পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র ভালোভাবে দেখার জন্য পরীক্ষক বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করছি। অবশ্যই পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। তবে তারা যেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ পরীক্ষক হন—সে বিষয়টি খেয়াল রাখা জরুরি। একজন পরীক্ষকের নীতি-নৈতিকতা, যোগ্যতা-দক্ষতা অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে সঠিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন। উত্তরপত্র মূল্যায়ন সঠিক না হলে শিক্ষার্থীরা বা পরীক্ষার্থীরা বৈষম্যের ও অবিচারের শিকার হয়—যা কোনোভাবেই নৈতিক নয়, যৌক্তিক নয়, মেনে নেওয়ার নয়। পরীক্ষকের অযোগ্যতা, অমনোযোগিতা বা দায়িত্ব অবহেলার কারণে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যেমন কম নম্বর পেয়ে যেতে পারেন, আবার একজন দুর্বল শিক্ষার্থী বেশি নম্বর পেয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ একই প্রশ্নের উত্তর একই রকম মানসম্পন্ন লেখার পরেও কোনও কোনও পরীক্ষার্থী তুলনামূলক কম বা বেশি নম্বর পেয়ে যেতে পারেন। এতে পরীক্ষার্থীর যোগ্যতার তুলনায় ফলাফল খারাপ হলে তিনি চরমভাবে আশাহত হন, অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন। একজন শিক্ষার্থীর বা পরীক্ষার্থীর এমন ক্ষতির দায় আমরা কোনোভাবেই এড়াতে পারি না।
পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন অবশ্যই অত্যন্ত দায়িত্বশীল কাজ, ন্যায়বিচারকের কাজ, বুদ্ধিবৃত্তিক ধৈর্যশীল কাজ। এটি শুধু অর্থ উপার্জনের কাজ নয়, অর্থ ও পুণ্য উপার্জনের কাজ। অথচ এমন সমালোচনা প্রায়শই হয়ে থাকে যে কোনও কোনও পরীক্ষক এ কাজে চরম দায়িত্ব অবহেলা করে থাকেন। উত্তরপত্র ভালোভাবে না পড়েই, না বুঝেই অন্ধের মত নম্বর দিয়ে থাকেন। খাতার পাতা গুনে নম্বর দেওয়ার কথাও শোনা যায়। আমার শিক্ষকতা জীবনে এমন অনেক শিক্ষক দেখেছি, যারা উপস্থিতি ও সময়ানুবর্তিতায় তলানিতে, পাঠদানে গতিহীন ও প্রস্তুতিহীন, প্রশ্ন তৈরিতে নিজস্বতা প্রমাণে অক্ষম, উত্তরপত্র মূল্যায়নে ও সঠিক সময়ে নম্বর জমাদানে ব্যর্থ—তারা শিক্ষা বোর্ড বা সরকারি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে সংখ্যাগত দিক থেকে সর্বাধিক এগিয়ে! কেউ কেউ আবার স্ত্রী/স্বামী সন্তান, শিক্ষার্থী বা অন্য কোনও নিকটজনকে দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করিয়ে থাকেন, এমন কথাও শোনা যায়। এটি সম্পূর্ণ অন্যায়, অনৈতিক ও অযৌক্তিক। এতে শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী অবিচারের শিকার হন, শিক্ষক বা পরীক্ষকের উপার্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যাকে দিয়ে অন্যায়ভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করানো হয়, তার মধ্যে পরীক্ষক সম্পর্কে ও পরীক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে নিকৃষ্ট ধারণা বদ্ধমূল হয় এবং তার মনে অপরাধ প্রবণতা যুক্ত হয়। সর্বোপরি পরীক্ষকের একটি পুণ্যকর্ম তাঁর ও তাদের পাপকর্মে পরিণত হয়।
উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত পরীক্ষকগণ প্রায়শই বলে থাকেন, তাদের যে পরিমাণ উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং সেগুলো মূল্যায়নের জন্য যে পরিমাণ সময় বেঁধে দেওয়া হয়, সেটি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তাছাড়া উত্তরপত্র মূল্যায়নের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, দায়িত্বশীল, শ্রমসাধ্য ও মেধাসাধ্য কাজের জন্য যে পরিমাণ সম্মানি দেওয়া হয়, সেটিও খুবই নগণ্য। তদুপরি কষ্ট করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে সামান্য সম্মানি প্রাপ্তির জন্য যতদিন অপেক্ষা করতে হয়, তাও অত্যন্ত পীড়াদায়ক! অনেক দিনের পুরোনো এ অভিযোগগুলোর সত্যতা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। এগুলোর সুষ্ঠু সমাধান অত্যাবশ্যক। মনে রাখতে হবে, অসন্তুষ্টি নিয়ে সন্তোষজনক কাজ করার মানুষ খুবই কম। বাড়তি কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক বা সম্মানি না পেলে তিনি কাজ ভালোভাবে করার আগ্রহ কম থাকা বা না থাকাই স্বাভাবিক।
শিক্ষা বোর্ড, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তথা সরকারি বা পাবলিক পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ টাকা নেওয়া হয়, সেগুলোর সঠিক বণ্টন হলে পরীক্ষকদের সম্মানি আরও বাড়ানো যেতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন। বেশির ভাগ অভিভাবক পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণের টাকা কত যে কষ্ট করে সংগ্রহ করেন, তা বর্ণনাতীত। প্রায়শই এমন সংবাদ প্রকাশিত হয় যে ফরম পূরণের টাকা সংগ্রহ করতে না পারায় শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। এখানেই সমাপ্ত হয়েছে তার শিক্ষাজীবন! হতদরিদ্র অভিভাবকদের এত কষ্টের টাকায় সংগঠিত সরকারি পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত ব্যয় যেসব খাতে সংঘটিত হয়ে থাকে, সে খাতগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি। সব খাতে টাকা দেওয়া কিংবা এত কম বা বেশি পরিমাণ টাকা দেওয়া যৌক্তিক কিনা, সেটি ভেবে দেখা উচিত। শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে ফরম পূরণ বা পরীক্ষার ফি বাবদ সারা দেশ থেকে আদায়কৃত টাকার সিংহভাগ যদি শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সদস্য, কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সদস্য, উপজেলা ও জেলা প্রশাসক (আওতাধীন সব পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে), আইন প্রয়োগকারী সদস্য ও অন্যদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য ব্যয় হয়ে যায়, বা ব্যয় করতে হয়—তাহলে যারা প্রত্যক্ষ বা প্রধানকর্মী, অর্থাৎ কক্ষ প্রত্যবেক্ষণে ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে নিয়োজিত শিক্ষক ও পরীক্ষক, তাদের সন্তোষজনক পারিশ্রমিক বা সম্মানি দেওয়া সম্ভব হবে কীভাবে? এক্ষেত্রে পারিশ্রমিক বা সম্মানি বণ্টনের ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা ভালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত এবং বৈষম্য নিরসন করে, ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যক্ষ কর্মে নিয়োজিত শিক্ষকদের উপযুক্ত বা সন্তোষজনক পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা উচিত।
পাবলিক পরীক্ষা তথা শিক্ষা বোর্ড, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এসএসসি বা সমমান, এইচএসসি বা সমমান, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য যোগ্য, দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল পরীক্ষক তৈরির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থাকা আবশ্যক। পরীক্ষক হতে আগ্রহী শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করা মানেই যথাযথ পরীক্ষক নির্বাচন করা নয়। ন্যূনতম যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করে সম্ভাব্য পরীক্ষকদের খসড়া তালিকা তৈরি করতে হবে। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে শুধু সফলদের নিয়ে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করতে হবে। চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রতি বছর নির্ধারিত পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষক নিয়োগ করতে হবে। অনুরূপভাবে প্রশিক্ষণে বেশি সফলতা অর্জনকারী বেশি অভিজ্ঞদের নিয়ে প্রধান পরীক্ষকদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করতে হবে। চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রতি বছর নির্ধারিত পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ করতে হবে। অবশ্যই পরীক্ষক এবং প্রধান পরীক্ষকদের কাজ প্রত্যেক বৎসর মূল্যায়ন করতে হবে এবং পরবর্তী বছরের পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক তালিকা প্রস্তুত করা ও নিয়োগ প্রদান করার ক্ষেত্রে এ মূল্যায়ন ফলাফল বিবেচনা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রত্যেক বৎসর নিয়োগপ্রাপ্ত পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকদের আপডেট প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মে নিয়োজিত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় মূল্যায়নে পিছিয়ে থাকা পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক ক্রমাগত তালিকা থেকে বাদ পড়বেন এবং যোগ্যতায়, অভিজ্ঞতায় ও প্রশিক্ষণে এগিয়ে থাকা শিক্ষকরা নতুন করে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক হবেন। অবশ্যই পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকদের বাছাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ উন্নত ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ উত্তম সফটওয়্যারের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, সঠিক সময়ে সন্তোষজনক সম্মানি দেওয়া না হলে বেশি যোগ্য-দক্ষ ও দায়িত্বশীল শিক্ষকরা আগ্রহ নিয়ে পরীক্ষক হতে আসবেন না। বাধ্য করা হলেও সবাই পর্যাপ্ত সময় দিয়ে, গুরুত্ব দিয়ে, মনোযোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেবেন না, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষামূল্যায়ন সঠিক হবে না। পরীক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত অবিচার ও বৈষম্যের শিকার হবে। যোগ্যতার তুলনায় ফলাফল খারাপ হলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিসহ অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে থাকবে। এমতাবস্থায় সময়মতো সন্তোষজনক সম্মানি দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে, নিরপেক্ষভাবে শিক্ষক বাছাই করে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে, পুল বা প্যানেল তৈরি করে, অধিক যোগ্য-দক্ষদের পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করানোই অধিক যুক্তিযুক্ত।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ এবং শিক্ষা বিষয়ক নিবন্ধকার




