নেতৃত্ব, তোষামোদ ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের সংকট 

ড. খালিদুর রহমান
২১ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:১৯

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব শুধু ক্ষমতা নয়, এটি নৈতিক দায়িত্ব ও সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন—যা জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই নেতৃত্বের ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই একটি অস্বাস্থ্যকর সাংস্কৃতিক প্রবণতার দ্বারা প্রভাবিত, যেখানে অন্ধভক্তি এবং অন্ধ ঘৃণার একটি পুনরাবৃত্ত চক্র রাজনীতিকে প্রভাবিত করে চলেছে।

বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্ববিরোধী মানসিক প্রবণতা কাজ করছে, যেখানে কোনও নেতাকে সমর্থন করা মানে তাকে ত্রুটিহীন এক অতিমানব হিসেবে কল্পনা করা এবং বিরোধিতা করা মানে তাকে সব সমস্যার মূল হিসেবে চিহ্নিত করা। এই দুই চরম অবস্থানের মধ্যে যে যুক্তিনির্ভর, সমালোচনামূলক এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থাকা উচিত, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আবেগনির্ভর হয়ে উঠছে এবং গণতান্ত্রিক সংলাপ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা এই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি দেখেছি—যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে একেকজন নেতাকে ঘিরে দেবতুল্য ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে এবং তাদের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা প্রায় সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য আচারে পরিণত হয়েছে। আবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই একই সমাজের ভিন্ন অংশ নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে একই ধরনের মহিমান্বিত বর্ণনা তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদের একটি অধিবেশন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রশংসা ও কাব্যিক উপস্থাপনা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়। চিফ হুইপ নেতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে একাকার করে উপস্থাপন করেন, যা সংসদে আবেগনির্ভর পরিবেশ তৈরি করে। পরবর্তীকালে কবিতার মাধ্যমে নেতাকে দেশের মুক্তির একমাত্র শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এসব উপস্থাপনা অনুপ্রেরণামূলক হলেও বাস্তব মূল্যায়নের ক্ষেত্র সংকুচিত করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় আবেগ ও আনুগত্যকে যুক্তি ও সমালোচনার ওপর প্রাধান্য দেয়।

এই ধরনের অতিরিক্ত প্রশংসা বা তোষামোদের সংস্কৃতি প্রথমে নিরীহ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা একটি গুরুতর সমস্যা তৈরি করে। যখন কোনও নেতৃত্বকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়, তখন তার সিদ্ধান্তগুলোর ওপর কার্যকর নজরদারি থাকে না। ফলে ভুল সিদ্ধান্তগুলোও প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে একটি আত্মতুষ্টির পরিবেশ তৈরি হয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন কোনও সরকার নিজের সমর্থকদের সমালোচনা শুনতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং একসময় সেই বিচ্ছিন্নতা বড় ধরনের সংকটে রূপ নেয়।

এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পেছনে কয়েকটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ব্যক্তিপূজার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আমাদের সমাজে বিদ্যমান, যেখানে রাজনৈতিক দল বা নীতির চেয়ে ব্যক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে একজন নেতার প্রতি আনুগত্য ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বিশ্বাসে পরিণত হয় এবং সেই বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা মানে নিজের পরিচয়কে প্রশ্ন করা বলে মনে হয়। দ্বিতীয়ত, সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চার অভাব আমাদের সমাজকে যুক্তির পরিবর্তে আবেগের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে, যেখানে তথ্যের চেয়ে আবেগ এবং প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতি নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে, যেখানে তারা বিশ্বাস করতে চায় যে, একজন ব্যক্তিই সব সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।

এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো গণতান্ত্রিক কাঠামোর দুর্বলতা। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহি, সমালোচনা এবং অংশগ্রহণ। কিন্তু যখন কোনও নেতাকে সমালোচনার বাইরে রাখা হয়, তখন জবাবদিহি অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া একমুখী হয়ে যায়। একইভাবে অন্ধ ঘৃণার সংস্কৃতিও সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং সংলাপের সুযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে না।

এই রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে তার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিনির্ধারণের গুণগত মানের ওপর। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি জটিল সংক্রমণকাল অতিক্রম করছে। মোট দেশজ উৎপাদনের আকার প্রায় ৫১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় প্রায় ২৮২০ ডলার হলেও প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এই বৈষম্য নির্দেশ করে যে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিম্নমুখী হয়েছে, যা বিনিয়োগের ধীরগতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক চাপের প্রতিফলন। একইসঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। খাদ্য, জ্বালানি এবং পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি মানুষের প্রকৃত আয়কে সংকুচিত করছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে বাস্তবতা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যেখানে প্রায় ৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশ রপ্তানি তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই একক নির্ভরতা বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে অর্থনীতিকে সরাসরি যুক্ত করে দেয়। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং কর-জিডিপি অনুপাতের নিম্নতা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা আবেগনির্ভর প্রশংসার বাইরে গিয়ে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম।

এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনারও সমান গুরুত্ব থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি এমন একটি সময়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যখন অর্থনীতি ও রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। তার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তবে তা দেশের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

রাজনীতিতে সমালোচনা কোনও নেতিবাচক বিষয় নয়, বরং এটি একটি অপরিহার্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। একজন শক্তিশালী নেতা সেই ব্যক্তি, যিনি প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাকেও গ্রহণ করতে পারেন এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে এবং তার নীতিকে উন্নত করতে পারেন। যখন এই সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যায়, তখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে একমুখী চিন্তার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি সরকারের প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড। এই লক্ষ্যগুলো অর্জিত হলে জনগণের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশংসা আসে, যা অর্জিত এবং টেকসই। কিন্তু যখন প্রশংসা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়, তখন তা বাস্তবতার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট সৃষ্টি করে।

মোটকথা, বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পুনর্গঠন করা সম্ভব। ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে যুক্তিবাদী চিন্তাকে উৎসাহিত করা এবং আবেগের পরিবর্তে বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে একটি সুস্থ ও টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যথায়, আমরা একই চক্রে আবদ্ধ থাকবো, যেখানে কখনও অন্ধ ভক্তি, কখনও অন্ধ ঘৃণা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে যাবে।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বন্ধ কারখানার মালিকদের ভোটাধিকার হারানোর শঙ্কা
বিজিএমইএ’র নতুন প্রস্তাব ঘিরে বিতর্কবন্ধ কারখানার মালিকদের ভোটাধিকার হারানোর শঙ্কা
ওয়ারীতে ৫৭ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই: আরও ৩ জন গ্রেফতার
ওয়ারীতে ৫৭ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই: আরও ৩ জন গ্রেফতার
ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিলেন চিকিৎসকরা
ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিলেন চিকিৎসকরা
৮৮ বছর প্রথম ম্যাচে হারেনি ব্রাজিল, এবার কী করবে?
৮৮ বছর প্রথম ম্যাচে হারেনি ব্রাজিল, এবার কী করবে?
সর্বশেষসর্বাধিক