বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প নিঃসন্দেহে বিশ্বে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজ বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যু হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, খাদ্য উৎপাদন এবং অবকাঠামো নির্মাণে দেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭৫ বছরে পৌঁছেছে এবং দারিদ্র্যের হারও দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আমরা খুব কমই করি—উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু কার অংশগ্রহণে? মানুষ কি উন্নয়নের অংশীদার, নাকি কেবল দর্শক?
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের অভাব নয়, প্রকল্পের অভাবও নয়, সবচেয়ে বড় সংকট হলো উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের অভাব। কারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন যত বড়ই হোক, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না, জবাবদিহিমূলক হয় না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনও পূরণ করতে পারে না।
বাংলাদেশ উন্নয়নের অনেক সূচকে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, এবং মানব উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের জন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। এই অর্জন অস্বীকার করার কোনও সুযোগ নেই। কিন্তু উন্নয়নকে যদি শুধু জিডিপি, অবকাঠামো কিংবা বাজেট ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা হয়, তাহলে উন্নয়নের একটি মৌলিক প্রশ্ন অনুত্তর থেকে যায়—এই উন্নয়ন কতটা মানুষের মতামত ও প্রয়োজনের প্রতিফলন?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ উন্নয়ন পরিকল্পনা এখনও ওপর থেকে নিচে পরিচালিত হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনগত ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশ্বব্যাংকও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারগুলো এখন পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে পারেনি। ফলে স্থানীয় জনগণের মতামত প্রায়ই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রান্তসীমায় থেকে যায়।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতি কী? প্রথমত, উন্নয়ন প্রকৃত চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাজধানীতে বসে কোনও গ্রামের সমস্যা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। যে গ্রামে নিরাপদ পানির সংকট সবচেয়ে বড় সমস্যা, সেখানে হয়তো একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মিত হলো। কোথাও কৃষকের প্রয়োজন খাল পুনঃখনন, কিন্তু বরাদ্দ এলো সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্পে। জনগণকে না শুনলে উন্নয়ন অনেক সময় সমস্যার সমাধান নয়, বরং সম্পদের ভুল ব্যবহার হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, অংশগ্রহণহীন উন্নয়ন জবাবদিহিকে দুর্বল করে। যে মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত থাকে না, সে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও খুব কম প্রশ্ন করে। ফলে নিম্নমানের কাজ, ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা অনিয়মের সুযোগ বাড়ে। গণতান্ত্রিক শাসনের সবচেয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হলো সচেতন নাগরিক, কেবল প্রশাসনিক তদারকি নয়।
তৃতীয়ত, অংশগ্রহণহীন উন্নয়ন বৈষম্য বাড়ায়। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর সহজেই নীতিনির্ধারণে পৌঁছে যায়। কিন্তু দরিদ্র মানুষ, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দলিত জনগোষ্ঠী কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন অনেক সময় অগ্রাধিকার পায় না। উন্নয়ন তখন সবার জন্য নয়; বরং যাদের কণ্ঠস্বর জোরালো, তাদের জন্য বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।
অনেকে যুক্তি দেন, বেশি অংশগ্রহণ মানেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব। এই যুক্তি আংশিক সত্য হতে পারে। কিন্তু দ্রুত নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক বেশি। একটি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার চেয়ে কয়েক মাস বেশি সময় নিয়ে মানুষের মতামত শোনা অনেক বেশি লাভজনক। উন্নয়নের গতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের সঠিক দিক।
বাংলাদেশে ২০০৯ সালের ইউনিয়ন পরিষদ আইন ওয়ার্ড সভা এবং উন্মুক্ত বাজেট সভার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বাস্তবে এসব সভা প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক নাগরিক জানেনই না কখন সভা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে, সভা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অংশগ্রহণের যে গণতান্ত্রিক চেতনা আইন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তা বাস্তবে অনেকাংশেই অপূর্ণ রয়ে গেছে।
এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। কারণ উন্নয়ন কেবল রাস্তা, সেতু বা ভবন নির্মাণের বিষয় নয়—উন্নয়ন একটি সামাজিক চুক্তি। মানুষ যদি মনে করে উন্নয়ন তার নিজের সিদ্ধান্তের ফল, তাহলে সেই উন্নয়ন রক্ষা করার দায়িত্বও সে নিজের বলে মনে করবে। কিন্তু উন্নয়ন যদি কেবল সরকারের প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে নাগরিকের মালিকানাবোধ কখনোই গড়ে উঠবে না।
আজকের বাংলাদেশে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরও বড় বাজেট নয়—বরং আরও বড় গণতান্ত্রিক পরিসর। ওয়ার্ড সভা কার্যকর করতে হবে, উন্মুক্ত বাজেটকে প্রকৃত অর্থে উন্মুক্ত করতে হবে, স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিতে হবে এবং প্রকল্প গ্রহণের আগে জনগণের মতামতকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রযুক্তিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন পরামর্শ, ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত তথ্যপ্রকাশ মানুষের অংশগ্রহণকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি১৬) কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ উন্নয়ন তখনই স্থায়ী হয়, যখন মানুষ কেবল সুবিধাভোগী নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও অংশীদার হয়।
আমরা প্রায়ই বলি, উন্নয়ন মানুষের জন্য। কিন্তু এই বাক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুপস্থিত থাকে। উন্নয়ন শুধু মানুষের জন্য নয়, মানুষকে নিয়েও হতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন হয়তো দ্রুত এগোতে পারে, কিন্তু সেই উন্নয়নের ভিত্তি থাকে দুর্বল। ইতিহাস বলে, যে উন্নয়ন মানুষের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থাও হারায়।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে কেবল নতুন মেগা প্রকল্প নয়, বরং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মানুষের অবস্থান। সময় এসেছে উন্নয়নকে সরকারের প্রকল্প থেকে জনগণের উদ্যোগে রূপান্তর করার। কারণ অংশগ্রহণহীন উন্নয়ন কখনোই প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না—তা কেবল উন্নয়নের একটি প্রদর্শনী মাত্র।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক




