মার্চের শপথ হোক মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধানের সতীত্ব ও অস্তিত্ব রক্ষার 

কাজী মাসুদুর রহমান
২৪ মার্চ ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১৪:০১

আগুন ঝরা ‘মার্চ’ আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যময় পরিক্রমায় এই শ্যামল বাঙলার ফাগুন কাননে ও বাঙালির বাসন্তী মননে মাসটি ফি-বছর ঘুরেফিরে আসে।১৯৭১ সালের ২ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের বীরোচিত পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে ‘মার্চ’ পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার জানান দিয়েছিল। তখন মার্চজুড়ে প্রতিটি দিন ও মুহূর্ত ছিল খুবই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ও কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ— যা সাড়ে ৭ কোটি মুক্তিপাগল পরাধীন বাঙালিকে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড সৃষ্টিতে প্রবলভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যার অনিবার্য পরিণতি ছিল মুক্তিযুদ্ধ। যার মধ্য দিয়ে বিস্ফোরিত হয়েছিল অদম্য স্বাধীনতার মহাজাগরণ। এবারের মার্চের বিশেষত্ব হলো— গত দেড় বছরে ইউনূসের শাসনামলের ‘রিসেট বাটন’, ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ’ এবং ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ এর মতো মুক্তিযুদ্ধের নীতি-আদর্শ পরিপন্থি ও বাংলাদেশবিরোধী রাষ্ট্রতত্ত্ব (?)-এর  শ্বাসরুদ্ধকর বিতর্কিত পরিস্থিতির কোপানল পেরিয়ে নবচেতনে নবোদ্যমে দেশবাসী তার গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বীরোচিত ইতিহাসকে মনন্তকরণে উপলব্ধি করতে যাচ্ছে। বলাবাহুল্য, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও তার সমর্থিত বিতর্কিত কিছু বিশেষ গোষ্ঠী ‘রিসেট বাটন’ তথা ‘২.০’ তত্ত্বের আলোকে গেল দেড় বছর কিভাবে সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তৎসংশ্লিষ্ট স্মৃতিস্মারকগুলোতে ‘ফ্যাসিজম’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ উৎসের অবাস্তব তথা কাল্পনিক ট্যাগ লাগিয়ে সেগুলোকে চরম অবমাননা এমনকি ক্ষত-বিক্ষত করার মধ্যদিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধস্নাত সংবিধানকে বিপণ্ন করার গভীর ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল, তা আমরা গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি।  

প্রসঙ্গত, আওয়ামী শাসনাধীন বিগত দীর্ঘ ১৫ বছরে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে- রন্ধ্রে দুর্নীতির সিন্ডিকেট, অর্থপাচার, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট কবলিত বাজার অব্যবস্থাপনায় সৃষ্ট দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি ইত্যাদি বিচিত্র সব সুশাসনের অভাবজনিত কারণে সৃষ্ট সুপ্ত জনরোষ এবং তার সঙ্গে চব্বিশের কোটা আন্দোলন পরবর্তী সংঘটিত তাবৎ হতাহতের নজিরবিহীন হৃদয় বিদারক ঘটনাবলি একাকার হয়ে আওয়ামী সরকারের পতনকে অনিবার্য করে তুলেছিল। পর্যায়ক্রমে  সংঘটিত এ হেন সার্বিক পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ ও তার সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে ধিকৃত করে তুলেছে। তবে, নির্মোহ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বলতে গেলে, সুশাসনের অভাবজনিত ফ্যাসিজমের দায় থেকে অবশ্য অতীতের কোনও সরকারই পুরোপুরি মুক্ত নয়। শাসনকালের আনুপাতিকে পার্থক্য শুধু পরিমাণে বা পরিমাপে। পরিলক্ষণীয়, আন্দোলনটি ‘কোটা বিরোধী’ থেকে এক পর্যায়ে 'বৈষম্যবিরোধী' চেতনায় দৃশ্যমান হলেও এর নেপথ্যে উগ্রসাম্প্রদায়িক ও  ক্ষমতালিপ্সু একাধিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা বেশ প্রকট ছিল—যা অভ্যুত্থান পরবর্তী সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কৃতিত্ব দাবির পারস্পরিক বচসায় রীতিমতো পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। তবে, অভ্যুত্থান-উত্তর একটি সত্যিকার বৈষম্যহীন সৃজনশীল রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার লালিত স্বপ্নের (যে স্বপ্ন ১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পূর্বে ও পরে যথাক্রমে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের দীর্ঘ নিষ্পেষণ ও প্রবঞ্চনার আড়ালে এই ভূখণ্ডের গণমানুষের মনে-মননে রোপিত হয়েছিল এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যার সফল অঙ্কুরোদগম ঘটেছিল) সফল বাস্তবায়ন সাধারণ মানুষ এবার দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু বিধি বাম হলো!

এ পরিস্থিতিতে আমরা গভীর বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলাম যে নব্বই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রেজিম পরিবর্তনের এই দ্বিতীয়  'গণঅভ্যুত্থান -২৪' কে 'বিপ্লব' হিসেবে আখ্যায়িত করে অন্তর্বর্তী সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের স্বঘোষিত বিরোধিতাকারী একাধিক চিহ্নিত গোষ্ঠী পারস্পরিক যোগসাজশে সম্মিলিতভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট ইতিহাস ঐতিহ্যে একের পর এক চরম অবমাননাকর আঘাত হানার এমনকি ভূ-লুণ্ঠিত করার নজিরবিহীন অপপ্রয়াস চালাতে থাকে, যা রাজপথের স্মৃতিফলক থেকে পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল। এ হেন তিক্ত ঘৃণ্য বিবরণ এই স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না। এছাড়াও, বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘ফ্যাসিস্ট’-এর দোসর ট্যাগিং করে মব দিয়ে চরম অবমাননা করা, এমনকি জুতার মালা পরিয়ে চরম অপদস্থ করার মতো নজিরবিহীন হৃদয় বিদারক ঘৃণ্য ঘটনাও আমরা দেখেছি। উপরন্তু, দেখেছি জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতকে চরম অবমাননা এমনকি পরিবর্তন করারও ঘৃণ্য আস্ফালন। এক্ষেত্রে কথিত আওয়ামী ফ্যাসিজমের দায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চিরায়ত বঙ্গীয় সংস্কৃতির কাঁধে কূটকৌশলে চাপিয়ে দিয়ে সেগুলোকে ‘ফ্যাসিজম’-এর উৎসমূল হিসেবে অপব্যাখ্যায়িত করার নীল নকশাও আঁটতে দেখেছি। এরই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের অমিয় স্লোগান 'জয় বাংলা' এবং বিশ্ব ঐতিহ্যিক, ঐতিহাসিক ও কালজয়ী ৭ মার্চ ভাষণকে স্তব্ধ করতে দেখেছি, যা আজও চলমান।

বলা বাহুল্য,  ভাষা আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক কৃতিত্ব অস্বীকার করার ন্যূনতম সুযোগ নেই। কিন্তু গভীর পরিতাপের বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী আওয়ামী লীগ সেই আদর্শের পথ থেকে ক্রমশ দূরে সরতে থাকে যা তৎকালে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুই তাঁর বচন বক্তৃতায় আক্ষেপের সাথে প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে '৭৫ এ অস্বাভাবিক পন্থায় রাজনৈতিক মেরুকরণ সংঘটনের মধ্য দিয়ে এ দেশের আবহমান সৃজনশীল রাজনীতি তার গতিপথ হারালে আওয়ামী লীগও সেই গড্ডালিকা প্রবাহে অনেকটা ভেসে যায়। কেননা, তখন প্রতিকূলে টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগের যে আদর্শিক ও নৈতিক দৃঢ়তা প্রয়োজন ছিল তা তারা সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে তেমনটা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অবক্ষয়ের মাত্রা পুঞ্জীভূত হতে হতে  সংগঠনটির অধিকাংশ নেতাকর্মীরা একপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে অনেকটাই দূরে সরে যায়। বিশেষ করে, শেষের দুই দশকে এই অবক্ষয়ের মাত্রা বেশ ঘনীভূত হয়ে ওঠে। এ সময় আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মহান রক্ষক সেজে কার্যত অনেকটাই ভক্ষক বনে গিয়েছিল। আওয়ামী নেতাকর্মীদের মুখে ও কাগজে-কলমে মুক্তিযুদ্ধের ফুলঝুরি ফুটলেও কার্যক্ষেত্রে এর আদর্শিক চেতনার ধারায় তারা তেমন দীক্ষিত ও ধাবিত হতে পারেননি। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী তাদের (আওয়ামী) পূর্বকৃত বিচিত্র অপকর্মের‌ দায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির কাঁধে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিকভাবে চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সেগুলো বিপন্ন করার সূক্ষ্ম মেটিকুলাস ডিজাইন আঁটা হয় অন্তর্বর্তী সরকার ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একাধিক চিহ্নিত গোষ্ঠীর যৌথ যোগসাজশে। এ লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন কর্তৃক বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম, মুক্তিযুদ্ধ প্রসূত সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ- চার মূলনীতি'র তিনটি ও 'বাঙালি জাতি' পরিচয় বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছিল যা এই রাষ্ট্র ও জাতির জন্মসূত্রকেই মুছে দেওয়ার শামিল মর্মে সচেতন মহলকে হতবাক করেছিল! এখানেই শেষ নয়; দুই লাখ নারীর বিসর্জিত সম্ভ্রমে ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তে বিধৌত বাংলাদেশের জন্ম সনদ 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র' পরিবর্তন/বাতিলেরও রোমহর্ষক অপচেষ্টা চালিয়েছিল, যা গণবিবেককে করেছিল স্তম্ভিত!

উল্লেখ্য, উক্ত কমিশন  '৭২ সংবিধানের চার মূলনীতি থেকে শুধু গণতন্ত্র রেখে বাকি তিনটি-  জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল, যা মূলত মহান মুক্তিযুদ্ধকেই সাংবিধানিকভাবে অস্বীকারের শামিল মর্মে প্রতীয়মান হয়। লক্ষণীয়, হাজারো বছরের সাংস্কৃতিক আবহে সমৃদ্ধ ও পরিপুষ্ট বাঙালি জাতিসত্তা,  অসাম্প্রদায়িক তথা সর্বজনীন মানবাধিকার ও সাম্যবাদিতার গণমানসিক আকাঙ্ক্ষা এই মূলনীতিমালার মধ্যে প্রতিভাত হয়েছে। ওই মূলনীতিগুলোকে ধারণ করেই তদানীন্তন পূর্ব বাংলার আবহমান রাজনীতি সৃজনশীল ধারায় আবর্তিত হয়ে আসছিল যার সৃষ্টিশীল পরিণতি ছিল 'বাংলাদেশ ' নামক এই জাতিরাষ্ট্রের। এটি অনস্বীকার্য ও অনুভবনীয় যে  মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের ঐতিহাসিক আত্মদান, কমপক্ষে দুই লাখ নারীর সম্ভ্রম ও অসংখ্য মানুষের ক্ষতবিক্ষত ও বিকলাঙ্গের মতো অকৃত্রিম বিসর্জনের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তিস্বরূপ ওই মূলনীতিগুলো সংবিধানে স্থাপিত ও স্বীকৃত। এর প্রতিটি হরফ শহীদের রক্তে পরিশোধিত। বাঙালির অন্তহীন দীর্ঘশ্বাস আর উচ্ছ্বাসে তা শুচিসিদ্ধ। এই সংবিধানের মৌলিক বিষয়াবলি রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সর্বোপরি আপামর জনসাধারণের (স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী কিছু অপাঙক্তেয় গোষ্ঠী বাদে) কাছে চূড়ান্ত মীমাংসিত বিষয়। কিছু চিহ্নিত গোষ্ঠী বাদে স্বাধীনতা পূর্বাপর আমাদের শিল্প-সাহিত্য- সংস্কৃতি ও গণরাজনীতি এই নীতিগুলোকে ধারণ করেই আবর্তিত হয়ে আসছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে বাংলাদেশ নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক (আর্য-অনার্য) সূত্রে একটি জাতিরাষ্ট্র যার একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে, যা কখনোই অস্বীকার করা যায় না। পৃথিবীর একমাত্র জাতিই বাঙালি যে তার ভাষার স্বাধীনতার জন্য '৫২ তে অবলীলায় জীবন দিয়ে জাতিরাষ্ট্রের জানান দিয়েছিল, যার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সূত্রে 'বাঙালি জাতীয়তাবাদই হলো এ দেশের রাজনীতির মৌলদর্শন। একমাত্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাই ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে পূর্ববাংলার আপামর জনসাধারণ (কিছু অপাঙক্তেয় বাদে)কে মুক্তিযুদ্ধে এক সূত্রে প্রেমাবদ্ধ করে এই জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল; এই অমোঘ সত্যের ওপর দাঁড়িয়েই '৭২ সংবিধানের এই মূলনীতি প্রণীত হয়েছিল। সুতরাং এই সংবিধানে খোঁচাখুঁচি করা মানে জাতি ও রাষ্ট্রের অস্তিত্বে ক্ষত সৃষ্টি করা এমনকি জাতি-রাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে বিপন্নে ঠেলে দেওয়া, যা কখনোই সমীচীন হবে না। যদিও, '৭৫ পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ছন্দপতনের সুযোগ নিয়ে ভিন্নধারার রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থে তাতে একাধিক ক্ষত সৃষ্টি করা হয়েছিল, যার সংক্রমিত রেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এ দেশ ও জাতিকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এর পচনশীল প্রদাহে জাতীয় রাজনীতি আজ এমনই পক্ষাঘাতগ্রস্ত, যার খেসারত দেশের প্রতিটি মানুষকে দিতে হচ্ছে! কখনও-কখনও এই প্রদাহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কোপানলে পরে এমনই ভয়ার্ত রূপ ধারণ করে, যা ব্যাপক জানমালের ধ্বংস সাধনের মধ্যদিয়ে সাময়িক স্থিতিশীল হয়। এমনিতেই স্বার্থান্ধ ও বিজাতীয়  রাজনীতির বৈরী প্রভাবে জাতীয় ইতিহাস একাধিকবার বিকৃত হয়েছে এবং সেই বিকৃত ধারায় জাতীয় রাজনীতি বারবার হোঁচট খেয়ে বিভ্রান্ত হয়েছে এবং হচ্ছে তার ওপর আবার সংবিধানের মূলনীতিতে এমন আঘাত! এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! এ অবস্থা চলতে থাকলে স্বজাতীয় রাজনীতি বিপন্ন হতে বাধ্য। ফলে, রাষ্ট্র ক্রমশ অস্তিত্ব সংকটে পরতে পারে। বিপন্ন হতে পারে জনজীবন। বলা বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে; তাই ঐতিহাসিক সূত্রে ধর্ম নিরপেক্ষতাই হলো এই রাষ্ট্রের যৌক্তিক ও বাস্তবিক বিধান। সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ দিলে মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই হত্যা করা হবে! ফলে দেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজন প্রকট রূপ ধারণ করবে—যা মোটেও শুভকর হতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী চিহ্নিত একাধিক সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এই রাষ্ট্রের জন্মের পূর্ব থেকেই তাদের মনস্তত্ত্বে সাম্প্রদায়িকতার নামে জাতিগত বিভাজন সৃষ্টির পাঁয়তারা করে আসছে। তারা তাদের রাজনৈতিক দর্শনেও ধর্মনিরপেক্ষতাকে লালন করেন না।

পরিলক্ষণীয়,  জুলাই অভ্যুত্থানকে নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও '৭২ সংবিধান'-এর কবর রচনার জন্য এমনকি রিসেট বাটন পুশিংয়ের মাধ্যমে সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় বাংলাদেশ তথা দ্বিতীয় স্বাধীনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিশ্চয়ই জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়নি। পাশাপাশি,  জাতি ও রাষ্ট্রের মৌলসত্তায় আঘাতের লক্ষ্যেও এই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়নি এবং এসব বিষয়ে ন্যূনতম কোনও ইঙ্গিতেরও সাক্ষ্য-চিহ্ন নাই। অভ্যুত্থানের নেপথ্য কোনও অংশীগোষ্ঠীর মধ্যে যদি এরকম কোনও গুপ্ত স্পৃহা থেকে থাকে, তবে তা হবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া লাখো তরুণদের নিঃস্বার্থ ত্যাগের সাথে ও সর্বোপরি সাধারণ জনগণের সাথে সূক্ষ্ম প্রতারণার শামিল।

দুঃখজনক হলেও সত্য  যে স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও আমাদের জাতীয় রাজনীতি আজও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় পরিপুষ্ট হয়ে ওঠেনি; ফলে রাজনীতিতে স্বদেশ প্রেমের  ঘাটতি বিরাজমান থাকে, যা বিভিন্ন ইস্যুতে অপ্রীতিকর ভাবে ফুটে ওঠে।

উল্লেখ্য, জাতিরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজনীতির মধ্যে যদি জাতিসত্তার উপাদান ও অনুভূতি না থাকে, তবে সেই রাজনীতি অন্তঃসারশূন্য হতে বাধ্য।

পরিশেষে, আমাদের মনে রাখা উচিত মুক্তিযুদ্ধ  কোনও নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়। এটা জাতীয় সম্পদ। সুতরাং কোনও দল বা গোষ্ঠীর ফ্যাসিজমের দায় মুক্তিযুদ্ধের কাঁধে চাপিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল সম্ভ্রমকে অবমানিত কিংবা এর অস্তিত্ব ভূলুণ্ঠিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সুতরাং জুলাই অভ্যুত্থানকে কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধের প্রতিযোগী হিসাবে উপস্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনাকে হেয়জ্ঞান কিংবা ম্লান করার গর্হিত ষড়যন্ত্র আঁটে এবং তদানুযায়ী মুক্তিযুদ্ধস্নাত সংবিধানের মূলনীতিগুলোকে হত্যা করার অপপ্রয়াস চালায়, তবে তা শুধু ছাত্রজনতার বিসর্জনের সঙ্গে প্রতারণার শামিল হবে না, সর্বোপরি স্পষ্টতই দেশবিরোধিতার শামিল বলে পরিগণিত হবে, যা কখনোই কাম্য নয়।

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
ইরানি ইসলামি শাসনবিরোধী শিল্পী মারজান সাত্রাপির প্রয়াণ
ইরানি ইসলামি শাসনবিরোধী শিল্পী মারজান সাত্রাপির প্রয়াণ
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
সর্বশেষসর্বাধিক