কাসেম বিন আবুবাকারের ইসলামি ভাবধারার জনপ্রিয় উপন্যাস

Send
ড. শাখাওয়াৎ নয়ন
প্রকাশিত : ১৩:৩৭, মে ০৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৬, মে ০৩, ২০১৭

শাখাওয়াৎ নয়নলেখালেখি ছেড়ে দেওয়া একজন মানুষ কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে প্রায় হঠাৎ করেই ইংল্যান্ডের ট্যাবলয়েড পত্রিকা ডেইলি মেইল, বার্তা সংস্থা এএফপি এবং আরব নিউজ ডটকম নিউজ করে বসলো। উক্ত খবরটি বাংলাদেশে একেবারে সুনামির মতো আছড়ে পড়লো; সাথে সাথেই সামাজিক এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নানা রকম পক্ষে-বিপক্ষের মতামত উপচে পড়া শুরু করলো। যারা কাসেম বিন আবুবাকারের পক্ষে মত দিয়েছেন তাদের যেমন অনেক যুক্তি আছে, তেমনি যারা বিপক্ষে বলছেন, তাদেরও যুক্তির অভাব নাই। বাংলাদেশে ফেইসবুকীয় যুক্তিতর্ক এখন একটা অদ্ভুত রূপ লাভ করেছে।  
মোটা দাগে দুইটি দল আছে; তারা একপক্ষ যদি বলে বিরাট এক ভয়ঙ্কর সাপ দেখেছে, সাপটি ফনা তুলে ফোঁস ফোঁস করেছে। সাথে সাথে আরেক পক্ষ বলা শুরু করবে ওখানে কোনও সাপই ছিল না, তারা দড়ি দেখে সাপ ভেবেছে। শুরু হয়ে যাবে সাপকে দড়ি বানানো এবং দড়িকে সাপ বানানো প্রকল্প। নিজেদের মতো প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে যেভাবে পারবে যত রকমের তত্ত্ব-তথ্য আছে হাজির করবে। বাদ যাবে না কিছুই... উত্তরাধুনিকতা, সাব-অল্টার্নিজম, পাবলিক স্পেফারবাদ, মার্ক্সবাদ, পুঁজিবাদ, ইসলাম, সংশয়বাদ, নিরীশ্বরবাদ, হেফাজতী, ওহাবী-মওদুদী, শরীয়তী-মারফতী সকল তরিকা দর্শনের আলোচনা চলবে, কয়েকদিন। আম-জনতা খালি দেখবে আর দেখবে; তারা সামান্য বিভ্রান্ত থেকে ব্যাপক বিভ্রান্ত হয়ে যাবে কিন্তু আসলে ঘটনাটি কী ঘটেছিল? তা কোনও দিনই জানতে পারবে না। 
এই যদি হয় একটি দেশের উচ্চ শিক্ষিত মানুষের ভূমিকা, তাহলে আম-জনতা যাবে কোথায়? এই কথাগুলো কেন বলছি? কারণ কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে বর্তমানে একই অবস্থা বিরাজ করছে। উদাহরণ দেওয়া যাক, কাসেম বিন আবুবাকারের পক্ষে শেখ ফজলে এলাহী নামক একজন ফেসবুকার লিখেছেন- ‘কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে আপনার কি প্রবলেম! শরৎ সাহিত্যের পাশাপাশি আপনি যে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত হননি, এটা আপনার উদাসীনতা এবং ক্ষেত্রমতো অক্ষমতাও। কাসেম বিন আবুবকর ওই ধারারই উত্তরাধিকারী। যে পাঠককূল রবীন্দ্ররচনাবলীর চেয়ে বেহেস্তের কুঞ্জিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়, আপনি তাদের নিয়ে ভাবেননি। এরাই বাংলাদেশে পাঠককূলের বৃহৎ অংশ। এদের বুঝার সক্ষমতা, এদের আবেগ অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য রেখেই আবুবাকারের লেখা। বাংলা একাডেমিতে একটা চেয়ার পাওয়ার জন্য এই লোক কোনও উপন্যাস লেখে নাই। সুতরাং তার সৃষ্টির সাহিত্যমূল্য সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলা বৃথা। বরং আপনি ভাবুন আপনার মানসম্পন্ন লেখার পাঠক কতজন! প্রকাশক যে ৫০০ বই ছাপার কথা বলে ৩০০ বই ছাপিয়ে বাজার দেখে সেটা তো আপনার জানা। আপনার বাজার নাই, বাজার মূল্য নাই। আপনার পাঠক নাই। তাহলে আপনি লিখেন কেন? আপনার কাজ আবুবাকারকে তাচ্ছিল্য করা নয়। জ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটানো। সেটা আপনি একা পারবেন না। আপনার আপোসবাদী অথবা হঠকারী লেখাসমূহ এই জ্ঞানচর্চার ক্ষতি সাধন করে। আপনার সমাজ যদি না আগায়, আপনি বেশি আগাতে পারবেন না। বড়জোর গোবরে পদ্মফুল হয়ে বিরাজ করবেন। একটা কঠিন সত্য যে বাংলাদেশের বৃহত্তর পাঠক সমাজে রবীন্দ্রনাথ এখনও গ্রহণযোগ্য নন। রবীন্দ্রনাথ এখনও শহুরে বিলাসিতা। আমরা সমাজ, পাঠক, কোনটাই সৃষ্টি করতে পারিনি। আমরা কেবল স্বার্থপরের মতো নিজেরা নিজেদের মনমানস তৈরিতে ব্যস্ত থেকেছি, আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছি। আর এখন আবুবকরকে দোষ দিয়ে দায়িত্ব পালন করছি। আমরা মন্দিরের ঘণ্টায় সুর খুঁজেছি, আজানের সমালোচনা করেছি, দুর্গাপূজায় উৎসব খুঁজেছি, ঈদে নীরব থেকেছি। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে আমরা দেখেছি নির্যাতন, তাদের সঙ্গমে পবিত্রতা দেখিনি।’

কী বুঝলেন? যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধান করা কিংবা প্রতিষ্ঠা করা এবং মিথ্যাকে অপসৃত করাই ছিল উক্ত শাস্রের উদ্দেশ্য। কিন্তু এই ফেসবুকীয় যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে আমরা হয়তো পুরোপুরি সত্য জানতে কিংবা বুঝতে পারি না; তারপরেও সওয়াল-জবাবের মধ্যে দিয়ে কিছু না কিছু টের পাওয়া যায়।  

চারিদিকে এত এত বলা হচ্ছে, কাসেম বিন আবুবাকার ইসলামি ভাবধারার প্রেমের উপন্যাস লিখেছেন। ইসলামি ভাবধারার প্রেমটা আবার কী রকম? তিনি তার বইতে নায়ক-নায়িকার বিবাহ বহির্ভূত ‘হালাল প্রেম’ এবং ডেটিং এর অবতারণা করেছেন, কিন্তু তা কি ইসলাম সম্মত? বিবাহ না করে শুধুমাত্র ‘বিসমিল্লাহ’ বলে চুমু খাওয়ার তরিকা তিনি কোথায় পেলেন? কিংবা ডেটিং করার কথা হাদিস-কোরআনের কোথায় উল্লেখ আছে? ‘বোরকা পরে প্রেম করা হালাল’ এটা তিনি কোথায় পেলেন? তিনি নিজেকে ইসলামি ভাবধারার লেখক হিসেবে কিভাবে দাবি করছেন? এরকম ইসলামের সঙ্গে তো আমাদের পরিচয় নেই। নবী-রাসুলের ইসলামের সাথে তো মিল খুঁজে পাচ্ছি না। তবে ওহাবী-মওদুদীদের ইসলাম একটু অচেনাই হয়।

জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গ; আমার পরিচিত হাতে গোনা দুই একজন শুধুমাত্র তার রচিত বই ‘ফুটন্ত গোলাপ’ কেউবা পড়েছে, কেউবা দেখেছে। অধিকাংশই পড়েনি কিংবা দেখেওনি। তাহলে তিনি এক জনপ্রিয় লেখক কিংবা বেস্ট সেলার লেখক হলেন কিভাবে? কেউ কেউ বলেন, গ্রামে-গঞ্জের মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ শিক্ষিত-আধা-শিক্ষিত মানুষের মধ্যে তার বইয়ের প্রচুর পাঠক আছে। আমার পিএইচডি গবেষণার জন্য তিনমাস একটি ইউনিয়নে থেকেছি। উক্ত ইউনিয়নের প্রতিটি বাড়ি শুমারি করেছি, জরিপ করেছি। ১১৩০০ নারীকে ইন্টারভিউ করেছি। কোনও বাড়িতে কাসেম বিন আবুবাকরের এক কপি বইও দেখিনি। দুই একটি বাড়িতে যাদের ছেলে-মেয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সেখানে দুই এক কপি হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলনের বই দেখেছি। কিন্তু লেখাপড়া জানা মানুষ বাস করে এমন প্রায় ৬০ ভাগ বাড়িতে কোরআন শরীফ, মোকসেদুল মমিন, সোলেমানী-মোহাম্মাদী খোয়াবনামা, লোকনাথ পঞ্জিকা দেখেছি। কাসেম বিন আবুবাকার নাকি ১০০টি বই লিখেছেন, তার ৫টি বইয়ের নাম বলতে পারে এমন কাউকে এখনও পাইনি। তাহলে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তার কতখানি সত্য? অবশ্যই অনুসন্ধানের দাবি রাখে।          

ফেসবুকের একজন পাঠক কিংবা পর্যবেক্ষক হিসেবে নাদিয়া ইসলামের একটি স্ট্যাটাস নজরে এসেছিল। তার সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলতে চাই, কাসেম বিন আবুবাকার হচ্ছেন একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর প্রকল্প। এখানে সুদূরপ্রসারী কোনও পরিকল্পনা আছে। একটু অতীতের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। প্রথমে কবি-লেখক-ব্লগার-প্রকাশক-মুক্তমনাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, তারপর ভিন্ন ধারার পুস্তক প্রকাশকদেরকে বইমেলা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, পাঠ্যপুস্তককে মুসলমানি করা হয়েছে। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার স্বীকৃতি আদায় করেছে; ভাস্কর্য সরানোর দাবি তুলেছে। মাঠ পরিষ্কার। প্রতিবাদ করার মতো কোথাও কেউ নেই। ফাঁকা মাঠে আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে কাসেম বিন আবুবাকারকে এখন হাজির করা হয়েছে। উদ্দেশ্যটা কী? উদ্দেশ্য পরিষ্কার। জানিয়ে দেওয়া হলো (১) বাংলাদেশে ইসলামি তরিকায় গল্প-উপন্যাস রচনা করলে বিরাট খ্যাতি লাভ করা যায় (২) প্রকাশক হিসেবে বিপুল পরিমাণ লাভের সম্ভাবনা আছে (৩) বাংলাদেশের মানুষ ইসলামি ভাব-ধারার গল্প উপন্যাস ভীষণ পছন্দ করে।

বাহ! কী দারুণ বিজ্ঞাপন! কোটি টাকা খরচ করেও কেউ এমন প্রচারণা চালাতে পারবে না। বিজ্ঞাপনের ফলাফল? আগামী ২০১৮ সালের জামিয়াহ আল-বাংলা কিতাব মাহফিল (বইমেলায়) বেশ কিছু সংখ্যক ওহাবী-মওদুদী তরিকার প্রেমের গল্প-উপন্যাস প্রকাশিত হতে পারে। কাসেমই শেষ নয় তিনি প্রথম, আরো বেশ কিছু নতুন লেখকের আমদানি হতে পারে। কাসেম বিন আবুবাকার এর নামে আরও বই প্রকাশ হতে পারে। তাদের বই প্রকাশ করার জন্য বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রকাশকদেরকে হুমকি দেওয়া হতে পারে, নয়তো ফয়সল আরেফিন দীপনের মতো হবে। কতিপয় প্রকাশক নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন লেখকদের কাছে ইসলামি ভাবধারার গল্প-উপন্যাস-কবিতার বই চাইবেন। বইমেলা শেষে সরকারকে চাপ দিয়ে ইসলামি ভাবধারার গল্প-উপন্যাস কিনিয়ে পাবলিক লাইব্রেরিগুলোতে দেওয়া হবে। কী সেলুকাস! বিচিত্র না এই দেশ?   

লেখক: কথাসাহিত্যিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ