস্থান কি এক হতে পারে? যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে জামায়াতের যে অবস্থান, বিএনপিও কি সেই একই অবস্থানে রয়েছে?
প্রসঙ্গত, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন নিজামী ও মুজাহিদ। আর সাঈদী ছিলেন সংসদ সদস্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে তারা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের মধ্যে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কারাগারে মারা যান। আর ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাকি ছয় জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ‘প্রমাণিত হওয়ায়’ তাদের দণ্ড দেওয়ার কথা বলা হয় ট্রাইব্যুনালের রায়ে।
শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করাই নয়, বরং মার্চ মাসে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়নি। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তার অগ্নিঝরা ভাষণ এবং ২৫ মার্চ মধ্যরাতে স্বাধীনতার ঘোষণার প্রসঙ্গেও কেউ কোনও কথা বলেননি। বরং সংসদ নেতা, সংসদের সভাপতি, স্পিকারসহ যারাই বক্তব্য দিয়েছেন, তাদের বক্তব্যে মনে হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস শুরু হয়েছে। এর আগে আর কিছু হয়নি! এমনকি সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদে যে দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছেন, সেখানেও তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা তো দূরের কথা, তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গই টানেননি। যদিও তার বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়েই জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ ছিল।
এদিন আরও একটি বেদনার সাক্ষী হয়েছে জাতীয় সংসদ। সেটি হলো, রাষ্ট্রপতি যখন ভাষণ দেওয়ার জন্য সংসদের অধিবেশন কক্ষে এলেন, তখন বিরোধী দল তথা জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। চিৎকার করতে থাকেন। তারা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার ভাষণের প্রতিবাদ জানান। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী এরই মধ্যে জাতীয় সংগীত বাজা শুরু হলেও তখনও বিরোধী এমপিরা হইচই করছিলেন। জাতীয় সংগীত বাজা শুরু হলে দাঁড়ানোর যে নিয়ম, তারা সেটিও মানেননি। বরং চেয়ারে বসে চিৎকার করছিলেন। ততক্ষণে বিএনপির সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে গেছেন এবং সামনের সারিতে থাকা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিরোধীদলীয় সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তখন জামায়াত ও এনসিপির এমপিরা দাঁড়ান। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেছে, তাদের অনেকের দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ তারা যে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছেন, সেটি তাদের শরীরিক ভাষায় স্পষ্ট হয়েছ—যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ইতিহাসে আরও একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলো।
বলা হয় মর্নিং শোজ দ্য ডে। সুতরাং, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত মার্চ মাসে শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনেই যা ঘটলো, অন্তত বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুক্ত এবং এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত জাতীয় সংগীতের প্রশ্নে যেসব ঘটনা ঘটলো, তা ভবিষ্যতে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেবে। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের পাঠেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক




