বিদ্যুতের দাম কমবে না কেন?

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৫:৪৩, অক্টোবর ০২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৬, অক্টোবর ০২, ২০১৭

শুভ কিবরিয়াদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পিডিবি পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সকল বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান তাদের আবেদন দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বার্ক)-এর কাছে। বার্ক প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসারে এই দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব যাচাই-বাছাই ও বার্কের নিজস্ব কারিগরি কমিটি দ্বারা মূল্যায়নের পর তা নিয়ে গণশুনানি করছে। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ থেকে এই গণশুনানি শুরু হয়েছে। ২৫, ২৬, ২৭, ২৮ সেপ্টেম্বর এই চারদিন গণশুনানি চলেছে। এই শুনানি চলবে ২, ৩, ৪ ও ৫ অক্টোবর ২০১৭। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড প্রথম দুদিন, এরপরে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (পবিবো) এবং ঢাকা শহরের অন্যতম বিদ্যুৎ বিতরণকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) তাদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। গণশুনানির নিয়ম অনুসারে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রস্তাব পেশের পরপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের টেকনিক্যাল কমিটি ওই প্রস্তাবের বিষয়ে তাদের মূল্যায়ন উপস্থাপন করে। এরপর ভোক্তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের কেউ কেউ এ বিষয়ে তাদের প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং মতামত দেন। তারা সবাই ইতোমধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিপক্ষে তাদের মতামত তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে সদস্যবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত শুনানি বোর্ড সকল পক্ষের যুক্তি-তর্ক শুনে যথাসময়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন। অতীতে এই প্রক্রিয়ায় যতবার শুনানি হয়েছে ততবারই বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। যদিও এই শুনানির শিরোনাম হচ্ছে ‘বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনের গণশুনানি’; তবুও অতীতে সকল সময়ই বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এই বৃদ্ধিকেই মূল্যহার পরিবর্তনের কায়দা হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। এই বিষয়ে পাবলিক পারসেপশন হচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠান হলেও সব সময় সরকারের ইচ্ছা বা নির্দেশনাকেই প্রতিপালন করেছে। কখনোই তারা স্বাধীনভাবে জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে তাদের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে নাই। সেই বিবেচনায় অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারকার গণশুনানির পরেও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কথাই হয়তো শোনা যাবে। কিন্তু গণশুনানিতে যেসব যুক্তি-তর্ক উপস্থাতি হয়েছে, যেসব তথ্য পরিবেশিত হয়েছে, যেসব আইন লঙ্ঘনের নমুনা তুলে ধরা হয়েছে তাতে বিদ্যুতের দাম এই মুহূর্তে বাড়ার বদলে কমানোটাই হবে যৌক্তিক এবং ন্যায্য।  কেন এই মুহূর্তে কোনও অবস্থাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়া উচিত নয় সেই যুক্তিতে আসার আগে এই গণশুনানিতে উপিস্থাপিত কিছু তথ্য আলোচনা করতে চাই। 

২.

একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ কাজ করতো পিডিবি। পিডিবি ভেঙ্গে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ১০টি নতুন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান। পাবলিক খাতের এই প্রতিষ্ঠান নানাভাবে বৈষম্যের শিকার। পিডিবি বলেছে তারা এখন নানাভাবে রাষ্ট্রীয় নীতি বৈষম্যের শিকার হয়ে দারুণভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন।। আগে একসময় গোটা দেশের মোট বিদ্যুতের সিংহভাগ উৎপাদন করতো পিডিবি। এখন তারা করে মোট বিদ্যুতের ৫৬%। বাকি ৪৪% বিদ্যুত তৈরি করে প্রাইভেট সেক্টর। প্রাইভেট সেক্টরের লক্ষ্য থাকে মুনাফা। অন্যদিকে পিডিবি সরকারি প্রতিষ্ঠান বলে তাকে বেশি দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। ফলে তাকে পড়তে হয় অসম প্রতিযোগিতায়। শুধু তাই নয়, সরকারের কাছ থেকে এই খাতে ভর্তুকি হিসাবে পাওনা না পাওয়ায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার লোকসানের বোঝা টানছে পিডিবি। তাই তারা এখন বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চাইছে?

পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি বলেছে যে দামে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তার চেয়ে কম দামে তারা বিদ্যুত বিক্রি করে। এবং এই খাতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে তাদের ঘাটতি থাকে ০.৭২ টাকা। তাই তারা এখন বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় ১৪.৭৮%।

এই বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করেই অন্যান্য বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানও নানান পরিমাণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং দিচ্ছে।

৩.

কিন্তু কেন বাড়ছে বিদ্যুতের দাম? তাদের প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে এইখাতে রয়েছে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি আর ভুল পরিকল্পনা। সেটাই  বারবার বিদ্যুৎখাতে দাম বাড়ানোর কারণ হয়ে চলেছে।

এক. বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকারের এখনকার নীতি হচ্ছে কম দামের বিদ্যুৎ কম উৎপাদন করা। বেশি দামের বিদ্যুৎ বেশি উৎপাদন করা। কষ্ট ইফেক্টিভ নীতি অনুসরণ না করায় বিদ্যুৎ খাত এক অসহনীয় বিপদজনক আর্থিক অবস্থার দিকে চলেছে। আর এই দায় মেটাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

দুই.  বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয় ফার্নেস অয়েল। পিডিবি এই ফার্নেস অয়েল বাধ্যতামূলকভাবে কেনে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন)-এর কাছ থেকে প্রতি লিটার ৪২ টাকা দরে। ফলে ফার্নেস অয়েল থেকে পিডিবি যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তার দাম পড়ে প্রতি ইউনিট ১২ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে এই তেলের দাম কমে গেছে অনেক দিন অগেই। বাংলাদেশ সরকার এই তেলের দাম সমন্বয় করে নাই। ফলে লিটার প্রতি ৪২ টাকা দরেই পিডিবিকে এই ফার্নেস অয়েল কিনতে হয়। পিডিবির পক্ষে এর বাইরে যাওয়ার কোনও উপায় নাই। অথচ সরকার ব্যক্তিখাতে যেসব রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বা অন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনে তাদেরকে বাজার মূল্যে ফার্নেস অয়েল কিনতে অনুমতি দিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে লিটার প্রতি ২২ হতে ২৪ টাকা দরে এই তেল আমদানি করে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে। এই ফার্নেস অয়েল ব্যবহৃত বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের খরচ পড়ে ইউনিট প্রতি ৬ টাকা। এই বিদ্যুৎ আবার তারা বেশি দামে বিক্রি করে পিডিবির কাছে।

এখানে উম্মুক্ত বাজার দরে পিডিবি যদি ফার্নেস অয়েল কেনার সুযোগ পায় কিংবা সরকার যদি বিপিসির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার দরেই ফার্নেস অয়েল কিনে সেই দরে পিডিবিকে দেয় তাহলে পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কম হবে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আর দরকার হবে না।

তিন. সংস্কার খাতের আওতায় পিডিবি ভেঙ্গে ১০টি নতুন প্রতিষ্ঠান বানিয়েছে সরকার। এসব নতুন প্রতিষ্ঠানের জনবল খরচ বেড়েছে বহুগুণে। বিইআরসি আইনের ব্যতয় ঘটিয়ে বেআইনিভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের জনবল খরচ বাড়ানো হয়েছে। এর বাড়তি চাপ পড়েছে বিদ্যুৎখাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। ফলে এখন বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে এসব ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে।

চার. বিদ্যুৎখাতে টেকসই পরিকল্পনার বদলে এইখাতকে সস্তা ও জনপ্রিয় রাজনীতিকরণের কাজে লাগানো হয়েছে। এর বড় উদাহরণ পল্লী বিদ্যুৎ খাত। আর্থিকভাবে প্রায় দেওলিয়া হওয়ার পথে এখন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে ১০টি বাদে প্রায় সব পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিই আর্থিকভাবে ভীষণতর আর্থিক ক্ষতির মুখে।  অথচ প্রতি মাসে ৩ লাখ নতুন গ্রাহককে সংযোগ দিয়েই চলেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সবার ঘরে বিদ্যুৎ সুবিধা দেওয়ার নাম করে। এই সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে আর্থিক ও কারিগরি বিবেচনার চাইতে রাজনীতিই মূখ্য হয়ে উঠেছে। এইসব অব্যবস্থাপনার চাপ পড়ছে বিদ্যুতের দামের ওপরে।

৪.

এই গণশুনানিতে এসব আলোচনা উঠছে। ভোক্তাদের পক্ষ থেকে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন(ক্যাব)-এর প্রতিনিধি এসব বিষয়ে প্রতিদিনই নানা প্রশ্ন উপস্থাপন করছেন। শুধু তাই নয় ক্যাবের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের মূল্যহার না বাড়িয়ে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১.৩২ টাকা কমানোর একটি প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। ক্যাবের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার কমানোর জন্য গণশুনানির দাবিও করা হয়। ক্যাবের প্রতিনিধির এই লিখিত দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের দাম কমানোর প্রস্তাবটি গ্রহণ করে আগামি ৫ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে গণশুনানির জন্য দিন ধার্য করেছে।

এই প্রস্তাবে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে তা বিবেচনায় নিলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বদলে কমানোই যৌক্তিক হবে। কেন না বিদ্যুৎখাতে যেসব গণস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাতে ব্যক্তিখাতের গুটিকয়েক ব্যবসায়ীই লাভবান হচ্ছে। এসব ভুল এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষাকারি নীতি বদলালে খুব সহজেই টেকসই ও সাশ্রয়ীমূল্যে জনগণকে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন যদি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখায় তবে এবারই বিদ্যুতের দাম বাড়ার বদলে কমবেই।

দেখার বিষয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সেই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সিদ্বান্ত দিতে পারে কিনা!

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ