সরকারি হাসপাতালের সেবা কি টাকার কাছে জিম্মি?

এম এম মুসা
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

একজন রোগী সরকারি হাসপাতালে যান চিকিৎসা নিতে। তার হাতে টাকা কম। এই কারণেই তিনি সরকারি হাসপাতালে গেছেন। কিন্তু হাসপাতালের গেট পেরোনোর পর শুরু হয় আরেক হিসাব; হুইলচেয়ার লাগবে, টাকা; রোগীকে ওয়ার্ডে নিতে হবে, টাকা; বেড দেখিয়ে দিতে হবে, টাকা; পরীক্ষার কাগজ কোথায় জমা হবে, টাকা; রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে, টাকা। সব জায়গায় টাকা নাও চাওয়া হতে পারে। কিন্তু বহু রোগীর অভিজ্ঞতায় এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ‘কাজটি দ্রুত হবে কিনা’, তার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক অর্থের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

এটি রাষ্ট্রের নাগরিক-সেবা ব্যবস্থার একটি গভীর ব্যর্থতা। বিশেষ করে হাসপাতালের সাধারণ কর্মচারী, ওয়ার্ডবয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, স্ট্রেচার বহনকারী, কিছু সহায়ক কর্মী; যখন রোগীর দুর্বল অবস্থাকে ব্যবহার করে টাকা দাবি করেন, তখন সেটি ছোটখাটো অনিয়ম বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রোগী তখন দর-কষাকষির অবস্থায় থাকেন না। তিনি নির্ভরশীল। অনেক সময় মৃত্যুভয়ে, অপারেশনের আতঙ্কে বা অসুস্থ স্বজনকে বাঁচানোর তাড়নায় তিনি টাকা দেন। এই অর্থ তাই স্বেচ্ছায় দেওয়া ‘বকশিস’ নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি ক্ষমতার অসম সম্পর্ক থেকে তৈরি হওয়া অনানুষ্ঠানিক ফি।

বাংলাদেশে এ সমস্যা নতুন নয়। প্রায় তিন দশক আগের গবেষণাতেও সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনানুষ্ঠানিক ফি নেওয়াকে ঘুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক রোগী অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিয়েছেন; দরিদ্ররা এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। একটি গবেষণায় সরকারি হাসপাতালে ৮২ শতাংশ রোগী দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার জন্য অনানুষ্ঠানিক অর্থ দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। অন্য একটি গবেষণায় সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যের পরামর্শের জন্য ৪১ শতাংশ রোগীর অর্থ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সংস্কৃতি রোগীর আচরণও বদলে দেয়। রোগী ভাবেন, টাকা না দিলে কাজ হবে না। কর্মচারী ভাবেন, টাকা চাওয়া অস্বাভাবিক নয়। অন্য কর্মচারীরা দেখেন, সহকর্মী টাকা নিচ্ছেন অথচ শাস্তি হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ দেখেন, অভিযোগের সংখ্যা সীমিত। ফলে একটি নীরব সামাজিক চুক্তি তৈরি হয়: ‘আপনি টাকা দিন, আমরা কাজটি করে দেব।’ এই চুক্তি ভাঙা ছাড়া শুধু কর্মচারী বদলি করে সমস্যার সমাধান হবে না।

সরকারকে এখানে একটি কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে। হাসপাতালের দুর্নীতি কেবল বড় কেনাকাটা, ঠিকাদারি বা ওষুধের টেন্ডারে হয় না। রোগীর পকেট থেকে নেওয়া ৫০, ১০০ বা ২০০ টাকার অর্থও দুর্নীতি। বরং এর সামাজিক ক্ষতি কখনো বড় দুর্নীতির চেয়েও গভীর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি হাসপাতালের অভিজ্ঞতা নিয়ে মানুষের পোস্টগুলোও এই আস্থার সংকেত। একই ধরনের অভিযোগ বারবার দেখা যায়, কর্মচারীর রূঢ় ব্যবহার, রোগীর স্বজনকে অপমান, ‘চা-পানি’ চাওয়া, স্ট্রেচার বা বেডের জন্য টাকা চাওয়া, ওয়ার্ডে প্রবেশে অযৌক্তিক বাধা এবং অভিযোগ করলে উল্টো হয়রানির ভয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি অভিযোগ সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। কিন্তু বহু বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তিকে সম্পূর্ণ গুজব বলাও দায়িত্বশীল হবে না। সরকারের উচিত এসব পোস্টকে বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ। এখানেই বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা। অভিযোগ ব্যবস্থাকে আমরা এমনভাবে সাজিয়েছি যেন নাগরিককে প্রথমে সাহসী হতে হবে, তারপর প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে, তারপর অভিযোগ করতে হবে, তারপর তদন্তের অপেক্ষা করতে হবে। একজন দরিদ্র রোগী বা তার স্বজনের কাছে এটি বাস্তবসম্মত নয়। যে কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন— পরের এক ঘণ্টাতেই তার কাছ থেকে আবার সেবা নিতে হতে পারে। ফলে অভিযোগ না করাই নিরাপদ মনে হয়।

ভারতের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি রোগীর দৃশ্যমান অভিযোগ ব্যবস্থা, নির্ধারিত অভিযোগ কর্মকর্তা এবং হাসপাতাল পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের হাসপাতাল ম্যানুয়ালে প্রতিটি হাসপাতালে অভিযোগ গ্রহণ এবং সমাধানের জন্য লোক নিয়োগ, প্রকাশ্য অভিযোগের ব্যবস্থা, অভিযোগ নথিভুক্তকরণ এবং সময়সীমাবদ্ধ নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। ভারতের শিক্ষা হলো ‘অভিযোগ করুন’ বলা যথেষ্ট নয়; অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, জবাব এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আপিল; পুরো শৃঙ্খলটি দৃশ্যমান করতে হয়।

সিঙ্গাপুর থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যেতে পারে। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অভিযোগের জন্য প্রথমে হাসপাতাল পর্যায়ে সমাধান, তারপর প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট পেশাগত সংস্থায় যাওয়ার সুস্পষ্ট ধাপ আছে। হাসপাতালকে নির্দিষ্ট ধরনের অভিযোগে ৭ থেকে ২১ দিনের মধ্যে সমাধানের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগকে সেখানে প্রশাসনিক দয়া নয়, সেবা-মানের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।

রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতা আরও কঠিন। সেখানে ২০০০-এর দশকে পারফরমেন্সের ওপর নির্ভার করে অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু হয়। ২০০৫ সালে ৭৪টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র দিয়ে শুরু করে ২০০৬ সালে আরও ৮৫টি কেন্দ্রে সম্প্রসারণ করা হয়; ২০০৮ সালে এটি জাতীয় কৌশলে পরিণত হয়। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মক্ষমতা পরিমাপ, তদারকি এবং রোগীর সন্তুষ্টি যাচাইকে অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। পাঁচ বছরের মূল্যায়নে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও সেবার মানে উন্নতি দেখা যায়। অর্থাৎ কর্মচারীকে শুধু ‘ভালো আচরণ করুন’ বলা হয়নি; ভালো আচরণ ও ভালো সেবাকে ব্যবস্থাপনার ফলাফলের অংশ করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। কর্মচারীদের আচরণকে ‘নৈতিকতা’ হিসেবে রেখে দিলে হবে না; এটিকে কর্মসম্পাদনের সূচক করতে হবে। একজন ওয়ার্ডবয়ের দায়িত্ব শুধু রোগী বহন করা নয়। রোগীকে সম্মানজনক আচরণ করা, নির্ধারিত সেবা বিনা অনানুষ্ঠানিক অর্থে দেওয়া এবং অভিযোগ না তৈরি করা— এসবও তার চাকরির ফলাফল।

সরকার চাইলে ছয় মাসের মধ্যে একটি বড় পরিবর্তন শুরু করতে পারে। প্রথমত, প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ‘কোন সেবার জন্য কত টাকা’ এই তালিকা বড় অক্ষরে টাঙাতে হবে। যে সেবা বিনামূল্যে, তার পাশে স্পষ্ট লিখতে হবে— ‘কোনো কর্মচারীকে টাকা দেবেন না।’ দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ওয়ার্ডে কিউআর কোড ও ফোন নম্বর রাখতে হবে, যাতে রোগী বা স্বজন এক মিনিটে অভিযোগ করতে পারেন। তৃতীয়ত, অভিযোগের সঙ্গে হাসপাতাল, বিভাগ, সময় ও কর্মচারীর পরিচয় দেওয়ার সুযোগ থাকবে; পরিচয় গোপন রাখার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। চতুর্থত, অভিযোগের ভিত্তিতে শুধু তদন্ত নয়, রোগী সেজে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাধীন দল ছদ্মবেশে রোগী সেজে হাসপাতালের সেবা পরীক্ষা করবে। কোথায় টাকা চাওয়া হয়, কোথায় রোগীকে ঘোরানো হয়, কোথায় রূঢ় আচরণ করা হয়, এসব নিয়মিত পরীক্ষা করা সম্ভব।

পঞ্চমত, টাকা নেওয়ার অভিযোগে প্রমাণ হলে শাস্তি হতে হবে দ্রুত। তিন বছর পর বদলি বা বিভাগীয় মামলা নয়। প্রথমবার সতর্কতা ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, পুনরাবৃত্তিতে বেতনবৃদ্ধি বা পদোন্নতি স্থগিত, গুরুতর বা ঘুষ দাবির ক্ষেত্রে বিভাগীয় শাস্তি; এমন একটি নির্দিষ্ট সিঁড়ি দরকার। জরুরি সেবা আটকে দিয়ে টাকা চাইলে সেটিকে গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা উচিত। ষষ্ঠত, ভালো কর্মচারীকেও পুরস্কৃত করতে হবে। রোগীর সন্তুষ্টি, অভিযোগের হার, সময়মতো সেবা এবং সহকর্মীদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে হাসপাতাল ও ইউনিটকে র‌্যাংকিং করা যেতে পারে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এমন কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের ভিত্তি তৈরির চেষ্টা আগে হয়েছে; এখন সেটিকে কাগজ থেকে বাস্তব ব্যবস্থাপনায় নিতে হবে।

সবশেষে সবচেয়ে কঠিন কথাটি বলা দরকার। হাসপাতালের সাধারণ কর্মচারীর বেতন কম, এটি অনানুষ্ঠানিক টাকা নেওয়ার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে কর্মচারীকে ঘুষ না দিতে রোগীকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু যখন সেবা না পাওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া হয়, তখন দায় প্রধানত সেই প্রতিষ্ঠানের, যে কর্মচারীকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ করেনি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে এখন তাই একটি মৌলিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। তারা কি হাসপাতালের সমস্যাকে শুধু চিকিৎসকসংকট, শয্যাসংকট ও যন্ত্রপাতির সংকট হিসেবে দেখবে? নাকি বুঝবে যে রাষ্ট্রের হাসপাতাল আসলে একটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যেখানে আচরণও চিকিৎসার অংশ? একজন রোগীকে অপমান করা, তার স্বজনকে ঘোরানো, টাকা ছাড়া কাজ না করা; এসব চিকিৎসার বাইরে নয়। এগুলোই স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা।

সরকার যদি সত্যিই সরকারি হাসপাতালকে দরিদ্র মানুষের শেষ আশ্রয় হিসেবে রাখতে চায়, তাহলে ‘চিকিৎসা বিনামূল্যে’ কথাটি যথেষ্ট নয়। বিনামূল্যে চিকিৎসার দরজা দিয়ে ঢুকে যদি রোগীকে প্রতিটি ধাপে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হয়, তাহলে রাষ্ট্র একটি ভুয়া বিনামূল্যের ব্যবস্থা চালাচ্ছে। এখন দরকার এমন হাসপাতাল, যেখানে রোগীর কাছে টাকা চাওয়া শুধু নিষিদ্ধ নয়; টাকা চাওয়ার ঝুঁকিও কর্মচারীর জন্য বাস্তব। সেবার মূল্য হবে সরকারের বাজেট; রোগীর মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের দায়।

লেখক: উন্নয়নকর্মী, গবেষক ও সাংবাদিক

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কাদেরসহ যে ৫ জনের অর্ধেক সম্পত্তি পাবে জুলাই ফাউন্ডেশন
কাদেরসহ যে ৫ জনের অর্ধেক সম্পত্তি পাবে জুলাই ফাউন্ডেশন
প্রকাশিত হলো লিটলম্যাগ ‘অন্তর্লোক’-এর প্রথম সংখ্যা
প্রকাশিত হলো লিটলম্যাগ ‘অন্তর্লোক’-এর প্রথম সংখ্যা
ইয়েমেনে সংঘাতে বাড়ছে হতাহত, বাস্তুচ্যুত ১ লাখ ২৫ হাজার
ইয়েমেনে সংঘাতে বাড়ছে হতাহত, বাস্তুচ্যুত ১ লাখ ২৫ হাজার
সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনা খতিয়ে দেখবেন তথ্য উপদেষ্টা
সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনা খতিয়ে দেখবেন তথ্য উপদেষ্টা
সর্বশেষসর্বাধিক