ক্রিকেটীয় শোক এবং টিনের দ্বীপপুঞ্জের ইংরেজ

Send
ড. শাখাওয়াৎ নয়ন
প্রকাশিত : ১২:৪০, অক্টোবর ২০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১০, নভেম্বর ২৪, ২০১৬

শাখাওয়াৎ নয়নআজ (বৃহস্পতিবার) শুরু হলো ইংল্যান্ড-বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজ। এর আগে একদিনের ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দল ইংরেজদের কাছে সিরিজ হেরে যায়। স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে শোক নেমে আসে। কারণ, বাংলাদেশ অনেকদিন ধরে নিজেদের মাটিতে কারও কাছে সিরিজ হারেনি। বাস্তবতার দিক থেকে বিবেচনা করলে এটা তেমন কিছুই না। ক্রিকেটে এমনটা হতেই পারে। ক্রিকেট তো গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। এই পরাজয় সাময়িক। আমাদের আগে বাড়তে হবে। জিততে যখন শিখেছি, আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না, ইনশাল্লাহ। 
আমার লেখার শিরোনামে উল্লেখ করেছি ‘টিনের দ্বীপপুঞ্জের ইংরেজ’। কারণ, অনেককাল আগে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জকে ‘টিনের দ্বীপপুঞ্জ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তখন ওই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে টিন এবং তামা জাতীয় মূল্যবান ধাতু পাওয়া যেত। যা-ই হোক, বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড একদিনের ক্রিকেট সিরিজে ইংরেজ খেলোয়াড়রা আমাদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে নানা রকম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন; যা অনেকের মনেই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, ‘ইংল্যান্ডের মতো দলের কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না’। আমি তাদেরকে তখন বলেছি, ‘কেন আশা করা যায় না? ইংরেজরা ভালো ছিল কবে?’  
আসুন, ইংরেজ জাতি সম্পর্কে কিছু কথা উল্লেখ করা যাক। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের ভাষায়, ‘ব্রিটিশরা ছিল অন্ধ, কুসংস্কারাচ্ছান্ন জাতি। তারা এত বেশি অন্ধ ও কুসংস্কারাচ্ছান্ন জাতি ছিল যে, তারা পুরোহিতদের দ্বারা পরিচালিত ও শাসিত হতো’। সেসব পুরোহিতদের বলা হতো  ‘ড্রুইড’। এরা নানা রকম দেব-দেবীর পূজা করতো। তাদের ধর্মে অন্ধকারের দেবতার নাম ছিল ‘টুইস্কো’, যুদ্ধের দেবতার নাম ‘ওডেন’, থর ছিল বজ্রের দেবতা, সমৃদ্ধির দেবতার নাম ছিল ‘ফ্রাইয়া’। তাদের দেবতাদের নামানুসারেই দিনের নামকরণ করা হয়। যেমন ‘টুইস্কো’র নামে টুইসডে, ‘ওডেন’ এর নামানুসারে ওয়েডনেসডে, ‘থর’ এর নামে থারসডে এবং ‘ফ্রাইয়া’র নামে ফ্রাইডে।   
কিছুকাল আগে ইংল্যান্ডসহ ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। কোনও দেশকে সার্বিকভাবে দেখার কিংবা বোঝার জন্য উক্ত দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালোভাবে জানা কিংবা দেখা প্রয়োজন। যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। আমি অনেকটা পদ্ধতিগতভাবেই ইউরোপের দেশগুলোকে বোঝার চেষ্টা করেছি। একদিকে যেমন রাজ-প্রাসাদ দেখতে গিয়েছি, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ও দেখতে গিয়েছি। আবার মিউজিয়াম, আর্ট গ্যালারি, পার্লামেন্ট হাউস, গির্জা এমনকি প্যাথোইনও বাদ দেইনি। এই আলোচনায় সব কিছু সম্পর্কে বলা সম্ভব হবে না। তবে খানিকটা তুলে ধরছি।
প্রথমেই ইংরেজদের ভাষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে কিছু বলা যাক। ইংরেজদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে গেলে তাদের দুটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করতেই হয়। (১) অক্সফোর্ড এবং (২) ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ইতিহাস একটু বৈচিত্র্যপূর্ণ। দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্বে ইউরোপের সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে, বই-পুস্তক পাঠ এবং বিদ্যা-শিক্ষালাভ ব্যাপারটা শুধুমাত্র গির্জার মানুষদেরই কাজ। সুতরাং এ ব্যাপারে তাদের কোনও ভূমিকা নেই, এমনকি অধিকারও নেই।  

কিন্তু, ওষুধ এবং আইন সংক্রান্ত ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক উন্নতির ফলে এবং এসব বিষয়ে আরও অধিকতর শিক্ষালাভের জন্য ইতালি এবং ফ্রান্সে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য তখন চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলো- (১) ধর্ম বিষয়ক পুস্তক (২) গির্জার আইন সংক্রান্ত (৩) ওষুধ বিষয়ক এবং (৪) অত্যন্ত নিকৃষ্ট বিষয় হিসেবে শিল্প-সাহিত্য সংক্রান্ত (যেমন- সংগীত, ব্যাকরণ, তর্কবিজ্ঞান, জ্যামিতি) শিক্ষা দেওয়া হতো।

ইংরেজ ছাত্ররা তখন উচ্চ শিক্ষার জন্য প্যারিস নগরীতে যেত। যেহেতু তাদের কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তর্কবিজ্ঞান (দর্শন) শিক্ষার বিষয় নিয়ে অধ্যাপকদের মধ্যে বেশ বিরোধ দেখা দেয়। ফলে একদল অধ্যাপক সেখান থেকে বিতাড়িত হলেন। সেই বিতাড়িত অধ্যাপকদল তাদের ছাত্রদের নিয়ে চলে যান ব্রিটেনে। তারাই ১১৬৮ সালে অক্সফোর্ড শহরে প্রথম একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। উক্ত ঘটনার ৪১ বছর পরে ১২০৯ সালে ক্যামব্রিজ শহরে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় দুটিকে ঘিরেই বিভিন্ন কলেজ স্থাপিত হতে শুরু করে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকদের ডিগ্রি দেওয়া হতো ব্যাচেলর অব আর্টস/সায়েন্স, মাস্টারস অফ আর্টস, এবং ডক্টর। সে যুগে ছাত্ররা বিদ্যালাভের প্রতি এত অনুরাগী ছিল যে, প্রথিতযশা শিক্ষকদের কাছ থেকে কিছু শিখে নেওয়ার প্রবল আগ্রহ থেকে, ছাত্ররা এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যেত।       

এ বিদ্যা-শিক্ষার যে ভাষা ইংরেজি, নিঃসন্দেহে তা একটি সমৃদ্ধশালী ভাষা। এ সমৃদ্ধশালী ভাষার উদ্ভব ঘটেছে ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চ ভাষার মিলনের ফলে। ১০৬৬ সালে নর্ম্যান্ডিরা (যারা ফ্রান্সের নর্ম্যান্ডি উপকূলীয় অঞ্চল থেকে এসেছিল) ইংল্যান্ড দখল করে নেয়। যদিও প্রথম দিকে ইংরেজদের ভাষাকে নর্ম্যানরা ইতর শ্রেণির ভাষা হিসেবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যজ্ঞান করতো। কোনও কিছুই গ্রহণ করেনি। কিন্তু একটা সময় পরে ইংরেজদের সঙ্গে তারা মিশেছিল কিন্তু নিজেদেরকে উঁচু আসনে রেখে। কারণ, নর্ম্যান্ডিরা ছিল শাসক ও প্রভু, আর ইংরেজরা ছিল শোষিত ও  দাস। ইংরেজ দাসরা অনাহারে-অর্ধাহারে ফরাসি প্রভুদের গরু, মহিষ, শুকর চড়াতো। আর প্রভুরা বসে বসে আরাম-আয়েশে ছানা-দুগ্ধ খেত। এই দাস-প্রভু সম্পর্ক তাদের ভাষার মধ্যে এখনও আছে। প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ অনেকে জানেই না। উদাহরণ দেওয়া যাক, প্রভুরা যেহেতু দাসদের ইতর সাধারণ বলে গণ্য করতো, তাই সমস্ত ইতর শ্রেণির প্রাণীগুলোর নাম রাখা হলো ইংলিশ শব্দে। কিন্তু ইতর প্রাণীগুলো থেকে যেসব খাবার রান্না কিংবা প্রস্তুত করা হতো, সেসবের নাম রাখা হলো ফরাসি (ফ্রেঞ্চ) ভাষায়। ইংরেজি শব্দ অক্স (OX), কিন্তু রান্না করা ষাড়ের মাংসের কোনও ইংরেজি শব্দ নেই; রান্না করা গরুর মাংসকে বলা ‘বিফ’। বিফ ফরাসি শব্দ। তেমনি ‘গোট’ (ছাগল) শব্দটি ইংরেজি, কিন্তু ছাগলের মাংস রান্না করার পর হয়ে যায় ‘মাটন’। এই মাটনের কোনও ইংরেজি শব্দ নেই, এটা ফ্রেঞ্চ শব্দ। ইংরেজি শব্দ ‘পিগ’ (শুকর), রান্না করার পর হয়ে যায় ‘পর্ক’। পর্কেরও কোনও ইংরেজি শব্দ নেই, এটা ফ্রেঞ্চ শব্দ। এমনকি খাবারের কোনও ইংরেজি শব্দ নেই। ‘ফুড’ একটি ফরাসি শব্দ। বিলাসবহুল খাবারের দোকানকে বলা হয় ‘রেস্তোরাঁ’। এ শব্দেরও কোনও ইংরেজি শব্দ নেই। কারণ, বিলাসবহুল খাবারের দোকান তো দাসদের জন্য নয়। কী ভয়ংকর বৈষম্য, তাই না? ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যে একটি জাতির কিংবা সমাজের অনেক গভীর সত্য লুকিয়ে থাকে।        

আমাদের দেশেও এসব আছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়। আমাদের বাসার কাজের লোকদেরকে আমাদের পরিবারের শিশুরাও ‘তুই’, ‘তুমি’ সম্বোধন করে। অফিসের বড়কর্তারা অপেক্ষাকৃত নিচের পজিশনে যারা কাজ করেন, তাদেরকে ‘তুই’/‘তুমি’ সম্বোধন করেন, কিংবা অসম্মানজনক আচার-ব্যবহার করেন। এসব শ্রেণি চরিত্র এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের কুফল।   

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক, একাডেমিক। 

ইমেইলঃ [email protected] 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ