অনিয়ম-অশিক্ষার দায় কার?

Send
রেজা সেলিম
প্রকাশিত : ১৮:১২, আগস্ট ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৬, আগস্ট ১৩, ২০১৮

রেজা সেলিমসড়ক দুর্ঘটনায় আমার দুই বন্ধু মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদের মৃত্যুর পরে পথের জীবন নিয়ে আমাদের অনেকের মনে নানারকম প্রশ্ন এসেছে। আমার মাথায় একটা প্রশ্নই বেশি ঘুরপাক খায়, যা নিয়ে কখনও লিখিনি। আজ সাত বছর পর ভাবলাম, প্রশ্নটি বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে পরিবহন নৈরাজ্য নিয়ে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের পর।
আমাদের দেশে মোটর গাড়ি চলার বয়স কত? পঞ্চাশ-একশো বছরের বেশি তো নয়! আমাদের সমাজে যারা উঁচুতলার মানুষ, তারাই নানা কাজে বিলেত যেতেন, হয় পড়তে নয় ব্যবসার কাজে। ফিরে আসতেন একটা ডিগ্রি, মোটর গাড়ি আর নানা রকম জামা কাপড়ের ফ্যাশন নিয়ে। কেউ কেউ বউ নিয়েও ফিরতেন। এই উঁচু তলার মানুষগুলো দেশের খেটে খাওয়া কৃষক পরিবার থেকেই লেখাপড়া শিখে ওপরে উঠেছেন বা আশরাফ–আতরাফ হয়েছেন। সুযোগ পেয়েছেন প্রথমে সমুদ্র পথে পরে উড়ালযোগে বিলেত বা ইউরোপ যাওয়ার। সে দেশের সংস্কৃতি ধার করে এনে নিজেরা নিজেদের পরিমণ্ডল সাজিয়েছেন। এই দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতি, লেখাপড়া-সিলেবাস, সরকারি দাফতরিক কাজ, বেসরকারি উদ্যোগ—সর্বত্র এই বিদেশি অভিজ্ঞতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে আর তাতে আমরা উন্নত হয়েছি, আমাদের শহরগুলোর শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে, জ্ঞানী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, বাজার ঘাট, শপিং মল, হোটেল এমনকি খাবারের মধ্যেও নানা দেশের বৈশিষ্ট্য তার মিশেল ঘটিয়েছে। দেশের নানা প্রান্তে গাড়ি-ঘোড়া বেড়েছে, সড়কগুলো আমরা উন্নয়নের অনিবার্য অনুসঙ্ঘ হিসেবে এমনকি প্রশস্তও করেছি। কিন্তু আমার মাথা থেকে একটা প্রশ্ন কিছুতেই যাচ্ছে না–আমরা গাড়ি আনলাম কিন্তু তার সঙ্গে সেটা কীভাবে চালাতে হবে তার শিক্ষাটা নিয়ে এলাম না কেন? এই নৈরাজ্য তো সেসব দেশে নেই যেসব দেশ আমাদের কাছে গাড়ি বিক্রি করে আর নানাভাবে আমাদের এলিট হতে সাহায্য করেছে?

আমরা গাড়ি চালাতে যে ড্রাইভার নিয়োগ দেই সে একজন দীন-দরিদ্র কৃষিজীবী পরিবারের মানুষ। কৃষিশ্রমের নিড়ানী ছেড়ে সে যখন একটা কাজের সন্ধানে শহরে এলো, তখন আমরা তাকে গাড়িটা দিয়ে চালাতে বলেছি কিন্তু কোনও নিয়মের শিক্ষা সঙ্গে দিয়ে দেইনি। না হলে দেখুন, দেশের ৯০ভাগ গাড়িচালক গাড়ি চালানো শিখে আর একজন ড্রাইভারের কাছে তার হেল্পার হিসেবে কাজ করে প্রায় বিনা বেতনে। তারপর আমি যখন একটা গাড়ি কিনি, তখন তা চালাতে ড্রাইভার এনে দেয় আর একজন ড্রাইভার। এদের কেউ কেউ টাকা জমিয়ে নিজেই একটা ভাঙা গাড়ি কিনে জোড়াতালি দিয়ে রাস্তায় চালায় আর আয় রোজগারের টাকা গ্রামে পরিবারের কাছে পাঠায়। 

সব জায়গায় আমরা আশরাফ–আতরাফ হয়েও এই একটা জায়গায় কিন্তু আমরা মূর্খই থেকে গেলাম। বড়লোক গাড়িওয়ালাদের বেশিরভাগই কিন্তু নিজে গাড়ি চালাতে জানে না। তো সে কেমন করে বুঝবে গাড়িটা কোন পথে কীভাবে চালাতে হবে? বউ-বাচ্চা নিয়ে সুন্দর করে সেজে-গুঁজে স্মার্ট হলাম কিন্তু আমার ড্রাইভার কোনও নিয়ম জানে না বলে সে যেমন-তেমনভাবে গাড়ি চালালে আমার কোনও নৈতিক অধিকার থাকে না এই গরিব, সদ্য ফিরে আসা কৃষকের বা দিন মজুরের সন্তানকে জেলে পুরে দেওয়ার।

যারা রাস্তায় বাস চালান তাদের পরিবারের খোঁজ নিয়ে দেখুন মাসে কত টাকা দরকার আর তা কেমন করে, সে রোজগার করবে সেই চিন্তায় সে ব্যস্ত। সঙ্গে মালিকের চাপ! আর সেই মালিক কে? যিনি গাড়ি বাড়ির মালিক তিনি-ই যিনি রাস্তার কোনও নিয়ম জানেন না।

যদি নিয়মটা একশো বছর আগে আমরা মোটর গাড়ির সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম আজ আমাদের এই দশা হতো না। বা পরেও যদি আমরা শিক্ষাটা ভালো সিলেবাস করে ভালো পরিবেশে দিতে পারতাম আমাদের কূল রক্ষা হতো। এই দেশে একটা গাড়ি চালানোর ভালো স্কুল পর্যন্ত আমরা করতে পারিনি। গাড়ির মডেলের সঙ্গে যে গাড়ি চালাবার নিয়ম পর্যন্ত পাল্টে যাচ্ছে তা নিয়ে কেউ পড়ান?

দোষ ওই ড্রাইভারের নয়, দোষ আমাদের, কারণ আমরা কোনও নিয়ম শিখিনি, তাকেও শেখাইনি। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের শেখাই না রাস্তার কোন অংশে সে কেমনভাবে হাঁটবে, আমরা নিজেরাও জেব্রা ক্রসিং বা সিগন্যাল মানি না। হিসাবে দেখা যাচ্ছে দুর্ঘটনায় শতকরা হারে বেশি মারা যাচ্ছে পথচারী। রাস্তায় গাড়ির অধিকার বেশি সেটা কে না জানে! আমরা জানবো না কেন?

এখন রাস্তায় যদি একটা গাড়ি আর একটা গাড়িকে মেরে দেয়, তাহলে তার দায়টা কার?    

লেখক: পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্যে তথ্য-প্রযুক্তি প্রকল্প

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ