গত মাসের শেষদিকে নতুন মন্ত্রিসভা তাদের প্রথম বৈঠকেই আসল ও সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষককে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিয়েছে, যারা এতদিন ঋণখেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। প্রায় ৩৫ বছর আগে, বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সরকার ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছিল। কৃষিঋণ মওকুফের এই সংস্কৃতি তার চেয়েও পুরোনো; সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের শাসনামলেও ধ্বংসাত্মক বন্যার পর কৃষকদের সুরক্ষায় সুদ মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
ঐতিহাসিকভাবে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই ধরনের মওকুফ দুর্যোগকালীন সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষার একটি পুনরাবৃত্তিমূলক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিঃসন্দেহে, এই পদক্ষেপগুলো কৃষকদের মানসিক ও আর্থিক ‘স্বস্তির শ্বাস’ ফেলার সুযোগ দেয়। এটি ভবিষ্যতে কৃষকের ঋণের যোগ্যতা বাড়াতে পারে, সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের সংকেত দেয়, বীজ ও সেচকাজে পুনরায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করে এবং গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের হার কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু এর একটি অন্য পিঠও আছে।
যখন সরকার ঋণ মওকুফ করে, তখন তার দায়ভার রাষ্ট্রের ওপর বর্তায় এবং জাতীয় বাজেট থেকে ব্যাংকগুলোকে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঘনঘন ঋণ মওকুফ ঋণের শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে। এটি ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ না করার প্রত্যাশা তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিখাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক, কিন্তু আর্থিক নিয়ন্ত্রক ও নীতি-নির্ধারকদের কেবল মওকুফের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না।
কৃষিঋণের ভেতরে যে পদ্ধতিগত ঋণখেলাপি সংস্কৃতি গেঁথে আছে— যা মূলত দুর্নীতি ও অদক্ষতাপ্রসূত— তা সংশোধন করা জরুরি। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সাময়িক মওকুফ হলো— গভীর ক্ষতে কেবল একটি ব্যান্ড-এইড লাগানো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৩৪ শতাংশ কৃষিঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। যদিও ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কমিয়ে আনার মতো সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তা সামগ্রিক সমস্যার সমাধান নয়।
কৃষকরা প্রায়ই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ির চেয়েও অন্যান্য অনেক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন। দুর্নীতি এখনও একটি বড় বাধা; ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নিয়মিতভাবে বলে এসেছে যে, ব্যাংক ও কৃষি খাতে ঋণ অনুমোদনের জন্য সাধারণ মানুষকে ঘুষ দিতে হয়। স্বল্প আয়ের কৃষকরা এর সবচেয়ে বড় শিকার; ধনী ঋণগ্রহীতাদের তুলনায় তাদের আয়ের বড় অংশই চলে যায় ‘স্পিড মানি’ বা ঘুষের পেছনে।
এছাড়া অর্থনীতির মূল ভিত্তি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে বড় আকারের শস্য বিমা প্রায় নেই বললেই চলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় আমাদের কৃষি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো মাটিতে দীর্ঘমেয়াদী লবণাক্ততা তৈরি করেছে, যা বছরের পর বছর উৎপাদনশীলতা নষ্ট করে কৃষকদের বহু বছরের ঋণের চক্রে আটকে রাখে।
বাহ্যিক ধাক্কাগুলোও মুনাফাকে সংকুচিত করেছে। মহামারীর পর বিশ্ব সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়া, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা— সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংকট বাংলাদেশকে এখনই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। যেহেতু রাসায়নিক সারের সিংহভাগ আমাদের আমদানি করতে হয়, তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ইরানের ওপর হামলা এবং মার্কিন মিত্রদের পাল্টা আক্রমণের মতো ঘটনাগুলো জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যা বিশ্বের ২৭ শতাংশ তেল, ২০ শতাংশ এলএনজি এবং ইউরিয়া ও ফসফেটসহ ৩০ শতাংশ সার রফতানি বহন করে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাণিজ্যকে স্থবির করে দিতে পারে, যা জ্বালানি ও সারের দাম বাড়িয়ে দেবে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) মতে, মজুদ থাকার কারণে তাৎক্ষণিক প্রভাব হয়তো কম বোঝা যাবে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা উৎপাদন কমিয়ে দেবে এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসলের দাম আকাশচুম্বী করবে।
দেশের ভেতরে সরবরাহ চেইন এখনও মধ্যস্বত্বভোগী ও অবৈধ চাঁদাবাজদের দখলে। কৃষক খুব কম মুনাফা পান কারণ সাধারণ পোশাকধারী কিংবা ইউনিফর্মধারী এই মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজরা খামার থেকে নগর ভোক্তা পর্যন্ত প্রতি ধাপে খরচ বাড়িয়ে দেয়। উৎপাদক থেকে বাজার পর্যন্ত পথ সুগম করতে একটি প্রকৃত ‘মধ্যস্বত্বভোগী দূরীকরণ’ প্রক্রিয়া দরকার। সর্বোপরি হিমাগার ও সংরক্ষণ কাঠামোর অভাবে কৃষকরা ফসল ওঠার সময় ‘পানির দরে’ পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন।
সরকারি ব্যাংকগুলো ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ হয়ে এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারির অভাবের কারণে সঠিক ঝুঁকি নিরূপণ ছাড়াই ঋণ দিয়ে থাকে।
সরকারকে এককালীন মওকুফের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খুঁজতে হবে। আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মধ্যমেয়াদী বেলআউট প্যাকেজ’ প্রয়োজন, যার মধ্যে থাকবে দেশব্যাপী কার্যকর শস্য বিমা ব্যবস্থা, সহজতর ভ্যালু চেইন এবং মুদ্রাস্ফীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে শক্তিশালী নীতি ও পরিকল্পনা।
শুধুমাত্র এই পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো দূর করার মাধ্যমেই আমরা সেই হাতগুলোকে প্রকৃত ক্ষমতায়ন করতে পারবো, যারা দেশের সব মানুষের অন্ন যোগায়।
লেখক: সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন



