বেতন বাড়ছে, এবার কাজের মানও বাড়ুক

শফিক আর. ভূইয়া
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। যথারীতি সিদ্ধান্তটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দেশের অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জ্বালানি সংকট অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে, রাজস্ব আদায় চ্যালেঞ্জের মুখে এবং সরকারের ঋণের বোঝা বাড়ছে— তখন সরকারি কর্মচারীদের পেছনে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

প্রশ্নটি অমূলক নয়। তবে বেতন বৃদ্ধির বিপক্ষে যাওয়ারও অবকাশ নেই। বরং, এটি একটি কাঠামোগত ব্যবস্থার অংশ হওয়া উচিত। অবাক করার মতো বিষয় হলো, সরকারি কর্মচারীরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন কাঠামোর অধীনে ছিলেন। অথচ প্রতি বছর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। তাই রাষ্ট্রব্যবস্থার কর্মীদের বেতন নিয়মিত পর্যালোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

একটি রাষ্ট্র যদি দক্ষ ও যোগ্য মানুষকে সরকারি সেবায় ধরে রাখতে চায়, তাহলে তাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে। ভালো বেতন কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা—দুটিই বাড়াতে পারে। বরং, বেতন কাঠামো এক দশকে একবার বড় করে না পাল্টে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের একটি ব্যবস্থা থাকাই শ্রেয়। তাহলে হঠাৎ করে এত বড় অঙ্কের চাপ অর্থনীতির ওপর পড়বে না।

কিন্তু ধরে নিলাম, বেতন বাড়ানোর ফলে কর্মীদের মনোবল বাড়বে, কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়বে, দক্ষ মানুষ সরকারি চাকরিতে আসবেন এবং দুর্নীতির প্রবণতাও কমবে। শুধু বেতন বাড়ালেই কি সত্যিই এসব হবে?

আমার মনে হয়, হবে না। কারণ বেতন একটি প্রণোদনা। কাজের মান নিশ্চিত করে নিয়ম, সুশাসন আর ব্যবস্থাপনা। নতুন পে-স্কেলকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে হলে সরকারকে এখন এমন কিছু সংস্কার করতে হবে—যার মাধ্যমে বাড়তি বেতনের পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবে সত্য প্রমাণিত হয়।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত ‘কর্মঘণ্টার পূর্ণ ব্যবহার’ নিশ্চিত করা। সরকারি অফিসের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নাগরিককে সেবা দেওয়ার সময়। সেই সময়ের প্রতিটি মিনিট অফিসে বসে কাগজপত্র নাড়াচাড়া করেই কাটাতে হবে, তা নয়। কিন্তু কর্মঘণ্টার একটি বড় অংশ যদি ব্যক্তিগত কাজে চলে যায়, দীর্ঘ বিরতি হয়, কিংবা নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে না থাকেন— তাহলে বাড়তি বেতন কীভাবে বাড়তি উৎপাদনশীলতা তৈরি করবে?

ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য বিরতি অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেটি হতে হবে নির্ধারিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং জবাবদিহির আওতায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও কর্মঘণ্টাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সংস্কৃতি তৈরি করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল উপস্থিতি ব্যবস্থা, কাজ পর্যবেক্ষণ এবং সেবা প্রদানের সময়সীমা একসঙ্গে যুক্ত করা গেলে শুধু অফিসে উপস্থিত থাকা নয়, কাজে উপস্থিত থাকা নিশ্চিত করা সম্ভব। এরপর আসতে হবে ‘কাজের হিসাব’।

প্রতিটি সরকারি দফতরের কিছু স্পষ্ট কর্মদক্ষতার সূচক বা কেপিআই থাকা উচিত। সব কাজ সংখ্যায় মাপা সম্ভব নয়, কিন্তু যেখানে সম্ভব, সেখানে অবশ্যই মাপতে হবে। ভূমি অফিসে কতগুলো আবেদন এসেছে, কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে, গড়ে কত দিন লেগেছে এবং কতগুলো নির্ধারিত সময়ের বাইরে পড়ে আছে—এসব তথ্য জানা সম্ভব। তেমনিভাবে, লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা কতদিনে একটি আবেদন নিষ্পত্তি করে, কতগুলো আবেদন ঝুলে আছে, কতগুলো অভিযোগ এসেছে এবং কতগুলো সমাধান হয়েছে—এসবও মাপা যায়।

সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু কত টাকা খরচ হয়েছে তা নয়, সময়মতো কাজ শেষ হয়েছে কিনা, নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে হয়েছে কিনা এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া গেছে কিনা, সেটিও মূল্যায়ন করা উচিত।

সরকারের সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা বা জিপিএমএস-এর মতো উদ্যোগ ইতোমধ্যে রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্যও বিভিন্ন দফতরে জিপিএমএস কাঠামো ও নির্দেশিকা রয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব ব্যবস্থাকে কাগজে-কলমের আনুষ্ঠানিকতা না রেখে বাস্তব কর্মদক্ষতা ব্যবস্থাপনার অংশ করা।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় মানবিক হস্তক্ষেপ কমে। কোনও সেবা ডিজিটাল করার অর্থ শুধু ওয়েবসাইট বা অ্যাপ তৈরি করা নয়। একজন নাগরিক যেন আবেদন করতে পারেন, কাগজপত্র জমা দিতে পারেন, ফি পরিশোধ করতে পারেন, আবেদনের অবস্থা দেখতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত পেতে পারেন—অপ্রয়োজনীয়ভাবে কোনও কর্মকর্তার টেবিলে ঘুরে বেড়ানো ছাড়াই।

প্রক্রিয়ার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের ডিজিটাল রেকর্ড থাকতে হবে। কারণ দুর্নীতি অনেক সময় তৈরি হয়, যেখানে তথ্যের অভাব এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সুযোগ বেশি থাকে। নাগরিক জানেনই না তার ফাইল কোথায়, কার কাছে আছে, আর কতদিনে কাজ হওয়ার কথা। তখন একজন দালাল এসে বলেন, ‘‘টাকা দিলে কাজটা দ্রুত হবে।’’ প্রক্রিয়াটি যত স্বচ্ছ ও অনুসরণযোগ্য হবে, ঘুষের সুযোগ তত কমবে।

চতুর্থত, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতার তথ্য নাগরিকের সামনে আনতে হবে। কতজন সেবা চেয়েছেন, কতজন সেবা পেয়েছেন, গড়ে কত সময় লেগেছে, কতগুলো অভিযোগ এসেছে, কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে, কতগুলো আবেদন আটকে আছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। স্বচ্ছতা শুধু দুর্নীতি ধরার জন্য নয়। এটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও দায়িত্ববোধ তৈরি করে। যে কর্মদক্ষতা প্রকাশ্যে দেখা যায়, সেটিকে উপেক্ষা করা কঠিন।

পঞ্চমত, ভালো কাজ এবং খারাপ কাজের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য তৈরি করতে হবে। একজন কর্মচারী নিয়মিত ভালো কাজ করলে এবং আরেকজন ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেও যদি দুজনের ক্যারিয়ারে প্রায় একই ধরনের পরিণতি হয়, তাহলে বাড়তি বেতন কীভাবে কর্মদক্ষতার উৎসাহ দেবে? পদোন্নতি, স্বীকৃতি, প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতার ভূমিকা বাড়াতে হবে।

একইসঙ্গে অনিয়ম, অবহেলা ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এখানে আরেকটি বিষয়ও ভেবে দেখা দরকার—সরকারি দফতরে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল আছে কিনা। কোথাও জনবল অপ্রতুল হতে পারে, আবার কোথাও কাজের ধরন বদলে যাওয়ায় কিছু পদ বা দায়িত্ব নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে। ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কাজের বণ্টন এবং জনবল কাঠামোও পর্যালোচনা করা দরকার।

একই কাজ করতে কোথাও যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জনবল লাগে, কিংবা একটি সেবা দিতে অস্বাভাবিক বেশি সময় লাগে, তাহলে শুধু বেতন বাড়ানোর আগে জনবল কাঠামো, কাজের বণ্টন এবং প্রক্রিয়ার দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা দরকার।

সরকারি কর্মচারীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মতো করে দেখাও ঠিক হবে না। সরকারি সেবার অনেক দায়িত্বই লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের একজন কর্মচারীর দায়িত্বের মধ্যে এমন অনেক কাজ থাকে, যার মূল্য সামাজিক, আর্থিক নয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কর্মদক্ষতার কোনও হিসাব থাকবে না। দায়িত্ব থাকলে প্রত্যাশা থাকবে। প্রত্যাশা থাকলে মূল্যায়ন থাকবে। আর মূল্যায়ন থাকলে জবাবদিহিও থাকতে হবে।

নতুন পে-স্কেলকে তাই শুধু সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখতে আমরা কেউই চাই না। এটিকে একটি বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে—যদি সেই বিনিয়োগের বিপরীতে রাষ্ট্র নাগরিককে আরও ভালো সেবা দিতে পারে। সরকার নিজেও বলেছে, নতুন পে-স্কেলের লক্ষ্য কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি একটি দক্ষ, গতিশীল ও নাগরিকবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা।

রাষ্ট্র বলছে, আমরা আমাদের কর্মীদের আরও ভালো বেতন দেবো। তাহলে রাষ্ট্রের কর্মীদের কাছ থেকেও প্রত্যাশা থাকতে হবে—তারা আরও ভালো কাজ করবেন। আর নাগরিকেরও প্রত্যাশা থাকবে—তিনি সময়মতো, স্বচ্ছভাবে এবং ঘুষ ছাড়া সেবা পাবেন। এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে না দেখলে নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় যুক্তিটিই দুর্বল হয়ে যায়।

আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা দরকার। সরকারি কর্মচারীদের বেতন একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লে অর্থনীতিতে তার একটি প্রভাব পড়বেই। অতিরিক্ত অর্থ মানুষের হাতে গেলে ভোগ ও চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু উৎপাদন যদি একইসঙ্গে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। আর তখন বেসরকারি খাতের কর্মীরা—যাদের বেতন একই হারে বাড়েনি, তারাই এর বড় ভুক্তভোগী হতে পারেন।

সরকারও এই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে শুধু সরকারি কর্মচারীদের কল্যাণের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না, এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

আমরা যা-ই বলি, আসলে বেতন বৃদ্ধির বিপক্ষে কেউই নই। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে সত্যিকার অর্থে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে এর পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটিকে বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে। কাজের মান  বাড়াতে হবে। কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেবার সময় কমাতে হবে। প্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক ধাপ কমাতে হবে। ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ কমাতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল থাকলে তা চিহ্নিত করতে হবে। আর এসবের ফলাফল নিয়মিত মাপতে ও প্রকাশ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত একজন নাগরিকের কাছে সরকারি কর্মচারীর বেতন কত, সেটি বড় বিষয় নয়। তার কাছে বড় বিষয় হলো—সরকারি সেবাটি কত দ্রুত, কত সহজে এবং কতটা স্বচ্ছভাবে পাওয়া গেল। নতুন পে-স্কেলের সাফল্য তাই বেতন-স্লিপে মাপা উচিত নয়। মাপা উচিত নাগরিকের পাওয়া সেবায়। বেতন বেড়েছে। এবার কাজের মানও বাড়ুক।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জেলায় জেলায় বিয়ে করা পুলিশ কর্মকর্তাকে যেভাবে ধরিয়ে দিলে ষষ্ঠ স্ত্রী
জেলায় জেলায় বিয়ে করা পুলিশ কর্মকর্তাকে যেভাবে ধরিয়ে দিলে ষষ্ঠ স্ত্রী
২০টি স্কুল উন্নত করার দায়িত্ব নিলেন আলিয়া ভাট ও রণবীর
২০টি স্কুল উন্নত করার দায়িত্ব নিলেন আলিয়া ভাট ও রণবীর
সৌদির নিরাপত্তায় ‘যেকোনও কিছু’ করতে প্রস্তুত পাকিস্তান
সৌদির নিরাপত্তায় ‘যেকোনও কিছু’ করতে প্রস্তুত পাকিস্তান
ফুটপাতের সেই গোলাপি বেগমকে বাড়ি উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী 
ফুটপাতের সেই গোলাপি বেগমকে বাড়ি উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী 
সর্বশেষসর্বাধিক